📘 গুরাবা > 📄 যেমন হবে গুরাবাদের বৈশিষ্ট্যাবলি

📄 যেমন হবে গুরাবাদের বৈশিষ্ট্যাবলি


যখন এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার নেই—এমন পরিস্থিতিতে তুমি নিজের বিষয়ে খেয়াল রাখবে আর সর্বসাধারণের চিন্তা ছেড়ে দেবে। কেননা, তোমাদের পরে আসবে কঠিন ধৈর্য-পরীক্ষার যুগ। তখন ধৈর্যধারণ করাটা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার মতো কঠিন হবে। সেই যুগে কেউ নেক আমল করলে তার সমকক্ষ পঞ্চাশ ব্যক্তির নেক আমল তাকে দেওয়া হবে।”

[১০] আহলে হক উলামায়ে কিরাম গুরবাদের বৈশিষ্ট্যাবলি তুলে ধরেছেন এভাবে—

একটা সময় অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এমন হবে যে, তারা সবার সাথে ওঠা-বসা করবে, ভ্রাতৃত্ববোধ ঠিক রাখবে। প্রতিবেশীর সাথে দেখা-সাক্ষাত করবে ও নানান বিষয়ে তাদের সাথে সম্পর্কও থাকবে। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। কেউ অসুস্থ হলে দেখতে যাবে। সখি-সন্ধি, ব্যবসায়িক অংশীদার, বন্ধু-বান্ধব সবার সাথেই চলাফেরা করবে। জানাজায় অংশগ্রহণ করবে। নিজেকে কখনো আড়াল করে রাখবে না। বিয়ে-শাদিসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উপস্থিত হবে। অজ্ঞতার ছড়াছড়ি ও দ্বীনের ব্যাপারে তাদের স্বল্প জ্ঞান থাকার দরুন তারা এ-সব কিছুই কুরআন-সুন্নাহর বিপরীতও প্রত্যয় করবে।

যখন একজন জ্ঞানী মুমিন, যাকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের বুঝ দিয়েছেন এবং নিজের দোষ-ত্রুটি দেখার সুযোগ দিয়েছেন ও তার সামনে মানুষের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেছেন, হক-বাতিল ও সুন্দর-অসুন্দরের মধ্যকার পার্থক্য করার শক্তি দিয়েছেন; সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ ও প্রবৃত্তিপূজারি এবং দুনিয়ার স্বার্থে পরকালের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনকারী ব্যক্তিদের সামনে সঠিক বিষয়ে আমল করাকে সে নিজের জন্য আবশ্যক করে নেবে; এ-সব লোকেরা যখন দেখবে, কেউ তাদের কাজকর্মের বিপরীতে হাঁটছে, তখন সেটি তাদের জন্য কষ্টের কারণ হবে—ফলে তারা তার বিরোধিতায় উঠেপড়ে লাগবে, তার হিদায়েতকে মন্দ হবে; সেই লোকেরা নিজের পরিবারের লোককেও ডাকে নিচে ঠোটেচমিটি করবে, তার ভাই-বেরাদারারা তাকে নিয়ে উপেক্ষিত হবে; মানুষজন তার সাথে লেনদেন করতে আগ্রহবোধ করবে না; বুদ্ধিপূজারী ও অন্ধ লোকাজন তার বিরোধিতায় উন্মত্তায় নিমগ্ন হবে; যেহেতু সে-সময় অধিকাংশ মানুষজনই ফিতনাগ্রস্ত ও গোমরাহিতে নিমজ্জিত হয়ে থাকবে, ফলে দ্বীন পালন করলে তাকে নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে হবে; সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জীবনাচার নষ্ট হয়ে যাবার কারণে লেনদেনের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি একাকী হয়ে পড়বে; মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ ও সদ্ভাব বিনষ্ট হবার দরুন লোকদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করার ক্ষেত্রে সে অসহায়য়ের শিকার হবে—মতাক্রমী, ইজতিহাদীও পরকালীগণ প্রতিটি বিষয়ে নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে যাবে; চলার পথে সে এমন কোনো সহমর্মীকে খুঁজে পাবে না, যে তার দুঃখে বুঝবে; এমন কোনো সহযোগীও দেখতে পাবে না, যার কাছে গিয়ে প্রাণ শীতল করবে—এমন ব্যক্তিই হবে গুরবাদের অন্তর্ভুক্ত কারণ, সে হবে অসৎ লোকদের ভিড়ে সততা অবলম্বনকারী, অজ্ঞ লোকদের মাঝে জ্ঞানের যথার্থবাদী, মূর্খ লোকদের ভিতর সহিষ্ণুতা ধারণকারী; সে হবে দুঃখ-কারাবাস-ক্ষুধা কমেই আনন্দ-ফুর্তিতে লিপ্ত; কেমন যেন সে কারাবন্দি কোনো কয়েদি—অত্যধিক ক্রন্দনে ডুবে থাকা ব্যক্তি; সে হবে অপরিচিত সেই মুসলিমদের মতো, যাকে কেউ চিনে না; কেউ তাকে সহমর্মিতা জানাতে আসে না, অচেনা লোকে তাকে দেখে যাতে দুঃখ দূর করে না। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বলেছেন, “অতি শীঘ্রই আবার তা অপরিচিত ও নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে”—মূলত এটাই হলো তার মর্মার্থ। এই বিষয়ে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

টিকাঃ
১. আল-মুনাহ, ইবনু মাজাহ: ৪০১৪; আল-মুনাহ, তিরমিযী: ৫০৫। এর সনদে কিছুটা দুর্বলতা আছে তবে বিষয়টি অন্য দুই মুহাদ্দিসের সনদের থাকায় প্রমাণিত ও পর্যাপ্ত উৎস। সম্পাদক

📘 গুরাবা > 📄 গরিবরা নীরবে অশ্রু প্লাবিত করে

📄 গরিবরা নীরবে অশ্রু প্লাবিত করে


[১১] মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন রহিমাহুল্লাহ বলেন, তুমি যদি নির্জন স্থানে গুরবার প্রকৃতি লাভ কর, তা হলে দেখবে, সে বসে চোখের জল ফেলছে, সাথে শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাসও ছাড়ছে—তার চেহারায বিষণ্নতার ছাপ ফুটে উঠছে। যদি তুমি তাকে দেখে চিনতে না পার, তা হলে মনে করবে হয়তো, লোকটি শোকে হয় তার কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে এভাবে কাঁদছে। কিছু তুমি যা তাভাবে বিষয়টা এর পুরোটাই ভুল। এই লোকটি তার কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে এভাবে কাঁদছে না, সে তার দ্বীনের ব্যাপারে ভয় করে এভাবে চোখের জল ফেলছে। যদি তার দ্বীন ঠিক থাকে, তা হলে দুনিয়ার সব সম্পদ চলে গেলেও সে কোনো আক্ষেপ করবে না। কারণ, সে তার দ্বীনকেই মূল পুঁজি বানিয়েছে, যার ব্যাপারে সে শক্তি রাখে।

হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘একজন মুমিনের মূল পুঁজিই হলো তার দ্বীন। সে যেখানেই যায়, এই মূল পুঁজিকে সাথে করে নিয়ে যায়। সে একে কারও কাছে গচ্ছিত রাখে না, আবার বাড়িতেও রেখে আসে না।’ 8

টিকাঃ
৪. অর্থাৎ একজন মুমিনের দ্বীন তার সাথে সব সময় থাকবে। সে অল্প সময়ের জন্য দ্বীনশূন্য হবে না।—সম্পাদক

📘 গুরাবা > 📄 গরিবদের উদ্দেশ্য কেবল প্রভুর ভালোবাসা

📄 গরিবদের উদ্দেশ্য কেবল প্রভুর ভালোবাসা


[১২] ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ প্রভুর দিকে গরিবদের চলার ধরনকে কবিতায় বলেছেন—

لِطُرُقٍ شَتَّى وَطَرِيقِ الْحَقِّ مُنْفَرِدٌ ... وَالسَّالِكُونَ طَرِيقِ الْحَقِّ أَفْرَادُ
لَا يُطْلَبُونَ وَلَا تُطْلَبُ مَسَاعِيهِمْ ... فَهُمْ عَمَنٍ مَيْلٍ يَمْشُونَ فُقَّادُ
وَالنَّاسُ فِي عَمَلِهِ عَمَّا لَهُ قَصَدُوا ... فَعَجِّلْهُمْ عَنْ طَرِيقِ الْحَقِّ رُقَّادُ

এই দুনিয়ায় পাবে তুমি অনেক পথের দেখা,
এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে কত রকম রেখা।

সঠিক পথের দেখা তবে একটা হাতে থাকে,
সেই পথেই হাঁটে গরিব নিঃস্ব বলে যাকে।

কারও কাছে চায় না কিছু চলে চুপে চুপে,
নিজের মতোই কাটায় জীবন নিঃস্বতাকে লুফে।

লোক সকলে গাফেল হয়ে রয়েছে পড়ে দূরে,
হাঁটছে তারা ভিন্ন পথে গাইছে ভিন্ন সুরে।

📘 গুরাবা > 📄 গুরাবারা অন্ধকারে কান্না করে

📄 গুরাবারা অন্ধকারে কান্না করে


[১৩] আবু আলী রহিমাহুল্লাহ গুরবাদের নিজের জন্য ক্রন্দন করা বিষয়ে আবৃত্তি করেন—

نَسَجْتُ مِنَ الْأَحْزَانِ شِعْرًا فَقُلْتُهُ ... لِأَنِّي غَرِيبٌ وَالْغَرِيبُ حَزِينُ
وَلَيَنْتَنِي دَهْرِي فَلَوْ كُنْتُ جَلْداً ... وَكُلُّ الْبَلَاءِ فِي الْكَلَامِ أَهِينُ
فَلَا تَعْجَبُوا مِنْ أَنَّهُ بَعْدَ زَفْرَةٍ ... يَذِلُّ غَرِيبٌ فِي الْكَلَامِ أَهِينُ

দুঃখ ভরে ক্লান্ত হয়ে বলি কাব্যাকারে,
গরিব আমি দুঃখী আজি জগত সংসারে।

যুগের ঝড়ে হলাম আমি যেন ভাঙা গাছ,
হৃদয় গলে যখন সেথায় লাগে দুঃখের আঁচ।

আমার হবার কিছু নেই আমার কান্না দেখে,
সব গরিবই কাঁদা করে কালো আঁধার থেকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00