📄 নবী (সা)-এর চারিত্রিক সৌন্দর্য
١. عَنِ الصَّادِقِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ خُلُقًا -
১. হযরত (জা'ফর) সাদিক (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।
٢. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَا كَانَ أَحَدٌ أَحْسَنَ خُلُقًا مِنْ رَسُولِ الله ﷺ مَا دَعَاهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ وَلَا مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ إِلَّا قَالَ لَبَّيْكَ، فَلِذَلِكَ أَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ -
২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর চেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী (দুনিয়ায়) আর কোন লোক ছিল না। তাঁর সাহাবা ও পরিবারবর্গের কেউ যখন তাঁকে ডাকতেন, তখন তিনি তার জবাবে বলতেনঃ 'লাব্বায়িক' 'আমি হাযির আমি হাযির'। এ কারণেই মহান আল্লাহ্ তাঁর সম্পর্কে নাযিল করেছেন : وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।
عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ قَالَ قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ يَا لَبَّيْكَ -
৩. হযরত আবূ জা'ফর [মুহাম্মদ বাকের (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! জবাবে তিনি বললেন : 'ইয়া লাব্বায়ক'।
٤. عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِت رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ إِنَّ النَّبِيُّ ﷺ كُنَّا إِذَا جَلَسْنَا إِلَيْهِ إِنْ أَخَذْنَا بِحَدِيثٍ فِي ذِكْرِ الْآخِرَةِ أَخَذَ مَعَنَا - وَإِنْ أَخَذْنَا فِي ذِكْرِ الدُّنْيَا أَخَذَ مَعَنَا ، وَإِنْ أَخَذْنَا فِي ذِكْرِ الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ أَخَذَ مَعَنَا فَكُلُّ هُذَا أُحَدِّثُكُمْ عَنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ-
৪. হযরত যায়দ ইব্ন সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন নবী -এর কাছে বসতাম, তখন যদি আমরা আখিরাতের কথা আলোচনা শুরু করতাম, তিনিও আমাদের সাথে তাতে মশগুল হতেন। আমরা যদি দুনিয়ার আলোচনা করতাম, তিনিও আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতেন। আর আমরা যদি পানাহারের আলোচনা করতাম তিনিও তাতে অংশ নিতেন। আমি রাসূলুল্লাহ্ থেকে এ সমুদয় কথা তোমাদেরকে বলছি।
قال (خَارِجَةُ) قُلْنَا لِزَيْدِ بْنِ ثَابِت أَخْبِرْنَا عَنْ أَخْلَاقِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ عَنْ أَيِّ أَخْلَاقِهِ أَخْبِرُكُمْ كُنْتُ جَارَهُ فَإِذَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ بَعَثَ إِلَى فَاكْتُبُهُ وَكُنَّا إِذَا ذَكَرْنَا الدُّنْيَا ذَكَرُهَا مَعَنَا فَذَكَرَ مِثْلَهُ)
৫. খারিজা (র) বলেন, আমরা যায়দ ইব্ন সাবিত (রা)-কে বললাম, রাসূলুল্লাহ্ -এর চরিত্র সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করুন। তিনি বললেন, আমি তাঁর কোন্ কোন্ চরিত্র সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করবো। আমি তো তাঁর প্রতিবেশী ছিলাম। তাঁর উপর যখনই ওহী নাযিল হতো, আমাকে ডেকে পাঠাতেন। আমি তা লিখে ফেলতাম। আর আমরা যখন দুনিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতাম; তিনিও আমাদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতেন। এরপর পূর্বানুরূপ রিওয়ায়াত বর্ণনা করেন।
سَمَاكَ عَنْ جَابِرِبْنِ سَمُرَةَ قَالَ قُلْتُ لَهُ أَكُنْتَ تُجَالِسَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ نَعَمْ وَكَانَ طَوِيلَ الصِمْتِ وَكَانَ أَصْحَابُهُ يَتَنَاشَدُونَ الشِّعْرَ عِنْدَهُ وَيَذْكُرُونَ أَشْيَاءَ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ وَيَضْحَكُونَ فَيَتَبَسَّمُ مَعَهُمْ إِذَا ضَحِكُوا -
৬. সিমাক (র) বলেন, আমি জাবির ইব্ন সামুরা (রা)-কে বললাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহ্ -এর সাহচর্যে বসতেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। (আমি তাঁর সাহচর্যে বসে দেখলাম) তিনি অধিকতর নীরব থাকতেন। সাহাবা (রা) তাঁর সামনে কবিতা আবৃত্তি করতেন; জাহিলী যুগের প্রসঙ্গ আলোচনা করতেন এবং পরিহাস করতেন। তাঁরা যখন হাসতেন, তখন তিনিও মুচকি হাসতেন।
عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ أَكَلْتُ ثُوْمًا فَانْتَهَيْتُ إِلَى الْمُصَلِّي وَقَدْ سُبِقَتْ بِرَكْعَةٍ، فَلَمَّا دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ وَجَدَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَرِيحَ النُّوْمِ فَلَمَّا قَضَى صَلَاتَهُ قَالَ مَنْ أَكَلَ مِنْ هُذِهِ الشَّجَرَةَ فَلَا يَقْرَبَنَا حَتَّى يَذْهَبَ رِيحُهَا (أَفْرِيْحُهُ) فَلَمَّا قَضَيْتُ صَلَاتِي جِئْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ وَاللَّهِ لَتُعْطِينِي يَدَكَ فَأَعْطَاهُ يَدَهُ قَالَ حُمَيْدُ إِذَنْ لَيَجِدَنَّهُ سَهْلاً قَرِيبًا)
فَأَدْخَلْتُ يَدَهُ فِي كُمِّي فَوَضَعْتُهَا عَلَى صَدْرِي، فَإِذَا أَنَا مَعْصُوبَ الصَّدْرِ فَقَالَ أَمَا إِنَّ لَكَ عُدْرًا -
৭. হযরত মুগীরা ইন্ন শু'বা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি রসুন খেয়েই মসজিদে গেলাম। (সালাত) এক রাকআত আমার ছুটে ছিল। আমি মসজিদে প্রবেশ করতেই রাসূলুল্লাহ্ রসুনের গন্ধ অনুভব করলেন। সালাত শেষ করে তিনি বললেন, এই বৃক্ষ (রসুন) কেউ ভক্ষণ করলে তার গন্ধ দূর না হওয়া পর্যন্ত সে যেন আমাদের কাছে না আসে। (রাবী বলেন) আমি সালাত শেষ করে রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্র কসম! আপনি আপনার হাত মুবারক একটু আমাকে দিন। তিনি তাঁর হাতখানা আমাকে দিলেন। [হুমাইদ (র) বলেন, এ সময় তো মুগীরা নবী -কে অবশ্যই কোমল ও নিকটবর্তী পেয়ে থাকবেন]। তখন আমি তাঁর হাতখানা আমার জামার হাতার মধ্য দিয়ে আমার বক্ষের উপর রাখলাম। তখন নবী লক্ষ করলেন যে, আমার বুকের উপর একটি পট্টি বাঁধা রয়েছে। তখন তিনি বললেন : আরে তোমার তো ওযর রয়েছে।
عَنْ جَرِيرٍ أَنَّ النَّبِيَّ دَخَلَ بَعْضَ بُيُوتِهِ فَامْتَلَاَ الْبَيْتُ وَدَخَلَ جَرِيرٌ فَقَعَدَ خَارِجَ الْبَيْتِ فَابَصَرَهُ النَّبِيُّ ﷺ فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَلَقَّهُ وَرَمَى بِهِ إِلَيْهِ وَقَالَ اجْلِسَ عَلَى هُذَا فَأَخَذَهُ جَرِيرٌ وَوَضَعَهُ عَلَى وَجْهِهِ وَقَبَّلَهُ -
৮. হযরত জারীর (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী তাঁর একটি গৃহে প্রবেশ করলেন। গৃহটি লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। (তাই জারীর (রা) বসার স্থান না পেয়ে। গৃহের বাইরে বসে পড়লেন। নবী যখন তাঁকে (বাইরে বসতে) দেখলেন, তখন তিনি তাঁর কাপড় ভাঁজ করে জারীর (রা)-এর দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং বললেন, এই কাপড়টির উপর বসো। জারীর (রা) ঐ কাপড়টি তুলে তাঁর চেহারায় লাগালেন এবং চুমু দিলেন।
ফায়দা: নবী -এর ন্যায় উন্নত চরিত্রের অধিকারীর পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না যে, তিনি তাঁর গৃহের মধ্যে ফরাশে উপবিষ্ট থাকতেন এবং জারীর (রা) বাইরে মাটিতে বসবেন। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর দিকে নিজের কাপড় ছুঁড়ে দিলেন যাতে সেটি বিছিয়ে তিনি তার উপরে বসতে পারেন। কিন্তু জারীর (রা) এটা কিভাবে পছন্দ করতে পারেন যে, নবী -এর পবিত্র কাপড় মাটিতে বিছিয়ে তার উপর তিনি বসবেন। তাই তিনি ঐ পবিত্র কাপড়টি তুলে অত্যন্ত ভক্তি সহকারে নিজের চোখে লাগালেন এবং তার উপর চুমু খেলেন।
عَنْ جُبَيْرِ بْنِ نُفَيْرٍ قَالَ دَخَلْتُ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا فَسَالَتُهَا عَنْ خُلُقٍ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَتِ الْقُرْآنُ -
৯. জুবায়র ইব্ নুফায়র (র) বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ্-এর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, তাঁর চরিত্র ছিল 'আল-কুরাআন'। অর্থাৎ নবী-এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণরূপে পবিত্র কুরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা। পবিত্র কুরআনে যতগুলো চারিত্রিক দিক-নিদের্শনা দেয়া হয়েছে নবী-এর জীবন ছিল তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তব নমুনা।
١٠. عَنِ الْحَسَنُ فِي قَوْلِهِ عَزَّ وَ جَلَّ فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ قَالَ هُذَا خُلُقُ مُحَمَّدٍ نَعَتَهُ اللَّهُ عَن وَجَلٌ -
১০. ইমাম হাসান বসরী (র) কুরআন কারীমের আয়াত فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ (হে মুহাম্মদ) আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, এই ছিল মুহাম্মদ-এর চরিত্র, যা আল্লাহ্ তা'আলা বর্ণনা করেছেন।
۱۱. عَنِ الأَسْوَدِ قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كَيْفَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ يَصْنَعُ فِي أَهْلِهِ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مَهْنَةِ أَهْلِهِ فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ قَامَ فَصَلَّى
১১. আসওয়াদ (র) বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর পরিজনের সাথে কিরূপ ব্যবহার করতেন? তিনি বললেন, তিনি তাঁর পরিজনের সাথে কাজে লেগে থাকতেন। যখন সালাতের সময় হতো, তখন উঠে দাঁড়াতেন এবং সালাত আদায় করতেন।
ফায়দা : এটাই ছিল আকায়ে নামদার সরদারে দু'জাহান-এর পবিত্রতম জীবনের দৃষ্টান্ত। একদিকে তিনি ছিলেন স্বীয় উম্মতের ভাবনায় সর্বদা নিমগ্ন এবং অন্যদিকে তিনি গার্হস্থ্য কাজেও তাঁর পরিজনকে সহযোগিতা করতেন।
۱۲. عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ رَجُلٍ حَدَّثَهُ أَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا سُئِلَتْ كَيْفَ كَانَ رَسُولُ الله ﷺ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ كَانَ يَعْمَلُ كَعَمَلِ أَحَدِكُمْ فِي بَيْتِهِ، يَخِيطُ ثَوْبَهُ وَيَخْصِفُ نَعْلَهُ -
১২. হযরত হিশাম ইব্ন উরওয়া (র) জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূলুল্লাহ্ কিভাবে তাঁর গৃহে সময় কাটাতেন?
তিনি বললেন, তিনিও তোমাদের মতো গৃহস্থালীর কাজকর্মে মশগুল থাকতেন। নিজের ঝাপড় নিজে সেলাই করতেন এবং নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস থেকে জানা গেলো যে, নবী -এর গৃহ-জীবন ছিল সাধারণ মানুষের মতো। কোন সাধারণ কাজ করতেও তিনি সংকোচ বোধ করতেন না।
عَنْ عُرْوَةَ قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ يَصْنَعُ إِذَا خَلَا؟ قَالَتْ يَخِيطُ ثَوْبَهُ يَخْصِفُ نَعْلَهُ وَيَصْنَعُ مَا يَصْنَعُ الرَّجُلُ فِي أهله -
১৩. উরওয়া (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী একান্তে কি কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, তিনি তাঁর কাপড় সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন এবং একজন মানুষ তার ঘরে বসে যে সব কাজ করে থাকে, তিনি তা সবই করতেন।
١٤. عَنْ عُرْوَةَ قَالَ سُئِلَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا مِثْلَهُ عَنِ الزُّهْرِيِّ قَالَ سُئِلَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا كَيْفَ كَانَ خُلُقُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فِي بَيْتِهِ ؟ فَقَالَتْ كَأَحَدِكُمْ يَرْفَعُ شَيْئًا وَيَضَعُهُ وَكَانَ أَحَبُّ الْعَمَلِ إِلَيْهِ الحَيَاطَةُ -
১৪. হযরত উরওয়া (র) বলেন, হযরত আয়েশা (রা)-কে অনুরূপ প্রশ্ন করা হলো। যুহরী (র) বলেন, হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর গৃহের মধ্যে কি ধরনের আচরণ করতেন? তিনি বললেন, তোমরা যেরূপ কোন একটি বস্তু উপরে তুলে রাখো এবং নিচে নামিয়ে রাখো তিনিও সেরূপ করতেন। তবে সেলাই কাজই ছিল তার সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ।
ফায়দা: একজন সাধারণ মানুষ তার ঘরে বসে যেসব কাজ করে থাকে, নবী ও সে সব কাজই করতেন। "এবং সেলাই করার কাজই তাঁর সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ ছিল" এ বাক্যটি বর্ণনাকারীর নিজস্ব মন্তব্য। এতে পূর্ববর্তী রিওয়ায়াতের প্রতিই ইশারা করা হয়েছে। অর্থাৎ নবী তাঁর নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন এবং নিজের জুতা নিজে মেরামত করতেন।
١٥. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كُنْتُ الْعَبُ بِالْبَنَاتِ فِي بَيْتِ النَّبِيِّ وَكُنَّ لِي صَوَاحِبَ يَأْتِينِي فَيَلْعَبْنَ مَعِي، فَيَنْقَمِعَنَّ إِذَا رَأَيْنَ رَسُولَ اللَّهِ وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَسْرَبُهُنَّ إِلَى فَيَلْعَبْنَ مَعِي -
১৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী-এর গৃহে কাপড়ের পুতুল নিয়ে খেলা করতাম। আমার কিছু সখীও ছিল। তারা আমার কাছে এসে
আমার সাথে খেলা করত। তারা রাসূলুল্লাহ -কে আসতে দেখলে গৃহের এদিক সেদিক লুকিয়ে থাকতো। রাসূলুল্লাহ্ তাদেরকে এদিক সেদিক থেকে একত্র করে পুনরায় আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। তারা পুনরায় আমার সাথে খেলা শুরু করত।
ফায়দা : এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ্ -এর সুসামাজিকতার দর্পণ স্বরূপ। স্বীয় পরিবার পরিজনের মনরক্ষা ও সন্তোষ বিধান পদ্ধতিও এ হাদীস থেকে জ্ঞাত হওয়া যায়।
١٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ خَدِمْتُ النَّبِيَّ ﷺ تِسْعَ سِنِينَ فَمَا أَعْلَمُهُ قَالَ قَطُّ هَلاً فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا وَلَا عَابَ عَلَى شَيْئًا قَطُّ -
১৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নয় বছর পর্যন্ত নবী -এর খিদমত করেছি। কিন্তু আমার জানা নেই, তিনি কখনো আমাকে বলেছেন, তুমি এরূপ কেন করেছো? এবং তিনি কখনো আমার কোনো কাজে সামান্যতম দোষও ধরেননি।
ফায়দা : এই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ -এর অনুপম চরিত্রের নমুনা। এ যুগে কাজের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহারকারীরা এই হাদীসটির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখবেন এবং নবী -এর এই মহান কর্মপদ্ধতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন।
۱۷. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ سَأَلْتُ أَبِي عَنْ دُخُولِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ دُخُولُهُ لِنَفْسِهِ مَانُونَا لَهُ فِي ذَلِكَ، وَكَانَ إِذَا أَتَى إِلَى مَنْزِلِهِ جَزْء دُخُولَهُ ثَلَاثَةٌ أَجْزَاء جُزْء لِلَّهِ وَجُزْء لِأَهْلِهِ وَجُزْءُ لِنَفْسِهِ ثُمَّ يَجْعَلُ جُزَاهُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَرُدُّ ذَلِكَ عَلَى الْعَامَّةِ بِالْخَاصَّةُ وَلَا يَدَّخِرُ عَنْهُمْ شَيْئًا فَكَانَ مِنْ سِيَرْتِهِ فِي جُزْء الامَّةِ إِبْثَارُ أَهْلِ الْفَضْلِ بِإِذْنِهِ وَقِسْمَتِهِ عَلَى قَدْرِ فَضْلِهِمْ فِي الدِّينِ مِنْهُمْ ذُو الْحَاجَةِ وَمِنْهُمْ ذُو الْحَاجَتَيْنِ وَمِنْهُمْ ذُو الْحَوَائِجِ فَيَسْتَغِلُ بِهِمْ وَيَشْغُلُهُمْ فِيْمَا يُصْلِحُهِمَ وَالأُمَّةَ مِنْ مَسْأَلَتْهِ عَنْهُمْ وَأَخْبَارِهِمْ بِالَّذِي يَنْبَغِي لَهُمْ يَقُولُ لَيُبَلِّغ الشَّاهِدُ مِنْكُمُ الغَائِبَ وَأَبْلِغُوْنِي حَاجَةً مَنْ لا يَسْتَطِيعُ إِبْلَاغِى حَاجَتَهُ فَأَنَّهُ مَنْ اَبْلَغَ سُلْطَانًا حَاجَةً مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ إِبْلَاغَهَا ثَبَّتَ اللهُ قَدَمَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يَذْكُرُ عِنْدَهُ إِلَّا ذَلِكَ وَلَا يُقْبَلُ مِنْ أَحَدٍ غَيْرَهُ قَالَ فِي حَدِيْثِ سُفْيَانَ بْنِ وَكِيعٍ يَدْخُلُوْنَ رَوَادًا وَلَا يَتَفَرَّقُوْنَ إِلَّا عَنْ ذَوَاقِرٍ وَيَخْرُجُونَ أَدِلَّةً يَعْنِي فُقَهَاءَ - قُلْتُ فَأَخْبِرْنِي عَنْ مَخَرَجِهِ كَيْفَ كَانَ يَصْنَعُ فِيهِ ؟
قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَخْزُنُ لِسَانَهُ إِلَّمَا يَعْنِيهِمْ وَيُؤَلْفُهُمْ وَلَا يُفَرِّقُهُمْ، يُكْرِمُ كَرِيْمَ كُلَّ قَوْمٍ وَيُوَلِّيْهِ عَلَيْهِمْ وَيَحْذَرُ النَّاسَ وَيَحْتَرِسُ عَنْهُمْ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَطْوِيَ عَنْ أَحَدٍ بِشْرَهُ وَخُلْقَهُ، وَيَتَفَقَّدُ أَصْحَابَهُ وَيَسْئَلُ النَّاسَ عَمَّا فِي النَّاسِ وَيُحَسِّنُ الْحَسَنَ وَيُصَوِّبُهُ، وَيُقَبِّحُ القَبِيْحَ وَيَذُمُّهُ، مُعْتَدِلُ الْأَمْرِ غَيْرُ مُخْتَلِفٍ، لَا يَغْفُلُ مَخَافَةَ أَنْ يَغْفُلُوا أَوْيَمَلُّوا، لِكُلِّ حَالِ عِنْدَهُ عُتَادُ، لَا يَقْصُرُ عَنِ الْحَقِّ وَلَا يُجَاوِزُهُ إِلَى غَيْرِهِ الَّذِينَ يَلُوْنَهُ مِنَ النَّاسِ خِيَارُهُمْ وَأَفْضَلُهُمْ عِنْدَهُ أَعَمُّهُمْ نَصِيْحَةً وَأَعْظَمُهُمْ عِنْدَهُ مَنْزِلَةً أَحْسَنُهُمْ مُوَاسَاةً وَمُوَازَرَةٌ، وَسَأَلَتُهُ عَنْ مَجْلِسِهِ فَقَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَا يَجْلِسُ وَلَا يَقُوْمُ إِلَّا ذَكَرَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَلَا يُوْطِنُ الْأَمَاكِنَ وَيَنْهَى عَنْ إِيْطَانِهَا وَإِذَا جَلَسَ إِلَى قَوْمٍ جَلَسَ حَيْثُ يَنْتَهِي بِهِ الْمَجْلِسُ وَيَأْمُرُ بِذَلِكَ وَيُعْطِي كُلَّ جُلَسَائِهِ بِنَصِيْبِهِ لَا يَحْسِبُ أَحَدٌ مِنْ جُلَسَائِهِ أَنَّ أَحَدًا أَكْرَمُ عَلَيْهِ مِنْهُ مَنْ جَالَسَهُ أَوْ قَاوَمَهُ لِحَاجَةٍ صَابِرَهُ حَتَّى يَكُوْنَ هُوَ الْمُنْصَرِفُ وَمَنْ سَأَلَهُ حَاجَةً لَمْ يَنْصَرِفْ إِلَّا بِهَا أَوْ بِمَيْسُوْرٍ مِنَ الْقَوْلِ-
قَدْوَسَّعَ النَّاسُ مِنْهُ خُلُقَهُ فَصَارَ لَهُمْ أَبًا وَصَارُوا عِنْدَهُ فِي الْحَقِّ سِوَاءٌ مَجْلِسُهُ مَجْلِسُ حِلْمٍ وَحَيَاء وَصِدْقٍ وَأَمَانَةٍ لَا تُرْفَعُ فِيهِ الأَصْوَاتُ وَلَا تُؤْبَنُ فِيْهِ الْحُرْمُ وَلَا تَنْثَنِيْ فَلْتَاتُهُ مُعْتَدِيْنَ يَتَوَاصَلُوْنَ بِالتَّقْوَى مُتْوَاضِعِيْنَ يُوَقِّرُونَ فِيْهِ الْكَبِيْرَ وَيَرْحَمُوْنَ فِيْهِ الصَّغِيرَ وَيُؤْثِرُونَ ذَالْحَاجَةِ وَيَحْفَظُوْنَ الْغَرِيبَ -
قُلْتُ كَيْفَ كَانَتْ سِيْرَتُهُ فِي جُلَسَائِهِ؟ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ دَائِمَ الْبِشْرِ سَهْلَ الْخُلُقِ لَيِّنَ الْجَانِبِ لَيْسَ بِفَظٍ وَلَا عَلِيْظٍ وَلَا صَخَّابٍ فِي الْأَسْوَاقِ وَلَا فَاحِشًا وَلَا عَيَّابًا وَلَا مَدَّاحًا يَتَغَافَلُ عَمَّا لَا يَشْتَهِي وَيُؤْيَسُ مِنْهُ وَلَا يُجِيبُ فِيْهِ قَدْتَرَكَ نَفْسَهُ مِنَ ثَلَاثَ الْمِرَاءِ وَالإِكْثَارِ وَمَا لَا يَعْنِيْهِ، وَتَرَكَ النَّاسَ مِنْ ثَلَاثٍ، كَانَ لَا يَذُمُّ أَحَدًا وَلَا يُعِيْرُهُ وَلَا يَطْلُبُ عَوْرَاتِهِ وَلَا يَتَكَلَّمُ إِلَّا فِيمَا رَجَا ثَوَابَهُ إِذَا تَكَلَّمَ أَطْرَقَ جُلَسَاؤُهُ كَأَنَّمَا عَلَى رُوسِهِمْ الطَّيْرُ، وَإِذَا سَكَتَ تَكَلَّمُوا وَلَا يَتَنَازَعُونَ عِنْدَهُ الْحَدِيثَ مَنْ تَكَلَّمَ أَنْصَتُوْالَهُ حَتَّى يَفْرُغَ حَدِيثُهُمْ عِنْدَهُ حَدِيثُ أَوْلَهُمْ يَضْحَكُ مِمَّا يَضْحَكُونَ وَيَتَعَجَّبُ مِمَّا يَتَعَجَبُونَ، وَيَصْبُرُ لِلْغَرِيبِ عَلَى الْجَفَوْةِ فِي مَنْطِقِهِ وَمَسْأَلِتْهِ حَتَّى إِنْ كَانَ أَصْحَابُهُ لَيَسْتَجِلُونَهُمْ فَيَقَوْلُ إِذَا رَأَيْتُمْ طَالِبٌ الحَاجَةِ يَطْلُبُهَا فَارَقْدُوهُ وَلَا يَقْبَلُ الثَّنَاءَ إِلَّا مِنْ مُكَافٍ، وَلَا يَقْطَعُ عَلَى أَحَدٍ حَدِيثَهُ حَتَّى يَجُوزَ فَيَقْطَعُهُ بِنَهْيِ أَوْ قِيَامٍ، فَسَأَلْتُ كَيْفَ كَانَ سُكُوتُ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ قَالَ كَانَ سُكُوتُ رَسُولِ اللهِ ﷺ عَلَى أَرْبَعُ عَلَى الْحِلْمِ وَالْحَدْرِةِ التَّقْدِيرِ والتَّفْكِيْرِ، فَأَمَّا تَقْدِيرُهُ فَفِي تَسْوِيَهُ النَّظَرِ وَالإِسْتِمَاعِ مِنَ النَّاسِ وَأَمَّا تَفْكِيْرُهُ فَفِيْمَا يَبْقَى وَلا يَفْنِي وَجُمِعَ لَهُ الْحِلْمُ فِي الصَّبْرِ فَكَانَ لَا يَغْضُبُهُ شَتَّى وَلَا يَسْتَفِزُّهُ، وَجُمِعَ لَهُ الْحَذَرُ فِي أَرْبَعِ أَخْذَهُ بِالْحُسْنِ لِيُقْتَدَى بِهِ، وَتَرْكُهُ القَبِيحَ لِيُنْتَهَى عَنْهُ وَاجْتِهَادُهُ الرَّأى فِيمَا أَصْلَحَ أَمُتَهُ، وَالقِيَامُ فِيْمَا هُوَ خَيْرُ لَهُمْ جَمَعَ لَهُمْ خَيْرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ .
১৭. হযরত হাসান ইব্ন আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে [হযরত আলী (রা)-কে) নবী -এর গৃহ-মধ্যকার কাজকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর এ অনুমতি ছিল যে, যখনই ইচ্ছা করতেন, তখনই তিনি গৃহে প্রবেশ করতে পারতেন। (তবুও) তাঁর অভ্যাস ছিল, যখনই গৃহে গমন করতেন, তাঁর সময়কে তিন ভাগ করতেন। এক ভাগ আল্লাহর ইবাদতের জন্য, দ্বিতীয় ভাগ নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য এবং তৃতীয় ভাগ নিজের আরামের জন্য। আবার নিজ আরামের সময়টুকুও লোকজনকে দিয়ে দিতেন। আর তা এইভাবে যে, বিশেষদের মাধ্যমে তার উপকারিতাও সাধারণদের মধ্যে ফিরিয়ে দিতেন। অর্থাৎ ঐ সময় বিশেষ বিশেষ সাহাবা কিরাম প্রবেশ করতেন এবং তাঁর কাছে দীনী মাসায়েল ও মর্মকথা শ্রবণ করে সাধারণ লোকদের মধ্যে পৌঁছে দিতেন। তাঁদের কাছে কোনো কথা গোপন রাখতেন না অর্থাৎ দীন ও দুনিয়ার লাভজনক সব কথাই বলতেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, উম্মতের জন্য নির্ধারিত সময়ে স্বীয় ইচ্ছা অনুযায়ী জ্ঞানীদেরকে প্রাধান্য দিতেন এবং ঐ সময়ের বণ্টনে দীনী মর্যাদা হিসাবে তারতম্য ঘটতো। তাদের মধ্যে কারো থাকতো একটি কাজ, কারো দু'টি কাজ এবং কারো কয়েকটি কাজ। তিনি তাদের কাজে লেগে যেতেন এবং তাদেরকেও ঐসব কাজে মশগুল রাখতেন। তাতে তাদের এবং উম্মতের সংশোধন হতো। তিনি তাদের সমস্যাবলি জানতে চাইতেন এবং তাদের অবস্থা অনুযায়ী তাদেরকে পরামর্শ দিতেন। বলতেন, যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন তা অনুপস্থিতদেরকে পৌঁছে দেয়। (তিনি বলতেন) আমাকে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন অবগত করো, যে তার প্রয়োজন আমার কাছে পৌঁছাতে পারে না। কেননা যে ব্যক্তি আমীর (প্রশাসক) পর্যন্ত এমন কোনো ব্যক্তির প্রয়োজনকে পৌছে দিয়েছে, যে তার নিজের প্রয়োজন ঐ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা ঐ ব্যক্তিকে দৃঢ়পদ রাখবেন। এ কথাই তাঁর কাছে আলোচিত হতো এবং এ ছাড়া তিনি কারো কোনো কথা পছন্দ করতেন না।
সুফিয়ান ইব্ন ওয়াকী'র রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবা তাঁর (নবী) কাছে ইলম ও দীন অন্বেষী হয়ে যেতেন এবং স্বাদ না নিয়ে সেখান থেকে ফিরতেন না। আর যখন বের হতেন, তখন পথ-প্রদর্শক হয়ে বের হতেন। বর্ণনাকারী পথ-প্রদর্শকের ব্যাখ্যা করেছেন 'ফুকাহা' শব্দ দ্বারা (অর্থাৎ দীনের অগাধ পাণ্ডিত্য নিয়ে উঠে আসতেন)।
হযরত হুসাইন (রা) বলেন, তারপর আমি (আমার পিতাকে) জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর (নবী) গৃহের বাইরের কাজকর্ম সম্পর্কে কিছুটা বলুন। অর্থাৎ গৃহের বাইরে তিনি কি কাজকর্ম করতেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ অনর্থক কথাবার্তা থেকে স্বীয় রসনা মুবারককে রক্ষা করতেন। মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতেন। বিচ্ছিন্ন হতে দিতেন না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতেন এবং তাকেই তাদের নেতা ও অভিভাবক বানাতেন। তিনি মানুষের সাথে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে সব সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু কারো সাথে স্বীয় আন্তরিকতা ও প্রফুল্লচিত্ততার ক্ষেত্রে তারতম্য করতেন না। স্বীয় সঙ্গীদের খোঁজ-খবর নিতেন। মানুষকে তাদের হাল অবস্থা জিজ্ঞেস করতেন। ভাল কথাকে ভাল বলতেন এবং তার প্রশংসা করতেন। আর মন্দ কথাকে মন্দ বলতেন এবং তার নিন্দা করতেন। প্রত্যেক কাজে তাঁর ভারসাম্য বজায় থাকতো, এদিকে-ওদিকে ঝুঁকে পড়তেন না। তিনি মানুষের প্রতি সর্বদা খেয়াল রাখতেন যাতে তারা অমনোযোগী না হয়ে পড়ে কিংবা অতিষ্ঠ হয়ে না ওঠে। প্রত্যেক অবস্থার জন্যই তাঁর নিকট তার উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতো। সত্য গ্রহণেও ত্রুটি করতেন না এবং সত্য ত্যাগ করেও অন্য দিকে চলে যেতেন না। তাঁর সঙ্গী-সাথীরা ছিলেন উত্তম লোক। তাঁর কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সবার মঙ্গল কামনা করতেন। এবং তাঁর কাছে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদাশীল ছিলেন সেই ব্যক্তি, যেনি তাদের সমব্যথী ও সাহায্য-সহায়তার ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম।
(হযরত হুসাইন (রা) বলেন,) এরপর আমি (আমার পিতাকে) রাসূলুল্লাহ্-এর মজলিস ও উঠাবসার অবস্থা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ উঠতে বসতে আল্লাহ্র যিকর করতেন। তিনি কোনো স্থানকে নিজের জন্য নির্ধারিত করতেন না এবং অন্য লোককেও এরূপ করতে নিষেধ করতেন। তিনি যখন মানুষের সাথে বসতেন, তখন যেখানেই বসার স্থান পেতেন বসে পড়তেন এবং মানুষকেও এরূপ করতে নির্দেশ দিতেন। তিনি তাঁর মজলিসের প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দান করতেন। কেউ একথা অনুভব করতো না যে, সে ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি তাঁর বেশি প্রিয় ব্যক্তি। যে ব্যক্তি (কোনো প্রয়োজন) তাঁর কাছে এসে বসতো কিংবা উঠে যেত তিনি তার সাথে নিজেকে সেই সময় পর্যন্ত আটকে রাখতেন যে পর্যন্ত সে নিজেই চলে না যেত। কেউ যদি তাঁর কাছে কোনো কিছু চাইতে আসতো, সে তার বাসনা পূরণ করে ফিরে যেতো কিংবা কোমল ব্যবহার ও সান্ত্বনা নিয়ে ফিরে যেতো। তাঁর ব্যবহার সমস্ত লোকের জন্য সমান ছিল। (স্নেহ-মমতার ক্ষেত্রে) তিনি ছিলেন তাঁদের পিতা। আর লোকেরা সব (অধিকারের ক্ষেত্রে) তাঁর কাছে ছিল সমান। তাঁর মজলিস ছিল ধৈর্যশীলতা, লজ্জাশীলতা, সত্যতা ও আমানতের মজলিস। সেখানে উচ্চৈঃস্বরে কথাবার্তা হতো না। কারো ইযযত-আব্রুর উপর কলংক আরোপ করা হতো না। কারো দোষত্রুটি সমালোচিত হতো না। সভার সদস্যদের মধ্যে সংযত ভাব ছিল। তাওয়া বজায় থাকতো। পরস্পরে ভদ্রতা ও নম্র আচরণ করতো। বড়দের শ্রদ্ধা করতো, ছোটদের স্নেহ করতো। অভাবগ্রস্তদের প্রাধান্য দিতো। অপরিচিত আগন্তুকদের প্রতি খেয়াল রাখতো।
হযরত হুসাইন (রা) বলেন, তারপর আমি (আমার পিতাকে) জিজ্ঞেস করলাম। তিনি তাঁর সভার সদস্যদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করতেন? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ তাঁদের সাথে আনন্দচিত্তে মিলিত হতেন। তিনি নম্র ও বিনয়ী ছিলেন। কঠোর ও দুর্বিনীত ছিলেন না। তিনি হাট-বাজারে হৈহুল্লোড় করতেন না। অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করতেন না। কাউকে দোষারোপ করতেন না। কারো অহেতুক প্রশংসাও করতেন না। অপছন্দনীয় জিনিস থেকে তিনি দূরে থাকতেন এবং এ ব্যাপারে মানুষ তাঁর সম্পর্কে নিরাশ হতো। তিনি সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্যও করতেন না। তিনটি বিষয় থেকে তিনি নিজকে দূরে রেখেছিলেন। এক. ঝগড়া-বিবাদ থেকে, দুই. বেশি কথা বলা থেকে, তিন. অর্থহীন কাজ থেকে। তিনটি বিষয় থেকে তিনি অন্য মানুষকে রক্ষা করেছিলেন। এক. কারো কুৎসা রটনা করতেন না। দুই. কাউকে লজ্জা দিতেন না। তিন. কারো দোষ অন্বেষণ করতেন না। যে কথা বললে সাওয়াবের আশা করা যেতো, তিনি তাই বলতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন সভাসদগণ তাঁদের গর্দান এমনভাবে ঝুঁকিয়ে রাখতেন যেনো তাঁদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। তিনি যখন কথা বন্ধ করতেন তখন অন্যরা কথা বলতেন। তাঁর সামনে কেউ কারো কথার প্রতিবাদ করতেন না। যখন কেউ কোনো কথা শুরু করতেন, তখন অন্যরা তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকতেন। তাদের মধ্যে প্রত্যেকের কথাই তাঁর কাছে ততটুকু গুরুত্বের অধিকারী হতো, যতটুকু গুরুত্ব পেতো প্রথম ব্যক্তির কথা। সবাই যে কথা শুনে হাসতো, তিনিও তাতে হাসতেন। সবাই যাতে আশ্চর্য হতো, তিনিও তাতে আশ্চর্য হতেন। আগন্তুকের অসংলগ্ন কথাবার্তা ও প্রশ্নাবলি তিনি ধৈর্যসহকারে শ্রবণ করতেন। তাঁর সাহাবীগণ এরূপ লোকদেরকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতেন (যাতে তাদের প্রশ্নাবলি থেকে নতুন বিষয় জানা যায়)। তিনি বলতেন, তোমরা যখন কোনো অভাবগ্রস্তকে তার অভাব দূর করার প্রার্থনা করতে দেখো, তখন তাকে সাহায্য করো। কেউ তাঁর প্রশংসা করুক, তিনি তা পছন্দ করতেন না। তবে কেউ কৃতজ্ঞতা বশত কিছু বললে তা ছিল স্বতন্ত্র। তিনি কারো কথার প্রতিবাদ করতেন না। অবশ্য সে যদি সীমা অতিক্রম করে যেতো, তবে তার কথার প্রতিবাদ করতেন। হয়তো তাকে নিষেধ করতেন কিংবা সেখান থেকে তিনি উঠে দাঁড়াতেন।
(হযরত হাসান (রা) বলেন। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চুপ থাকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্-এর চুপ থাকা ছিল চারটি কারণে। এক. সহনশীলতার কারণে, দুই. সাবধানতার দরুন, তিন. আন্দাজ করার উদ্দেশ্যে ও চার. চিন্তা-ভাবনা করার জন্য। তাঁর আন্দাজ করা ছিল অবস্থার উপর পূর্ণ চিন্তা-ভাবনা করা এবং মানুষের আলাপ-আলোচনা শ্রবণ করা। আর তিনি চিন্তা-ভাবনা করতেন সেসব বিষয়ে, যা অবশিষ্ট থাকে এবং বিলীন হয় না। আর সহনশীলতা তাঁর ধৈর্যের মধ্যেই একত্র করা হয়েছিল। অর্থাৎ কোনো বিষয় তাঁকে ক্রুদ্ধও করতে পারতো না এবং অস্থিরও করতে পারতো না। আর সাবধানতা তাঁর জন্য চারটি জিনিসের মধ্যে একত্র করা হয়েছে। (আর তা হচ্ছে) তিনি উত্তম বস্তুটি গ্রহণ করতেন, যাতে মানুষ তাঁকে গ্রহণ করে এবং তিনি মন্দ বস্তু পরিত্যাগ করতেন, যাতে মানুষ তা থেকে বিরত থাকে। এবং যে জিনিসে তাঁর উম্মতের সংশোধন হতো, তিনি তার পক্ষে জোরালো মত প্রকাশ করতেন আর যাতে তাদের কল্যাণ হতো, তিনি সে বিষয়ে সক্রিয় থাকতেন। এভাবে তিনি তাঁর উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণকে সমন্বিত করেছিলেন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ قَالَ صَحِبْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَشَرَ سِنِينَ، وَشَمَمْتُ العِطر كُلَّهُ فَلَمْ أَشُمَّ نِكْهَةً أَطَيْبَ مِنْ نِكْهَتِهِ، وَكَانَ إِذَا لَقِيْهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ قَامَ مَعَهُ فَلَمْ يَنْصَرِفْ حَتَّى يَكُونَ الرَّجُلُ يَنْصَرِفُ عَنْهُ، وَإِذَا لَقِيَهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فَتَنَاوَلَ يَدَهُ نَاوَلَهَا إِيَّاهُ فَلَمْ يَنْزِعُ مِنْهُ حَتَّى يَكُوْنَ الرَّجُلُ هَوَالَّذِي يَنْزِعُ عَنْهُ، وَإِذَا لَقِيَهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فَتَنَاوَلَ أُذُنَهُ نَاوَلَهَا إِيَّاهُ فَلَمْ يَنْزِعُهَا عَنْهُ حَتَّى يَكُونَ الرَّجُلُ هُوَ الَّذِي يَنْزِعُهَا عَنْهُ -
১৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দশ বছর পর্যন্ত আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাহচর্যে ছিলাম এবং সব রকমের আতরের আমি ঘ্রাণ নিয়েছি। কিন্তু তাঁর মুখের ঘ্রাণ থেকে উত্তম কোনো ঘ্রাণ আমি শুকিনি। সাহাবাদের মধ্যে কারো সাথে যখন তাঁর সাক্ষাৎ হতো, তখন তিনি তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং যে পর্যন্ত তিনি তাঁর থেকে পৃথক না হতেন, তিনি নিজে তাঁর থেকে পৃথক হতেন না। আর যখন কোনো সাহাবী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার সময় তাঁর হাত মুবারক তাঁর হাতে নিতেন তখন যে পর্যন্ত ঐ সাহাবী তাঁর হাত গুটিয়ে না নিতেন, তিনি তাঁর হাত মুবারক গুটিয়ে নিতেন না। আর কোনো সাহাবী যখন তাঁর সাথে মিলিত হয়ে তাঁর কানে কানে কোনো কথা বলতে চাইতেন, তখন তিনি তাঁর কান তার দিকে পেতে দিতেন এবং সেই সময় পর্যন্ত তাঁর কান সরিয়ে আনতেন না, যে পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি নিজে না সরিয়ে নিতেন।
۱۹. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَتَتْ بِى أُمِّي إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ هُذَا خُوَيْدِمُكَ، فَخَدَمْتُ النَّبِيُّ تِسْعَ سِنِينَ فَمَا قَالَ لِي لِشَيْ قَطُّ أَسَأَتَ وَلَا بِئْسَ مَا صَنَعْتَ -
১৯. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মাতা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ -এর খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এই আপনার ছোট সেবক। তারপর আমি নয় বছর পর্যন্ত নবী -এর সেবা করলাম। (এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে) তিনি কখনো আমাকে বলেননি যে, তুমি এ কাজটি ভাল করোনি কিংবা তুমি এ কাজটি খারাপ করেছো।
٢٠. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ وَقَفَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَلَى بَابِ حُجْرَتِي وَالْحَبَشُ يَلْعَبُوْنَ بِحَرَابِهِمْ فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقُمْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِمْ فَقَامَ يَسْتُرُ نِي بِرِدَا نِهِ حَتَّى انْصَرَفْتُ أَنَا مِنْ قِبَلِ نَفْسِي فَاقْدُرُوا قَدْرَ الْجَارِيَةِ الْحَدِيثَةِ السِّنِ الْحَرِيْصَةِ عَلَى اللَّهْوِ -
২০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমার হুজরার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাবশী লোকেরা তখন মসজিদে নবীতে যুদ্ধের কসরত দেখাচ্ছিল। আমিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কসরত দেখছিলাম। তখন তিনি আমাকে তাঁর চাদর দ্বারা আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং যে পর্যন্ত আমি সেখান থেকে সরে না এসেছি, তখন পর্যন্ত তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তোমরা অনুমান করো, একজন অল্প বয়সী বালিকার খেলাধুলার প্রতি কতখানি আগ্রহ থাকতে পারে (এবং তিনি কত দীর্ঘসময় পর্যন্ত তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন)।
۲۱ . عَنْ يَزِيدَ بْنِ بَابْنُوسٍ قَالَ دَخَلْتُ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا فَقُلْتُ يَا أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ مَا كَانَ خُلُقُ رَسُولِ اللهِ ﷺ قَالَتْ كَانَ خُلُقُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ القُرْآنُ ثُمَّ قَالَتْ أَتَقْرَؤُنَ سَوْرَةَ الْمُؤْمِنِينَ؟ قُلْنَا نَعَمْ، قَالَتْ اقْرًا، فَقَرَأَتُ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُوْنَ وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ - فَقَالَتْ هُكَذَا كَانَ خُلُقُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
২১. হযরত ইয়াযীদ ইব্ন বাবনূস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রা) -এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে উম্মুল মু'মিনীন! রাসূলুল্লাহ্ -এর চরিত্র কিরূপ ছিল? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর চরিত্র ছিল কুরআন। তারপর বলেন, তোমরা কি সূরা মু'মিনূন পড়ো না? আমরা বললাম, হ্যাঁ, পড়ি। তিনি বলেন, পড়ো, তখন আমি পড়লাম "অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ; যারা বিনয়-নম্র নিজেদের সালাতে; যারা অসার ক্রিয়াকলাপ হতে বিরত থাকে; যারা যাকাত দানে সক্রিয়; যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে।" তারপর হযতর আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর চরিত্র এরূপই ছিল।
٢٢ . عَنْ خَارِجَةَ أَنَّ نَفَرًا مِنْ أَهْلِ الْعِرَاقِ دَخَلُوا عَلَى زَيْدِ بْنِ ثَابِت فَقَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَإِذَا ذَكَرْنَا الدُّنْيَا ذَكَرَهَا مَعَنَا، وَإِذَا ذَكَرْنَا الطَّعَامُ ذَكَرَهُ مَعَنَا -
২২. হযরত খারিজা (রা) থেকে বর্ণিত, হযরত যায়িদ ইব্ন্ন সাবিত (রা)-এর কাছে কিছু লোক ইরাক থেকে আগমন করলো। তিনি বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর সাহচর্যে ছিলাম। আমরা যখন দুনিয়ার প্রসঙ্গে আলোচনা করতাম তিনিও আমাদের সাথে ঐ প্রসঙ্গ আলোচনা করতেন। আমরা যখন আখিরাত প্রসঙ্গ আলোচনা করতাম, তিনিও আমাদের সাথে ঐ প্রসঙ্গে আলোচনা করতেন। আমরা যখন আহার সম্পর্কে আলোচনা করতাম, তিনিও আমাদের সাথে সে বিষয়ে আলোচনা করতেন।
٢٣ . عَنْ عُمْرَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنَ قَالَتْ قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كَيْفَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا خَلا ؟ قَالَتْ كَانَ أَبَرَّ النَّاسِ وَأَكْرَمَ النَّاسِ ضَحَاكًا بَسَامًا -
২৩. উমরাহ বিন্ত আবদুর রহমান (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ্ একান্তে কিভাবে কাটাতেন? তিনি বললেন, তিনি ছিলেন সবচেয়ে পুণ্যবান ও ভদ্র এবং খুব হাসিখুশি ব্যক্তিত্ব।
٢٤ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ جُزْءٍ يَقُوْلُ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ -
২৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন হারিস ইব্ন জুই (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চেয়ে অধিক হাসিখুশি লোক দেখিনি।
٢٥ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ امْرَأَةً كَانَ فِي عَقْلِهَا شَى فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي إِلَيْكَ حَاجَةً فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا أُمَّ فُلَانٍ خُذِي فِي أَيِّ الطَّرِيقِ شِئْتِ قَوْمِي فِيْهِ حَتَّى أَقُوْمَ مَعَكِ ؟ فَخَلَا مَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُنَاجِيْهَا حَتَّى قَضَتْ حَاجَتَهَا.
২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক স্ত্রীলোকের বুদ্ধিতে কিছুটা ত্রুটি ছিল। সে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। রাসূলুল্লাহ্ বললেন, হে অমুকের মা! তুমি যে কোনো এক রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াও। যাতে আমিও তোমার সাথে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। তারপর তিনি তার সাথে গিয়ে একান্তে কথাবার্তা বললেন-যে পর্যন্ত না ঐ স্ত্রীলোকটি তার প্রয়োজন পূর্ণ করেন।
٢٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ إِنْ كَانَتْ الْوَلِيدَةُ مِنْ وَلَا ئِدِ الْمَدِينَةِ تَجِي فَتَأْخُذُ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَمَا يَنْزِعُ يَدَهُ مِنْ يَدِهَا حَتَّى تَذْهَبَ بِهِ حَيْثُ شَاءَتْ -
২৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদীনার ছোট্ট মেয়েদের মধ্যে কোনো এক মেয়ে রাসূলুল্লাহ্-এর কাছে আসতো এবং তাঁর হাত ধরতো। তিনি মেয়েটির হাত থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নিতেন না। সে যেখানে ইচ্ছা তাঁকে হাত ধরে নিয়ে যেতো।
۲۷. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَتْ أَلَامَةُ مِنْ إِمَاءِ أَهْلِ الْمَدِينَةِ لِتَأْخُذُ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَيَدُورُ بِهَا فِي حَوَا نِجِهَا حَتَّى تَفْرُغَ ثُمَّ تَرْجِعُ -
২৭. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদীনাবাসী দাসীদের মধ্য থেকে কোন এক দাসী এসে রাসূলুল্লাহ্-এর হাত ধরতো। তিনি তাকে সাথে নিয়ে তার প্রয়োজনের জন্য ঘুরে বেড়াতেন যে পর্যন্ত সে তার কাজ শেষ করে ফিরে না যেতো।
۲۸. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ رَجُلاً قَطُّ أَخَذَ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَيَتُرُكُ يَدَهُ حَتَّى يَكُوْنَ الرَّجُلُ هُوَ يَنْزِعُ يَدَهُ -
২৮. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কখনো এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, যে রাসূলুল্লাহ্-এর হাত নিজের হাতে নিয়েছে আর তিনি তাঁর হাত ছেড়ে দিয়েছেন, যে পর্যন্ত সে নিজেই তার হাত গুটিয়ে না নিতো।
۲۹. وَزَادَ فِي رِوَايَةِ وَمَا رَأَيْتُ رَجُلاً قَطُّ التَقَمَ أُذُنُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَيُنَحِي رأْسَهُ حَتَّى يَكُوْنَ هُوَ الَّذِي يَنْحَى رَأْسَهُ يَعْنِي الرَّجُلَ -
২৯. হযরত আনাস (রা)-এর অন্য এক রিওয়ায়াতে আরো বর্ণিত আছে যে, (তিনি বলেন) আমি কখনো এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, যে রাসূলুল্লাহ্ -এর কানে কানে কোন কথা বলার জন্য তাঁর দিকে ঝুঁকেছে আর তিনি তাঁর শির তার দিক থেকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন যে পর্যন্ত সে তার নিজের মাথা সরিয়ে না নিতো।
٣٠ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ رَبَّمَا نَزَلَ عِنْدَ الْمِنْبَرِ وَقَدْ أُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَيَعْرِضُ الرَّجُلُ فَيُحَدِّثُهُ طَوِيلاً ثُمَّ يَتَقَدَّمُ إِلَى الصَّلاةِ -
৩০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কখনো এমনও হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সালাতের জন্য মিম্বার থেকে নেমেছেন। সালাতের ইকামতও বলা হয়েছে, এমন সময় কোন ব্যক্তি তাঁর সামনে এসে লম্বা আলাপ জুড়ে দিয়েছে। আলাপ শেষ হওয়ার পর তিনি সালাতের জন্য অগ্রসর হয়েছেন।
٣١. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ الْمُؤَذِّنَ أَوْ بِلالًا كَانَ يُقِيمُ فَيَدْخُلُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَيَسْتَقْبِلُهُ الرَّجُلُ فَيُقِيمُ مَعَهُ حَتَّى يَخْفِقَ عَامَّتُهُمْ بِرُوسِهِمْ -
৩১. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুয়াযযিন (কিংবা বলেন, বিলাল) ইকামত বলতো এবং রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে প্রবেশ করতেন। এরপর কোনো ব্যক্তি তাঁর সামনে আসতো এবং তিনি তার সাথে এতো দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তন্দ্রায় লোকদের মাথা ঢুলতে থাকত।
٣٢ عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَقَدْ خَدِمْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ عَشَرَ سِنِينَ، فَوَاللَّهِ مَا قَالَ لِي أَفْ قَطُّ، وَلَمْ يَقُلْ لِشَيْ فَعَلْتُهُ لِمَ فَعَلْتَ كَذَا أَوْكَذَا؟ وَلَا لِشَيْ لَمْ أَفْعَلْهُ أَلَّا فَعَلْتَ كَذَا؟
৩২. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ -এর খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাজে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি। আমার কোন কাজে তিনি একথাও বলেননি যে, তুমি এ কাজটি কেন করেছো? আর কোনো কাজ না করলে তিনি একথাও বলেননি যে, তুমি এ কাজটি কেন করলে না?
عَنْ أَنَسٍ قَالَ خَدَمْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَلَمْ يُعَيِّرْ عَلَى شَيْئًا قَطُّ أَسَاتُ - فِيهِ
৩৩. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি আমার কোনো ত্রুটিতে কখনো আমাকে লজ্জা দেননি।
৩৪. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَجِيْنُ إِلَيْنَا وَأَخُ لِى صَغِيرُ فَيَقُولُ يَا أَبَا عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟
৩৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাদের বাড়িতে আগমন করতেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিল। তিনি (কৌতুক করে তাকে) বলতেন, হে আবূ উমায়র! কোথায় গেল তোমার নুগায়র?
৩৫. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُخَالِطُنَا وَيَغْشَانَا، وَكَانَ مَعَنَا صَبِيٌّ يُقَالُ لَهُ أَبُو عُمَيْرٍ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا أَبَا عُمَيْرُ مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟
৩৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাদের সাথে সদ্ভাব রাখতেন এবং আমাদের এখানে আসা-যাওয়া করতেন। আমাদের সাথে একটি ছেলে ছিল। তাকে আবূ উমায়র নামে ডাকা হতো। (একবার) রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কৌতুক করে তাকে বললেন, হে আবূ উমায়র! কোথা গেল তোমার নুগায়র?
৩৬. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ كَانَ لِى أَخُ يُقَالُ لَهُ أَبُو عُمَيْرٍ أَحْسِبُهُ قَالَ فَطِيمًا وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا رَآهُ قَالَ أَبُو عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟ نُغَيْرُ كَانَ يَلْعَبُ بِهِ - عَنْ أَنَسٍ أَنَّ أَبَا طَلْحَةَ كَانَ ابْنَ لَهُ يُكَنَّى أَبَا عُمَيْرٍ، وَكَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَقُولُ أَبَا عُمَيْرٍ! مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟
৩৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ উমায়র নামে আমার এক ভাই ছিল। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছিলেন, তার দুধ ছাড়ানো হয়েছিল) রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন তাকে দেখতেন, তখন বলতেন, হে আবূ উমায়র! কোথায় গেলে তোমার নুগায়র? নুগায়রের সাথে ঐ ছেলেটি খেলা করতো। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত আবু তালহা (রা)-এর একটি ছেলের কুনিয়াত ছিল আবূ উমায়র। নবী ﷺ তাকে বলতেন, হে আবূ উমায়র! কোথায় গেলে নুগায়র?
۳۷ . عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ مَا شَمَمْتُ رَائِحَةَ أَطْيَبَ مِنْ رَائِحَةِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَ وَلَا تَنَاوَلَ أَحَدٌ يَدَهُ فَيَتْرُكُهَا حَتَّى يَكُونَ هُوَ الَّذِي يَتْرُكُهَا ، وَمَا أَخْرَجَ رُكْبَتَيْهِ بَيْنَ يَدَى جَلِيْسَ لَهُ قَطُّ، وَمَا قَعَدَ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ رَجُلٌ قَطُّ فَقَامَ حَتَّى يَقُوْمَ -
৩৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর চেয়ে উত্তম কোনো সুগন্ধি শুঁকিনি। [হযরত আনাস (রা) বলেন] এমন কখনো হয়নি যে, কোন ব্যক্তি তাঁর সাথে হাত মিলিয়েছে আর তিনি তাঁর হাত ছেড়ে দিয়েছেন। যে পর্যন্ত সে তার হাত ছেড়ে না দিত। তিনি কখনো তাঁর কাছে কোনো উপবেশনকারীর সামনে হাঁটু প্রসারিত করেননি। আর এমন কখনো হয়নি যে, কোনো ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে বসেছে এবং তিনি তার দাঁড়ানোর পূর্বে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন।
عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا أَخْرَجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رُكْبَتَيْهِ قَطُّ بَيْنَ يَدَى جَلِيْسٍ لَهُ وَلَا قَعَدَ أَحَدٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَيَقُوْمَ حَتَّى يَقُوْمَ الْآخَرُ وَلَا نَاوَلَ يَدَهُ النَّبِيُّ ﷺ فَيَتْرُكُ يَدَهُ حَتَّى يَكُوْنَ الرَّجُلُ هُوَ يَتْرُكُهَا -
৩৮. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কখনো তাঁর কাছে উপবেশনকারীর সামনে হাঁটু ছড়িয়ে বসেননি। আর এমন কখনো হয়নি যে, তাঁর কোনো ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে এসে বসেছে এবং সে উঠে যাওয়ার পূর্বে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন। আর এমনও কখনো হয়নি যে, কোনো ব্যক্তি তার হাত নবী -এর মুবারক হাতের সাথে মিলিয়েছে এবং তিনি তাঁর হাত ছেড়ে দিয়েছেন, যে পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি তাঁর হাত ছেড়ে না দিত।
٣٩. عَنْ أَبِي مَالِكِ الا شَجَعِيُّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كُنَّا نُجَالِسُ النَّبِيَّ ﷺ فَمَا رَأَيْتُ أَطْوَلَ صَمْتًا مِنْهُ وَكَانُوا إِذَا أَكْثَرُوا عَلَيْهِ تَبَسَّمَ -
৩৯. আবূ মালিক আশজাঈ (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমরা নবী -এর নিকট উপবেশন করতাম। আমি তাঁর চেয়ে অধিক নির্বাক কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি। সাহাবীগণ যখন তাঁর নীরবতাকে অধিক উপভোগ করতেন, তখন তিনি হেসে দিতেন।
٤٠ عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ النَّبِيَّ رَجُلاً سَهْلًا إِذَا هَوِيَتْ يَعْنِي عَائِشَةٌ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا الشَّيْ تَابَعَهَا عَلَيْهِ -
৪০. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী অত্যন্ত শিষ্ট নবী ছিলেন। হযরত আয়েশা (রা) যখন কোনো কিছু কামনা করতেন, তখন তিনি তা পূরণ করতেন।
٤١ عَنِ ابْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُكْثِرُ الذِكْرَ وَيُقِلُّ اللَّعْنَ وَيُطِيلُ الصَّلاةَ وَيَقْصُرُ الْخُطْبَةَ وَكَانَ لَا يَأْنَفُ وَلَا يَسْتَكْبِرُ أَنْ يَمْشِي مَعَ الْأَرْمِلَةِ وَالْمِسْكِيْنِ فَيَقْضِي لَهُ حَاجَتَهُ -
৪১. হযরত ইব্ন আবূ আওফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আল্লাহকে অধিক স্মরণ করতেন এবং কাউকে অভিশাপ করতেন না। তিনি সালাত দীর্ঘ করতেন এবং খুৎবা সংক্ষেপ করতেন। বিধবা ও মিস্কীনদের সাথে চলে তাদের অভাব পূর্ণ করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। নিজকে তাদের চেয়ে বড়ও মনে করতেন না।
٤٢. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ خَدِمْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ سِنِينَ فَمَا سَبَّنِي سَبَّةٌ قَطُّ، وَلَا ضَرَبَنِي ضَرَبَةً وَلَا انْتَهَرَنِي وَلَا عَبَسَ فِي وَجْهِي، وَلَا أَمَرَنِي بِأَمْرٍ فَتَوَانَيْتُ فِيْهِ فَعَاتَبَنِي عَلَيْهِ، فَإِنَّ عَاتَبَنِي عَلَيْهِ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِهِ قَالَ دَعُوهُ فَلَوْ قُدِرَ شَيْئً كَانَ -
৪২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর বহু বছর খিদমত করেছি। (এই দীর্ঘ সময়ে) তিনি আমাকে কখনো গালি দেননি, মারপিট করেননি, ধমক দেননি, চোখ রাঙাননি। আর এমন কোনো বিষয়ে তিনি আমাকে তিরস্কারও করেননি, যা তিনি আমাকে করতে আদেশ করেছেন অথচ আমি তা করতে আলস্য করেছি। তাঁর গৃহের কেউ যদি এ ব্যাপারে আমাকে ভর্ৎসনা করতো, তবে তিনি বলতেন, আরে রাখো তো! যদি তকদীরে থাকত তাহলে তো তা ঘটতই।
টিকাঃ
১. হুমাইদ (র) নীচুস্তরে এ হাদীসের একজন রাবী ছিলেন। তিনি যখন এই হাদীস বর্ণনা করতে করতে এই পর্যন্ত পৌঁছেন, তখন স্থানের উপযুক্ততা হেতু সহসা এই বাক্যটি তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে গেলো। অর্থাৎ স্বীয় এই কর্মপদ্ধতি দ্বারা হযরত মুগীরা (রা) নবীকে নিজের জন্য কোমল ও নিকটবর্তী করে নেন।
১. অর্থাৎ নবী -এর বাইরে থাকার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না বরং আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে এ অনুমতি ছিল যে, তিনি যখন ইচ্ছা করতেন, গৃহে গমন করতে পারতেন।
২. নবী -এর কাছে প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদা মূল্যায়িত হতো। প্রত্যেক ব্যক্তি তার দীনী মর্যাদা হিসেবে তাঁর দরবারে স্থান লাভ করতো।
১. এখান থেকে হযরত হুসাইন (রা) রিওয়ায়াত শুরু হচ্ছে। প্রকাশ থাকে যে, এ হাদীসের প্রথম হযরত হাসান (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর এ অংশটি হযরত হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত।
২. প্রকাশ থাকে যে, এ অবস্থা ছিল প্রথম দিকের। পরবর্তী সময়ে যখন প্রতিনিধি দলের আগমন শুরু হয় এবং বহিরাগতদের পক্ষে তাঁকে চিনতে অসুবিধা হয়, তখন তিনি তাঁর জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থানের ব্যবস্থা করতে সাহাবা কিরামকে অনুমতি দেন।
১. এ হাদীস থেকে সেসব লোকের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, যারা নিজেদের চাকর-নওকর ও কর্মচারীদের সাথে প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহার করে থাকেন। মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামকে অনুসরণ করা এবং নবী -এর সুন্দরতম চরিত্রকে নিজেদের জীবনের অঙ্গীভূত করা। কেননা, নবী -এর আনুগত্য ও অনুসরণ ছাড়া মুক্তির কোন উপায় নেই।
১. এর দ্বারা জানা গেলো যে, নবী-এর জীবনে কঠোরতা ছিল না। এবং নবী-এর মজলিস ছিল সহজ-সরল। দীন ও দুনিয়ার সব রকম কথাই সেখানে আলোচিত হতো।
১. নুগায়র বুলবুল কিংবা লাল পাখিকে বলা হয়।
📄 নবী (সা)-এর দয়া, পরম ধৈর্য ও ক্রোধ সংবরণ
٤٣. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَا ضَرَبَ النَّبِيُّ امْرَأَةً قَطُّ وَلَا ضَرَبَ خَادِمًا قَطُّ وَلاَ ضَرَبَ بِيَدِهِ شَيْئًا قَطُّ إِلا أَنْ يُجَاهِدُ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَلَا نَيْلَ مِنْهُ فَانْتَقَمَ مِنْ صَاحِبِهِ إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ مَحَارِمُهُ فَيَنْتَقِمُ -
৪৩. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কখনো কোনো স্ত্রীকে মারেননি। কখনো কোনো খাদিমকেও মারেননি এবং কারো উপর তিনি তাঁর হাত কখনো তোলেননি। তবে তিনি যখন আল্লাহর পথে জিহাদ করতে বের হতেন তখনকার কথা আলাদা। আর এমনও কখনো হয়নি যে, কেউ তাঁকে কষ্ট দিয়েছে এবং তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন। তবে কেউ যদি দীনের বিধি-নিষেধ অমান্য করতো, তিনি তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।
৩৯. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَا خَيْرَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي أَمْرَيْنِ إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَ هُمَا مَالَمْ يَكُنْ إِثْمًا فَإِنْ كَانَ إِثْمًا كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ وَمَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لِنَفْسِهِ إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ -
৪৪. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -কে যখন কোন দু'টি বিষয়ের মধ্যে ইখতিয়ার দেয়া হতো, তখন তিনি সবচেয়ে সহজ পন্থাটি গ্রহণ করতেন, আর যদি তা পাপের কাজ হতো, তবে তিনি তা থেকে সবার চেয়ে অধিক দূরে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর নিজস্ব ব্যাপারে কখনো কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর বিধি-নিষেধ যদি লঙ্ঘন করা হতো (তখন তিনি তার অবশ্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন)।
٤٥. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ مُنْتَصِرًا مِنْ ظَلَامَةٍ ظُلِمَهَا قَطُّ إِلَّا أَنْ يُنْتَهَكَ مِنْ مَحَارِمِ اللهِ شَيْءٌ وَإِذَا انْتُهِكَ مِنْ مَحَارِمِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ شَيْءٌ كَانَ أَشَدَّهُمْ فِي ذَلِكَ وَمَا خَيْرَ بَيْنَ أَمَرَيْنِ قَطُّ إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا -
৪৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে কখনো তাঁর উপর কৃত জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে দেখিনি। তবে আল্লাহর বিধি-নিষেধের অবমাননা করা হলে সে সময়ের কথা স্বতন্ত্র। আর যখন আল্লাহর বিধি-নিষেধের সামান্যতমও অবমাননা করা হতো, তখন তিনি সে ব্যাপারে সবার চেয়ে অধিক কঠোরতা অবলম্বন করতেন। আর যখনই তাঁকে কোনো দু'টি বিষয়ের মধ্যে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে, তিনি তার মধ্যে সহজতর পথটি গ্রহণ করেছেন।
٤٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ خَدَمْتُ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ عَشَرَ سِنِينَ وَأَنَا غُلَامُ لَيْسَ كُلُّ أَمْرٍ أَمَرَنِي كَمَا يَشْتَهِي صَاحِبِي أَنْ يَكُونَ ، فَمَا قَالَ لِمَ فَعَلْتَ هُذَا؟ أَوْ أَلا فَعَلْتَ هُذَا ؟
৪৬. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর খেদমত করেছি। আমি তখন ছোট্ট ছিলাম। তাই সব কাজ আমি তাঁর মন মতো করতে পারতাম না। তবুও তিনি কখনো আমাকে এ কথা বলেননি যে, তুমি এরূপ কেন করলে? কিংবা এরূপ কেন করলে না?
৪৭. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ صَحِبْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَشَرَ سِنِينَ فَمَا قَالَ لِشَيْءٍ قَطُّ لِمَ صَنَعْتَ كَذَا أَوْ كَذَا؟
৪৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্-এর সাহচর্যে ছিলাম। (এই দীর্ঘ সময়ে) তিনি কখনো কোনো ব্যাপারে আমাকে বলেননি যে, তুমি এরূপ এরূপ করলে কেন?
٤٨ عَنْ أَنَسٍ قَالَ خَدِمْتُ النَّبِيُّ الله عَشَرَ سِنِينَ لَمْ يَقُلْ لِشَيْ فَعَلْتُ لِمَ فَعَلْتَ؟ وَلَا لِشَيْ لَمْ أَفْعَلْهُ أَلَّا فَعَلْتَهُ؟
৪৮. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত নবী-এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি আমার কোনো কৃতকর্মের উপর একথা বলেননি যে, তুমি এরূপ কেন করলে? আর কোনো কাজ না করলেও বলেননি যে, তুমি এ কাজটি কেন করোনি?
٤٩ عَنْ أَنَسٍ قَالَ خَدِمْتُ النَّبِيُّ الله تِسْعَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِشَيْ أَسَأْتَ وَلَا بِئْسَ مَا صَنَعْتَ ، وَكَانَ إِذَا أَنْكَرَ الشَّيْئَ يَقُولُ كَذَا قُضِيَ -
৪৯. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নয় বছর পর্যন্ত নবী -এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কোনো ব্যাপারেই একথা বলেননি যে, তুমি খারাপ করেছো এবং একথা বলেননি যে, তুমি মন্দ কাজ করেছো। আর যখন তিনি কোনো বিষয়কে অপছন্দ করতেন, তখন বলতেন, এরূপ কথাই বলা ছিল।
٥٠. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّهُ قَالَ خَدِمْتُ النَّبِيُّ اللهَ عَشَرَ سِنِينَ فَمَا قَالَ فِي شَيْءٍ فَعَلْتُ لِمَ فَعَلْتَ؟ وَلَا لِشَئْي لَمْ أَفْعَلْهُ لِمَ لَمْ تَفْعَلْهُ؟ زَادَ مَعْمَرٌ وَمَا سَبَنَّي سَبَّةٌ قَطُّ -
৫০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত নবী-এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি আমার কোনো কাজ সম্পর্কেই একথা বলেননি যে, তুমি এটি কেন করেছ এবং আমি কোনো কাজ না করলে একথা বলেননি যে, তুমি এটি করলে না কেন? এ রিওয়ায়াতে মামার থেকে এ বাক্যটিও বর্ণিত আছে যে, এবং তিনি আমাকে কখনো গালমন্দও করেননি।
اه عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللهِ ﷺ سَبَّابًا وَلَا فَحَاشًا كَانَ يَقُولُ لاحَدِنَا فِي الْمَعْتَبَةِ مَالَهُ تَرِبَتْ يَمِينُهُ
৫১. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কাউকে গালাগালও করতেন না এবং কাউকে অশালীন কথাও বলতেন না। তিনি যখন আমাদের কাউকে ভর্ৎসনা করতে চাইতেন, তখন বলতেন: তার কি হয়েছে? তার হাত ধুলিমলিন হোক।
٥٢ . عَنْ ابْنِ عُمَرَ كَانَ النَّبِيُّ الله لَمْ يَكُنْ فَاحِشًا وَلَا مُتَفَحِّشًا، وَإِنَّهُ كَانَ يَقُولُ خِيَارُكُمْ أَحْسَنُكُمْ خُلُقًا
৫২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ না অশ্লীল ভাষী ছিলেন, না নির্লজ্জর মত ভাষা প্রয়োগ করতেন। বরং তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সর্বোত্তম।
٥٣ . عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ كَانَ النَّبِي بِأَبِي وَأُمِّي لَمْ يَكُنْ فَاحِشًا وَلَا مُتَفَحِّشًا وَلَا سَخَّابًا فِي الْأَسْوَاقِ -
৫৩. হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মাতা-পিতা নবী ﷺ -এর জন্য কুরবান, তিনি না অশ্লীল ভাষী ছিলেন, না নির্লজ্জের মত ভাষা প্রয়োগ করতেন। আর না তিনি হাট-বাজারে চিৎকার করে কথা বলতেন।
٥٤ . عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ إِذَا صَافَحُ رَجُلًا لَمْ يَنْزِعَ يَدَهُ مِنْ يَدِهِ حَتَّى يَكُونَ الرَّجُلُ هُوَ الَّذِي يَنْزِعُ يَدَهُ ، وَلَا يَصْرِفُ وَجْهَهُ عَنْهُ حَتَّى يَكُوْنَ هُوَ الَّذِيْنَ يَصْرِفُ، وَلَمْ يُرَ مُقَدِّمًا رُكْبَتَيْهِ بَيْنَ يَدَى جَلِيْسٍ لَهُ قَطُّ -
৫৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন কারো সাথে মুসাফাহা করতেন, তখন ঐ ব্যক্তি তার হাত গুটিয়ে না নেয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর হাত মুবারক গুটিয়ে নিতেন না এবং তিনি তাঁর চেহারা মুবারক ঐ ব্যক্তির থেকে ফিরিয়ে নিতেন না, যে পর্যন্ত সে তার চেহারা ফিরিয়ে না নিতো। আর কখনো তাঁকে এমন অবস্থায়ও দেখা যায়নি যে, তিনি তাঁর কাছে কোনো উপবেশনকারীর দিকে তাঁর হাঁটু বাড়িয়ে দিয়েছেন।
عَنْ يَزِيدَ الرُّقَاشِي عَنْ أَنَسٍ مِثْلَهُ
৫৫. ইয়াযীদ রাক্কাশীও হযরত আনাস (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ مَا سَأَلَ سَائِلَ قَطُّ إِلَّا أَصْغَى إِلَيْهِ حَتَّى يَكُونَ هُوَ الَّذِي يَنْصَرِفُ، وَمَا تَنَاوَلَ أَحَدٌ يَدَهُ قَطُّ إِلا نَاوَلَهَا إِيَّاهُ فَلَمْ يَنْزِعُهَا مِنْ يَدِهِ حَتَّى يَكُوْنَ هُوَ الَّذِي يَنْزِعُهَا
৫৬. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট যখনই কোনো প্রশ্নকারী প্রশ্ন করতো, তিনি তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগী থাকতেন যে পর্যন্ত সে নিজে সরে না যেতো। আর যখন কোনো ব্যক্তি তার হাতে তাঁর হাত মুবারক নিতো তখন তিনি তাঁর হাত মুবারক তাকে প্রদান করতেন। তারপর যে পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি তার নিজের হাত ছাড়িয়ে না নিতো, তিনি তাঁর হাত মুবারক ছাড়িয়ে নিতেন না।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ خَدِمْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ عَشَرَ سِنِينَ فَشَمَمْتُ الْعِطْرَ وَلَمْ أَشُمَّ نِكْهَةً أَطْيَبَ مِنْ نِكْهَةِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا لَقِيَهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فَقَامَ مَعَهُ لَمْ يَنْصَرِفُ عَنْهُ، وَإِذَا لَقِيَهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فَتَنَاوَلُ يَدَهُ نَاوَلَهَا إِيَّاهُ ثُمَّ لَمْ يَنْزِعْهَا مِنْهُ حَتَّى يَكُوْنَ الرَّجُلُ هُوَ الَّذِي يَنْزِعُ يَدَهُ مِنْهُ، وَإِذَا لَقِيَهُ أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فَتَنَاوَلُ أُذُنُهُ نَاوَلَهَا إِيَّاهُ ثُمَّ لَمْ يَنْزِعْهَا مِنْهُ حَتَّى يَكُونَ الرَّجُلُ هُوَ الَّذِي يَنْزِعُهَا مِنْهُ
৫৭. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ -এর খিদমত করেছি। আর আমি (সব রকমের) আতরের ঘ্রাণ শুঁকেছি কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ -এর মুখের ঘ্রাণ থেকে উত্তম কোনো সুগন্ধি শুঁকিনি। সাহাবাদের মধ্য থেকে যখনই কারো সাথে তাঁর সাক্ষাত হতো, তিনি তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তার থেকে দূরে থাকতেন না। আর যখন তাঁর সাহাবীদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সাথে মিলিত হতো এবং তাঁর হাত মুবারক নিজের হাতে নিতো, তখন তিনি তাঁর হাত মুবারক ঐ ব্যক্তির হাতে প্রদান করতেন এবং সেই সময় পর্যন্ত ছাড়িয়ে নিতেন না যে পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি নিজেই তার হাত ছাড়িয়ে না নিতো। আর যখন কোনো সাহাবী তাঁর সাথে মিলিত হয়ে তাঁর কানে কোনো কথা বলতে চাইতো, তিনি তাঁর কান তার দিকে পেতে দিতেন এবং সেই অবধি তা সরিয়ে নিতেন না যে পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি নিজেই তা সরিয়ে না নিতো।
৫৮. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ خَدِمْتُ النَّبِيَّ ﷺ عَشَرَ سِنِينَ لَمْ يَصْرِبْنِي قَطُّ، وَلَمْ يَنْتَهِرْنِي يَوْمًا قَطُّ، وَلَمْ يَعْبَسُ وَجْهَهُ عَلَى يَوْمًا قَطُّ -
৫৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দশ বছর পর্যন্ত নবী -এর সেবা করেছি। (কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়ে) তিনি আমাকে কখনো মারেননি। কোনো দিন আমাকে ধমকাননি। কোনো দিন আমার প্রতি ভ্রুকুটি করেননি।
٥٩. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ أَنَّهُ ذَكَرَ النَّبِيَّ ﷺ فَقَالَ كَانَ أَكْرَمَ النَّاسِ -
৫৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) একবার নবী -এর আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি ছিলেন সবচেয়ে ভদ্র ও দয়ালু।
٦٠. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ أَدْرَكَهُ أَعْرَابِيُّ فَأَخَذَ بِرِدَائِهِ فَجَبَذَهُ جَبْذَهُ شَدِيدَةٌ فَنَظَرْتُ إِلَى عُنُقِ رَسُولِ اللهِ ﷺ وَقَدْ أَثَرَتْ فِيْهِ حَاشِيَةُ الرِّدَاءِ مِنْ شِدَّةِ جَبْنَتِهِ، ثُمَّ قَالَ يَا مُحَمَّدًا مُرْ لِیْ مِنْ مَالِ اللهِ الَّذِي عِنْدَكَ فَالْتَفْتَ إِلَيْهِ رَسُولُ الله ﷺ فَضَحِكَ وَأَمَرَ لَهُ بِعَطَاءٍ -
৬০. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার এক বেদুঈন নবী -এর চাদর ধরে জোরে হেঁচকা টান মারলো। আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাতে জোরে চাদর টানার কারণে দাগ পড়ে গিয়েছে। তারপর বেদুঈন বললো, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র যে সম্পদ তোমার কাছে আছে, তা থেকে আমাকে কিছু দান করার নির্দেশ দাও। তিনি তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু সম্পদ দানের নির্দেশ দিলেন।
টিকাঃ
১ হযরত আনাস (রা)-এর বর্ণনাগুলোর বিষয়বস্তু যদিও অভিন্ন, কিন্তু যেহেতু হাদীসসমূহ বিবিধ সূত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাই হাফিয আবূ শায়খ ইস্ফাহানী (র) প্রতিটি বর্ণনাকে ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন।
📄 নবী (সা)-এর পরম লজ্জাবোধ
٦١. عَنْ أَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِيِّ يَقُوْلُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَشَدُّ حَيَاءً مِنَ الْعَذْرَاءِ فِي خِدْرِهَا ، وَكَانَ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عَرَفْنَاهُ فِي وَجْهِهِ -
৬১. হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ পর্দানশীল কুমারী অপেক্ষাও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি যখন কোনো কিছু অপছন্দ করতেন আমরা তা তাঁর চেহারা মুবারক দেখেই বুঝে ফেলতাম।
📄 নবী (সা)-এর ক্ষমাগুণ সম্পর্কিত বর্ণনা
৬৫. হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) থেকে বর্ণিত যে, তাঁর গোত্রের জনৈক ব্যক্তি নবী-এর কাছে হাযির হয়ে বললো, আমার পড়শীদেরকে কোন্ অপরাধে বন্দী করা হয়েছে? নবী তার এই ঔদ্ধত্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করলেন না। ফলে সে তাঁকে হুমকি দিয়ে বললো, আমি যদি একথা সবার সামনে বলে দেই, তবে তারা ভাববে যে, তুমি তো লোকদেরকে অন্যায় ও জুলুম করা থেকে বারণ করো কিন্তু নিজে তা মেনে চলো না। এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ তার ভাই উঠে দাঁড়ালো এবং বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সে তার দুর্ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে (আমি তার দায়িত্ব নিলাম) তখন তিনি বললেন, শোনো! তোমরা যদি একথা বলেও থাকো এবং আমি যদি এ কাজ করেও থাকি, তবে মনে রেখো! আমিই তার প্রতিফল ভোগ করবো, তোমরা নয়। তারপর তিনি সাহাবাগণকে বললেন, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্ত করে দাও।
ফায়দা : এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (র)-এর মুসনাদে এর চেয়ে বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়েছে। হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) বলেন, নবী আমার গোত্রের কতিপয় লোককে কোনো এক অভিযোগের ভিত্তিতে বন্দী করেছিলেন। সেই ব্যাপারে আমার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হলো, তিনি তখন খুত্বা দিচ্ছিলেন। সে (রাগান্বিত অবস্থায়ই অত্যন্ত অভদ্রভাবে) বললো, আমার পড়শীদেরকে কেন বন্দী করা হয়েছে? নবী চুপ রইলেন। কোনো জবাব দিলেন না। তারপর সে তাঁকে ধমক দিয়ে বললো (আমি যদি আপনার এই অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ জনসমক্ষে তুলে ধরি, তবে লোকেরা বলবে, আপনি অন্য লোকদেরকে তো জুলুম অত্যাচার ও নির্যাতন-উৎপীড়ন থেকে বারণ করেন, কিন্তু অহেতুক নিজে তা থেকে বিরত থাকেন না। রাসূলুল্লাহ্ তার কথা সম্পূর্ণ শুনতে পাননি, তাই) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটি কি বলছে? মুআবিয়া ইবন হায়দা (রা) বলেন, (আমি একথা শুনে সামনে অগ্রসর হলাম এবং) উভয়ের কথাবার্তার মাঝখানে অন্তরায় সাজলাম। আমার আশংকা ছিল, নবী যদি আমার গোত্রকে বদ-দু'আ করেন, তবে তাদের কখনো কল্যাণ হবে না। কিন্তু একটু পরেই তিনি ঐ ব্যক্তির কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, লোকেরা তো একথা বলেছে (এবং অপবাদ দিয়েছে) এবং ভবিষ্যতেও এরূপ বলবে। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি যদি এরূপ করি, তবে তার প্রতিফল আমি ভোগ করবো তারা নয়! এরপর তিনি সাহাবাগণকে নির্দেশ দিলেন যে, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্তিদান করো।
এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কত বড় ভদ্র ও মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লোকদের অহেতুক অভদ্র ও অশালীন আচরণ সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে সর্বদা ক্ষমা ও দয়াই প্রদর্শন করতেন। কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। মুখ দিয়ে খারাপ কথা সর্বদা উচ্চারণ করতেন না, শাস্তিও দিতেন না। এমনকি তাদেরকে বদ-দু'আও করতেন না। বরং সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিতেন। তাঁর গোটা জীবন-চরিত ও সমগ্র ঘটনাই এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
সহীহ্ বুখারীতে শিষ্টাচার অধ্যায়ে (২য় খণ্ড, ৯০৪ পৃষ্ঠা) হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো তাঁর নিজের ব্যাপারে কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহ্ দীন ও তাঁর বিধি-বিধানের অবমাননা করা হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।
٦٦ حَدَّثَ عَبْدُ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رِجَالًا مِنَ الْأَنْصَارِ خَاصَمُوا الزُّبَيْرَ فِي شِرْجٍ مِنْ شَرَاجِ الْحَرَّةِ الَّتِي يَسْقُوْنَ بِهَا الْمَاءَ ، فَغَضِبَ الأَنْصَارِيُّ وَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنْ كَانَ ابْنُ عَمَّتِكَ ، فَتَلَوْنَ وَجْهُ النَّبِيِّ وَقَالَ اسْقِ يَازُبَيْرُ ثُمَّ احْبِسِ الْمَاءَ حَتَّى يَبْلُغَ الْجُدُرَ ثُمَّ ارْسِلِ الْمَاءَ إلى جَارِكَ -
৬৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত যে, (একবার আমার পিতা) হযরত যুবায়র (রা)-এর সাথে মদীনার প্রস্তরময় অঞ্চলের এমন এক পানির নালার ব্যাপারে এক আনসারীর বিবাদ হলো যা থেকে (আশপাশের) লোকটি (তাদের ক্ষেত ও বাগানসমূহের) পানি সেচ দিতো। শেষে এই বিবাদ নবী -এর দরবারে পেশ হলো। তিনি সে বিবাদ মীমাংসা করলেন। ঐ আনসারী তার বোকামি ও বক্রবুদ্ধির দরুন এ মীমাংসাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বলে গণ্য করলো এবং ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই। (এজন্য আপনি তার পক্ষপাতিত্ব করেছেন। যেহেতু এটি ছিল তাঁর সততা ও ন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আক্রমণ) তাই তাঁর মুখমণ্ডল মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠলো। কিন্তু তিনি ঐ অভদ্র আনসারীকে কিছুই বললেন না এবং যুবায়র (রা)-কে বললেন: যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি জমিয়ে রেখে তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতে পানি ছেড়ে দাও।
ফায়দা: গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ -এর ক্ষমা গুণের বর্ণনা দেয়া, তাই তিনি ক্ষমার সাথে সম্পর্কিত এই হাদীসের শেষ অংশটুকু শুধু বর্ণনা করেন। মিশকাত শরীফে (পৃষ্ঠা ২৫৯) পুরো হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বর্ণনা করেন যে, (প্রথম অর্থাৎ আনসারী কর্তৃক রাগান্বিত করার পূর্বে) রাসূলুল্লাহ হযরত যুবায়র (রা)-কে বলেন, যুবায়র! তুমি (তোমার ক্ষেতে প্রয়োজন পরিমাণ) পানি সেচ করো। তারপর তোমার পড়শীর (ক্ষেতের) দিকে পানি ছেড়ে দাও। নবী কর্তৃক হযরত যুবায়র (রা)-কে এই পরামর্শ দান ছিল পড়শীর অধিকার ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ভিত্তিতে। কিন্তু নির্বোধ আনসারী তাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব মনে করে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো (এবং) বললো, যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই বলে আপনি তার পক্ষপাতিত্ব ও আমার অধিকার হরণ করছেন। তখন নবী নির্দেশ দিলেনঃ হে যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং তোমার ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখো। তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতের দিকে পানি ছেড়ে দিবে। বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বলেন, আনসারী যখন পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ -কে রাগান্বিত করে দিলো, তখন তিনি বিচার নীতির স্পষ্ট বিধি অনুযায়ী যুবায়রের অধিকার১ তাকে পুরোপুরি দিয়ে দেন। এর পূর্বে তিনি (উভয়ের সুবিধা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে) মীমাংসা করার ভিত্তিতে এমন এক পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে উভয়ের জন্য সুবিধা ছিল।
হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর উদার মানসিকতা সম্পর্কে অনুমান করুন। আনসারী নবী-এর সততা ও আমানতদারীর উপর আক্রমণ করছে, অধিকার হরণ ও পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিচ্ছে, প্রচণ্ড ক্রোধে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রক্তিমবর্ণ ধারণ করছে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে একটি বাক্যও উচ্চারিত হচ্ছে না। কেননা, তিনি জানেন যে, ঐ ব্যক্তি যদিও মুসলমান তবে নির্বোধ ও ক্রোধে অভিভূত। তার কথায় উত্তেজিত হওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তার হুঁশিয়ারি ও শিক্ষার জন্য হযরত যুবায়র (রা)-কে তার পূর্ণ অধিকার বুঝে নিতে বললেন। আর এটাই হচ্ছে ক্রোধ সংবরণ করা ও অপরাধীর অপরাধ ক্ষমা করার উত্তম আদর্শের উচ্চতম মাপকাঠি, যে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّسِ وَاللَّهِ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ - সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার নিষ্পাপ নবীর উপর এই পক্ষপাতিত্বের অপবাদ সহ্য করেননি! এবং তৎক্ষণাৎ আয়াত নাযিল করে উম্মতকে জানিয়ে দিলেন যে, নবী -এর ফয়সালাকে তা নিজের মনঃপূত হোক কিংবা না হোক মনেপ্রাণে গ্রহণ ও মান্য করা ছাড়া আল্লাহর নিকট তোমাদের ঈমানও সঠিক নয়। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
৬৯. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মাহারিবে খাসফা নামক স্থানে (বানু গাতফানের সাথে) যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিলেন। (যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি কিন্তু) কাফিররা মুসলমানদের অসতর্কতার সুযোগ খুঁজছিল। জনৈক কাফির চুপিসারে এসে রাসূলুল্লাহ্ -এর শিয়রে দাঁড়ালো (তিনি তখন একটি গাছের নিচে আরাম করছিলেন) এবং বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ্! তৎক্ষণাৎ তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ্ তলোয়ারটি তুলে নিলেন এবং বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? সে বললো, আপনি ক্ষমতা পেয়ে উত্তম গ্রেফতারকারী হন। সুতরাং আপনি আমার জীবন রক্ষা করে উত্তম অনুগ্রহকারী হওয়ার প্রমাণ দিন। তিনি বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই আর আমি হচ্ছি আল্লাহ্র রাসূল? সে বললো, না অবশ্য আমি (অঙ্গীকার করছি যে) আপনার বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করবো না। (কোনো যুদ্ধে) আপনার সাথেও যোগদান করবো না এবং আপনার প্রতিপক্ষের সাথেও যোগদান করবো না। রাসূলুল্লাহ্ তাকে ছেড়ে দিলেন। সে তার সঙ্গীদের কাছে এলো। এবং বললো, আমি সর্বোত্তম ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।
ফায়দা : মাহারিবে খাসফা যুদ্ধের প্রসিদ্ধ নাম 'যাতুর্ রিকা'। এ যুদ্ধকে 'যাতুর্ রিকা' বলার কারণ, প্রস্তর কংকরময় ভূমিতে সফর করার দরুন মুসলমানদের পা যখম হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা পায়ে পট্টি বেঁধে রেখেছিলেন। কোনো কোনো চরিতকার বলেন, 'যাতুর রিকা' হচ্ছে একটি লাল ও সাদা-কালো প্রস্তরময় পাহাড়ের নাম এবং এই যুদ্ধের নামকরণও পাহাড় করা হয়েছে। বানু গাতফানের বিপুল সংখ্যক লোক মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হয়েছিল। কিন্তু তাদের হামলা করার সাহস হয়নি, তাই যুদ্ধ হয়নি। এ ঘটনা ঘটেছিল চতুর্থ হিজরীর মুহররম কিংবা জমাদিউল আউয়াল মাসে।
এ ঘটনাও রাসূলুল্লাহ্ -এর আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ ক্ষমা ও দয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত। জাগতিক কর্মকৌশল ও ফন্দি-ফিকিরের দিকে দৃষ্টিপাতকারীদের মতে এ হামলা ও শত্রুকে জীবিত ছেড়ে দেওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ ছিল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ -এর দৃষ্টি ছিল সমস্ত কারণের আদি কারণ আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি। এজন্য তিনি ঐ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর এই ক্ষমা ও দয়ার কি ফল হয়েছিল? স্বগোত্রীয়দের কাছে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে সে যে সাক্ষ্য দিয়েছিল তাতেই তা প্রতিভাত হয়।
عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ .
عَلَى حِمَارٍ فَقَالَ لِسَعْدٍ أَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالَ أَبُو الْحُبَابُ يُرِيدُ عَبْدَ اللَّهِ بْنِ أَبَيِّ قَالَ كَذَا وَكَذَا فَقَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ اعْفُ عَنْهُ وَاصْفَحْ، فَعَفَا عَنْهُ رَسُولُ اللهِ الله
وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَعْفُوْنَ عَنْهُ أَهْلَ الْكِتَابَيْنِ وَالْمُشْرِكِينَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ -
৭০. হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ গাধার উপর সাওয়ার ছিলেন। [হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য তিনি গমন করছিলেন। তিনি সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-কে (তাঁর গৃহে পৌঁছে) বললেন, তুমি কি শোননি আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই (মুনাফিক নেতা) কি বলেছে? তিনি তার কথার পুনরুক্তি করে বললেন, সে আমাকে এরূপ এরূপ বলেছে। তখন সা'দ ইব্ন উবাদা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং উপেক্ষা করুন। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবা কিরাম সাধারণত আহলি কিতাব ও মুশরিকদের এরূপ কটুবাক্য ও ক্লেশদানকেও অনুরূপ ক্ষমা করে দিতেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ (প্রশংসারূপে) এই আয়াত নাযিল করেন:
فَاعْفُوا وَاصْفَحُوْا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ -
তোমরা ক্ষমা করো ও অপেক্ষা করো যতক্ষণ না আল্লাহ্ (যুদ্ধ ও প্রতিশোধের) কোনো নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
ফায়দা : এখানেও যেহেতু গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের বর্ণনা করা, সেহেতু পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেননি। বরং ঐ সংক্রান্ত অংশটুকু বর্ণনা করাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। পূরো হাদীসটি সহীহ বুখারীতে উল্লিখিত হয়েছে: একবার রাসূলুল্লাহ্ হযরত সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য গাধার উপর আরোহণ করে রওয়ানা করেন। তাঁর পিছনে তিনি উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে বসিয়ে নেন। তিনি একটি জনসমাবেশের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে মুনাফিক-নেতা আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূলও উপস্থিত ছিল। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে মুসলমান, ইয়াহূদী, মুশরিক সবাই ছিলো। নবী-এর বাহনের চলার কারণে যখন ধুলাবালি উড়ে গিয়ে সমাবেশে পড়লো, তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই তার নাকে চাদর গুঁজে দিলো এবং নবী-কে বললো, দেখো, আমাদের উপর ধুলি উড়িয়ো না। তোমার গাধার ধুলোবালি আমার দেমাগ খারাপ করে দিয়েছে। নবী তার কথায় কর্ণপাত করলেন না এবং সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে সালাম করে বাহন থেকে নেমে অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু সে (আবদুল্লাহ্) তাঁকে সম্বোধন করে বললো, দেখো, এটা ঠিক না, আমাদের সভায় এসে আমাদের বিব্রত করবে না। তুমি তোমার বাহনের উপর উঠো এবং যে তোমার কাছে যাবে তাকে তোমার দীনের দাওয়াত দাও। তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) যিনি ঐ সভায় উপবিষ্ট ছিলেন-নবীকে বললেন, আপনি অবশ্যই আমাদের সভা-সমাবেশে আগমন করবেন। আমরা আপনার আহ্বান ও বক্তব্য পছন্দ করি। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি এতই বেড়ে গেলো যে, মুসলিম, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের পরস্পরের মধ্যে বচসা, গালিগালাজ ও হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। এমনকি যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। কিন্তু নবী অতিকষ্টে তাদেরকে থামিয়ে দেন এবং ব্যাপারটি মিটমাট হয়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর বাহনের উপর আরোহণ করে সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর বাড়িতে গমন করেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে তাঁকে বলেনঃ হে সা'দ্! তুমি কি শোননি যে, একটু আগে আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূল কি বলেছে? সাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তার কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
এটি ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনা। তখনো জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হয়নি। তখন মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ ছিল ঐসব কাফির ও ইয়াহুদীদের নিকট থেকে কোনোরূপ প্রতিশোধ না নেয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ করার নির্দেশ নাযিল না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমা ও উপেক্ষা করে চলার। কিন্তু নবী এত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে, জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হওয়ার পরও তিনি মদীনার ঐ সব মুনাফিককে তাদের মুনাফিকী ও ইসলামের বিরোধিতার জন্য শাস্তি দেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করেননি। এই ক্ষমা ও দয়ার ফলেই ক্রমে ক্রমে সমস্ত মুনাফিক অবশেষে একনিষ্ঠ মুসলমান হয়ে যায়। কেবল কয়েকজন ছাড়া, যারা তাদের মুনাফিক থাকা অবস্থায়ই বিভীষিকাময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে।
۷۱. عَنِ الزُّهْرِيُّ حَدَّثَنِي عُمَارَةَ بْنُ خُزَيْمَةَ أَنَّ عَمَّهُ حَدَّثَهُ (وَهُوَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيُّ ( أَنَّ النَّبِيَّ وَابْتَاعَ فَرَسًا مِنْ أَعْرَابِي فَاسْتَتْبَعَهُ النَّبِي لِيُعطيه ثَمَنَ فَرَسِهِ فَأسْرَعَ النَّبِيُّ الْمَشْيَ وَابْطَأَ الْأَعْرَابِيُّ فَطَفِقَ رِجَالٌ يُعَرِضُوْنَ لِلأَعْرَابِي يُسَارِمُونَهُ بِالْفَرَسِ لَا يَشْعُرُونَ أَنَّ النَّبِيَّ ابْتَاعَهُ حَتَّى زَادَ بَعْضُهُمْ لِلْأَعْرَابِي فِي السَّوْمِ عَلَى الثَّمَنِ الَّذِي ابْتَاعُهُ النَّبِي فَنَادَى الْأَعْرَابِيُّ فَقَالَ لَئِنْ كُنْتَ مُمْتَاعًا هُذَا الْفَرَسَ فَابْتَعْهُ وَإِلَّا بِعْتُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ حِيْنَ سَمِعَ نِدَاءَ الْأَعْرَابِي أَوَلَيْسَ قَدْ ابْتَعْتُهُ فَقَالَ لَا وَاللَّهِ مَا بِعْتَكَ فَقَالَ بَلَى قَدِ ابْتُعْتُهُ مِنْكَ ، فَطَفِقَ النَّاسُ يَلُؤْذُونَ بِالنَّبِيِّ الله وَالأَعْرَابِي يَقُولُ هُلَمَّ شَهِيدًا فَلْيَشْهَدْ أَنَّى قَدْ بَايَعْتُكَ ، فَمَنْ جَاءَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَالَ لِلأَعْرَابِي وَيْلَكَ أَنَّ النَّبِيُّ وَ لَمْ يَقُولُ الأَحَقَّا .
৭১. যুহরী (র) বলেন, আমার নিকট উমারা ইবন খুযায়মা (র) বর্ণনা করেন যে, আমার নিকট আমার চাচা (যিনি নবী-এর একজন সাহাবী ছিলেন) বর্ণনা করেন। নবী একবার কোনো এক বেদুঈনের নিকট থেকে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন এবং মূল্য পরিশোধ করার জন্য তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন। নবী জোর কদমে অগ্রসর হচ্ছিলেন। আর ঐ বেদুঈন চলছিলো ঢিমে-তেতালা গতিতে। (ফলে ঐ বেদুঈন নবী এর অনেক পেছনে পড়ে গেলো) এবং লোকেরা তাকে রাস্তায় থামিয়ে ঘোড়াটি ক্রয় করার কথাবার্তা শুরু করলো। তারা জানতো না যে, এ ঘোড়াটি নবী খরিদ করেছেন। সুতরাং কেউ কেউ ঐ ঘোড়াটির মূল্য নবী-এর স্থিরীকৃত মূল্যের চেয়েও অধিক হাঁকালো। এই অবস্থা দেখে বেদুঈনের মনে গোলমাল দেখা দিলো। সে নবী-কে ডেকে বললো, আপনি যদি এ ঘোড়াটি ক্রয় করতে চান, তবে ক্রয় করুন নতুবা আমি অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেবো। নবী বেদুঈনের কথা শুনে বললেন, আরে আমি কি তোমার কাছ থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করিনি? সে বললো, না। আল্লাহ্র কসম! আমি ঘোড়াটি আপনার কাছে বিক্রি করিনি। নবী বললেন, তুমি এ কি বলছো! আমি তো তোমার নিকট থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করেছি। নবী ও বেদুঈনের আশপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলো। তখন বেদুঈন বলতে লাগলো, (আচ্ছা) আপনি যদি সত্যবাদী হন, তবে আমি যে আপনার কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছি এ ব্যাপারে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করুন। কিন্তু সেখানে যে মুসলিমই আসতো, সেই ঐ বেদুঈনকে বলতো যে, আরে হতভাগা! নবী তো সত্য ছাড়া কিছু বলতেই পারেন না।
ফায়দা: দেখুন, এ ঘটনায় হতভাগা বেদুঈন তার গোয়ার্তুমির দরুন নবী-এর সততা ও সাধুতার উপর কত বড় আক্রমণ করলো। একজন নিরীহ সাধারণ মানুষও এরূপ ঔদ্ধত্য সহ্য করতে পারে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ কৃপা ও করুণার মূর্ত প্রতীকরূপে বেদুঈনের কথা শ্রবণ করেন। তাকে কিছুই বললেন না। আল্লাহ্ সত্যই বলেছেন (بِالْمُؤْمِنِينَ رَقُفُ رَّحِيمٌ )মু'মিনদের প্রতি তিনি বড়ই দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা: ২৮)
۷۲. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتِ ابْتَاعَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ جَزُورًا مِنْ أَعْرَابِي بِوَسَقٍ مِّنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ - فَجَاءَ بِهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَالْتَمَسُ التَّمَرُ فَلَمْ يَجِدْهُ فِي الْبَيْتِ قَالَ فَخَرَجَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَقَالَ يَا عَبْدَ اللَّهِ أَنَّا ابْتَعْنَا مِنْكَ جزُورَكَ هُذَا بِوَسَقٍ مِنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ نَحْنُ نَرَى أَنَّهُ عِنْدَنَا فَلَمْ نَجِدْهُ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ وَاغْدَرَاهُ وَاغَدْرَاهُ فَوَكَزَهُ النَّاسُ وَقَالُوا لِرَسُولِ تَقُولُ هَذَا ؟ فَقَالَ دَعُوهُ -
৭২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ জনৈক বেদুঈন থেকে এক 'ওয়াসাক' মওজুদ কৃত খেজুরের বিনিময়ে একটি উট ক্রয় করলেন (তাঁর ধারণা ছিল গৃহে খেজুর মওজুদ আছে) তাই তিনি তাকে গৃহে নিয়ে এলেন এবং খেজুর তালাশ করলেন, কিন্তু খেজুর পাওয়া গেলো না। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ বেদুঈনের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন, হে আল্লাহ্র বান্দা! আমি তোমার নিকট থেকে এক 'ওয়াসাক' খেজুরের বিনিময়ে তোমার এই উটটি ক্রয় করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল, খেজুর আমার কাছে মওজুদ আছে, কিন্তু এখন দেখলাম নেই। এ কথা শুনে বেদুঈন বললো, হায় ধোঁকাবাজি! হায় ধোঁকাবাজি!! তখন লোকেরা তাকে ঘুষি মারা শুরু করলো এবং বললো, হতভাগা! রাসূলুল্লাহকে এরূপ কথা বলছো! তখন তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ কোনো নিয়ম বিরোধী কথা বলেননি। প্রায়ই এরূপ ঘটনা ঘটে থাকে। এটাকে প্রতারণা ও অসাধুতা বলা যায় না। কেননা, তখনো বিক্রীত দ্রব্য বিক্রেতার নিকটই ছিল। কিন্তু ঐ বেদুঈন ব্যক্তি তার গোয়ার্তুমি ও মূর্খতার দরুন নবী -কে অসাধু ও প্রতারক বলে তাঁকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। লক্ষণীয় যে, অজ্ঞতার দরুন নবী-কে গালমন্দ করা ধর্মত্যাগ ও হত্যাযোগ্য অপরাধ না হলেও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু এ বিষয়টি ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ এর পবিত্র সত্তার সাথে সম্পর্কিত, তাই তিনি তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী ঐ বেয়াদব ও দুষ্ট লোকটিকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেন।
۷۳. عَنْ مَهْدِي بْنِ عِمْرَانَ قَالَ رَأَيْتُ أَبَا الطُّفَيْلِ جِيئَ بِهِ فِي كَسَاءِ وَالْقِيَ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقِيلَ هُذَا قَدْ رَأَى النَّبِيُّ فَدَنَوْتُ مِنْهُ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ وَ فَاتَّبَعْتُهُ حَتَّى أَتَى دَارًا فَدَفَعَ بَابَهَا فَدَخَلَ فَإِذَا لَيْسَ فِي الدَّارِ إِلَّا قَطِيفَةُ فَنَفَضَهَا فَإِذَا رَجُلٌ أَعْوَرُ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ لا تَعْوَذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ هَذَا -
৭৩. মাহদী ইব্ন ইমরান (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখলাম, হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-কে মসজিদে হারামে নিয়ে এসে শায়িত করা হয়েছে। তিনি তখন চাদরে আবৃত ছিলেন। কেউ বলেন, ইনি নবীকে দর্শন করেছেন। অর্থাৎ আবূ তোফায়ল (রা) নবী-এর সাহাবী ছিলেন। মাহ্দী ইব্ন ইমরান (রা) বলেন, আমি হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-এর কাছ থেকে হাদীস শোনার জন্য তাঁর নিকট গেলাম। তিনি বললেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-কে কোথাও যেতে দেখলাম। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে রওয়ানা হলাম। তিনি একটি গৃহে উপস্থিত হলেন এবং দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। গৃহে একটি কম্বল পড়ে ছিলো। কম্বলটি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তিনি ঐ কম্বলটি ধরে হেঁচকা টান মারলেন। তার মধ্য থেকে একটি কানা (একচক্ষু বিশিষ্ট) লোক বেরিয়ে এলো। সে রাসূলুল্লাহ্-কে বললো, আপনি কি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল? তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন, হে লোক সকল! তোমরা তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর পানাহ চাও।
ফায়দা: এই ব্যক্তি ছিল ইব্ন সায়্যাদ। সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে তার কাহিনী সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। ইব্ন সায়্যাদের ডাকনাম 'সাফ' এবং এক বর্ণনা মতে আবদুল্লাহ্। এ ছিল মদীনার এক ইয়াহুদী। এর সম্পর্কে বর্ণনাকারীদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। কেউ কেউ তাকে দাজ্জালও বলেন। বর্ণনাসমূহ থেকে জানা যায়, সে প্রতিশ্রুত দাজ্জাল না হলেও ফিত্না সৃষ্টিতে কমও ছিল না। বাল্যকাল থেকেই গণক ও জাদুকরের মতো কথা বলতো। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদের পরীক্ষার জন্য তাকে সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথমে সে নিজেকে নবী বলে দাবি করতো। কিন্তু শেষে ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলমানদের সাথে হজ্জ ও জিহাদ প্রভৃতিতেও শরীক হয়। কিন্তু তারপরও সে এই ধরনের উচ্ছৃংখল কথাবার্তা বলতো। গ্রন্থকারের এই হাদীসটিও এ স্থলে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে, এ ধরনের উচ্ছৃংখলতা ও ধৃষ্টতা ছাড়াও সে নবী-এর সামনে নিজেকে নবী বলে দাবি করে এবং স্বয়ং নবী-কেই তার উপর ঈমান আনার জন্য আহ্বান করে। নবী তাকে হত্যা করেননি এবং কোনো শাস্তিও দেননি। কারণ সে ছিল তখন বালক। তাছাড়া মদীনার ইয়াহূদীর সাথে তখন নবী সন্ধিবদ্ধও ছিলেন। অবশ্য তিনি লোকদেরকে তার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সাবধান করে দেন।
٧٤ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ يَهُودِيَّةً اَتَتِ النَّبِيُّ بِشَاةٍ مُسْمُوْمَةٍ لِيَأْكُلَ مِنْهَا فَجِيَ بِهَا إِلَى النَّبِيُّ فَسَأَلَهَا عَن ذَلِكَ، فَقَالَتْ أَرَدْتُ قَتْلَكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لَيُسَلِّطْكِ عَلَى ذَلِكَ أَوْ قَالَ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ قَالُوا أَفَلَا نَقْتُلُهَا؟ قَالَ لَا -
৭৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ইয়াহুদী নারী নবী-এর নিকট একটি ভুনা বক্রীর বাচ্চা আহারের জন্য নিয়ে আসে। তাতে সে বিষ মিশ্রিত করেছিল। (এরপর নবী যখন ঐ গোস্ত বিষ মিশ্রিত হওয়ার সংবাদ মহান আল্লাহ্ তরফ থেকে জানতে পারলেন, তখন এ স্ত্রীলোকটিকে ডাকালেন) লোকেরা নবী-এর নিকট তাকে উপস্থিত করলো। তিনি ঐ বিষ মিশ্রিত গোস্ত সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ কাণ্ড কেন করেছো? ঐ (উদ্ধত) নারী বললো, আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন: মহান আল্লাহ্ তোমাকে এ কাজে সফল হতে দেবেন না (অর্থাৎ তুমি নবীকে হত্যা করতে পারবে না)। কিংবা বলেছেন, কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ ব্যাপারে সফল করবেন না। সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেন, না।
ফায়দা: এখানেও হাদীসের শুধু সেই অংশই বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে নবী-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, খায়বারের অধিবাসী এক ইয়াহুদী নারী বিষ মিশ্রিত করে একটি ভুনা বক্সী নবী-এর নিকট পেশ করলো। তিনি ঐ বক্রীর গোস্তের মধ্য থেকে হাতার একটি অংশ ভক্ষণ করলেন। তাঁর সাথে আরো কিছু সাহাবীও খাচ্ছিলেন। তাঁরাও এই বিষ মিশ্রিত বক্সীর গোস্ত খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু লোকক্কা মুখে দিতেই নবী সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা খাওয়া বন্ধ করো (গোস্তে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে) এবং তখনই তিনি ঐ ইয়াহুদী নারীকে ডেকে পাঠালেন। (আসার পর) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই বক্রীর গোস্তে বিষ মিশিয়েছো? সে বললো, আপনাকে কে বলেছে? তিনি বললেন, এই টুকরোটি আমাকে বলে দিয়েছে যা আমার হাতে রয়েছে। তখন ঐ ইয়াহুদী নারী স্বীকার করলো এবং বললো, আমি আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য বিষ মিশিয়েছি। আপনি যদি সত্য নবী হন তবে এই বিষে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা, আপনি তা অবগত হতে পারবেন। আর আপনি যদি সত্য নবী না হন, তবে ধ্বংস হয়ে যাবেন এবং আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাবো। নবী ঐ নারীকে তার প্রাণনাশের চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো শাস্তি দেননি। বরং ক্ষমা করে দেন। নবী-এর সাথে যে সাহাবী ঐ মাংস ভক্ষণ করেছিলেন, তিনি ঐ বিষের প্রতিক্রিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
অন্যান্য রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, নবী তাঁর নিজের পক্ষ থেকে ঐ নারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অবশ্য যখন ঐ বিষে হযরত বিশর ইন্ন বারাআ (রা) ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর কিসাসস্বরূপ তিনি ঐ নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ হাদীস থেকে অনুমিত হয়, তিনি তাঁর প্রাণের শত্রুদের সাথে কি পরিমাণ সদয় আচরণ করতেন। তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া ছাড়াও তাদের কল্যাণ কামনাও করতেন। যেমন বিভিন্ন ঘটনা ও রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, তায়েফে শত্রুরা কি পরিমাণ তাঁকে নির্যাতন করে। দুষ্ট ও দুরন্ত বালকদেরকে লেলিয়ে দিয়ে প্রস্তর বর্ষণের মাধ্যমে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। নবীজীর মাথা গোঁজার কোথাও আশ্রয় ছিল না।
তায়েফের নেতারা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলো। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ঐ সময় হযরত জিব্রাঈল (আ) পাহাড়ের অধিকর্তা ফিরিস্তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং বলেন যে, আপনি হুকুম দিলে এখনই এই দুই পাহাড়ের মাঝে ফেলে তাদেরকে পিষে মারা হবে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এই দু'আই নিঃসৃত হলো اللَّهُمَّ أَهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ ) আল্লাহ্! আমার জাতিকে হিদায়াত করুন। কেননা, এরা জানে না (যে, আমি আল্লাহ্ রাসূল)"।
٧٥ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ سَجِرَ النَّبِيُّ اللهِ رَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ قَالَ فَاشْتَكَي لِذلِكَ أَيَّامًا ، قَالَ فَأَتَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ فَقَالَ إِنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ سَحَرَكَ فَعُقِدَلَكَ عَقْدًا فَأَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلِيًّا فَاسْتَخْرَجَهَا فَجَاءَ بِهَا، فَجَعَلَ كُلَّمَا حَلَّ عُقْدَةً وَجَدَ لِذلِكَ خِفَّةً، فَقَامَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَأَنَّمَا أُنْشِطَ مِنْ عِقَال: فَمَا ذَكَرَ ذَلِكَ لِليَهُودِي وَلَآرَاهُ فِي وَجْهِهِ قَطُّ -
৭৫. হযরত যায়িদ ইব্ন আরকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক ইয়াহুদী নবী-কে জাদু করলেন। ফলে তিনি কিছুদিন অসুস্থ বোধ করছিলেন।' বর্ণনাকারী বলেন, তারপর একদিন তাঁর নিকট হযরত জিব্রাঈল (আ) আগমন করে তাঁকে অবগত করলেন যে, জনৈক ইয়াহুদী আপনাকে জাদু করেছে এবং (কালো) সূতার মধ্যে গিরা লাগিয়েছে। নবী তখন হযরত আলী (রা)-কে সেখানে পাঠালেন। হযরত আলী (রা) সেই তাগা সেখান থেকে তুলে আনেন। নবী ঐ গিরাগুলো খুলতে শুরু করেন। এক একটি গিরা খোলার সাথে সাথে তাঁর কষ্টের উপশম অনুভূত হতো। সবগুলো গিরা খোলার সাথে সাথে তিনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, যেমন কোনো বাঁধা ব্যক্তি রশি থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো ঐ জাদুর আলোচনা ঐ ইয়াহূদীর সাথে করেননি এবং কখনো তিনি প্রতিশোধের দৃষ্টিতে তার প্রতি তাকাননি।
ফায়দা : রিওয়ায়াত সমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ ইয়াহুদীর নাম ছিল লাবীদ ইব্ আসাম। সে ছিলো বানু যুরায়ক গোত্রের লোক। সে নবীকে মেরে ফেলার জন্য (নাউযুবিল্লাহ্) তাঁর উপর প্রচণ্ড রকমের জাদু করেছিলো। মুশরিক ও ইয়াহুদীরা ছিলো তাঁর প্রাণের শত্রু। তাঁকে যে কোনোভাবে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ছিলো তারা সদা তৎপর। গোপন স্থানে লুকিয়ে থেকে আঁধার রাতে তাঁর উপর হামলা করেছে, বিষ প্রয়োগ করেছে এবং যখন তাতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তাঁকে জাদু দ্বারা মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর নবীর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, মানুষের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করবেন। وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنْ النَّاسِ )আল্লাহ্ আপনাকে লোকের হাত থেকে বাঁচাবেন)। তাই আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। কোথাও মুশরিকদের উপর প্রভাব ফেলে তাদের থেকে রক্ষা করেছেন, কোথাও ওহীর মাধ্যমে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেছেন এবং কোথাও ফেরেস্তা পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। নবী-এর নিকট সব উপায় বিদ্যমান ছিলো। যেভাবে ইচ্ছা ঐ ইয়াহুদী ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তাদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা কখনো করেননি। প্রতিবার কাফিরদের কষ্ট দানকে ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের প্রতি দয়া করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিলো, তারা হিদায়াত কবুল না করলেও তাদের সন্তান-সন্ততি অবশ্যই সুপথে আসবে। তিনি প্রতিনিয়ত তাঁর জাতির হিদায়াতের জন্য দু'আ করতেন। বিশেষ করে স্বীয় ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। তাই ইয়াহুদী যখন তাঁর উপর জাদু করলো তিনি তার প্রতি একটু অসন্তোষও প্রকাশ করেননি, তাকে শান্তি দেননি। এমনকি তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও করেননি। অপর এক রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বলেছিলেন যে, আপনি ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচারণা কেন চালাচ্ছেন না। তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ্ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তাই আমি তার দুর্নাম রটানো পছন্দ করলাম না। এটাই ছিলো তাঁর উঁচুমন ও মহান আল্লাহ্র বাণী ( إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٌ “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত)-এর বাস্তব নমুনা।
عَنِ ابْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمَ الْفَتْحِ أَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى صَفْوَانَ بْنِ أُمَيَّةَ بْنِ خَلْفَ وَأَبِي سُفْيَانَ بْنَ حَرْبٍ وَإِلَى الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ، قَالَ ابْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقُلْتُ قَدْ أَمْكَنَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْهُمْ بِمَا صَنَعُوا حَتَّى قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَا قَالَ يُوسُفُ لِإِخْوَتِهِ لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ فَانْفَضَحْتُ حَيَاءً مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ
৭৬. হযরত (উমর) ইব্ন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাওয়ান ইবন উমায়্যা ইবন খালফ, আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব ও হারিস ইবন হিশামকে ডেকে পাঠালেন। হযরত উমর (রা) বলেন, আমি আপন মনে বললাম, আজ আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তিদান ও প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দান করবেন। কেননা, স্পষ্টতই এরা যুদ্ধবন্দী। নবী তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং আমার দ্বারাই এ কাজ করাবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সে সময় বললেন, এখন আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ হযরত ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের মতো। এজন্য আমি তাই বলবো, যা হযরত ইউসুফ (আ) বলেছিলেন : ”لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ - কাজেই তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রা) বলেন, (তাঁর এই উদারতা দেখে) আমি লজ্জায় নতমুখ হয়ে গেলাম। (আমি যেখানে প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আনন্দ উল্লাস করছি, তিনি সেখানে আজীবনের দুশমনদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ শোনাচ্ছেন।)
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ كَاتِبٍ عَلَى أَنَّهُ سَمِعَ عَلِيًّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أنا والزُّبَيْرُ وَالْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ انْطَلِقُوا حَتَّى تَأْتُوا رَوْضَةَ خَاخٍ، فَإِنَّ بِهَا ظَعِيْنَةً مَعَهَا كِتَابُ فَخُذُوهُ مِنْهَا فَانْطَلَقْنَا حَتَّى آتَيْنَا رَوْضَةَ خَاخٍ فَقُلْنَا أَخْرِجْى الْكِتَابَ فَقَالَتْ مَا مَعِي مِنْ كِتَابِ قُلْنَا لَتُخْرِجَنَّ الْكِتَابَ أَوْ لَنُقَلِبَنَّ الثَّيَابَ فَأَخْرَجُوهُ مِنْ عِقَاصِهَا فَأَتْيَنَا بِهِ النَّبِيُّ فَإِذَا فِيْهِ مِنْ حَاطِبِ بْنِ أَبِي بَلْتَعَةَ إِلَى أُنَاسِ مِنَ الْمُشْرِكِينَ يُخْبِرُهُمْ أَمْرًا مِنْ أَمْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا حَاطِبُ مَا هُذَا ؟ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ لا تَعْجَلْ عَلَى إِنِّي كُنْتُ امْرًا مُلْصِقًا فِي قَوْمِي، وَكَانَ مَعَكَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ لَهُمْ قَرَابَاتُ بِمَكَّةَ يَحَمُوْنَ اَهْلِيْهِمْ فَأَحْبَبْتُ إِذَا فَاتَنِي ذَلِكَ مِنْهُمْ مِنَ النَّسَبِ أَنْ أَتَّخِذَ فِيْهِمْ يَدًا يَحَمُوْنَ بِهَا قَرَابَتِي، وَلَمْ أَفْعَلْ ذَلِكَ كُفْرًا وَلَا رِضًا بِالْكُفْرِ بَعْدَ الإِسْلامِ وَلَا ارْتِدَادًا عَنْ دِيْنِي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَدَقَكُمْ فَقَالَ عُمَرُ أَضْرِبُ عُنُقَ هُذَا الْمَنَافِقِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللَّهَ اطَّلَعَ إِلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
৭৭. হযরত আলী (রা)-এর কাতিব (লিপিকার) উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন্ন রাফি হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ যুবায়র, মিকদাদ (রা) ও আমাকে (এক মহিলা গুপ্তচরকে গ্রেফতার করার জন্য) প্রেরণ করেন এবং বলেন: তোমরা চলে যাও। যখন 'রাওযা খাখ' নামক স্থানে পৌঁছবে, সেখানে একটি স্ত্রীলোকের সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। তার নিকট একটি চিঠি আছে। চিঠিটা তার নিকট থেকে নিয়ে আসবে। আলী (রা) বলেন, আমরা তখনই রওয়ানা দিলাম। যখন আমরা 'রাওযা খাখ' পৌছলাম। সেখানেই ঐ স্ত্রীলোকটিকে দেখতে পেলাম। আমরা তাকে বললাম, 'চিঠি বের করো'। সে বললো, 'আমার কাছে কোন চিঠি নেই।' আমরা তাকে (ধমক দিয়ে) বললাম, চিঠি বের করো নতুবা আমরা তোমার দেহ তল্লাশি করবো। [হযরত আলী (রা) বলেন], তখন সে চিঠি তার চুলের খোঁপার মধ্য থেকে বের করলো। আমরা সে চিঠি নিয়ে নবী -এর নিকট উপস্থিত হলাম। (তিনি ঐ চিঠি খুলে দেখলেন), তাতে লেখা আছেঃ "হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আর পক্ষ থেকে (মক্কার) মুশরিকদের প্রতি" চিঠিতে রাসূলুল্লাহ্-এর কোনো যুদ্ধের গোপন খবর দেয়া হয়েছিলো। তিনি হাতিবকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন: হে হাতিব! এ কী ব্যাপার? হাতিব (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মেহেরবানী করে তাড়াহুড়ো করবেন না। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, আমি বংশগতভাবে কুরায়শী নই। বরং আমার গোত্র কুরায়শের মিত্র। আর এই সুবাদেই কুরায়শের সাথে আমার সামান্যতম সম্পর্ক বিদ্যমান। তাদের সাথে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক আদৌ নেই। অথচ আপনার সাথে যেসব মুহাজির আছেন, মক্কায় তাদের সবার আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। (তাদের আত্মীয়-স্বজন) তাদের ধন-সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। তাই আমি যখন দেখলাম, মক্কায় আমার এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, যারা আমার সম্পদ সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তখন আমি মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ করা শ্রেয় মনে করলাম, যাতে তারা আমার সম্পদ-সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করে। এটা আমি কুফর বা ইসলাম গ্রহণের পর কুফরীর প্রতি সন্তোষ প্রকাশ এবং আপন দীন ত্যাগ করার ভিত্তিতে আদৌ করিনি। (আমি এখনো ঠিক পূর্বের মতো একনিষ্ঠ মুসলিম রয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ সকল সাহাবাকে সম্বোধন করে বললেন: হাতিব তোমাদের কাছে সত্য কথা প্রকাশ করে দিয়েছে। (সে অজ্ঞতাবশতঃ এই ভুল করেছে) তখন হযরত উমর (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি তার শিরশ্ছেদ করবো না? তিনি বললেন, না, এরূপ করবে না। এ ব্যক্তি তো বদরের যুদ্ধে শরীক ছিল। মহান আল্লাহ্ বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কত মেহেরবান তা কি তুমি জানো? আল্লাহ্ বলেছেন : اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرَتْ لَكُمْ তোমরা যা ইচ্ছা করো। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।
ফায়দা: এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা, হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ (রা) সেই সকল মুহাজিরের অন্যতম; যাঁরা ইসলাম গ্রহণের দরুন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছেন। নিজেদের সকল সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ইসলামের জন্য মক্কায় ছেড়ে এসেছেন। হাতিব (রা) বদরের সেই সব সৌভাগ্যবান মুহাজির সাহাবীগণের অন্যতম, যারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কেই মহান আল্লাহ্ এই আয়াতসমূহ নাযিল করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيْلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمُ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلَ إِنْ يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَالْسِنَتَهُمْ بِالسُّوْءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ، لَنْ تَنْفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرُ.
হে মু'মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছো? অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাকো, তবে কেন তোমরা তাদের সাথে গোপন বন্ধুত্ব করছো? তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা প্রকাশ করো, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে কেউ এটা করে সে তো বিচ্যুত হয় সরল পথ হতে। তোমাদেরকে কাবু করতে পারলে তারা হবে তোমাদের শত্রু এবং হাত ও জিহ্বা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং চাইবে যে, তোমরাও কুফরী করো। তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিবেন। তোমরা যা কর, তিনি তা দেখেন। (সূরা মুমতাহিনা : ১-৩)
হযরত হাতিব (রা) ইয়ামনের অধিবাসী ছিলেন। পূর্ণ নাম হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ ইব্ন আম্র ইবন উমাইর ইবন সালামা ইবন সা'ব ইব্ন সাহল লাখামী। তিনি কুরায়শের বনূ আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যার মিত্র ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, হযরত যুবার (রা) এর মিত্র ছিলেন। তিনি যে বদরী সাহাবী ছিলেন সে ব্যাপারে সবাই একমত। বদরের যুদ্ধ ছাড়াও তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে ৩০ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।
তিনি ইয়ামন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করছিলেন। মক্কাবাসীদের সাথে তার কোনো আত্মীয়তা ছিল না। নবী-এর হিজরতের পর তিনি তাঁর পুত্রগণ ও ভাইদের ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন। সুতরাং মক্কার মুশরিকদের তরফ থেকে তাঁর সম্পদ-সন্তানের ক্ষতির আশংকা সততই ছিল। সেই আশংকায় তিনি (অজ্ঞতাবশত) এই কৌশল অবলম্বন করলেন যে, মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ দেখাবেন, যার দরুন তারা তাঁর সম্পদ-সন্তানের কোনো ক্ষতি করবে না। তাই তিনি মক্কার মুশরিকদের কাছে এই মর্মে এক চিঠি লিখলেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ অমুক দিন তোমাদের উপর আক্রমণ করবেন।” মক্কার মুশরিকদের কাছে গোপনে এই চিঠিটা পৌঁছাবার জন্য তিনি একটি স্ত্রীলোককে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁর নবীকে এই রহস্য জানিয়ে দিলেন এবং তিনি ঐ চিঠি উদ্ধার করলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাঁর সত্যতা স্বীকার করলেন এবং নবী-এর কাছে সব কথা খুলে বললেন। তিনি বললেন, আমি এ সব এই বিশ্বাস রেখেই করেছি যে, আল্লাহ্ আপনাকে এই যুদ্ধে অবশ্যই জয়লাভ করাবেন। আমার চিঠিতে ইসলামের এতটুকু ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার পরিবার-পরিজন ও মাল-আসবাব এই সামান্য উপকার দ্বারা রক্ষা পাবে। নবী ও শুধু তাঁর সত্যবাদিতার দরুন তাঁর ওযর কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবাগণকেও জানিয়ে দিলেন যে, আমি তাঁকে এজন্য ক্ষমা করে দিয়েছি।
এই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া করতেন। যুদ্ধের তথ্য বিশেষ করে হামলার দিন-তারিখ দুশমনকে জানিয়ে দেওয়া হত্যাযোগ্য অপরাধ। আর এ কারণেই হযরত উমর (রা) তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু নবী এতবড় অপরাধকেও নিছক তাঁর সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার দরুন ক্ষমা করে দিলেন এবং কোনো শাস্তি বিধান করলেন না।
۷۸ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَتِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ اضْرِبُوهُ فَمِنَّا الضَّارِبُ بِيَدِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِنَعْلِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِثَوْبِهِ ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ الْقَوْمِ أَخْزَاكَ اللَّهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لا تَقُولُوا هَكَذَا وَلَا تُعِينُوا الشَّيْطَانَ عَلَيْهِ وَلَكِنْ قُولُوا رَحِمَكَ اللَّهُ -
৭৮. হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট এক মদ্যপ ব্যক্তিকে আনা হলো। তিনি লোকদেরকে বললেন: ওকে পিটাও। (বর্ণনাকারী বলেন, এ আদেশ পাওয়া মাত্রই) আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাকে হাত দিয়ে মারা শুরু করলো, কেউ জুতা দিয়ে এবং কেউ কাপড় দিয়ে। এরপর সে যখন মারপিট খেয়ে চলে গেলো, তখন এক ব্যক্তি তাকে বদ্ দু'আ দিলো এবং বললো, আল্লাহ্ তোকে হেয় ও অপদস্থ করুন। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, এভাবে বলো না এবং এ কথা বলে তার উপর শয়তানকে প্রবল করো না। বরং বলো, আল্লাহ্ তোমার উপর রহম (দয়া) করুন।
ফায়দা : নবী ﷺ সবার সাথে সদ্ব্যবহার করতেন। কখনো কাউকে নিজেও বদ্ দু'আ করতেন না এবং অন্যকেও বদ্ দু'আ করতে নিষেধ করতেন। একজন মদ্যপায়ীকেও বদ্ দু'আ দেয়া তিনি পছন্দ করলেন না। আর যখন কেউ বদ্ দু'আ দিলো, তখন তাকেও তা থেকে বিরত রাখলেন, বললেন: বদ্ দু'আ করো না, বরং তার কল্যাণ কামনা করো। তবে তিনি ঐ মদ্যপায়ীকে মারপিট করার যে আদেশ করেছিলেন, তা ছিল মদপানের শাস্তিস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, তখনো মদ্যপানের দণ্ড নির্ধারিত হয়নি, তাই মারপিট করে ছেড়ে দেন।
۷۹. عَنْ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قِسْمًا، فَقَالَ رَجُلٌ مِّنَ الْأَنْصَارِ إِنَّ هَذِهِ القِسْمَةَ مَا أُرِيدُ بِهَا وَجْهُ اللَّهِ فَذُكِرَتْ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَأَحْمَرُ وَجْهَهُ وَقَالَ رَحْمَةُ الله عَلَى مُوسَى قَدْ أُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هُذَا فَصَبَرَ -
৭৯. হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ মালে গনীমত বণ্টন করছিলেন। জনৈক আনসারী (কটাক্ষ করে) বললো, এ বন্টনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়নি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা নবী ﷺ-এর কর্ণগোচর হলো। এ কথা শোনামাত্রই তাঁর চেহারা মুবারক লাল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, মূসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্র রহমত হোক! তাঁকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা ও দুশমনী সব সময় লেগেই থাকতো। নবী ﷺ যখন এ দুনিয়ায় আবির্ভূত হন, তখন তিনি তাঁদেরকে এক দীন ও এক পথে এনে দাঁড় করিয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার এমন আত্মা ফুঁকে দেন, যাতে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রেম-ভালবাসা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হওয়া শুরু করলো। পুরানো শত্রুতা দূর হতে লাগলো। তা সত্ত্বেও এমন কিছু লোক অবশিষ্ট ছিল যাদের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রেম-ভালবাসা সৃষ্টি হয়নি। বিশেষত আনসারগণ তাদের চাষাবাদে ব্যস্ত থাকার দরুন নবী-এর সাহচর্য থেকে যথোচিত উপকৃত হতে পারতো না। যেমন: একদিন যখন তিনি গনীমতের কিছু মাল সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করেছিলেন, তখন তাঁর বণ্টন খুব সুষ্ঠু হওয়া সত্ত্বেও ঐ ধরনের এক আনসারীর মনে অন্য গোত্রের লোককে সম্পদ লাভ করতে দেখে তার পুরানো শত্রুতা জাগ্রত হলো। সে (অজ্ঞানবশত) নবী-এর বণ্টনকে অবিচার বলে আখ্যায়িত করলো এবং তাঁর ব্যাপারে এই অশিষ্ট বাক্য প্রয়োগ করলো। কিন্তু নবী ঐ আনসার ব্যক্তির কথা শুনে ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বললেন, হযরত মুসা (আ)-কে আমার চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তিনিও ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। আমিও ধৈর্য ধারণ করছি। তোমরাও এরূপ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করবে। এটাই নবীদের তরীকা বা পথ। নবী ইচ্ছা করলে ঐ আনসারকে তার ঔদ্ধত্যের শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমা করে দেন এবং তাকে কিছুই বললেন না। এই হচ্ছে তাঁর উদারনৈতিক শিক্ষা। এই নৈতিক উদারতা শক্তি দ্বারাই ইসলাম সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করছে।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا يُبَلِّغُنِي احَدٌ مِنْكُمْ عَنْ أَحَدٍ مِنْ أَصْحَابِي شَيْئًا فَانِي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصدر -
৮০. হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন: তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কোনো সাহাবী সম্পর্কে আমার কাছে কোনো অভিযোগ করবে না। কেননা, আমি তোমাদের সামনে যখন আসবো তখন তোমাদের ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রশান্ত থাকুক— এটাই আমি চাই।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক রাখার জন্য নবী ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি আমার কাছে কারো বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ করবে না, যাতে তার প্রতি আমার মনে কোনো অসন্তোষ বা বিষণ্ণ ভাব জাগতে পারে। এ হাদীস নবী-এর ক্ষমা ও দয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ। কেননা, কারো থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ন্যূনতম মাধ্যম হচ্ছে তার সম্পর্কে কোনো কুৎসা শোনা বা প্রচার করা, যাতে তার অপমান হয় ও বদনাম রটে যায়। কিন্তু নবী তার শিকড়ই উপড়ে ফেলেন। সকল সাহাবাকে এই মর্মে নিষেধ করে দেন যে, তোমাদের কেউ কারো বিরুদ্ধে আমার কাছে কোনো অভিযোগ বা বদনাম করবে না, যাতে তোমাদের প্রতি আমার মন সর্বদা পরিষ্কার থাকে এবং আমি তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ইনসাফ ও সুবিচারমূলক আচরণ করি। আর এই উত্তম আদর্শই )اُسْوَةُ حَسَنَةً( আমার সমস্ত উম্মত নিজেদের বৈশিষ্ট্য )شعار( বানাবে। এখানে স্মর্তব্য যে, কারো বদনাম শোনা ও শোনানোর মধ্যেই পারস্পরিক সম্পর্কে অবনতির বীজ উপ্ত থাকে। নবী তাঁর উপরোক্ত ঘোষণার মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন করতে চেয়েছেন।
টিকাঃ
১. প্রকাশ থাকে যে, الاقرب فالاقرب )যে সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সবচেয়ে প্রথম হকদার) এই নীতি অনুযায়ী হযরত যুবায়র (রা)-এর পানি সেচ অধিকার ছিল আনসারীর পূর্বে। তাছাড়া ফসলের ক্ষেত বা বাগানের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখা প্রত্যেক ক্ষেত বা বাগান মালিকের অধিকার। তাই রাসূলুল্লাহ্-এর প্রথম উক্তি উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসার ভিত্তিতে ছিল এবং দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল আইনের বিচার।