📘 গুরাবা > 📄 ধৈর্যধারণ করা হলো গরিবের স্তরে পৌঁছার মাধ্যম

📄 ধৈর্যধারণ করা হলো গরিবের স্তরে পৌঁছার মাধ্যম


[২] মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহু বলেন, যে ব্যক্তি সত্যিকার শুরাবাদের স্তরে পৌঁছতে চায়, সে যেন তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী বা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের রূঢ় আচরণের সম্মুখীন হলেও ধৈর্যধারণ করে। যদি কারও মনে এমন প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, আমি যদি আমার পরিবারের কাছে প্রিয় হয়ে থাকি, যারা আমার সাথে কখনোই রূঢ় আচরণ করে না, তা হলে আমি কি শুরাবার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারব না? এর উত্তরে বলা হবে, আপনার পরিবার যদি দীন থেকে দূরে সরে থাকে, ধূসর দুনিয়া যদি তাদেরকে একেবারে ঘিরে ফেলে, প্রবৃত্তির অনুসরণেই তারা যদি থাকে ডুবন্ত, তখন যদি আপনি তাদের বিরোধিতা না করেন, বরং এই দুনিয়ায় তাদের সব চাহিদা বা শরীয়াতবিরোধী সব কাজ পূরণ করে দেন, তা হলে আপনি তো আপনার পরিবার-পরিজনের শুধু কাছের বা প্রিয় হবেন না, বরং আপনি হবেন তাদের গুরু। আর যদি আপনি তাদেরকে দীনের দিকে দাওয়াত দেন বা ইখলাসের সঠিক পথে চলতে বলেন, শরীয়াতবিরোধী বিভিন্ন কাজকর্ম করতে নিষেধ করেন, তা হলে তারা আপনার সাথে রূঢ় আচরণ শুরু করে দেবে। আপনার আপন বাবা-মা আপনার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। আপনার প্রিয়তমা স্ত্রীও আপনার থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার কথা বলবে। আপন ছেলেমেয়েরা আপনাকে মূল্যহীন করবে না, অযথা আপনাকে বকাঝকা করবে। ভাই-বোনেরাও আপনার ধারেকাছে আসবে না তখন। এমন পরিস্থিতিতে আপনি হয়ে যাবেন একা—শুরাবাদের অন্তর্ভুক্ত; সঙ্গহীন একজন মানুষ। নীচুছারা পাখির মতোই আপনি এ-জগতে তখন হবেন অসহায়। আপনার ভাই, বোন, মা-বাবা কেউই আপনার সাথে থাকল না। আপনাকে সঙ্গ দেওয়ার মতো এখন আর কেউ নেই। এমন হলে বুঝবেন, আপনি আল্লাহর পথে চলতে শুরু করলেন। যে-পথে আপনার সাথে কেউ থাকবে না। তখন আপনি একজন গরিব মানুষ, যার সাথে কেউ না থাকলেও আল্লাহ আছেন। আপনার প্রিয়জনরা আপনাকে এভাবে ছেড়ে যাওয়াও আপনি দুঃখ পাবেন না সামান্যও।

আপনি বাকি জীবনটা একা পথে চলতে শুরু করলেন। ঐ যে, সমুদ্রে ছোট একটি কুটিরেই আপনার বসবাস। জীবনটা এভাবে কেটে যাচ্ছে কেবলই আল্লাহর তাআল্লার জন্য। রাত-দিন আল্লাহর ইবাদাত করছেন। এই তো আর কটা দিন, তারপর তো সুদূর তুমি খুঁজে পাবে—এসব বলে মনকে আশা দিয়েই কাটাচ্ছেন একাকীত্বের রাত্রিগুলো। হ্যাঁ, কেবল আল্লাহর জন্য জীবনের কষ্টের দিনগুলোর বিনিময়ে আপনি পাবেন সুখের দিন, সুখের বিশাল ভূমি। সেখানে থাকবে কেবল সুখ আর সুখ। আখিরাতের সেই সুখের দিনে আপনি একা থাকবেন না। আপনার সাথে থাকবে হাজারও হুর-পরি—যাদেরকে দেখে আপনি ভুলে যাবেন দুনিয়ার যত কষ্ট, ব্যথা-বেদনা। সে-দিন আপনি হাসবেন সুখের হাসি, তৃপ্তির হাসি। আপনি যা প্রত্যাশা করবেন, তা-ই পাবেন সেখানে। কোনো কিছুর অভাব হবে না। ধূসর দুনিয়াতে ছোট কুটিরে থাকার দুঃখটা ভুলে যাবেন পরকালের সেই সুখের বাড়ীটির প্রথম দর্শনেই। সে-দিন মুখে এক ছিলিতো হাসিও ফুটবে আপনার। তখন হয়তো বলবেন, এত সুখ আমি কোথায় রাখব! আপনার সে-সুখ ক্ষয়প্রাপ্তী না। আপনার সে-সুখ হবে আজীবনের। দুনিয়ার কষ্টটা তো ছিল ক্ষণিকের। যখন ফল খেতে হচ্ছে বিষ—ব্যস, দেখবেন—কত রকমের ফল, যা আপনার চোখ কখনোই দেখেনি, মনও কখনো কল্পনা করতে পারেনি। গলা শুকিয়ে গেলে, পানির প্রয়োজন হলে আপনাকে দেওয়া হবে মধু-মিশ্ৰিত পানি। এক ঢোক পান করেই আপনি সুখের দীর্ঘশ্বাস ছাড়বেন। আর মনে মনে বলবেন, আহ, মানুষ যদি দুনিয়াতে এর কথা জানত! পবিত্র কুরআনেুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে—
يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيْهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنتُمْ فِيْهَا خَالِدُونَ
“তাদের কাছে পরিবেশন করা হবে স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র এবং সেখানে রয়েছে মন যা চায় এবং চোখ যাতে তৃপ্ত হয়, সব। তোমরা চিরকাল থাকবে।” [৯] আরও বলা হয়েছে—
يُسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ وَمِزَاجُهُ مِن تَسْنِيمٍ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ
“তাদেরকে সিলমোহর করা বিশুদ্ধ পানি থেকে পান করানো হবে। তার মোহর হবে মিশকা আর এর জন্য প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। আর তার মিশ্রণ হবে তাসনীম থেকে। তা এক প্রস্রবণ, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে।” [১০] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
يَطُوْفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُوْنَ، بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيْقَ، وَكَأْسٍ مِّنْ مَّعِيْنٍ، لَا يُصَدَّعُونَ عَنْهَا وَلَا يُنْزِفُونَ، وَفَاكِهَةٍ مِّمَّا يَتَخَيَّرُوْنَ، وَلَحْمٍ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُوْنَ، وَحُورٌ عِيْنٌ، كَأَمْثَالِ اللُّؤْلُؤِ الْمَكْنُونِ، جَزَاءً بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
“তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির-কিশোরেরা। পানপাত্র কুঁজা ও ঝাটি সুরাপাত্র গেলা হলো হাতে থাকবে, যা পান করলে তাদের শিরঃপীড়া হবে না এবং বিকারগ্রস্তও হবে না। সেখানে উপস্থিত হবে তাদের পছন্দমতো ফল-মূল নিয়ে, রুচিমতো পাখির গোশত নিয়েও। সেখানে থাকবে অনবদ্যনয়না হুরগণ, যাদের আবরণ রক্ষিত মোতির ন্যায়। (এটা হলো) দুনিয়াতে তাদের করা আমলের পুরস্কার।” [১১]

টিকাঃ
৯. সূরা যুখরুফ: ৭১
১০. সূরা মুতাফিফিন: ২৫-২৬
১১. সূরা ওয়াক্বিয়াহ: ১৭-২২

📘 গুরাবা > 📄 দুনিয়াতে নীড়হারা পাখির মতো চলবে

📄 দুনিয়াতে নীড়হারা পাখির মতো চলবে


[২০] মুহাম্মাদ ইবনু মূআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাকে খুরাসানের এক যুবক বলেছেন, "আল্লাহ তায়ালা পূর্বের কোনো নবীর নিকট এ-মর্মে ওহী প্রেরণ করলেন যে, তুমি সুরক্ষিত কোনো স্থানে আমার সাফাত কামনা কর, তা হলে তুমি দুনিয়াতে চিন্তিত ও একাকিত্ব অনুভব করে বসবাস করো—যেমন একাকী শহরে নীচুছারা পাখি নীল আকাশে একাই ওড়ে, যেখানে আর অন্য পাখিদের মিলনমেলা ঘটে না। ঐ নীচুছারা পাখিটি গাছের সর্বোচ্চ শিখরের পাতা বেয়ে বেঁচে থাকে, পড়েও বিকেলে সে তার বাসায় ফেরে একাকী। যে-বাসাটির পক্ষে অন্য কোনো পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যায় না, আবার মানুষেরও কোনো আওয়াজ নেই সেখানে। পাখিটি সেখানে চুপটি করে রাত কাটিয়ে দেয় একা-একা। ঠিক তেমনি তুমিও এভাবে একা-একা দুনিয়াতে শুরাবাদের দলভুক্ত হয়ে থাকো। আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠো না। তবেই তুমি সহজে আমার সাফাত লাভ করতে পারবে।

📘 গুরাবা > 📄 গরিব যদি আল্লাহর কাছে কিছু চেয়ে কসম করে

📄 গরিব যদি আল্লাহর কাছে কিছু চেয়ে কসম করে


[২৪] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
لَوْ أَعْطِيَ لِعَبْدٍ فَقِيْرٌ مَقْعَدَهُ فَقَدَمَا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ عَنْ رَجُلٍ وَلَا عَرَبَّ رَجُلٌ لَإِرَّبَ إِنْ كَانَ فِيْهِمْ أَنَّ شَفَعَ إِنْ شَفَعَ لَمْ تُسْمَعْ، وَإِنْ السَّاعَةُ كَانَ فِيْهِمْ، وَإِنْ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنَ لَهُ، طَوَّلَ لَهُ ثُمَّ طَوَّلَ لَهُ
“সুন্নবাদ এ বোঝার জন্য, যে আল্লাহর রাস্তায় তার পা-কে ধূলোয় ধূসরিত করেছে। তার চুল উস্কখুস্ক। সৈন্যবাহিনী থাকলে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়, আর যদি পাহারার প্রয়োজন পড়ে, সেখানেও সে পাহারাদারদের দলভুক্ত হয়। যদি সে কোনো সুপারিশ করে, তার সুপারিশ গৃহীত হয় না। (কারণ, সে বান্দা খুবই সাধারণ মুমিন। অত পরিচিত না।) আবার কোনো কিছুর অনুমতি চাইলেও অনুমতি দেওয়া হয় না। সুন্নবাদ তার জন্য, সুন্নবাদ তার জন্য।” [২৫]

টিকাঃ
[২৫] মুসনাদে আহমাদ, ত্বাবারানী: ১৪/২৮২। সনদ সহীহ।

📘 গুরাবা > 📄 গরিব যদি কসম করে আল্লাহ তা পূরণ করেন

📄 গরিব যদি কসম করে আল্লাহ তা পূরণ করেন


[২৬] আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
رَبِّ أَعْبِرْ ذِيْ ظِمْنَنِيْ ذِيْ ظِمْنَنِيْ لَهُ أَوْ أَقْسِمْ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَأَبْرَهُ
“দু-দানা ছেঁড়া বস্ত্ৰ পরিহিত অনেক গরিব বান্দা রয়েছে, যাদেরকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এরকম বান্দা যদি আল্লাহর কসম করে কিছু বলে, তা হলে আল্লাহ তায়ালা তা পূর্ণ করেন।” [২৮]

টিকাঃ
[২৮] হিলয়াতুল আউলিয়া, আবূ নুয়াইম: ১/২৭৫। এর সনদে দুর্বলতা আছে। তবে ইবনু তিরমিযী রাহ. এই হাদিসটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। (তিরমিযী: ৩৮১৪)-সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00