📄 অনুবাদকের কথা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি এক ও অদ্বিতীয়; যিনি এ জগত-সংসারের একচ্ছত্র অধিপতি। সৃষ্টির ক্ষুদ্র হতে বৃহৎ সব কিছুকেই বেষ্টন করে আছে প্রিয়তম প্রভুর সীমাহীন ভালোবাসা, দয়া ও রহমত। রাত-দিনের আবর্তনের প্রতিটি ক্ষণে আল্লাহর নিদর্শন প্রকাশ পায়। বিন্দু থেকে বিন্দু সব কিছুর ইলম সেই মহাজ্ঞানী প্রভুর আয়ত্তে রয়েছে। রাতের আঁধারে ছোট পিপিলিকার পায়ের আওয়াজও তিনি শুনতে পান।
অগণিত দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, যাঁর নবুয়াতী আলোকথারায় এ পৃথিবী থেকে দূরীভূত হয়েছে সব ধরনের পাপ ও অন্ধকার, যাঁর পরশে মানব-জাতি খুঁজে পেয়েছে সফলতার সঠিক দিশা। শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর পূত-পবিত্র পরিবারবর্গের প্রতি, তাঁর আনসারীবাদের প্রতি এবং সৌভাগ্যশালী উম্মতের প্রতি—যাঁরা সীমাহীন জুলুম-অত্যাচারের শিকার হয়েও বেছে নিয়েছেন প্রিয় নবীজির পথ-পন্থা, আঁকড়ে ধরে আছেন তাঁর অনুপম আদর্শ।
খুঁস এই দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দু’টি পথে বিভক্ত করেছেন—একটি 'শুরাবাদের পথ', অন্যটি বিতর্কশীল ও খ্যাতিমানদের পথ। রহস্যেরা দুনিয়াতে শুরাবাদের সব ইচ্ছা পূরণ হবে না বলেই আল্লাহ তায়ালা জান্নাত নামের একটি উদ্যান তৈরী করে রেখেছেন তাদের জন্য। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে গুণরাবা বানিয়েছেন, যাতে তারা এই দুনিয়া নামক অন্ধকারপথে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে। এই দুনিয়ার সাময়িক সম্পদ, ঐশ্বর্য আর আভিজাত্যের ভিড়ে তারা যেন ভুলে না যায় মহান রবের কথা। এই দুনিয়া লোভের রঙিন চশমার ফ্রেমে বন্দি হয়ে ভুলে না যায় সে-রাহত অনুপকারী চোখ কখন গিয়ে রহস্য খোজে; অথচ আদৌ সে-রহস্য কেউ উন্মোচন করতে পারবে কি না, জানা নেই। আল্লাহর পরীক্ষায় সফলতা পেতেই আমাদের জন্ম হতে পারে! অনেক কিছুই হতে পারে! রহস্য অনাবৃত করতে আমরা ডুবি বিশুদ্ধতার অতলে—কখনো চিন্তায়, কখনো ধ্যানে কিংবা সর্বসীমানা পেরিয়ে। অবশেষে বিনাশ দুয়ারে ঠিক প্রয়োজনকালেই আল্লাহর ডাক এসে যায়— “আমি জানি, যা তোমরা জানো না। ১”
এই তো দর্শন, এই তো জীবন, এই তো হাসি, এই তো খুশি; এটিই তো ধূসর দুনিয়া, যা মুমিনের জন্য কারাগারস্বরূপ। কারাবন্দি আর কী চাইতে পারে? চাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। কেবল তা ব্যতীত, বিপু প্রতিপালক যার ইচ্ছা করেন—চাইতে তো পারেন তিনিই। এই দুনিয়াতে 'গুরাবা' হলে কখনোই হতাশ হওয়া চলবে না। প্রকৃত ইমানদারদের জন্য এই দুনিয়া কখনোই আনন্দদায়ক ছিল না। বারবার হোঁচট খেতে হবে, দুঃখ-কষ্ট- সমস্যায় জর্জরিত হতে হবে—এটিই নিয়ম।
ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়াটা মথের রবের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। তার প্রমাণ হলো, মহান রবের কাছে প্রিয় হীনদার মানুষ এবং প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাকে অভুক্ত ও অনাহারী রাখেন। আর কুফর দুনিয়াতে ইতর প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভিক্ষসহকারে কুকুরদের খাবারের ব্যবস্থা করেন।'
মানুষের জীবনে হাজারও কষ্ট থাকে, পাথরচাপা কষ্ট। বুকের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট, অপূর্ণতার নিদারুণ কষ্ট। এই কষ্টগুলো বাকিরা দেখে না। একজন দেখেন, একজন জানেন। তিনি শুনতে পান—কষ্টের প্রতিটি শব্দ তিনি ভালো করেই শুনতে পান। আমার যত কষ্ট, আমার যত দুঃখ, আমি তাকেই সব বলব। নীরব- নিভৃতে তাঁর সাথে আলাপন করব আমার বুকের জমানো ব্যথা নিয়ে। আমি তো গুরাবা, কেন দুনিয়ার লোকদের কাছে বলতে যাব! আমারও একটি দুঃখের কথা বলার আছে। কষ্টের সমগ্রগুলো হাসিমুখে স্রষ্টার দাসত্ব করে যাওয়াও তো আমার সবর।
আমি বিশ্ব-জগতের মালিকের কাছে জীবন-সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছি সেই কবেই— যে-দিন নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করেছি! আমি স্বপ্ন দেখি, আমার আমলনামা ডান হাতে পাওয়ার; বড় দামি সেই স্বপ্ন! স্বপ্ন দেখি, সেই মানুষটার পাশে বসে একই সুন্দর পানি পান করার, যিনি আমার জন্য অবেক্ষাও ফেঁদেছিলেন, যখন আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না; যাঁর চোখ-দুটি ভরে উঠত প্রতিদিন কেবল আমার জন্য; আমার জন্য চিন্তা করতে করতে অন্তর্দৃষ্টি আর্য হয়ে যেত যাঁর—আমার পুন ইচ্ছে, ইয়াকুত পাথরের প্রাসাদে বসে এমন একটি মুখের দিকে দিকে তাকিয়ে থাকব, যাঁর মতো সুন্দর দুনিয়া ও আখেরাতে আর কেউ নেই, যাঁর তুলনা হয় না।
দারিদ্র্য সে-দিনই শেষ হয়, যে-দিন আমার প্রভু আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন। সে-দিন এই ধূসর দুনিয়াতে আমার যত ব্যথা ছিল, তা আমি এক নিমিষেই মুছে ফেলব। আর প্রভুর দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন হৃদয়ে এক চিলতে হাসি দিতে পারব।
প্রিয় পাঠক, 'গুরাবা' নামক পুস্তকখানার তত্ত্বের প্রবেশের পূর্বে অনেক কথাই বলে ফেললাম। আরও কিছু অনুভূতির কথা বলতে চাই। আসলে আমার হৃদয়ে সালাফদের প্রতি ভালোবাসার বীজ রোপিত আছে অনেক আগেই। সালাফদের লেখাগুলোতে কেমন যেন একটা কুহিনিয়াত খুঁজে পাই। সালাফদের বই-পুস্তকগুলোর সুখই খুবই ভালো লাগে আমার। কারণ, প্রকৃত কুরআনুল কারীমের আয়াত, তারপর হাদিসে রাসূল, আছারে সাহাবা, তাবেয়ীদের বক্তব্য ও অনেক সুবর্ণদের উক্তির সমাহার থাকে তাদের বই-পুস্তকগুলো। এ-বইটিও সে-ধারার ব্যতিক্রম নয়; এটি আবু বকর মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন আল-আজুররী রাহিমাহুল্লাহ-এর আবেগজড়ানো মূল্যবান একটি সংকলন— যেটি কিতাবুল গুরাবা নামে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর রেখে-যাওয়া মুক্তোগুলো সেই সম্পদেরই বাংলা অনুবাদ এখন, প্রিয় পাঠক, আপনার হাতে।
অনুবাদ করার ক্ষেত্রে আমি কিছু নীতিমালা অবলম্বন করেছি। সেগুলো পাঠক-সমীপে পেশ করছি:
১. মূল কিতাবে লেখক তার প্রতিটি বর্ণনার শুরুতে শিরোনাম ব্যবহার করেননি। কিন্তু আমি পাঠকের উপকারের প্রতি লক্ষ করে উপযোগী শিরোনাম উল্লেখ করে দিয়েছি, যাতে কোন বর্ণনার কি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, তা সহজে পাঠকের বোধগম্য হয়।
২. বইটিতে উল্লেখিত আরবী কিতাবগুলো ভাবান্বিত করার সময় পাঠকের উপকারের আবেদনে দু-চার শব্দ সংযোজন দিয়েছি। ফলে কোথাও মূল পাঠের সাথে হুবহু নাও মিলতে পারে।
৩. ভাবান্বিত বইটির উপস্থাপনা সরল করতে পূর্ণ সনদকে পরিহার করে কেবল শেষোক্ত জনের নামটি রেখেছি।
গুরাবা পাঠের আমন্ত্রণ।
সাইফুল্লাহ আল-মাহমুদ
মীরহাজীরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
টিকাঃ
১. বুখারি: ৭০
📄 সম্পাদকীয় ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহইরা। দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর।
মানবজাতির দুনিয়ায় আগমনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে; তা হলো, আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার মাধ্যমে ইহকালীজন ও পরকালীজন মুক্তি লাভ করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنَ
“আর আমি কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই জিন ও মানুষদের সৃষ্টি করেছি।”১ অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَاُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ
“থাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম।”২
এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে মানুষ দুনিয়ার বুকে নানারূপ বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়। অনেক ধরনের সমস্যা ও প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয় তাকে। সেজন্যই একজন মানুষের শুধু ঈমান আনয়ন করার মাধ্যমেই সফলতা অর্জিত হয়ে যায় না, বরং তাকে ঝাঁপ দিতে হয় সংগ্রামে। লড়াই করতে হয় নিজের নফস, শয়তান ও দুনিয়ার তৈরি করে দেওয়া কুপ্রথা, সামাজিক কুসংস্কার ও অন্যায়-অপরায়ের বিরুদ্ধে। এটাই হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত একজন মুমিনের জন্য পরীক্ষা।
অন্য আয়াতে এই বিষয়ে ইরশাদ ফরমাও—
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوْا أَنْ يَقُوْلُوْا اٰمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُوْنَ وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللهُ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِيْنَ
“মানুষ কি ধারণা করে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য এবং কারা মিথ্যাবাদী।”৩
একজন মুমিন যখন দ্বীন পালনে সচেষ্ট হয়, তখন চারপাশে থেকে আপত্তি আর বিপত্তির তীর ছুটে আসতে থাকে তার দিকে। সবাই তাকে বয়কট করা শুরু করে। তাকে দেখলে এড়িয়ে চলে। কথা বলতে গেলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। হাজারও মানুষের ভিড়ে সে যেন একাকী এক প্রাণী।
সময়ের দীর্ঘ টেনে দিন যত সামনে এগোচ্ছে, ততই যেন এই চিত্র প্রকট হচ্ছে আমাদের সমাজে, দুনিয়ার বুকে। স্কুল-কলেজ বা ভার্সিটিতে পড়া একটি ছেলে যখন দাড়ি রাখা শুরু করে, তখন বন্ধু-বান্ধব তো বটেই, অনেক সময় পরিবারের লোকেরাও তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে শুরু করে। তার পাশে বসে না। তার কাছে ঘেঁষে না। অনেকে আবার এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিভিন্ন কটু কথা শুনিয়ে দেয়। সুযোগ পেলে ‘রবি’ বলে টিপ্পনী কাটতে ভুল করে না— যেন সে দাড়ি রেখে মস্ত বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে! এমদাবাবে একটি মেয়ে পর্দা করা শুরু করলে তাকেও পোহাতে হয় নানান রকম দুর্ভোগ। পাড়াপড়শি থেকে শুরু করে টিচাররা পর্যন্ত তাকে হেনস্তা করে অনেক সময়। বাজে মন্তব্য আর বিভিন্ন অমূলক সন্দেহের বুলেট বর্ষণীরা হতে হয় তাকে প্রতিনিয়ত। এটা আমাদের সমাজের নিত্য দিনের চিত্র। এই ভিন্ন দিন যত যাবে, তত গাঢ় হবে। তত বেশি অসহনীয় হয়ে উঠবে। কিন্তু এতে খুব বেশি ব্যথিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এমন পরিস্থিতিতে যারা নিজেদেরকে আঁকড়ে ধরবে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য সান্ত্বনার বাণী রেখে গেছেন। তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা।
তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে থাকো। অবশেষে যখন তুমি (লোকদেরকে) কৃপণতার আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিব স্বার্থকে অগ্রাধিকার এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের মতামতের ব্যাপারে আমল দেখতে পাবে এবং এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার নেই, এমন পরিস্থিতিতে তুমি নিজের বিষয়ে খেয়াল রাখবে আর সর্বসাধারণের চিন্তা ছেড়ে দেবে। কেননা তোমাদের পরে আসবে কঠিন ধৈর্য-পরীক্ষার যুগ। তখন ধৈর্যধারণ করাটা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার মতো কঠিন হবে। সেই যুগে কেউ নেক আমল করলে তার সমকক্ষ পঞ্চাশ ব্যক্তির নেক আমল তাকে দেওয়া হবে।’৪
দ্বীনের রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার দরুন নিজের পরিবার-পরিজন, সমাজ-রাষ্ট্রসহ সবার কাছে অপাঙক্তেয় হয়ে যারা, ইসলামের পরিভাষায় তাদেরকেই বলা হয় গুরাবা। গুরাবা একটি আরবী বহুবচন শব্দ। এর একবচন হলো গারিব। গারিব শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে —বিদেশি, প্রবাসী, আগন্তুক, মুসাফির, অপরিচিত ইত্যাদি। গুরাবার পারিভাষিক অর্থের মধ্যে এর শাব্দিক অর্থগুলো পুরোপুরি বা আংশিক পাওয়া যায়। কারণ, দ্বীনের জন্য যিনি সমাজের লোকদের থেকে বিভিন্ন বিড়ম্বনার শিকার হন, তিনি তাদের থেকে দূরে সরে যান বা তারাই তার থেকে দূরে সরে যায়। ফলে ওই দ্বীনদার ব্যক্তির কাছে বহিরাগত কোনো অপরিচিত আগন্তুকের মতোই হয়ে যান। দ্বীন পালনের অপরাধে (?) মানুষদের কাছে অপাঙক্তেয় হয়ে ওঘার বিষয়টি অনেক ব্যাপক। যেহেতু দ্বীনের অনেক শাখা-প্রশাখা আছে। ফলে গুরাবার পরিচিতি ও অনেক সঙ্কুলতাও। কিছু অনেকে মনে করেন, গুরাবা বলতে বোঝানো হয় শুধু আল্লাহ্র পথে লড়াইকারী মুজাহিদকে —এটি সঠিক নয়; গুরাবার অর্থ এই এক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদিও একজন মুজাহিদ জিহাদের ফরয ইবাদত পালনের কারণে কিংবা একজন আলেম বা সাধারণ মুসলিম জিহাদের ভালোবাসা বুকে লালন করা ও জিহাদের বিষয়ে উম্মায় আমলের কথা উন্মুক্তকরণে সক্রিয় ভূমিকা দেওয়ার কারণে সমাজের লোকদের দ্বারাও প্রাসঙ্গিক গুরাবা বান্দাহ হিসেবে গণ্য হতে পারে। অনেকে আবার মনে করেন, মরুভূমি বা নির্জন কোনো বিরান জায়গায় গিয়ে বসবাস করেন। দুনিয়ার কোনো সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করে একাকীত্ব পূর্ণ ধর্ম। এটিও গুরাবার সঠিক পরিচয়ের প্রতিনিয়ত করা না। কারণ, এভাবে দেশে গুরাবার অর্থ সতীর্থাটা দলচ্যুত হয়।
একজন মানুষ সমাজের লোকজনের সাথে বসবাস করে ও গুরাবাদের দলভুক্ত হতে পারেন। লেখক উক্ত বইতে এক জায়গায় গুরাবার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে যে চিত্র আঁকেন, সেখান থেকে আমরা প্রাধিকারভাবে গুরাবা সম্পর্কে একটি ধারণা অর্জন করতে পারি। তিনি বলেছেন, ‘যখন একজন জ্ঞানী মুমিন—থাকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের বুঝ দিয়েছেন এবং নেক দোয়-ফুর্তী দেখাবো। সে ও তার সামনে মানুষের সার্বিক অবস্থা শুধু গ্রহণ করবে, হক-বাতিল ও সুদূর-অসুদ্ধের মধ্যকার পার্থক্য করার শক্তি দিয়েছেন, সে সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ ও প্রবৃত্তিপূজারি এবং দুনিয়ার স্বার্থে পরকালে প্রতি অবস্থা প্রদর্শনকারী ব্যক্তির সামনে সঠিক বিষয়ে আমল করবে। সে নিজের জন্য আশঙ্ক করছে লোকে, দুনিয়ার লোকেরা যখন দেখতে, কেউ তাদের কাজকর্মের বিপরীত হচ্ছে, তখন সেটি তাদের জন্য কঠিন কারণ হবে— ফলে তারা তার বিরোধিতায় উচ্চতাও লাগাবে, তার বিরোধিয়াও মন্তব্য হবে; সেই লোকের নিজের পরিবারের লোকেরাও তাকে নিয়ে টেঁটামেটি করবে, তার ভাই-বন্ধুরা তাকে উপেক্সিত হতে হবে; মানুষজন তার সাথে লেনদেন করতে আগ্রহরোধ করবে না; প্রবৃত্তিপূজারি ও অসৎ লোকজন তার বিরোধিতায় নিমগ্ন হবে; যেহেতু সেসময় অধিকারশ মানুষজনও ফেতনাগ্রস্ত ও গোমরাহিতে নিমজ্জিত হবে থাকবে, ফলে দ্বীন পালন করার স্বার্থে তাকে নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে হবে; সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জীবনযাত্রার নষ্ট হয়ে যাবার কারণে লেনদেনের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি একাকী হয়ে পড়বে; মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ ও সঙ্গ বিনষ্ট হবার দরুন লোকদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করার ক্ষেত্রে সে অসহায়তার শিকার হবে—মোটকথা ইহজাগতিক ও পরকালীন প্রতিটি বিষয়ে নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে যাবে; চলার পথে সে এমন কোনো সহযাত্রীকে খুঁজে পাবে না, যে তার দুঃখ বুঝবে; এমন কোনো সহযোদ্ধাকে দেখা পাবে না, যার কাছে গিয়ে প্রাণ শীতল করবে—এমন ব্যক্তি হলো গুরাবাদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সে হবে অসৎ লোকদের ভিড়ে সততা অবলম্বনকারী, অজ্ঞ লোকদের মাঝে জ্ঞানের ঝর্ণাধারী, মূর্খ লোকদের ভেতর সহিষ্ণুতা ধারণকারী; সে হবে দুঃখ-ভারাক্রান্ত—খুব কমই আনন্দ- ফুর্তিতে লিপ্ত; কেমন যেন সে কারামাদীনী কোনো কছুমি—অত্যধিক ফন্দনে ডুবে-থাাকা ব্যক্তি। সে হবে অপরিচিত সেই মুসাফিরের মতো, যাকে কেউ চিনে না; কেউ তাকে সহমর্মিতা জানাতে আসে না, ওঠনো লোকে তাকে দেখে শ্রদ্ধা রাখ্য গ্রহণ করা না।’
২ এই হল গুরাবার পরিচয়, প্রকর ও বৈশিষ্ট্যধারী আরও বিপদদাতাকে পাঠকগণ জানতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ। গুরাবা বিষয়ে আমাদের অনেককে লালনকৃত কিছু ভুল ধারণা সংশোধনের জন্য এখানে শুধু প্রাথমিকভাবে ওপর কয়েকটি কথা তুলে ধরা হলো।
এই বইটি গুরাবা বিষয়ে রচিত সর্বপ্রথম স্বতন্ত্র কোনো বই। চতুর্থ শতকের বিখ্যাত আলেম আবু বকর আল-আজুরী রাহ. এটি রচনা করেছেন। পাঠক বইটি পড়তে গিয়ে অনেক কবিতার মুখোমুখি হবেন। যারা সালাফদের বই-পুস্তকের সাথে কমবেশি পরিচিত, তারা জানেন যে, সালাফদের বইতে প্রচুর পরিমাণে কবিতার সমাহার দেখতে পাওয়া যায়। সেখান থেকে অনুমানও হয়, কবিতা তাঁদের কাছে ভালো রকম চিত্রিত ছিল— না হয় তাদের বইতে এত এত কবিতা উপস্থিতির দেখা যাওয়ার কথা না। আমরা এখানে কবিতা প্রসঙ্গে ইসলামের দৃষ্টিতে এবং সালাফদের বই-পুস্তকে এত বেশি কবিতা উপস্থিতির হেতু তুলে ধরার চেষ্টা করব। আল্লাহই সর্বোচ্চ তাওফিকদাতা।
ইসলাম পূর্বযুগে এবং ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেও কবিতা ছিল আরব-অঞ্চলের লোকদের মনের ভাব ও অনুভব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। সে-যুগে রচিত অসংখ্য কবিতা এখনো কাগজের পাতায় বিদ্যমান। প্রেমে ও কামে, যুদ্ধে ও শান্তিতে, হরফ ও বিবাদে, ভালবাসা ও ঘৃণায় কবিতাই ছিল আরবদের অন্যতম হাতিয়ার। তৎকালীন আরবের সাংস্কৃতিক জীবন পুরোটাই ছিল কবি ও কবিতাকেন্দ্রিক। আরব-অঞ্চলে কবি এবং সেনাপতি, বিজয়ী ও শ্রেষ্ঠ মানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। কোনো কবি শুধু তার কবিতার মাধ্যমে গোত্রের ধ্বংস ও নামহীন করে দিতে পারত। অনুরূপভাবে কোনো নাম-পরিচয়হীন গোত্রকে মাত্র একজন কবিই তার কবিতার পঙক্তি দিয়ে সুখ্যাতির শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে দিত।
আরবের জাহেলি যুগের কবিরা ছিল সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি। সাধারণ লোক মুখে- দুঃখে, আপদে-বিপদে তাদের পরামর্শ মেনে চলত। তাদেরকে আক্ষাদাতবে খাতির ও সম্মান করত। কবিদেরকে অনেক আপন গোত্রে গোত্র-গোত্রে কলহ-বিবাদ, ঝগড়া- মানবিক মূল্যয়নের চরম অবক্ষয়ের সে-যুগে কবিতা ছিল ছত্রিমপ্রায়ণ, অপরিহার্য, বিলাসবীয় জনতার প্রেরণা ও উন্মাদনার প্রধান বাহন। যার ফল কবি ও কবিতার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা যা বলেন—
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانتَصَرُوا مِن بَعْدِ مَا ظُلِمُوا
"বিপথগামী লোকেরা কবিদের অনুসরণ করে থাকে। তুমি কি দেখতে পাও না, তারা প্রতিটি উপত্যকায় উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ায়? তারা মুখে যা বলে, বাস্তবে তা করে না। তবে যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং আল্লাহর যিকর অধিকতর তৎপর রয়েছে এবং অত্যাচারিত হলে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট হয়েছে, তাদের সম্বন্ধে ও-কথা প্রযোজ্য নয়।"১
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয় সমগ্র কাব্য-সাহিত্য নয়; বরং যে-সমস্ত কবিতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দিয়েছে, কেবল তারই সমালোচনা করা হয়েছে। আয়াত নাযিল হওয়ার পর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা, কাব বিন মালিক এবং হাসসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে কাঁদতে কাঁদতে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, কুরআনে কবিদের সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়েছে। আমরাও তো কবি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, 'সম্পূর্ণ আয়াত পড়, ঈমানদার, নেককারদের কথা বলা হয়নি।' তখন তাঁরা নিশ্চিন্ত হলেন।২
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উৎসাহে অনেক সাহাবী কাব্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। নিয়মিত কাব্যচর্চাকারী সাহাবী কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—হাসসান বিন সাবিত, কাব বিন মালিক, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, আলী বিন আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দিক, উমর ফারুক, লাবীদ বিন রাবিয়া, কাব বিন যুহায়র, আকবাস বিন মিরাদস, যুহায়র বিন জুনাব, সুহায়ম, আবু লায়লা রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ। রাসূল আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবী কবিদের মধ্যে থেকে কবি হাসসান বিন সাবিতকে সভাকবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাকে বলা হতো 'শায়িরুর রাসূল'— তথা রাসূলের কবি। কবিরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবিতার মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করলে তিনি হাসসান বিন সাবিত রা.-কে তাঁর পক্ষ থেকে জবাব প্রদানের নির্দেশ দিতেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করতেন।
এক হাদীস এসেছে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন—
يَا حَسَّانُ أَجِبْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ
'হে হাসসান, আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে (কাফিরদের) জবাব দাও। হে আল্লাহ, আপনি তাকে জিবরীলের মাধ্যমে সাহায্য করুন।'১
আরেক হাদীসে এসেছে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসসান রা.-কে বলেছিলেন—
اِهْجُهُمْ وَجِبْرِيلُ مَعَكَ
'তুমি কাফিরদের নিন্দা করো। জিবরীল তোমার সাথে আছেন।'২
কুরআনের উল্লেখিত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা দুই শ্রেণির মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। একদিকে আছে বিপথগামী মুশরিক কবিরা—যারা নিজেদেরা যেমন বিভ্রান্ত, তেমনি তাদের অনুসারীদেরকেও বিভ্রান্ত করতে তৎপর। অপরদিকে আছে সত্য ও সুন্দরের পথবাহী ঈমানদার কবিগণ—যারা তাদের কাব্যপ্রতিভার মাধ্যমে মূলত ইসলাম, সত্য ও ন্যায়কে বিজয়ী করতে সচেষ্ট। যারা কবি, তারা সৃষ্টিগতভাবে কিছুটা ভাবুক, কল্পনাপ্রবণ ও আবেগপ্রবণ—এটি তাদের স্বভাবধর্ম। কল্পনাপ্রবণ ও আবেগী না হলে কাব্য সৃষ্টি করা যায় না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কবিদের প্রতি বিশেষ এক নিয়ামত। যে-কারণে সাধারণ মানুষ শখের মাধ্যমে ভাষার যে-খনন দিতে পারে না, কবিরা তা পারেন। এখানেই কবিদের সাথে সাধারণ মানুষের পার্থক্য—এটিকেই বলে কাব্যপ্রতিভা। কবিদেরকে দেখতে শেখো থেকে, কল্পনাপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা আল্লাহর ইচ্ছা নয়। তবে তারা যেন এ ভাবের জগতে বিচরণ করতে গিয়ে বিপথগামী না হয়, এ জন্য আল্লাহ্ তাআলা কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। সেগুলো হলো:
১. একজন কবিকে ঈমানদার হতে হবে। কারণ, একজন মানুষ মুমিন হওয়া মানেই শরীয়তের দেখানো পথে চলতে সে বাধ্য থাকে। আল্লাহ তাআলা যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। পাশ্চাত্যের ইসলামের গতিতে আবদ্ধ না হলে তার সামনে কোনো সীমারেখা থাকে না। ফলে যা খুশি করা ও বলার অবাধ স্বাধীনতার সে বিদ্রোহ হয়ে অন্যের ইজ্জত ও প্রতিপত্তিতে আঘাত করতে পারে না। শব্দের বুননে অন্যায়ভাবে অন্যের চরিত্র হননে পিছল হয় না।
২. ঈমান আনার সাথে সাথে অসৎ কর্ম বর্জন করে সত্য ও সুন্দরের অনুসারী হতে হবে। কারণ, মানুষ যখন সত্য ও সুন্দরের অনুসারী হয়, তখন তার সব কাজ ও কর্ম পরিশীলিত ও মনোহারী হয়।
৩. যে-ভাবপ্রবণতা ও আবেগে যাতে করে তাকে সৎ পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে, সে-জন্য আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা—সর্বদা তাঁর সাহায্য চাওয়া। কারণ, আল্লাহ স্মরণ মানুষকে সবসময়ই মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে, অন্তরকে প্রশান্ত রাখে।
৪. যেখানেই মানবতা বিপন্ন হবে, নিপীড়িত ও নির্যাতিত হবে, সেখানেই সর্বশক্তি নিয়োগ করে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য অপরাপর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। নিপীড়ন ও নির্যাতনের ব্যাপারে জনগণকে একত্রিত করা। কীসে ও কীভাবে মানবতা বিপন্ন হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা। সভ্যতার পক্ষে বিপ্লবের বাণী উজ্জীবিত করা। মোটকথা সর্বদা মজলুমের পক্ষে ও জালিমের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া।
যে-সব কবি এই সকল শর্ত মেনে কবিতার চর্চা করে, তাদের কবিতা প্রসঙ্গে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
إِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حِكْمَةً
'নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতায় মহা জ্ঞানের কথা আছে।'১
আর যারা এসব শর্তের ধার ধারে না, তারাই নিন্দনীয়। এ-সকল কবিদের ব্যাপারেই কুরআনে নিন্দা করা হয়েছে। এদের রচিত কবিতা প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
لَأَنْ يَمْتَلِئَ جَوْفُ أَحَدِكُمْ قَيُحًا خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمْتَلِئَ شِعْرًا
'তোমাদের কারও পেট কবিতা দ্বারা পূর্ণ হওয়ার চেয়ে পূঁয দ্বারা পূর্ণ হওয়া উত্তম।'১
ইমাম বুখারী রাহ. এই হাদীসটি যে-অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, তার শিরোনাম দিয়েছেন এমন—'যে-কবিরা মানুষকে আল্লাহ স্মরণ, ইলম হাসিল ও কুরআন থেকে বাধা দান করার মতো প্রভাবিত করে, তা নিন্দিত।'
তাঁর দেওয়া এই শিরোনাম প্রমাণিত করে যে, এখানে সাধারণভাবে যে-কোনো কবিতার কথা বলা হয়নি; বরং উপরোক্ত শর্ত থেকে মুক্ত কবিতাই এই নিন্দার যোগ্য। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার সারকথা হলো, মৌলিকভাবে কবিতা বেশ—যদি তাতে মন্দের মিশ্রণ ঘটে, তবে তা নিন্দাযোগা। আর যদি এর মাধ্যমে ভালো কিছু করা হয়, তবে তা প্রশংসাযোগা। মূলত উলামায়ে কিরাম ও সালাফে সালেহীন কবিতার চর্চা করতেন বেশ কিছু প্রয়োজনকে সামনে রেখে। কাব্যচর্চার মাধ্যমে কেবল বিনোদন লাভ করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। যে-সব প্রয়োজনের খাতিরে তাঁরা কবিতা পড়তেন, রচনা করতেন ও নিজেদের সিনিতিতে কবিতা আশ্রয় দিতেন তার কারণগুলো নিম্নরূপ:
ক. আরবীভাষা জানা
যে-কোনো ভাষা তার সাহিত্যে সমৃদ্ধি লাভ করে কাব্যচর্চার মাধ্যমে। কাব্যের উৎকর্ষ আর নান্দনিকতা সেই ভাষার সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্যকে উজ্জীবিত করে তোলে। ফলে আরবীভাষার উৎকর্ষ লাভের জন্য আরবী কবিতার সাথে পরিচয় থাকা জরুরি। কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, উৎপ্রোক্ষা ও বচন-প্রবচন একজন মানুষের ভাষাজ্ঞানকে শানিত করে। তার চিন্তা ও বোধকে সুললিত করে। ভাষা-বিষয়ক ভাব ও ভাবনাকে পরিশীলিত করে। কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী জ্ঞানের ভাণ্ডার যেহেতু আরবীভাষায় গড়ে উঠেছে, তাই ইসলামী জ্ঞানে পারঙ্গমতা অর্জনের জন্য আরবীভাষার কাব্য-ভাগ্যের সাথেও একজন ব্যক্তিকে পরিচিত হতে হয়।
খ. কুরআনের অফুরন্তি জ্ঞান
ভাষা একটি চলমান বিষয়। নদীর মতোই এর ধারা আগে সদাবহমান। সময়ের স্রোত বয়ে ভাষার মধ্যে ঢুকে পড়ে অনেক রকমের পরিবর্তন। পরিবর্তিত পরিস্থিতির শিকার ২৮ হয়ে একটি বাক্যের বা বাকী অনেক অনেক শব্দের অর্থ চেহারার ঘোমটা দিয়ে নতুন অর্থ ধারণ করে। সমকালীন কোনো ব্যক্তি যদি সেই শব্দের প্রাচীন অর্থও জানা না থাকে, তবে তিনি প্রাচীন যুগের রচিত কোনো রচনা পড়তে গিয়ে অর্থ-অর্ধের গোলকধাঁধায় ডুবে যেতে পারেন। সঠিক মর্ম উদ্ঘাটনে হতে পারেন পথ হারানোর শিকার। বিষয়টিকে সহজ করার জন্য ভন্ড আমরা একটি শব্দের অর্থ নিয়ে বর্তমানের বাংলাভাষায় বহুল ব্যবহৃত 'রাজাকার' শব্দটিকে কথাই ধরুন। এর আসল অর্থ ছিল স্বেচ্ছাসেবক। বাংলা ভাষায় এই শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে আগমন করেছে। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত শব্দটি তার আপন অর্থেই ব্যবহার হতো। তারপর একাত্তরের স্বাধীনত যুদ্ধের এ-শ্রেণীর কিছু মানুষ পাকবাহিনীর পক্ষে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তাই ‘রাজাকার’ নামে খ্যাত হন। বর্তমানে রাজাকার বলতে আমরা বুঝি যুদ্ধাপরাধীকে, অর্থ এই শব্দটির মূল অর্থ আর এটি নয়। এখন যদি কেউ স্বাধীনতার আগের তার রচনায় শব্দটি ব্যবহার করে থাকে, সেটি কি বর্তমানের মতো যুদ্ধাপরাধী অর্থে প্রদান করবে না, বরং তার মূল অর্থই সে প্রকাশ করবে। কোনো ব্যক্তি যদি রুনাবলি সঠিক ভাবে বোঝার জন্য তার মুখের ভাষা সম্পর্কে ধারণা না থাকে। এতোটা সময় ভুল ধারণা থেকে।
আরবীভাষার ক্ষেত্রেও হুবহু কথাগুলো প্রযোজ্য। কুরআন যে-যুগে ও যে-সমাজের মানুষের কাছে নাযিল হয়েছে, তাদের সেই সময়কার ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে কুরআন তাফসীর ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। কুরআনে ব্যবহৃত শব্দগুলি ঠিক কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বোঝা সহজ হয়; সে ক্ষেত্রে ভুলের শিকার হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে আসে। সে-জন্যই কোনো কোনো তাফসীরে—বিশেষত প্রাচীন তাফসীরগ্রন্থগুলোতে—অতিরিক্ত পরিমাণে কবিতার উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়।
গ. হাদীসের মর্যাদা রক্ষা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তিনি যে-সমাজের মানুষ ছিলেন ও যে-যুগে যে-ভাষাতে আবির্ভূত কমবেশি, সে-সমাজে সম্যক ধারণা থাকা অপরিহার্য। অনেক সময় এমনও হয়ে থাকে, হাদীসে ব্যবহৃত কোনো শব্দ পরবর্তী যুগে এসে পাল্টে গেছে। সে-যুগের খাঁটি সাহিত্য সংরক্ষিত হয়েছে কবিতার মাধ্যমে, গদ্যের আলাদা সংকলন গড়ে ওঠেনি; আরবেরা লোকেরা ভাষা ৫৮ হাজার কবিতার লাইন মুখস্থ করে রাখত—এভাবে যুগ-পরম্পরায় কবিতার মাধ্যমে তাদের সমাজচিত্র, সংস্কৃতি ও ভাবধারা-ভাবধারা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিসের মর্ম বুঝতেও কবিতার দরকার হয়।
খ. ভালো কাজের প্রচার
কবিতা যেহেতু মানুষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে এবং ছন্দে ছন্দে অনেক কথাই মনে রাখা সহজ হয়, তাই সালাফে সালেহীন ও উলামায়ে কিরাম কবিতা রচনার প্রতিও মনোযোগী ছিলেন। কবিতার ভেতর দিয়ে মানুষের সামনে পরকালের স্মরণ, দুনিয়ামুখিতা, জ্ঞানগর্ভ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথামালা এবং সত্য ও সুন্দরের শিক্ষা প্রচারে সচেষ্ট ছিলেন।
আবু বকর রা. বলেছেন, 'তোমরা সন্তানদেরে কবিতা শিক্ষা দাও। কারণ, তা তাদেরকে উন্নত আখলাক শিক্ষা দেবে।'
উমর রা. বলেছেন, 'তোমরা কবিতা সংরক্ষণ করো। কারণ, কবিতা সচ্চরিত্রবান হবার শিক্ষা দেয়। উম্মত আমলের দিশা দেয়। উত্তম কর্মের প্রতি উৎসাহিত করে।'
মুয়াবিয়া রা. বলেছেন, 'একজন ব্যক্তির জন্য স্ত্রীর সন্তানকে সাহিত্য সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া অত্যাবশ্যক। আর কবিতা হলো সবচেয়ে উচ্চতর সাহিত্য।'”
কবিতা সম্পর্কে দুইজন ইমামের মূল্যায়ন উল্লেখ করছি—
ইমাম শাফিয়ী রাহ. বলেছেন, 'দ্বীনী কোন বিষয়ে কারও জন্য ফতোয়া প্রদান করা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে আল্লাহর কিতাব, এর নাসিখ-মানসুখ—তথা রহিতকারী ও রহিত আয়াতসমূহ, মুহকাম-মুতাশাবিহ—তথা সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট আয়াতসমূহ সম্পর্কে অবগত না হবে; এর সাথে তাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু লাইহু ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস সম্পর্কে জ্ঞাত হতে হবে, আরবীভাষা ও কবিতা সম্পর্কেও বিচক্ষণ হতে হবে। ১২
অন্য আরেকজন ইমাম ইবনু কুনামাহ রাহ. লিখেছেন, 'কবিতা বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মতানৈক্য নেই। সালাফগণ ও উলামায়ে কিরাম কবিতা রচনা করেছেন। [১১] আরবীভাষা জানা, কুরআনের তাফসির করা অন্য কবিতায় মাধ্যমে দলিল পেশ করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার মর্মার্থ বোঝা ইত্যাদি নানান কারণেই কাব্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।' ১৩
অনেক ফকীহ প্রথমদিকের কবিদের কবিতা কবিতা সম্পর্কে ধারণা রাখা, সেগুলো পড়া ও এই সম্বন্ধে জ্ঞান রাখাকে ফরযে কিফায়া বলেছেন। সাহিত্যজ্ঞান-বিচারে আরব-কবি ও সাহিত্যিকদের ছয় ভাগে ভাগ করা হয়। যথা :
১. ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগের কবি-সাহিত্যিকগণ। যেমন : ইমরউল কায়েস, আনতারা বিন শাদ্দাদ, যুহাইর, লাবীদ প্রমুখ।
২. মু’য়াম্মারাইন—যারা জাহেলি ও ইসলামী উভয় যুগই পেয়েছেন। যেমন : সাহাবী হাসসান বিন সাবিত, খুলাসা, কাব বিন যুহাইর যুহাইর ইবনুল বিন আমার দাউসী রা. প্রমুখ।
৩. ইসলামিয়্যিন—তাদেরকে গুয়ারা মুতাক্বদিমীনও বলা হয়। বানী উমাইয়্যার শাসনকাল পর্যন্ত তাদের যুগ। কুরআনের চর্চা তাদের সাহিত্যমানকে সমৃদ্ধ করেছিল। যেমন : ফারায়াদাক, জারীর, যুর রিফায়াহ, জামীল প্রমুখ।
৪. মুখাদরামীন—যারা বানী উমাইয়্যার পরে এসেছে। তাদের অধিকাংশের দেছেই অনারবী রক্ত রয়েছে। যেমন : বাশশার বিন বুরদ, আবু নুয়াস প্রমুখ।
৫. মুওয়াদদীন—যারা মুয়াল্লাদীনের পর আগমন করেছে। যেমন : বুহতুরী, আবু তাম্মাম প্রমুখ।
৬. মুতাআখখিরীন এবং তাদের পরে আরও যাদের আগমন। যেমন : আহমদ শাওকী, নায়্যার প্রমুখ।
প্রথম তিন শ্রেণির সাহিত্যজ্ঞান অনেক উচ্চের। তাদের কবিতা জানার ব্যাপারে অনেক ফুকাহা ফরযে কিফায়া হওয়ার মত দিয়েছেন। এর কারণ হলো, এর সাথে আরবীভাষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যার মাধ্যমে কুরআন-হাদীস জানা যায় ও হারাম-হালালের মধ্যে তারতম্য করা যায়। তাদের রচিত কবিতার মধ্যে অর্থের ভুল-ত্রুটি থাকার থাকলেও ভাষা ও ভাষাগত দিক দিয়ে সেগুলো ত্রুটিমুক্ত। ১৪
প্রস্তুত সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে-কাজগুলো করা হয়েছে :
• মূল আরবীর সাথে মিলিয়ে অনুবাদ নিরীক্ষণ করেছি। যে-সব জায়গায় অসংগতি ও অসামঞ্জস্য দৃষ্টগোচর হয়েছে, সে-সব জায়গা সংশোধন করে দিয়েছি।
• বইটিতে উল্লেখিত হাদীসসমূহের সূত্র ও মান উল্লেখ করেছি। এই ক্ষেত্রে অনেক সময় সহায়তা নিয়েছি ক্বুয়েতের দারুল খুলাফা লিলকিতাবিল ইসলামী থেকে প্রকাশিত বাসরুল বাদার কর্তৃক তাহকীকৃত নুসখাটি।
• প্রয়োজনেদেখা ঠিকানো কোনো কোনো বর্ণনার ব্যাখ্যা বা তৎসংশ্লিষ্ট কোনো মন্তব্যও করেছি।
• বইটিতে উল্লেখিত কবিতাসমূহের কাব্যানুবাদ অনুবাদক নিজেই করেছিলেন; কিন্তু সেগুলো পরিবর্তে নতুন করে আমি নিজেই আবার সেসব কবিতার কাব্যানুবাদ করে দিয়েছি।
• নাতিদীর্ঘ একটি ভূমিকার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় পাঠকের সামনে সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। তার মধ্যে অন্যতম হলো গুরাবা বিষয়ে অনেকের সংকীর্ণ ধারণা, ইসলামে কবি ও কবিতার অবস্থান, সালাফদের বই-পুস্তকে ব্যাপকহারে কবিতা থাকার হেতু ইত্যাদি। মূলত সালাফদের বইগুলোর শুরুতে তৎসংশ্লিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে বিস্তারিত আকারে আলোচনা করার মাধ্যমে পাঠককদের সামনে আলাদা আলাদাভাবে কিছু নতুন বিষয়ের তাহকীক উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি আমরা।
বইটির শেষে যুক্ত করা হয়েছে ইবনুল কাইয়্যিম রাহ.-এর বিখ্যাত গ্রন্থ মাদারিজুস সালিকীন থেকে গুরাবা-বিষয়ক একটি আলোচনা। বিষয় একই হওয়ায় হাদীসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এতে। তবুও এতে মূল বইয়ের বাইরে আরও নতুন কিছু তথ্য পাঠকের অধ্যয়নে পূর্ণতা আনবে আশা রেখে আমরা তা পরিশিষ্ট আকারে যুক্ত করেছি। তা ছাড়া অনেক সময় একই বর্ণনার পুনরাবৃত্তি স্মৃতিতে গেঁথে যাওয়ার পক্ষে সহায়ক হয়। আমরা আশাবাদী, পাঠক সেই উপকার এখান থেকে লাভ করবেন, ইনশাআল্লাহ। বইটিকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টায় আমাদের কোনো কমতি ছিল না। তবুও মানুষ ভুলমুক্ত নয়—এই বাস্তবতা মাথা পেতে মেনে নিয়ে আরজ করব, যদি এতে কোনো ত্রুটি পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়, তবে তা আমাকে বা প্রকাশনীকে অবহিত করবেন। ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে তা শুধরে নেওয়া হবে।
পরিশেষে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞচিত্তে শুকরিয়া আদায় করছি এমন একটি বইয়ের কাজ করার তাওফীক্ব পাওয়ার কারণে। সেইসাথে শুকরিয়া আদায় করছি মাকতাবাতুল আসলাফের, যাদের উৎসাহী উদ্যোগের ফলে পাঠকদের সামনে একজন মহান সালাফের রেখে-যাওয়া এই সম্পদ সাবলীলিত হয়ে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে—আল্লাহ তাদের মঙ্গল করুন এবং ইখলাসের সাথে এমন আরও অনেক খিদমাত আঞ্জাম দেওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। ফকরিরিড থেকে শুরু করে প্রেস থেকে পাঠকের হাতে আসা পর্যন্ত আল্লাহ যারাাইই কোনো না কোনোভাবে বইটির সাথে যুক্ত থেকেছেন, এতেও সময় ও শ্রম দিয়েছেন, তাদের সকলের জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে দুআ—আল্লাহ তাদের মঙ্গল করুন। আমীন।
আব্দুল্লাহ আল মাসউদ
প্রধান সম্পাদক, মাকতাবাতুল আসলাফ
৫ রমজান, ১৪৪০ হিজরী
abdullahmasud887@gmail.com
টিকাঃ
১. সূরা হিজর: ৫৬
২. সূরা আল-ইমরান: ১৮৫
৩. সূরা আনকাবূত: ২৯
৪. আস-সুন্নাহ, ইবনু মাজাহ: ৪১২৪; আস-সুন্নাহ, তিবরানী: ৩৩৬৮। এর সনদে কিছুটা দুর্বলতা আছে। তবে ইব তিব-এর অন্যান্য হাদিসের সমর্থন থাকায় এটি একটি প্রাথমিক দৃষ্টান্ত হলো।
১. সূরা আশ-শুয়ারা, ২২২-২২৭
২. তাফসীর ইবনু কাসীর: ৩/৬৭৫; তাফসীর তাবারী: ১৯/৭৯
১. আল-সুনান, বুখারী: ৪৬২
২. আল-সুনান, বুখারী: ৬১৫৩
১. আল-সুনান, বুখারী: ৫১৪৫
১. আল-সুনান, বুখারী: ৬১৪৪
১২. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১৩৭
১৩. আল-মুহলী, ইবনু হাযম: ১০/১৫৫
১৪. মুকাদ্দামাতু শাদী: ১/১০৯
📄 গুরাবাদের জন্য সুসংবাদ
[১] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
إِنَّ الْإِسْلَامَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ
“নিশ্চয় ইসলাম নিংসঙ্গ ও অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল, আবার অচিরেই তা নিংসঙ্গ ও অপরিচিত হয়ে যাবে। সুতরাং গুরবাদের (তথা নিংসঙ্গ ও অপরিচিতদের) জন্য সুসংবাদ!”
জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আল্লাহ্র রাসূল, গুরবা কারা?' উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
اَلَّذِينَ يَصْلُحُونَ إِذَا فَسَدَ النَّاسُ
“গুরবা হলো এ সমস্ত লোক, মানুষেরা গোমরাহ হলে যারা তাদের সংশোধন করবে।”
📄 নিঃসঙ্গদের জন্য সুসংবাদ
[২] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
إِنَّ الْإِسْلَامَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ
“নিশ্চয় ইসলাম নিংসঙ্গ ও অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল, আবার অচিরেই তা নিংসঙ্গ ও অপরিচিত হয়ে যাবে। সুতরাং গুরবাদের (তথা নিংসঙ্গ ও অপরিচিতদের) জন্য সুসংবাদ!”
জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আল্লাহ্র রাসূল, গুরবা কারা?' উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
اَلنِّزَاعُ مِنَ الْقَبَائِلِ
"গুরবা হলো তারা, যারা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে কোথাও চলে গেছে।"