📄 দুনিয়া থেকে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে
[১৮] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার শরীরের এক অংশে স্পর্শ করে ইরশাদ করেছেন—
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ , وَعُدَّ نَفْسَكَ مِنْ أَهْلِ الْقُبُورِ
“হে ইবনু উমর, তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করবে, যেন তুমি 'গরিব' বা মুসাফির। আর তুমি নিজেকে কবরবাসীদের কাতারে গণ্য করবে!”
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বলেছেন, 'হে মুজাহিদ, যখন বিকেলে উপনীত হবে, তখন সকালে উপনীত হতে পারবে, তা ভেবো না। যখন তুমি সকালে উপনীত হও, তখন বিকেলে উপনীত হতে পারবে, এমনটা মনে কোরো না। তুমি তোমার দুনিয়া থেকে আখেরাতের (পাথেয়) সংগ্রহ করবে।'২
টিকাঃ
১. রিয়াদুস স্বালেহীন, আবু নুয়াইম: ৩/৩৩৫ ইবনু রজব হান্বালী রাহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'দুনিয়ায় বেশি আশা পোষণ বা কসর বিষয়ে এটি মূল হাদীস। একজন মুমিনের জন্যে এটা শোভা পায় না যে, সে দুনিয়াতে তার আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ ও বিলাসের ফুল হিসেবে গ্রহণ করে। অতএব প্রাণান্ত লাভ করো। বরং দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করা উচিত, যেন সে সফর অবস্থায় আছে। নবীগণ ও তাদের অনুসারীগণও এমন প্রতিপাদই করে গিয়েছেন। (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ইবনু রজব হান্বালী: ৫০৭)—সম্পাদক
২. আন-সুন্নাহ, আহমাদ: ২/১৩২ (হাদীস নং: ৪৩৮৬); রিয়াদুস স্বালেহীন, আবু নুয়াইম: ৪/১১২। সনদ সহীহ।
📄 আল্লাহর ইবাদাত যেভাবে করতে হবে
[১৯] ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার শরীরের একটি অংশে স্পর্শ করে বলেছেন—
اَعْبُدُ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ , وَكُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ عَابِرُ سَبِيلٍ
“তুমি আল্লাহর ইবাদাত এমনভাবে করবে, যেন তুমি আল্লাহকে দেখে-দেখেই ইবাদাত করছ। আর দুনিয়াতে একজন মুসাফিরের মতো বসবাস করবে।”
📄 কবির আকুতি
[২০] আবদুল্লাহ ইবনু হুমাঈদ আল মুআদিদু রাহিমাহুল্লাহ আকুতি করেন—
أَيُّهَا الْغَافِلُ فِي ... دُلٍّ نَعِيمٍ وَسُرُورٍ
كُنْ غَرِيبًا وَاجْعَلْ اللَّهَ ... نَيَّا سَبِيلًا لِلْقُبُورِ
وَاعْدُدْ النَّفْسَ طَوَالَ ... الدَّهْرِ مِنْ أَهْلِ الْقُبُورِ
وَارْفُضْ الدُّنْيَا وَلَا ... تَرْكُنْ إِلَى دَارِ الْغُرُورِ
আয়েশমও ওহে গাফেল, গরীব হয়ে যাও,
দুনিয়াকে আখিরাতের পথ বানিয়ে নাও।
কবরবাসী ভাবো তোমায় বেঁচে যত দিন,
দুনিয়াকে ত্যাজ্য করো— দুনিয়া থাকুক লীন।
📄 দুনিয়া হলো ধূসর এক মরীচিকা
[২১] মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যদি কেউ বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস— "তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করবে, যেন তুমি গরিব বা মুসাফির।" —এ হাদীসের ব্যাখ্যা কী? তখন উত্তরে বলা হলো, এ-হাদীস সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। তবে ব্যাখ্যাটি এমনও হতে পারে, মনে করুন, এক ব্যক্তি মরুভূমি অবস্থায় আছে, তার অনেক সম্পদ রয়েছে; স্ত্রী, সন্তান- সন্ততি, চাকর-বাকরসসহ সব কিছু আছে। খাবার-দাবারের কোনো কমতি নেই—দুঃখের কোনো আলামতও নেই তার জীবনে। বিন্দু বিন্দু সুখের ছোঁয়াতে তার জীবন চলছিল। সুখ-শান্তির মতো আনন্দ নিয়ে চলাফেরা করে সে। কোনো দিনও দুঃখের একটু বাতাসও যায় যায়নি তার জীবন-জমিনে। একদিন তার সফর করার প্রয়োজন হলো। সুন্দর কোনো এক গ্রামে মরুভূমি ভেদ করে সফরে যেতে হবে তাকে। সফরের সব কিছু ঠিকঠাক করে সফরের জন্য নিজ ঘর থেকে বের হলো সে।
অনবরত মরুভূমি। অবৈধতা পথেই চলছে লোকটি। তার গন্তব্যে পৌঁছতে এখনো অনেক দিন লাগবে। সফরের পথ শেষ হয়ে ক্লান্তির সুরটা ডুবতে এখনো কত দিন লাগবে, তাও লোকটির কাছে অজানা। ঠিক তখনই সে দেখতে পেল, সফরের জন্য যা কিছু সাথে নিয়ে এসেছে, তার অধিকাংশই শেষ। আমার সে এখন এক মরুভূমিতে আছে, যা তার অচেনা ও অজানা। এবার সে চিন্তিত হলো। দুশ্চিন্তায় আকর্ষণীয় চেহারায় বিক্ষিপ্ততার ছাপ ফুটে উঠল। টানাটানা চোখে হতাশার মলিনতা প্রবল হয়ে উঠল। তখন সে স্থির করল, আর না; এবার আমি আমার নিজ দেশে ফিরে যাব। ফেরার সংকল্প নিয়ে চলতে শুরু করল সে। ধীরে-ধীরে তার সব খাবারই ফুরিয়ে যাচ্ছে। কাপড়চোপড়ও শেষ হয়ে গিয়েছে—সতর আবৃত করার মতো কিছু কাপড়মাত্র বাকি আছে। পাত্র হিসেবে আছে একটি পানির পাত্র। সে বিষণ্ণ মনে চলতে লাগল। ক্রমাগত তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধারে নির্ঘুম রাত্রি কাটানোর সময় মাঝে-মাঝে চোখের জলও টুপ টুপ করে যায় গাল বেয়ে। মরুভূমির উত্তপ্ত গরম থেকে বাঁচার জন্য রাতে ঘুমিয়ে পথ চলে সে। চলার পথে তার মনে পড়ে যায়, সুখের দিনের কথা—সেখানে কত সুখ লুকিয়ে ছিল! এ-সব ভেবে-ভেবেই সে তার কাছে যা আছে, তা নিয়েই পথ চলল। রাতের আঁধারে সে উপত্যকা বা গিরিপথে সফর করে। আর দিনের বেলায় পাহাড়ে বা মাটির উপর পাতা বিছিয়ে বিশ্রাম নেয়। চলার পথে মন যা চায়, সে সে-দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না। এই কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করার জন্য নিজেকে নিজে নসিহত করে বলে—'একটু ধৈর্য ধরো, তোমাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। দুঃখের পরে সুখ আসবে, ইনশাআল্লাহ!'
সে যখন পথ চলতে থাকে, তখন দু চোখের কোণ বেয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ে— দীর্ঘ তপ্ত শ্বাসও বের হয়ে আসে ভেতর থেকে। তার সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে, সে পাল্টা খারাপ ব্যবহার করে না। কেউ কষ্ট দিলে একে কোনো কষ্টই মনে করে না। তাকে কেউ না চিনলেও সে-দিক কোনো কামনা নেই তার। সে তার মতোই চলছে। কারওও কাছে নিজের সফরের সামান্যপত্রের জন্যও হাত পাতে না। ব্যস, তার জন্য দুনিয়ার সব কষ্ট-ক্লেশই সহজ হয়ে গেল। অবশেষে একদিন মুসাফির লোকটা সফর শেষ করে।
একজন প্রকৃত জ্ঞানী মুমিন, যিনি কেবল আখিরাতকেই কামনা করেন এবং দুনিয়ার প্রতি তাঁর লোভ কম, তাকে বলা হবে—আপনি এই মুসাফিরের মতো দুনিয়াতে বসবাস করুন, যে কেবল সফরে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রতি মনোযোগী ছিল—সফরে সে অন্য কোনো বস্তুর প্রতি মনোযোগী হয়নি। ওহে মুমিন, আপনি যদি নিজেকে এই দুনিয়ায় গরিব-মুসাফির মনে করতে পারেন, তা হলে দুনিয়া আপনার কাছে একেবারে তুচ্ছ ও মরীচিকা মনে হবে। দুনিয়ার সফর শেষে আপনিও পৌঁছে যাবেন মানযিলে মাকসুদে—জান্নাতের সুখময় উদ্যানে; অনাবিল এক সুখের জায়গাতে। সে-দিন এই ধূসর মরীচিকাময় দুনিয়ার সফরে আপনার দুঃখ-কষ্ট এবং তাতে ধৈর্যধারণ করার ওপর প্রশংসা করবেন। খুশির হাসি দিয়ে ভুলে যাবেন দুনিয়ায় ভোগ-করা সব গ্লানি ও কষ্টের কথা।