📄 আল্লাহ তাআলা গরিবের বন্ধু
[৩৮] ইউনুন মিসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমরা একবার সফরে বের হলাম। ভ্রমণের সময় একজন আবেদ্যা মহিলার সাথে আমার সাক্ষাত হলো। মহিলা অনেক নেককার ছিলেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি অনেক চিন্তিত—যেন স্বীয় সন্তানকে হারিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। সে-মহিলা আমাকে বললেন, 'তুমি কোন জায়গা থেকে এসেছ?' উত্তরে আমি বললাম, 'আমি একজন নিম্ন মানুষ!'
তখন সে-মহিলা বলতে লাগলেন, 'ওহে মুসাফির, তোমার সাথে আল্লাহ তাআলা থাকা সত্ত্বেও তুমি নিজেকে অসহায় মনে করছ এবং নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছ? অথচ আল্লাহ তাআলা হলেন অসহায়দের বন্ধু, তিনি দুর্বল ও সম্বলহীনদের সাহায্য করেন!'
আমি এই মহিলার কথা শুনে কেঁদে দিলাম। তখন তিনি আমাকে বলতে লাগলেন, 'আমি তো জানি, আমি হৃদয়ে প্রশান্তি জোগায়, আর কান্নার মাধ্যমেই মানব-আত্মায় শান্তি আসে। তবে একটা কথা মনে রেখো, বিলাপ করে আরও কাছে মনের দুঃখ প্রকাশ করা থেকে হৃদয়ের জমিনে হাজারও কষ্ট লুকিয়ে রাখাই শ্রেয়।'
আমি তাকে বললাম, 'তা হলে আপনি আমাকে কিছু শিক্ষা দিন।' তখন তিনি বলতে লাগলন, 'আল্লাহকে ভালোবাসো, আল্লাহর প্রতিই আগ্রহী হও। তোমার যা কিছু প্রয়োজন, তাঁর কাছে চাও, তিনি তোমাকে কখনো তার দরজা থেকে ঠেলে ফেলে দেবেন না। কেননা, আল্লাহ তাআলা কোনো একদিন তাঁর প্রিয় বান্দাদের দিকে তাকাবেন এবং তাদের মনের সকল আশা পূরণ করে করে দেবেন।'
এরপর আমি আবেদ্যা মহিলাকে সেখানে বিদায় জানিয়ে সামনে রওয়ানা হলাম।
📄 পাহাড়ের চূড়ায়
[৩৯] মুহাম্মাদ ইবনু আবী আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, শামের একজন ব্যক্তি আমাকে বর্ণনা করেছেন, একবার রাস্তায় একজন খ্রিস্টানের সাথে আমার সাক্ষাত হলো। তখন আমি তাকে বললাম, 'ভাই, আপনি কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছেন?' সে আমাকে জানাল, 'ভাই, আমি তো একজন পাদরির কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করেছি। পাদরি থেকে জ্ঞান আহরণ করব তো, ভাই!'
আমি তাকে বললাম, 'আমি যদি তোমার সাথে তোমার কাঙ্ক্ষিত পাদরির কাছে যেতে চাই, তা হলে কোনো সমস্যা আছে?'
সে বলল, 'না, কোনো সমস্যা নেই। তুমি মোরে চাইলে আমার সাথে চলো।' আমরা অনেকটা পথ মাড়িয়ে রাস্তার শেষ প্রান্তে একটি পাহাড়ের গুহার কাছে এলাম। ঐ খ্রিস্টান ব্যক্তি সেখানে দাঁড়িয়ে সজোরে ডাক দিয়ে বলতে শুরু করল, 'হে কল্যাণকর বিষয়ের শিক্ষাদাতা, আমি আপনার থেকে ভালো কিছু জ্ঞান অর্জন করতে এসেছি। আপনি আমাকে ভালো কিছু শিক্ষা দিন। আল্লাহ আপনাকে স্বীয় ইলমের মাধ্যমে উপকৃত করবেন!'
কথাগুলো সে খুব জোরে জোরে চিৎকার করে বলল। তখন পাহাড়ের গুহা থেকে অদ্ভুতভাবে কে যেন জবাব দিতে লাগল, 'হে কল্যাণের পথযাত্রী, যখন মুর্খরা নিজেদের ব্যাপারে বেখবর হয়ে রইবে, তখন তুমি সচেতন থেকো।'
খ্রিস্টান ব্যক্তিটি তখন বসে পড়ল এবং রোদন করা শুরু করে দিল। তাকে দেখে আমার অসুস্থ মনে হলো। আমি পেরেশান হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি মৃত্যু এসে তাকে গ্রাস করে ফেলবে। কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি তাকে বললাম, 'আমার যদি পাহাড়ের মধ্যে প্রবেশ করি, তা হলে ভালো হবে।'
তখন খ্রিস্টান লোকটি বলল, 'তোমার ইচ্ছে।'
এরপর আমরা গুহার দিক অগ্রসর হলাম। অদূরেই নজরে পড়ল একজন মানুষের ওপর। লোকটি একেবারে বৃদ্ধ। টিলঢালা চামড়া, চুল সাদা। তার ভ্রুগুলো চোখ ছুঁয়ে পড়ছে। বৃদ্ধটি তার মাথা নিচু করে বসে আছে। এগুলো দেখে আমি খুবই বিস্মিত হলাম। বৃদ্ধ লোকটি মুখে একটি বাক্য উচ্চারণ করেছ, 'ওহে দয়াময়, যদি তুমি দুনিয়ার জন্য আমার কষ্ট-ক্লেশকে প্রলম্বিত কর, আখিরাতে আমার দুর্ভাগ্যকে দীর্ঘায়িত কর, তার মানে হলো তুমি আমাকে অবকাশ দিয়েছ এবং আমাকে তোমার দৃষ্টি থেকে ছেড়ে দিয়েছ।'
আমরা ধীরে-ধীরে বৃদ্ধ লোকটির সামনে গেলাম এবং তাকে সালাম করলাম। তিনি তার চেহারায়ও ওপরে উঠালেন। দেখতে পেলাম, তার দু চোখের কোণ বেয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ছে। তার চোখের পানিতে জমিন ভিজে গেছে। বৃদ্ধ লোকটি আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর বলতে লাগলেন, 'আমার এখানে তোমরা কেন এসেছ? কী চাও তোমরা? তোমাদের জন্য কি পুরো জমিন প্রশস্ত নয়, সেখানের মানুষগুলো কি তোমাদের সান্ত্বনা দিতে পারে না?' যখন আমি তার জ্ঞানের পরিচয় পেলাম, তখন তাকে বললাম, 'আল্লাহর শপথ, আমরা আপনার জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ছিলাম, আর জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকতে চাই।' আমার এ-কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি আরও জোরে কেঁদে ফেললেন। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলতে লাগলেন, 'তোমার জন্য কি আল্লাহর রহমত প্রশস্ত নয়, অথচ সারা জগত জুড়ে আল্লাহর রহমত বিস্তৃত রয়েছে?'
তখন আমি বললাম, 'আল্লাহ তাআলার রহমত, দয়া, মায়া মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের লোকের জন্য হয় না।'
তখন বৃদ্ধ আরও কেঁদে দিয়ে বলতে লাগলেন, 'আমি তো ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম জানি না!' তখন আমার সাথে-আসা খৃস্টান বিরক্ত হয়ে বলতে লাগল, 'ওহে কল্যাণের শিক্ষাদাতা, আপনি কি খৃস্টানধর্ম এবং ঈসা ইবনু মারিয়াম-এর ধর্ম থেকে বিমুখ হয়ে গেছেন?' বৃদ্ধ লোকটি খৃস্টানের দিকে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকালেন। এরপরে বলতে লাগলেন, 'তোমার অকল্যাণ হোক, আমি তো ঈসা-এর ধর্মের উপরই আছি, আর ঈসা-এর ধর্ম কি ইসলামধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম ছিল? না, বরং ঈসা- এর ধর্মও ইসলামধর্ম ছিল। আল্লাহ তায়ালা যখন তাকে সৃষ্টি করেছিলেন, তখনই তাঁকে ইসলামধর্মের জন্য সৃষ্টি করেছেন। যে ইসলামধর্ম থেকে বিমুখ হয়ে যাবে, পরকালে সে কোনো সুখবর কিংবা সুখের কিছুই পাবে না!'
এ-কথা শোনার পরে খৃস্টান ক্ষেপে গেল ও উত্তেজিত হলো। সে পাহাড় থেকে ফিরে আসতে চাইল। তখন আমি ঐ খৃস্টানকে বললাম, 'ভাই, একটু অপেক্ষা করুন, দুজন একসাথেহেঁ বের হয়ে যাব।'
খৃস্টানের কাজকর্ম দেখে বৃদ্ধ লোকটি বলতে লাগলেন, 'ঐ খৃস্টানকে যেতে দাও, যার কপালে দুর্ভাগা লেখা রয়েছে, সে কোনো দিনও সফল হতে পারবে না!'
কিন্তু এই বৃদ্ধ পাহাড়ের চূড়াকে কেন পছন্দ করলেন, দুনিয়ার ঘরবাড়ি ছেড়ে কেন তিনি এখানে একা একা বসবাস করছেন – এ-সব প্রশ্ন আমার মনে তীব্র দোলা দিতে লাগল। একপর্যায়ে আমার মনের অজান্তে লুকিয়ে-থাকা প্রশ্নটা তাকে করেই ফেললাম, 'আরাহার রহম আপনার জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে নাযিল হোক। আচ্ছা, আপনি মানুষ থেকে পৃথক হয়ে এই একাকী স্থানকে বেছে নিলেন কেন?' তখন তিনি উত্তরে বলতে লাগলেন, 'তুমি তো আমার ভাই, এই স্থানটা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার এক উত্তম জায়গা। তুমি যদি এই জায়গাটা গ্রহণ কর, তা হলে এরচে আর কোনো উত্তম স্থান খুঁজে পাবে না।' তখন আমি তাকে বললাম, 'খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে হয়?' তখন তিনি বললেন, 'যখন আমি খাবারের ইচ্ছা করি, জমিন খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়। গাছও ফলফলাদি দেয়।' আমি বললাম, 'বিদায়বেলা আপনি আমাকে কিছু নসিহত করুন, আপনার দেয়া নসিহতগুলো যেন আমি মেনে চলতে পারি।'
তখন তিনি বললেন, 'সত্যিই আমার নসিহত ও ওসিয়ত মানবে?' আমি বললাম, 'ইনশাআল্লাহ।' দরদমাখা কণ্ঠে তিনি বলতে লাগলেন, 'দুনিয়াতে বসবাস করতে গিয়ে আগামীকালের জন্য কিছুই জমা করে রেখো না। আমাদের কোনো অংশে নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিও না। আল্লাহর আবশ্যকীয় বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করবে। আল্লাহর প্রিয় কাজগুলোকে তোমার প্রিয় করে নেবে, যদিও সেগুলো তোমার কাছে কষ্টের মনে হয়। সর্বোপরি তোমাকে আরেকটা কথা বলি—শোনো, কখনো অন্যের মুখাপেক্ষী হবে না।'
টিকাঃ
[৪০] ইনরিহুন মুখজিয়া, আবু নু'আইম: ৯/৩৮৯
📄 খলীফা হারুনের পুত্রের ঘটনা
[৪০] আবদুল্লাহ ইবনু আবুল ফারাজ বলেন, আমার বাড়ির দেয়ালটা ধসে পড়ায় দেয়ালের পুনর্নির্মাণের জন্য কাজের লোকের তালাশে বের হই। মজদুর তালাশ করতে করতে বাজারে আসি। দেখতে পেলাম, বাজারের শেষ প্রান্তে একজন যুবক বসে আছে। অতি সাধারণ একটি তোয়ালে তার কাঁধে ঝুলানো। গায়ে সুতার একটি জুব্বা। যুবকের কাছে যাই। অত্যন্ত সুন্দর, দেহের অবয়ব অনেক ভালো। একটি বৃক্ষের নিচে সে বসে আছে। সে তার সময়কে নষ্ট করে না। হাতে আছে একটি কুরআন শরীফ। সে বসে-বসে তিলওয়াত করছে। 'হে যুবক ভাই, তুমি কি আমার ভাঙা দেওয়াল ঠিক করে দেওয়ার কাজে সম্মত আছ?' বিনীতভাবে বললাম আমি। যুবক উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ, সম্মত আছি। তবে দুটি শর্ত : ক. আপনি আমার কাজের বিনিময়ে আমাকে এক দিরহাম এবং আরেক দিরহামের ছয়ভাগের একভাগ দেবেন। খ. নামাজের সময় হলে আপনি আপনার কাজ আর করবেন না। নামাজ আদায় করতে চলে যাব। আপনার কাজ না করে আমি মালিকের সাথে নীরবে-নিভৃতে ইবাদত করব।' যুবকের দুই শর্ত মেনে নিলাম আমি। তাকে নিয়ে আমার বাড়িতে আসার পর যুবকটি শর্ত অনুযায়ী কাজেই ব্যস্ত হয়ে যায়। যুবক আল্লাহর নাম জপত আর কাজে মগ্ন থাকাত কারও সাথে কোনো কথা বলত না। এভাবে যোহরের সালাতের সময় ঘনিয়ে এলো। তখন যুবক আমাকে বলল, 'হে আবদুল্লাহ, মসজিদের মিনার থেকে আল্লাহর ডাক চলে এসেছে, আমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে মসজিদে চলে যাব।' আমি বললাম, 'যাও, কোনো সমস্যা নেই।'
যুবক যোহরের সালাত আদায় করে পুনরায় কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। এভাবে আসরের সালাতের আযান পর্যন্তও কাজ করতে লাগল। আসরের সালাতের আযানের সাথে সাথেই যুবক আবার মসজিদে চলে গেল। (অন্য বর্ণনায় আছে, এই সময়ের ভেতর যুবকটি একাই দশজনের কাজ করে ফেলল।) বেলা শেষে পুনর্বার্ধিত পারিশ্রমিক নিয়ে যুবক নিজ বাড়ি চলে গেল।
পরদিন দেয়ালের বাকি কাজ করার জন্য কাজের লোক খুঁজতে বের হওয়ার প্রাক্কালে আমার স্ত্রী ডেকে বলল, 'গতকালকার যুবকটাকে খুঁজে নিয়ে আসুন। কাজের লোক হিসেবে সে অনেক ভালো।' আমি সে-যুবককে খুঁজতে বাজারে যাই, কিন্তু সেখানে তাকে পেলাম না। লোকমুখে জানতে পারলাম যে, যুবক শুধু সপ্তাহে একদিনই (শনিবার) কাজ করে। আর পুরো সপ্তাহে আল্লাহর ইবাদাতে মগ্ন থাকে। আমি আর অন্য কোনো কাজের লোক তালাশ না করে সোজা বাড়িতে চলে আসলাম।
পুরো সপ্তাহ ঐ যুবকের অপেক্ষা করলাম। আজ শনিবার। তাকে খুঁজাতে খুঁজে পেলাম। পূর্বের শর্ত অনুযায়ী আজও কাজেই লেগে যায় যুবক। বেলা শেষে কাজের ধরন দেখে আমি তাকে দুই দিনার দিলে যুবক তা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায়। সে পুনর্বার্ধিত পারিশ্রমিক নিয়েই চলে যায়। এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে পুনরায় আমি শনিবার তার বেলাম। কিন্তু আমি তাকে বাজারে পেলাম না।
তখন কেউ বলল, যুবক তো অসুস্থ। তালাশ করতে করতে জানতে পারলাম, ঐ যুবক একজন বৃদ্ধার ঘরে আছে। আমি সেখানে গিয়ে বৃদ্ধার কাছে জিজ্ঞেস করে যুবকের ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, অসুস্থতার কারণে সে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। যুবককে দেখে আমার বেশ কষ্ট হলো। আমি যুবককে সালাম করলাম। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর পেলাম না। এবার পুনরায় তাকে সালাম করলাম। এবার সে চোখ খুলে আমাকে চিনতে সক্ষম হলো। তার মাথার নিচে ছিল ইঁট। আমি ত্বরিত ইঁটটি সরিয়ে তার মাথাটাকে আমার কোলে রাখলাম। জড়িয়ে ধরলাম পরম আবেগে।
তারপর তাকে বললাম, 'তোমার কোনো প্রয়োজন আছে কি?'
আমি বললাম, 'ইনশাআল্লাহ, রাখবো।' যুবক তার আবেগমাখা কণ্ঠে আমাকে বলতে লাগল—
• হে আমার বন্ধু, তুমি দুনিয়ার আকর্ষণে ধোঁকাগ্রস্ত হয়ো না। মানুষের জীবন যেমন নিঃশেষ হয়ে যায়, তেমন তোমার জীবনও নিঃশেষ হবে। তুমি যখন কাউকে কবরস্থ করার জন্য কবরে নিয়ে যাও, তখন এই চিন্তা করবে যে, একদিন তোমাকেও এভাবে কবরে নিয়ে যাওয়া হবে।
• হে আমার প্রিয় বন্ধু, আমার মৃত্যু সন্নিকট, আমার দেহ থেকে আত্মা নামক প্রাণ- পাখি উড়ে যাওয়ার পর তুমি আমাকে গোসল দিয়ে আমার পুরনো কাপড় দিয়ে আমাকে কাফন পরাবে।
আমি বললাম, ‘হে আমার ভাই, আমি যদি তোমাকে নতুন কাপড় দিয়ে কাফন পরাই, তা হলে কি কোনো সমস্যা আছে?’ যুবক বলল, ‘নতুন কাপড় পরিধান উপযুক্ত হচ্ছে জীবিত মানুষ। তা ছাড়া নতুন কাপড়ও কিছু দিন পরেই ছিঁড়ে-ফেঁটে যাবে, বাকি থাকবে মানুষের আমলসমূহ। সুতরাং তুমি পুরাতন কাপড় দিয়েই আমাকে সমাধিস্থ করবে।'
• হে হৃদয়ের বন্ধু আমার, যে-ব্যক্তি আমার কবর খনন করবে, তাকে তুমি আমার এই পানির পাত্র এবং ছুরির হাদিয়া দিয়ে দিয়ো। তোমার কাছে আমার বড় ওসিয়ত হলো যে, আমার এই আরচি এবং কুরআন শরীফ তোমার কাছে আমানত রাখলাম। তুমি আমার এই আমানতগুলো খলীফা হারুনের কাছে পৌঁছে দিয়ো। অন্য কারও কাছে দিয়ো না। খলীফা হারুনের হাতে এগুলোর দিলেম, একজন প্রবাসী এই আমানতগুলো আপনার কাছে পৌঁছে দেয়ার ওসিয়ত করে সে এই মৃত দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে এবং আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, উদাসীন এবং ধোঁকাগ্রস্ত অবস্থায় যেন আপনার মৃত্যু এসে না যায়। এর কিছুক্ষণ পরই দেখ থেকে তার প্রাণপাখি উড়ে গেল। যুবক এখন লাশে পরিণত হলো। যুবকের মৃত্যুতে আমি অত্যন্ত মर्माহত ও দুঃখিত হলাম। আমি শুরুতে জানতাম না যে, এ যুবক খলীফা হারুনের পুত্র। তারপর তার ওসিয়ত মোতাবেক তার কাফন-দাফন সমাধা করি। আর ছুরি এবং লোটা কবর-খননকারীর হাদিয়া দিয়ে দিই। পবিত্র কুরআন শরীফ এবং খলীফা হারুন স্বাক্ষরের সাথে সাক্ষাতের জন্য রওনা করি। রাস্তার এক প্রান্তরে বসেছিলাম বাদশার অপেক্ষায়। একটু পরে দেখতে পেলাম, খলীফা সেখান দিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাকে ডেকে ডেকে বলতে লাগলাম, 'খলীফা, আমার কাছে আপনার কিছু আমানত গচ্ছিত আছে!' এরপর খলীফা আমাকে রাজদরবারে নিয়ে যেতে আদেশ করলেন। লোকেরা আমাকে রাজদরবারে নিয়ে গেল। খলীফা রাজদরবারে আমাকে তলব করলেন, আমি খলীফার সামনে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কে?' আমি বললাম, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনুল ফারাজ।' তারপর তার হাতে আরচিটি দিয়ে বললাম, 'খলীফা, প্রবাসী এক যুবক এই পবিত্র কুরআন এবং আরচিটি আমার কাছে আমানত রেখে আপনার কাছে পৌঁছানোর ওসিয়ত করে মৃত্যুবরণ করেছে। তাই আমি এই আমানত আপনার কাছে পৌঁছানোর জন্য বসরা থেকে বাগদাদে এসেছি। যুবক এখন আর পৃথিবীতে নেই। তাকে বসরার জমিনেই সমাধিস্থ করা হয়েছে।' এভাবে আরও বিস্তারিত খুলে বললাম আমি। খলীফা হারুন পবিত্র কুরআন এবং আরচিটি দেখে ফ্যালফ্যাল নয়নে রইলেন আমার দিকে—যেন আমি তার পুরনো স্মৃতিবিজড়িত কোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছি। তিনি অবশেষে কাঁদতে লাগলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে শির নিচু করে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি নিজ হাতেই তার কবরের মাটি দিয়েছ?' আমি উত্তর দিলাম, 'জি হ্যাঁ, আমি নিজেই তার কাফন-দাফন সমাধা করেছি।' খলীফা জিজ্ঞাসা করলাম, 'ঐ যুবকের সাথে আপনার কী সম্পর্ক?' খলীফা বললেন, ‘ঐ যুবক আমার পুত্র।’ আমি বললাম, 'তাঁ-র অবস্থা হলো কী করে?' বাদশা বললেন, ‘এই দুনিয়ার প্রতি তার কোনো লোভ-লালসা ছিল না। এই খৃসার মর্তিকা নামক দুনিয়াতে অপরিচিত হয়ে চলতে সে পছন্দ করত। তার খরচাদির জন্য তার কাছে অনেক টাকা দিয়েছি, কিন্তু সে তার মায়ের থেকে অতিরিক্ত কোনো টাকা-পয়সা গ্রহণ করত না। তার মাও দুনিয়াতে বেঁচে নেই। তুমি আজ যা জানালে, এর বাহিরে আমিও পুত্র সম্পর্কে কিছুই জানতাম না!'
তারপর খলীফা আমাকে বললেন, ‘রাত্রি হলে আমি তার কবর যিয়ারত করতে যাব। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে।’
রাতের আঁধার ঘনিয়ে এলে খলীফা আমার সাথে একাকী বের হয়ে এলেন এবং পুত্রের কবর যিয়ারত করলেন। তিনি সেখানে প্রচুর অশ্রু বিসর্জন দিয়ে সকালে আবার ফিরে গেলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘কথা দাও যে, আমার সাথে প্রতিদিন এভাবে কবর যিয়ারত যাবে।’
আমি তাকে কথা দিলাম এবং বেশ অনেক দিন খলীফার সাথে রাত নেমে এলে তার পুত্রের কবর যিয়ারত করতে যেতাম তার সাথে। খলীফা যদি না জানাতেন, তা হলে আমি জানতেই পারতাম না যে, যুবকটি ছিল খলীফার পুত্র।
এক বর্ণনায় এসেছে, এই ঘটনার পর খলীফা ইবনুল ফারাজকে অনেক সম্পদ উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। ১৫
আবু বকর রহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন আবদুল্লাহ ইবনুল ফারাজকে ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁর মৃত্যুর কথা আবদুল্লাহর ভাইদেরকেও জানাননি। তিনি একাই গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করলেন। অথচ তখনো তার ভাইয়েরা ঘরের দরজার সামনে আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কাফন ইত্যাদি পরানোর পরে আবদুল্লাহর ভাইদেরকে তিনি বললেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু আল ফারাজ মারা গেছে!’
এরপর আবদুল্লাহর ভাইয়েরা তাকে বকন করে নিয়ে দাফন করে দেন।
টিকাঃ
১৫. এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, যিয়ারতের পরবর্তী রাতে স্বপ্নে আবদুল্লাহ ইব্নুল ফারাজ রহিমাহুল্লাহ একটি নুরের বিরাট গম্বুজ দেখতে পান। সেই নুরে উপবিষ্ট বাদশাহ হারুনের যুবক পুত্র মূসা মুখ হাসছে আর বলছে, ‘হে আবু আমের, [প্রাণপুরুষের উপাধি] তুমি আমাকে অতি উত্তমভাবে কাফন-দাফন করেছ, আমার অরিয়তসমূহ যথাযথভাবে পূরণ করেছ এবং আমার আমানত গুনাহের মুক্তি দিয়েছে। আমরা তাআলা তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুক।’ এই বলে হাসতে হাসতেই সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
📄 পড়ন্ত বিকেলে
[৪১] মুহাম্মাদ ইবনু খালাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, বালহাজ্জাম নামক এলাকার একজন মুয়াজ্জিন বলেছেন, সুফিয়ান সাওরী রহিমাহুল্লাহ আমাদের পল্লীতে বসবাস করা শুরু করলেন। তিনি আমাদের সাথে এমনভাবে বসে থাকতেন যে, আমরা তাকে চিনতেই পারতাম না। আমরা ভাবতাম, তিনি গ্রাম্য কেউ হবেন। তার চলাফেরাতে কোনো জৌলুস ছিল না। তিনি আমাদের থেকে হাদীস শুনতেন। তিনিও আমাদেরকে বিভিন্ন হাদীস শোনাতেন। আর যখন তিনি যিয়ারত বলতেন, তখন জামাতের আলোচনা করে আমাদেরকে আনন্দ দিতেন। আবার জাহাজামের আযাব সম্পর্কে হাদীস বলে আমাদেরকে ভীতি প্রদর্শণও করতেন। সূর্য যখন পড়ন্ত বেলায় এসে ডুবে দিত, তখন তিনি ফেরার পথ ধরতেন।