📄 গরিবকে চিনতে হলে
[৮] আবু হামিদ রাহিমাহুল্লাহ কবিতা আবৃত্তি করেন—
وَتَرَى الْمُؤْمِنَ فِي الدُّنْيَا ... غَرِيبًا مُسْتَقَرًّا
فَهُوَ لَا يَجْزَعُ مِنْ ذُلِّ ... وَلَا يَطْلُبُ عِزًّا
وَتَرَاهُ مِنْ جَمِيعِ الْخَلْقِ ... خُلُوًّا مُشْمِزًّا
ثُمَّ بِالطَّاعَةِ مَا عَاشَ ... وَيَا خَيْرَ مُلِزًّا
দেখবে তুমি জগত জুড়ে এমন অনেক গরিব আছে
অপমানে হৃদয়ে তার জমে না তো ব্যাথা,
চায় না কভু সে হয়ে যাক বড় কোন নেতা।
দেখবে তাকে জগত ছেড়ে রয়েছে পড়ে অনেক দূরে,
করছে সেথায় অবস্থান ইবাদাতের যাত্দর নূরে।
📄 ইসলাম নিঃসঙ্গ ও অপরিচিত হওয়ার ব্যাখ্যা
[৯] মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস— "নিশ্চয় ইসলাম নিংসঙ্গ ও অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল, আবার অচিরেই তা নিংসঙ্গ ও অপরিচিত হয়ে যাবে।"—এর ব্যাখ্যা কী?
তখন তাকে বলা হবে, 'মক্কার মানুষগুলো ছিল অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। তারা আল্লাহর ঘর কাবার মতো পবিত্র স্থানে মূর্তি স্থাপন করে সেগুলোর পূজা করত। তারা পাথর পূজা করত। মক্কার মানুষগুলো কুফর-শিরক ও অন্যান্য পাপেতে লিপ্ত হয়ে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। তাওহীদের আলোকময় পথ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে অন্ধকাময় পথে চলছিল আর যাবতীয় জীবনপ্রণালী। অবশেষে আল্লাহ তাআলা এই কুফরির অন্ধকারময় জগতে প্রেরণ করলেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। তিনি এলেন দাউদ হয়ে। তিনি কুফুরিতে মৃত পৃথিবীকে তাওহীদের আলো দ্বারা আলোকিত করলেন। প্রিয়নবী এ-দাওয়াহে ইসলাম গ্রহণ করলেন নারী-পুরুষ, আজাদ-গোলামসহ অনেকেই—যারা সবাই ছিল একেবারে সংজ্ঞাহীন ও নিঃস্ব, যারা পারিবারিকভাবে বা অর্থ-সম্পদগত দিক ও গোত্রীয়ভাবে ছিল একেবারে দুর্বল। এ-জীবনের চর্চা কিছু দিন গোপনেও হয়েছিল। ইসলাম গ্রহণের কারণে নিঃস্ব-দুর্বল সাহাবায়ে কেরামকে তার পরিবার বা গোত্রীয় লোকেরা অনেক কষ্ট দিত। মক্কার উত্তপ্ত বালিতে তার পাথরের চাপ সহ্য করে নবুয়ত মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন কতক সাহাবায়ে কেরام রাদিয়াল্লাহু আনহুম। জুমুআ-নিম্নভাগের অপসহনীয় অবস্থার সাথে জীবন-যাপন করতে হয়েছে তাদের। অবশেষে আল্লাহ তাআলা ইসলামকে সুমুক্ত করলেন। কাফিরদের জুলুমের হাতকে ভেঙে দিলেন। মুসলমানদেরকে বিজয় দান করলেন। সোনালি দিনের সোনালি মানুষগুলোর নিংসঙ্গ ও অপরিচিতি অবস্থাতেই ইসলামের দাওয়াতও শুরু হয়েছিল, হাদীসের প্রথম অংশে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। "অচিরেই ইসলাম আবার নিংসঙ্গ ও অপরিচিত হয়ে যাবে।"—হাদীসের এই অংশটুকুর অর্থ আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। তিনি সর্বজ্ঞাতা। তবে এমন এক সময় আসবে, তখন ফিতনার বজ্রধ্বনি হতেই থাকবে। মুসলমানরা তখন প্রবৃত্তির অনুসরণ ও ফিতনা-ফাসাদে জড়িয়ে পড়বে। সে-সময় মানুষ দিকভ্রান্ত হয়ে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। বুকে লালন করবে শিরক-কুফরি। কিন্তু সেই কঠিন মুহূর্তেও কিছু লোক ঈমানের ওপর অটল থাকবে। তখন ইসলামের অবস্থা তেমনই হবে, যেমন একেবারে শুরুলগ্নে হয়েছিল—অর্থাৎ শেষ সময়ে ইসলাম প্রকৃত মুসলিমশূন্য হয়ে পড়বে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন—
تَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً
‘আমার উম্মত তেহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। একটি দল জান্নাতে যাবে; আর বাকি বাহাত্তরটি দল দোজখে জাহান্নামে।’
জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দল কোনটি—অর্থাৎ কোন দলটি জান্নাতে যাবে?’
উত্তরে তিনি বললেন—
مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
‘‘আমি এবং আমার সাহাবাদের মতাদর্শের উপর যারা থাকবে, তারা। ’’
আবু সালাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
ائْتَمِرُوا بِالْمَعْرُوفِ، وَتَنَاهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ، حَتَّى إِذَا رَأَيْتَ شُحًّا مُطَاعًا، وَهَوًى مُتَّبَعًا، وَدُنْيَا مُؤْثَرَةً، وَإِعْجَابَ كُلِّ ذِي رَأْيٍ بِرَأْيِهِ، وَرَأَيْتَ أَمْرًا لَا يَدَانِ لَكَ بِهِ، فَعَلَيْكَ خُوَيْصَةَ نَفْسِكَ، وَدَعْ أَمْرَ الْعَوَامِ، فَإِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ، الصَّبْرُ فِيهِنَّ عَلَى مِثْلِ قَبْضِ عَلَى الْجَمْرِ، لِلْعَامِلِ فِيهِنَّ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلًا، يَعْمَلُونَ بِمِثْلِ عَمَلِهِ.
“তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে থাকো। অবশেষে যখন তুমি (লোকদেরকে) কৃপণতার আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিব স্বার্থকে অগ্রাধিকার এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের মতামতের ব্যাপারে আত্মমগ্ন দেখতে পাবে (১), তখন তুমি তোমার নিজের দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো। আর সাধারণ লোকদের ব্যাপার ছেড়ে দাও। কারণ, তোমাদের পিছনে ধৈর্যধারণের সময় রয়েছে। সে সময়ে ধৈর্যধারণ করা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার মতো কঠিন হবে। যারা সে সময়ে আমল করবে, তারা তোমাদের মত আমলকারী পঞ্চাশ জন লোকের সমতুল্য সওয়াব পাবে।”
টিকাঃ
১. আবু-সুন্নাহ, তিরমিযী : ২৫৪১। এই হাদীসের সনদে কিছু দুর্বলতা থাকলেও এটি অনেকগুলো সনদে বর্ণিত হওয়া প্রমাণ করে যে, এর ভিত্তি আছে। (বিস্তারিত জানতে দেখুন : সিলসিলা সহীহা, আল-আলবানী : ২০৪ ও ২০২) – সম্পাদক
📄 যেমন হবে গুরাবাদের বৈশিষ্ট্যাবলি
যখন এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার নেই—এমন পরিস্থিতিতে তুমি নিজের বিষয়ে খেয়াল রাখবে আর সর্বসাধারণের চিন্তা ছেড়ে দেবে। কেননা, তোমাদের পরে আসবে কঠিন ধৈর্য-পরীক্ষার যুগ। তখন ধৈর্যধারণ করাটা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার মতো কঠিন হবে। সেই যুগে কেউ নেক আমল করলে তার সমকক্ষ পঞ্চাশ ব্যক্তির নেক আমল তাকে দেওয়া হবে।”
[১০] আহলে হক উলামায়ে কিরাম গুরবাদের বৈশিষ্ট্যাবলি তুলে ধরেছেন এভাবে—
একটা সময় অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এমন হবে যে, তারা সবার সাথে ওঠা-বসা করবে, ভ্রাতৃত্ববোধ ঠিক রাখবে। প্রতিবেশীর সাথে দেখা-সাক্ষাত করবে ও নানান বিষয়ে তাদের সাথে সম্পর্কও থাকবে। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। কেউ অসুস্থ হলে দেখতে যাবে। সখি-সন্ধি, ব্যবসায়িক অংশীদার, বন্ধু-বান্ধব সবার সাথেই চলাফেরা করবে। জানাজায় অংশগ্রহণ করবে। নিজেকে কখনো আড়াল করে রাখবে না। বিয়ে-শাদিসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উপস্থিত হবে। অজ্ঞতার ছড়াছড়ি ও দ্বীনের ব্যাপারে তাদের স্বল্প জ্ঞান থাকার দরুন তারা এ-সব কিছুই কুরআন-সুন্নাহর বিপরীতও প্রত্যয় করবে।
যখন একজন জ্ঞানী মুমিন, যাকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের বুঝ দিয়েছেন এবং নিজের দোষ-ত্রুটি দেখার সুযোগ দিয়েছেন ও তার সামনে মানুষের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেছেন, হক-বাতিল ও সুন্দর-অসুন্দরের মধ্যকার পার্থক্য করার শক্তি দিয়েছেন; সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ ও প্রবৃত্তিপূজারি এবং দুনিয়ার স্বার্থে পরকালের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনকারী ব্যক্তিদের সামনে সঠিক বিষয়ে আমল করাকে সে নিজের জন্য আবশ্যক করে নেবে; এ-সব লোকেরা যখন দেখবে, কেউ তাদের কাজকর্মের বিপরীতে হাঁটছে, তখন সেটি তাদের জন্য কষ্টের কারণ হবে—ফলে তারা তার বিরোধিতায় উঠেপড়ে লাগবে, তার হিদায়েতকে মন্দ হবে; সেই লোকেরা নিজের পরিবারের লোককেও ডাকে নিচে ঠোটেচমিটি করবে, তার ভাই-বেরাদারারা তাকে নিয়ে উপেক্ষিত হবে; মানুষজন তার সাথে লেনদেন করতে আগ্রহবোধ করবে না; বুদ্ধিপূজারী ও অন্ধ লোকাজন তার বিরোধিতায় উন্মত্তায় নিমগ্ন হবে; যেহেতু সে-সময় অধিকাংশ মানুষজনই ফিতনাগ্রস্ত ও গোমরাহিতে নিমজ্জিত হয়ে থাকবে, ফলে দ্বীন পালন করলে তাকে নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে হবে; সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জীবনাচার নষ্ট হয়ে যাবার কারণে লেনদেনের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি একাকী হয়ে পড়বে; মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ ও সদ্ভাব বিনষ্ট হবার দরুন লোকদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করার ক্ষেত্রে সে অসহায়য়ের শিকার হবে—মতাক্রমী, ইজতিহাদীও পরকালীগণ প্রতিটি বিষয়ে নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে যাবে; চলার পথে সে এমন কোনো সহমর্মীকে খুঁজে পাবে না, যে তার দুঃখে বুঝবে; এমন কোনো সহযোগীও দেখতে পাবে না, যার কাছে গিয়ে প্রাণ শীতল করবে—এমন ব্যক্তিই হবে গুরবাদের অন্তর্ভুক্ত কারণ, সে হবে অসৎ লোকদের ভিড়ে সততা অবলম্বনকারী, অজ্ঞ লোকদের মাঝে জ্ঞানের যথার্থবাদী, মূর্খ লোকদের ভিতর সহিষ্ণুতা ধারণকারী; সে হবে দুঃখ-কারাবাস-ক্ষুধা কমেই আনন্দ-ফুর্তিতে লিপ্ত; কেমন যেন সে কারাবন্দি কোনো কয়েদি—অত্যধিক ক্রন্দনে ডুবে থাকা ব্যক্তি; সে হবে অপরিচিত সেই মুসলিমদের মতো, যাকে কেউ চিনে না; কেউ তাকে সহমর্মিতা জানাতে আসে না, অচেনা লোকে তাকে দেখে যাতে দুঃখ দূর করে না। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বলেছেন, “অতি শীঘ্রই আবার তা অপরিচিত ও নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে”—মূলত এটাই হলো তার মর্মার্থ। এই বিষয়ে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
টিকাঃ
১. আল-মুনাহ, ইবনু মাজাহ: ৪০১৪; আল-মুনাহ, তিরমিযী: ৫০৫। এর সনদে কিছুটা দুর্বলতা আছে তবে বিষয়টি অন্য দুই মুহাদ্দিসের সনদের থাকায় প্রমাণিত ও পর্যাপ্ত উৎস। সম্পাদক
📄 গরিবরা নীরবে অশ্রু প্লাবিত করে
[১১] মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন রহিমাহুল্লাহ বলেন, তুমি যদি নির্জন স্থানে গুরবার প্রকৃতি লাভ কর, তা হলে দেখবে, সে বসে চোখের জল ফেলছে, সাথে শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাসও ছাড়ছে—তার চেহারায বিষণ্নতার ছাপ ফুটে উঠছে। যদি তুমি তাকে দেখে চিনতে না পার, তা হলে মনে করবে হয়তো, লোকটি শোকে হয় তার কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে এভাবে কাঁদছে। কিছু তুমি যা তাভাবে বিষয়টা এর পুরোটাই ভুল। এই লোকটি তার কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে এভাবে কাঁদছে না, সে তার দ্বীনের ব্যাপারে ভয় করে এভাবে চোখের জল ফেলছে। যদি তার দ্বীন ঠিক থাকে, তা হলে দুনিয়ার সব সম্পদ চলে গেলেও সে কোনো আক্ষেপ করবে না। কারণ, সে তার দ্বীনকেই মূল পুঁজি বানিয়েছে, যার ব্যাপারে সে শক্তি রাখে।
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘একজন মুমিনের মূল পুঁজিই হলো তার দ্বীন। সে যেখানেই যায়, এই মূল পুঁজিকে সাথে করে নিয়ে যায়। সে একে কারও কাছে গচ্ছিত রাখে না, আবার বাড়িতেও রেখে আসে না।’ 8
টিকাঃ
৪. অর্থাৎ একজন মুমিনের দ্বীন তার সাথে সব সময় থাকবে। সে অল্প সময়ের জন্য দ্বীনশূন্য হবে না।—সম্পাদক