📘 গুরাবা > 📄 যেমন হবে একজন মুমিন

📄 যেমন হবে একজন মুমিন


[৩২] আবদুল্লাহ ইবনু হুয়াহিদ রাহিমাহুল্লাহু দুনিয়াতে একজন মু'মিনের কেমন হওয়া উচিত, সে-সম্পর্কে মনের মাধুরী মিশিয়ে আবৃত্তি করেন—
أَخْصَ الْنَّاسِ بِالْإِيْمَانِ عَبْدٌ ... خَفِيفُ الْحَاذِ مَسْكَنُهُ الْقِفَارُ
لَهُ فِي اللَّيْلِ حَظُّ مِن صَلَاةٍ ... زَمَنَ صَوْمٍ إِذَا جَاءَ الْقِفَارُ
وَقُوْتُ النَّفْسِ يَأْتِي فِي كَفَافِ ... وَكَانَ لَهُ عَلَى ذَاكَ اضْطِرَابُ
وَفِيْهِ عِفَّةٌ وَبِهِ خُمُوْلٌ ... إِلَيْهِ بِالْأَصَابِعِ لَا يُشَارُ
وَلَمَّا الْبَاكَياتِ عَلَيْهِ لَمَّا ... قَضَى نَحْبًا وَلَيْسَ لَهُ يُسَارٌ
فَذَلِكَ قَدْ نَجَا مِن كُلِّ شَرٍّ ... وَلَمْ تَمْسَسْهُ يَوْمَ الْبَعْثِ نَارُ
শ্যালক্যুনতিদের মালিক যিনি, জগত মু'মিনের মধ্যে থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মু'মিন তিনি।

রাতের আঁধারে প্রচুর কদমে সিজদায় পড়ে কাদন,
দিনের বেলায় রোযা রাখেন, প্রচুর প্রেমে হাসেন।

নশ্বর এই ধরবার বুকে বেশি কিছু নাহি চায়,
খুব অল্প রিযিক্ব পেলে অনেক খুশি হয়ে যায়।

এই জীবনে লুকিয়ে আছে সততার দামী আলো,
হোক না তার দুনিয়ার লোকে বলে না তেমন ভালো।

এমন লোকের মৃত্যু হলে কম মানুষই কাঁদে,
এমন মানুষ প্রচুর প্রিয় হয়েছে কী আর সাবে!

দুনিয়ার এই শুরাবা শ্রেণী মন্দ থেকে মুক্ত রবে,
কাল হাসরে যখন কি না নিজেকে নিয়ে ভাববে সবে।

টিকাঃ
[৩৩] আল-মুসনাদ, আবু দাউদ তায়ালিসি: ২০৮২। সনদ সহিহ।

📘 গুরাবা > 📄 গুরাবারা আল্লাহ তাআলার প্রিয়জন

📄 গুরাবারা আল্লাহ তাআলার প্রিয়জন


[৩৪] আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ‘আল্লাহ তা'আলার কাছে শুরাবা-শ্রেণির লোকেরা সবচেয়ে বেশি প্রিয়।’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘শুরাবারা পরিচয় কী?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘শুরাবারা হলো সে-সকল লোক, যারা (দ্বীনদারিতা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কায়) আপন দ্বীন সাথে করে পালিয়ে বেড়ায়। কিয়ামতের দিন তারা ঈসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে গিয়ে একত্রিত হবে।’

টিকাঃ
[৩৬] কিফায়াতু মুহাব, আহামদ : ৭৭

📘 গুরাবা > 📄 সাহাবীর চোখে দুনিয়া

📄 সাহাবীর চোখে দুনিয়া


[৩৫] নাফি ইবনু রালিফ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন, সাহাবী মু'আজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বসে কাঁদছেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবু আবদুর রহমান, তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কোনো সাথি-ভাইকে কি হারিয়ে ফেলেছ? তাই এভাবে বসে নীরবে চোখের জল ফেলছ?’

তখন সাহাবী মুআজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘না, আমার কোনো ভাইকে হারিয়ে আমি কাঁদছি না। আমি বরং একটি হাদিসের জন্য কাঁদছি, যে-হাদিসটি এ প্রসিদ্ধিকেই আমার প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন। আমি সেই হাদিসটিকে স্মরণ করে আজ এভাবে কাঁদছি।’

উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আবু আবদুর রহমান, সে-হাদিস কোনটি—আমাকে বলে দাও না!’

তখন সাহাবী মুআজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতে লাগলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَ أَتْقِيَائِهِمْ الْأَخْفِيَاءِ الْأَبْرِيَاءِ الَّذِينَ إِذَا غَابُوا لَمْ يُفْتَقَدُوا، وَإِنْ حَضَرُوا لَمْ يُعْرَفُوا ، قُلُوبُهُمْ مَصَابِيحُ الْهُدَى يَخْرُجُونَ مِنْ كُلِّ غَبْرَاءِ مُظْلِمَةٍ
‘আমাকে সরদার দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলা দায়মুক্ত, মুত্তাকী ও (লোকদের মাঝে) অপরিচিত মুমিনকে ভালোবাসেন। যদি তারা দৃষ্টির অন্তরাল হয়, তখন আর তাদের তালাশ করা হয় না। আর যদি তারা কোনো মজলিসে উপস্থিত হয়, লোকেরা তাদের চেনে না। তাদের হৃদয়গুলো হিদায়াতের আলোকবর্তিকা। তারা সব ধরনের অন্ধকারাচ্ছন্ন কর্দম কোণা থেকে মুক্তি পাবে।’

টিকাঃ
[১৯] উমর ইবনু মুহাম্মাদ মনে করেন এই হাদিসটি এসেছে তাঁকে ইসনাদ বিন আবদুর রহমান নামক একজন রাবীর কারণে, যে মাকবুল মুমিনগণ গরীব বলেছেন। তবে মুজাদদাহ ফিকহসহ আরও কয়েকটি গ্রন্থে এটি নেই মনে হয়েছে। কারণ যে উক্ত রাবী নেই। ফাকিহ হিকম একে সহিহ বলে অভিহিত করেছেন। আল্লামা যাহাবীও তাঁর সাথে সম্ভবত সেলাব করেছেন। এছাড়া ওয়াহাব আল-আরনাউতও তা সহিহ হওয়ার সম্ভাবনা কথা উল্লেখ করেছেন। (বিস্তারিত জানতে দেখুন, আল-মুকাদ্দমা, হাকিম : ০৪; সুনান ইবনু মা’জা, জাওয়াব আল-আরনাউতের তাহকীক, সুনান নং: ৩৮৮)।

📘 গুরাবা > 📄 একজন যুবকের বিস্ময়কর ঘটনা

📄 একজন যুবকের বিস্ময়কর ঘটনা


[৩২] মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আত-তাইয়িবী রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘বনী হারামের মসজিদের মুজাহিদীন আবু আবদুর রহমান রহমাতুল্লাহু আলাইহি বলেন, আমার একজন প্রতিবেশী যুবক ছিল। আমি যখন সালাতের জন্য আযান দিতাম, তখন সে আর কোথাও থাকত না, সোজা মসজিদে চলে আসত; আমার সাথে সালাত আদায় করত। সালাত শেষে আবার সেই যুবক ছুটে পায়ে গিয়ে সোজা বাড়িতে চলে আসত। আমার মন চাইল, যুবকের সাথে একটু কথা বলি। সে প্রতিদিন কেন সালাত শেষ করে সাথে সাথেই বাসায় চলে আসে? সে কোনো প্রয়োজনে চলে আসে, নাকি এমনিতেই আসে—এ-সব নিয়ে আমার কৌতূহল হলো। এভাবে অনেকদিন চলে গেল, কিন্তু ঐ যুবককে আর প্রশ্ন করা হয়নি।

একদিন ঐ যুবক আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, ‘আবু আবদুল্লাহ, আপনার কাছে ক্বুরআনুল কারীম আছে? আমাকে ধার দিতে পারবেন? আমি একটু ক্বুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করতাম।’

সে কথাগুলো বলেছিল বেশ মায়ার সুরে। কথার মধ্যেও কেমন যেন মাদকতা মিশে আছে। প্রতিটি শব্দে কোমলতা ফুটে উঠেছিল সে-দিন। তখন আমি তাকে ক্বুরআনুল কারীমের একটি নুসখা দিলাম। সে ক্বুরআনটিকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তারপর তা নিজ বাসস্থানে চলে গেল।

একদিন আমি ঐ যুবককে আর দেখতে পেলাম না। সারাদিন সে সালাত আদায় করে মসজিদে আসেনি। আমি মনে মনে ভাবলাম, হয়তো মাগরিবের সালাতে সে আসতে পারে। কিন্তু আমি মাগরিবের সালাতের আযান দিলাম, তবুও সে এলো না। আমি ইশার সালাতের অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু সে ইশার সালাতেও মসজিদে আসেনি। এবার ঐ যুবককে প্রতি আমার একটু খারাপ ধারণা সৃষ্টি হলো। আমি ইশার সালাত আদায় করে ঐ যুবকের যে-বাড়িতে থাকে, সে-দিকে গেলাম। দেখলাম, যুবকের ঘরটি বেশ ছোট। একটি বালতি আর উক্ত জিন্নার একটি পাত্র ছাড়া অতিরিক্ত কোনো কিছুই নেই। ঘরের দরজাতে একটি পর্দা ঝুলানো রয়েছে। সেখানে যুবকের কোনো সাজসজ্জা না পেয়ে আমি পর্দা উঠিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। দেখি, যুবকটি এই দুনিয়ায় আর নেই। সে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। তার প্রাণ-পাখি উড়ে গেছে না ফেরার দেশে। যেখান থেকে কেউ আর কোনো দিন ফিরে আসে না। যুবকের দেহটা মাটিতে পড়ে আছে। যুবকের ঘরে আমার দেওয়া ক্বুরআনুল কারীমটি রয়েছে এখনো। যুবকের এ-অবস্থা দেখে আমার ভেতরটা চুরমার হয়ে গেল। আমি ক্বুরআনুল কারীমটি তার কামরা থেকে নিয়ে আসলাম। আশেপাশের লোকদের সাহায্যে নিয়ে মৃত যুবককে খাটের উপর রাখলাম।

রাত তখনো শেষ হয়নি, আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, এ-যুবকের ব্যাপারে কারও সাথে আলোচনা করে তারপর দাফন করব।

রাতের আঁধার কেটে যখন সুবহে সাদিক উদিত হলো, তখন আমি ফজরের সালাতের জন্য আযান দিলাম। আযান শেষ করে মসজিদে প্রবেশ করলাম সালাত আদায়ের জন্য। ঠিক তখনই একটি উজ্জ্বল আলো আমার নজরে পড়ল। দূর থেকেই ঝিকিরে পড়ছে আলোটি। আমি ধীরে ধীরে আলোর কাছাকাছি গেলাম। দেখতে পেলাম, ঐ যুবকের লাশটি কাফনের কাপড় দিয়ে পেঁচানো। এরকম অবস্থা দেখে আমি চমকে উঠলাম এবং মহান রবের প্রশংসা করে তাকে ঘরে নিয়ে এলাম।

এরপরে ফজরের সালাত আদায়ের জন্য ইকামত বললাম। সালাত শেষ করার পর আমার ডান পাশে বিখ্যাত নেককার সাবিও যুননী, মালিক বিন দীনার, হাবীব আল ফারিসী ও সালিহ আল মুররী রহিমাহুমুল্লাহু প্রমুখকে দেখতে পেলাম।

তারা আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ‘আচ্ছা, এ রাতে তোমার কোনো প্রতিবেশী মারা গিয়েছে?’

আমি বললাম, ‘জি, আমার একজন যুবক প্রতিবেশী মারা গিয়েছে। সে সব সময় আমার সাথে সালাত আদায় করত।’

তখন তারা আমাকে বলতে লাগলেন, ‘সেই যুবকের কাছে আমাদেরকে নিয়ে চলো।’

আমি তাদেরকে যুবকের লাশের কাছে নিয়ে গেলাম। যুবককে দেখামাত্রই মালিক ইবনু দীনার রহিমাহুল্লাহু তাঁর কপালে চুমো দিলেন।

তারপর মালিক ইবনু দীনার রহিমাহুল্লাহ খুব মলিন সুরে বলতে লাগলেন, ‘হে হাজ্জাজ, যদি তোমাকে কেউ কোনো স্থানে চিনে ফেলত, তখন তুমি অন্য জায়গাতে চলে আসতে, যাতে সেখানকার কেউ তোমাকে না চেনে। তোমরা তার গোসলের ব্যবস্থা করো!’

ঐ যুবককে গোসল দিতে সেখানকার সবাই প্রস্তুত ছিল। সবাই কাফনের কাপড়ও ছিল। কেউ বলল, ‘আমি তাকে গোসল দেব’, আবার কেউ বলল, ‘আমি তার গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করব।’ এভাবে দীর্ঘ সময় কথাবার্তা চলছিল।

আমি তাদেরকে রাতে ঘটে-যাওয়া ঘটনাটিই সরাসরি জানালাম। তাদেরকে বললাম, ‘আমিও তো চিন্তা করেছিলাম, এই বিষয়ে কারও সাথে আলোচনা করার পরে তার দাফনের ব্যবস্থা করব। কিন্তু আমি ফজরের আযান দিয়ে সালাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পর একটি ঝলমলে আলো দেখতে পেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, যুবকের লাশটি অত্যন্ত সুন্দর করে কাফনে মোড়ানো। আমি জানি না, কে বা কারা তাকে কাফন পরিয়েছে!’

তাঁরা বলল, ‘সেই কাফনের উপর পুনরায় কাফন পরানো হবে!’

অতঃপর আমরা তাকে পুনরায় কাফনের কাপড় পরলাম। তার লাশ বহন করতে অনেক মানুষের সমাগম হলো। লোকদের ভিড়ে আমাদের মাটিতে পড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00