📘 গুরাবা > 📄 আল্লাহর ইবাদাত যেভাবে করতে হবে

📄 আল্লাহর ইবাদাত যেভাবে করতে হবে


[১৯] ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার শরীরের একটি অংশে স্পর্শ করে বলেছেন—

اَعْبُدُ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ , وَكُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ عَابِرُ سَبِيلٍ
“তুমি আল্লাহর ইবাদাত এমনভাবে করবে, যেন তুমি আল্লাহকে দেখে-দেখেই ইবাদাত করছ। আর দুনিয়াতে একজন মুসাফিরের মতো বসবাস করবে।”

📘 গুরাবা > 📄 কবির আকুতি

📄 কবির আকুতি


[২০] আবদুল্লাহ ইবনু হুমাঈদ আল মুআদিদু রাহিমাহুল্লাহ আকুতি করেন—

أَيُّهَا الْغَافِلُ فِي ... دُلٍّ نَعِيمٍ وَسُرُورٍ
كُنْ غَرِيبًا وَاجْعَلْ اللَّهَ ... نَيَّا سَبِيلًا لِلْقُبُورِ
وَاعْدُدْ النَّفْسَ طَوَالَ ... الدَّهْرِ مِنْ أَهْلِ الْقُبُورِ
وَارْفُضْ الدُّنْيَا وَلَا ... تَرْكُنْ إِلَى دَارِ الْغُرُورِ

আয়েশমও ওহে গাফেল, গরীব হয়ে যাও,
দুনিয়াকে আখিরাতের পথ বানিয়ে নাও।

কবরবাসী ভাবো তোমায় বেঁচে যত দিন,
দুনিয়াকে ত্যাজ্য করো— দুনিয়া থাকুক লীন।

📘 গুরাবা > 📄 দুনিয়া হলো ধূসর এক মরীচিকা

📄 দুনিয়া হলো ধূসর এক মরীচিকা


[২১] মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যদি কেউ বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস— "তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করবে, যেন তুমি গরিব বা মুসাফির।" —এ হাদীসের ব্যাখ্যা কী? তখন উত্তরে বলা হলো, এ-হাদীস সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। তবে ব্যাখ্যাটি এমনও হতে পারে, মনে করুন, এক ব্যক্তি মরুভূমি অবস্থায় আছে, তার অনেক সম্পদ রয়েছে; স্ত্রী, সন্তান- সন্ততি, চাকর-বাকরসসহ সব কিছু আছে। খাবার-দাবারের কোনো কমতি নেই—দুঃখের কোনো আলামতও নেই তার জীবনে। বিন্দু বিন্দু সুখের ছোঁয়াতে তার জীবন চলছিল। সুখ-শান্তির মতো আনন্দ নিয়ে চলাফেরা করে সে। কোনো দিনও দুঃখের একটু বাতাসও যায় যায়নি তার জীবন-জমিনে। একদিন তার সফর করার প্রয়োজন হলো। সুন্দর কোনো এক গ্রামে মরুভূমি ভেদ করে সফরে যেতে হবে তাকে। সফরের সব কিছু ঠিকঠাক করে সফরের জন্য নিজ ঘর থেকে বের হলো সে।

অনবরত মরুভূমি। অবৈধতা পথেই চলছে লোকটি। তার গন্তব্যে পৌঁছতে এখনো অনেক দিন লাগবে। সফরের পথ শেষ হয়ে ক্লান্তির সুরটা ডুবতে এখনো কত দিন লাগবে, তাও লোকটির কাছে অজানা। ঠিক তখনই সে দেখতে পেল, সফরের জন্য যা কিছু সাথে নিয়ে এসেছে, তার অধিকাংশই শেষ। আমার সে এখন এক মরুভূমিতে আছে, যা তার অচেনা ও অজানা। এবার সে চিন্তিত হলো। দুশ্চিন্তায় আকর্ষণীয় চেহারায় বিক্ষিপ্ততার ছাপ ফুটে উঠল। টানাটানা চোখে হতাশার মলিনতা প্রবল হয়ে উঠল। তখন সে স্থির করল, আর না; এবার আমি আমার নিজ দেশে ফিরে যাব। ফেরার সংকল্প নিয়ে চলতে শুরু করল সে। ধীরে-ধীরে তার সব খাবারই ফুরিয়ে যাচ্ছে। কাপড়চোপড়ও শেষ হয়ে গিয়েছে—সতর আবৃত করার মতো কিছু কাপড়মাত্র বাকি আছে। পাত্র হিসেবে আছে একটি পানির পাত্র। সে বিষণ্ণ মনে চলতে লাগল। ক্রমাগত তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধারে নির্ঘুম রাত্রি কাটানোর সময় মাঝে-মাঝে চোখের জলও টুপ টুপ করে যায় গাল বেয়ে। মরুভূমির উত্তপ্ত গরম থেকে বাঁচার জন্য রাতে ঘুমিয়ে পথ চলে সে। চলার পথে তার মনে পড়ে যায়, সুখের দিনের কথা—সেখানে কত সুখ লুকিয়ে ছিল! এ-সব ভেবে-ভেবেই সে তার কাছে যা আছে, তা নিয়েই পথ চলল। রাতের আঁধারে সে উপত্যকা বা গিরিপথে সফর করে। আর দিনের বেলায় পাহাড়ে বা মাটির উপর পাতা বিছিয়ে বিশ্রাম নেয়। চলার পথে মন যা চায়, সে সে-দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না। এই কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করার জন্য নিজেকে নিজে নসিহত করে বলে—'একটু ধৈর্য ধরো, তোমাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। দুঃখের পরে সুখ আসবে, ইনশাআল্লাহ!'

সে যখন পথ চলতে থাকে, তখন দু চোখের কোণ বেয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ে— দীর্ঘ তপ্ত শ্বাসও বের হয়ে আসে ভেতর থেকে। তার সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে, সে পাল্টা খারাপ ব্যবহার করে না। কেউ কষ্ট দিলে একে কোনো কষ্টই মনে করে না। তাকে কেউ না চিনলেও সে-দিক কোনো কামনা নেই তার। সে তার মতোই চলছে। কারওও কাছে নিজের সফরের সামান্যপত্রের জন্যও হাত পাতে না। ব্যস, তার জন্য দুনিয়ার সব কষ্ট-ক্লেশই সহজ হয়ে গেল। অবশেষে একদিন মুসাফির লোকটা সফর শেষ করে।

একজন প্রকৃত জ্ঞানী মুমিন, যিনি কেবল আখিরাতকেই কামনা করেন এবং দুনিয়ার প্রতি তাঁর লোভ কম, তাকে বলা হবে—আপনি এই মুসাফিরের মতো দুনিয়াতে বসবাস করুন, যে কেবল সফরে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রতি মনোযোগী ছিল—সফরে সে অন্য কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগী হয়নি। ওহে মুমিন, আপনি যদি নিজেকে এই দুনিয়ায় গরিব-মুসাফির মনে করতে পারেন, তা হলে দুনিয়া আপনার কাছে একেবারে তুচ্ছ ও মরীচিকা মনে হবে। দুনিয়ার সফর শেষে আপনিও পৌঁছে যাবেন মানযিলে মাকসুদে—জান্নাতের সুখময় উদ্যানে; অনাবিল এক সুখের জায়গাতে। সে-দিন এই ধূসর মরীচিকাময় দুনিয়ার সফরে আপনার দুঃখ-কষ্ট এবং তাতে ধৈর্যধারণ করার ওপর প্রশংসা করবেন। খুশির হাসি দিয়ে ভুলে যাবেন দুনিয়ায় ভোগ-করা সব গ্লানি ও কষ্টের কথা।

📘 গুরাবা > 📄 ধৈর্যধারণ করা হলো গরিবের স্তরে পৌঁছার মাধ্যম

📄 ধৈর্যধারণ করা হলো গরিবের স্তরে পৌঁছার মাধ্যম


[২] মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহু বলেন, যে ব্যক্তি সত্যিকার শুরাবাদের স্তরে পৌঁছতে চায়, সে যেন তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী বা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের রূঢ় আচরণের সম্মুখীন হলেও ধৈর্যধারণ করে। যদি কারও মনে এমন প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, আমি যদি আমার পরিবারের কাছে প্রিয় হয়ে থাকি, যারা আমার সাথে কখনোই রূঢ় আচরণ করে না, তা হলে আমি কি শুরাবার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারব না? এর উত্তরে বলা হবে, আপনার পরিবার যদি দীন থেকে দূরে সরে থাকে, ধূসর দুনিয়া যদি তাদেরকে একেবারে ঘিরে ফেলে, প্রবৃত্তির অনুসরণেই তারা যদি থাকে ডুবন্ত, তখন যদি আপনি তাদের বিরোধিতা না করেন, বরং এই দুনিয়ায় তাদের সব চাহিদা বা শরীয়াতবিরোধী সব কাজ পূরণ করে দেন, তা হলে আপনি তো আপনার পরিবার-পরিজনের শুধু কাছের বা প্রিয় হবেন না, বরং আপনি হবেন তাদের গুরু। আর যদি আপনি তাদেরকে দীনের দিকে দাওয়াত দেন বা ইখলাসের সঠিক পথে চলতে বলেন, শরীয়াতবিরোধী বিভিন্ন কাজকর্ম করতে নিষেধ করেন, তা হলে তারা আপনার সাথে রূঢ় আচরণ শুরু করে দেবে। আপনার আপন বাবা-মা আপনার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। আপনার প্রিয়তমা স্ত্রীও আপনার থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার কথা বলবে। আপন ছেলেমেয়েরা আপনাকে মূল্যহীন করবে না, অযথা আপনাকে বকাঝকা করবে। ভাই-বোনেরাও আপনার ধারেকাছে আসবে না তখন। এমন পরিস্থিতিতে আপনি হয়ে যাবেন একা—শুরাবাদের অন্তর্ভুক্ত; সঙ্গহীন একজন মানুষ। নীচুছারা পাখির মতোই আপনি এ-জগতে তখন হবেন অসহায়। আপনার ভাই, বোন, মা-বাবা কেউই আপনার সাথে থাকল না। আপনাকে সঙ্গ দেওয়ার মতো এখন আর কেউ নেই। এমন হলে বুঝবেন, আপনি আল্লাহর পথে চলতে শুরু করলেন। যে-পথে আপনার সাথে কেউ থাকবে না। তখন আপনি একজন গরিব মানুষ, যার সাথে কেউ না থাকলেও আল্লাহ আছেন। আপনার প্রিয়জনরা আপনাকে এভাবে ছেড়ে যাওয়াও আপনি দুঃখ পাবেন না সামান্যও।

আপনি বাকি জীবনটা একা পথে চলতে শুরু করলেন। ঐ যে, সমুদ্রে ছোট একটি কুটিরেই আপনার বসবাস। জীবনটা এভাবে কেটে যাচ্ছে কেবলই আল্লাহর তাআল্লার জন্য। রাত-দিন আল্লাহর ইবাদাত করছেন। এই তো আর কটা দিন, তারপর তো সুদূর তুমি খুঁজে পাবে—এসব বলে মনকে আশা দিয়েই কাটাচ্ছেন একাকীত্বের রাত্রিগুলো। হ্যাঁ, কেবল আল্লাহর জন্য জীবনের কষ্টের দিনগুলোর বিনিময়ে আপনি পাবেন সুখের দিন, সুখের বিশাল ভূমি। সেখানে থাকবে কেবল সুখ আর সুখ। আখিরাতের সেই সুখের দিনে আপনি একা থাকবেন না। আপনার সাথে থাকবে হাজারও হুর-পরি—যাদেরকে দেখে আপনি ভুলে যাবেন দুনিয়ার যত কষ্ট, ব্যথা-বেদনা। সে-দিন আপনি হাসবেন সুখের হাসি, তৃপ্তির হাসি। আপনি যা প্রত্যাশা করবেন, তা-ই পাবেন সেখানে। কোনো কিছুর অভাব হবে না। ধূসর দুনিয়াতে ছোট কুটিরে থাকার দুঃখটা ভুলে যাবেন পরকালের সেই সুখের বাড়ীটির প্রথম দর্শনেই। সে-দিন মুখে এক ছিলিতো হাসিও ফুটবে আপনার। তখন হয়তো বলবেন, এত সুখ আমি কোথায় রাখব! আপনার সে-সুখ ক্ষয়প্রাপ্তী না। আপনার সে-সুখ হবে আজীবনের। দুনিয়ার কষ্টটা তো ছিল ক্ষণিকের। যখন ফল খেতে হচ্ছে বিষ—ব্যস, দেখবেন—কত রকমের ফল, যা আপনার চোখ কখনোই দেখেনি, মনও কখনো কল্পনা করতে পারেনি। গলা শুকিয়ে গেলে, পানির প্রয়োজন হলে আপনাকে দেওয়া হবে মধু-মিশ্ৰিত পানি। এক ঢোক পান করেই আপনি সুখের দীর্ঘশ্বাস ছাড়বেন। আর মনে মনে বলবেন, আহ, মানুষ যদি দুনিয়াতে এর কথা জানত! পবিত্র কুরআনেুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে—
يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيْهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنتُمْ فِيْهَا خَالِدُونَ
“তাদের কাছে পরিবেশন করা হবে স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র এবং সেখানে রয়েছে মন যা চায় এবং চোখ যাতে তৃপ্ত হয়, সব। তোমরা চিরকাল থাকবে।” [৯] আরও বলা হয়েছে—
يُسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ وَمِزَاجُهُ مِن تَسْنِيمٍ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ
“তাদেরকে সিলমোহর করা বিশুদ্ধ পানি থেকে পান করানো হবে। তার মোহর হবে মিশকা আর এর জন্য প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। আর তার মিশ্রণ হবে তাসনীম থেকে। তা এক প্রস্রবণ, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে।” [১০] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
يَطُوْفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُوْنَ، بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيْقَ، وَكَأْسٍ مِّنْ مَّعِيْنٍ، لَا يُصَدَّعُونَ عَنْهَا وَلَا يُنْزِفُونَ، وَفَاكِهَةٍ مِّمَّا يَتَخَيَّرُوْنَ، وَلَحْمٍ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُوْنَ، وَحُورٌ عِيْنٌ، كَأَمْثَالِ اللُّؤْلُؤِ الْمَكْنُونِ، جَزَاءً بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
“তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির-কিশোরেরা। পানপাত্র কুঁজা ও ঝাটি সুরাপাত্র গেলা হলো হাতে থাকবে, যা পান করলে তাদের শিরঃপীড়া হবে না এবং বিকারগ্রস্তও হবে না। সেখানে উপস্থিত হবে তাদের পছন্দমতো ফল-মূল নিয়ে, রুচিমতো পাখির গোশত নিয়েও। সেখানে থাকবে অনবদ্যনয়না হুরগণ, যাদের আবরণ রক্ষিত মোতির ন্যায়। (এটা হলো) দুনিয়াতে তাদের করা আমলের পুরস্কার।” [১১]

টিকাঃ
৯. সূরা যুখরুফ: ৭১
১০. সূরা মুতাফিফিন: ২৫-২৬
১১. সূরা ওয়াক্বিয়াহ: ১৭-২২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00