📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 দুনিয়ার ব্যাপারে নবীজির দৃষ্টিভঙ্গি

📄 দুনিয়ার ব্যাপারে নবীজির দৃষ্টিভঙ্গি


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশ্রামাগারে উপস্থিত হলাম। দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খেজুরের চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আরাম করছেন। চাটাইয়ের দাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মোবারকের ওপর রেখাপাত করেছিল। এই দৃশ্য দেখে আমার চোখে অশ্রু নেমে এলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবদুল্লাহ, কাঁদছ কেন?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই (দুনিয়ার বাদশাহ) কিসরা ও কায়সার তো রেশমের নরম গালিচায় শুয়ে থাকে। আর আপনি (উভয় জগতের বাদশাহ হওয়া সত্ত্বেও) খেজুরের চাটাইয়ের ওপর বিশ্রাম নিচ্ছেন!' আমার একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
‘আবদুল্লাহ, কেঁদো না। কারণ তাদের জন্য দুনিয়াই সবকিছু। আর আমাদের জন্য আখেরাত (-এর নেয়ামত রয়েছে)। দুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী বা কীসের? আমার আর দুনিয়ার দৃষ্টান্ত ঐ মুসাফিরের মতো, যে (বিশ্রামের জন্য) কোনো গাছের নিচে অবতরণ করে। কিছুক্ষণ পর সে স্থান ছেড়ে পুনরায় চলতে শুরু করে।’ ১৩২ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের হেদায়েত ও শিক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় দারিদ্র্যের পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং নিজের আদর্শের মাধ্যমে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।

টিকাঃ
১৩২. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৪/৮৬।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 সুস্থতা ও সময়ের অবমূল্যায়ন

📄 সুস্থতা ও সময়ের অবমূল্যায়ন


মানুষ সাধারণত আল্লাহ তায়ালার মহান দুটি নেয়ামতের মূল্যায়ন করে না এবং এই নেয়ামত দুটির মাধ্যমে যতটা উপকৃত হওয়া দরকার, এর সাহায্যে আখেরাতের যে পরিমাণ সফলতা অর্জন করা দরকার, এক্ষেত্রে যারপরনাই অবহেলা প্রদর্শন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
‘নি’মাতানি মাগবুনুন ফীহিমা কাথীরুম মিনান নাস : আস-সিহহাতু ওয়াল ফারাগ’
অর্থাৎ দুটি নেয়ামতের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় : ১. সুস্থতা, ২. অবসর সময়। ১৩৩

বিখ্যাত হাদিসবিশারদ ইবনে বাত্তাল রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, 'সুস্থতা ও অবসরের প্রতিটি মুহূর্ত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। এ নেয়ামত দুটির যথার্থ মূল্যায়ন হলো, এ দুই সময়ে : ১. আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, ২. হারাম বিষয়াদি থেকে দূরে থাকা। যদি এতে কোনো রকম অবহেলা হয়, তাহলে ঐ ব্যক্তি আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, 'মানুষ কখনো সুস্থ থাকে কিন্তু তার হাতে সময়-সুযোগ থাকে না। আবার কখনো সময়-সুযোগ থাকে, কিন্তু সুস্থতা থাকে না। যখন এই দুটি নেয়ামত একত্রে পাওয়া যায়, তখন মানুষ অলস হয়ে যায়। যে ব্যক্তি অবহেলা ও অলসতা ত্যাগ করে এই দুই নেয়ামতকে ইবাদতের কাজে লাগাবে, সে উপকৃত হবে। আর যে ব্যক্তি অলসতাবশত এই সময়কে নষ্ট করবে, তার ক্ষতির কোনো সীমা থাকবে না।' ১৩৪

টিকাঃ
১৩৩. বুখারী, হাদীস নং-৬৪১২।
১৩৪. ফাতহুল বারী, ৪/২৯৬-২৭৭।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 সর্বদা প্রস্তুত থাকুন

📄 সর্বদা প্রস্তুত থাকুন


বিবেক-বুদ্ধির দাবি হলো, সর্বদা আখেরাতের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং আজকের কাজ কালকের জন্য না রাখা। বরং জীবনে যত বেশি পুণ্য অর্জন করা সম্ভব, সুস্থ ও অবসর সময়ে তা অর্জন করা উচিত। কারণ এমন সুযোগ পুনরায় আসবে কি না বলা কঠিন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলতেন, 'সন্ধ্যায় থাকাকালে সকালের অপেক্ষা কোরো না, আর সকালে থাকাকালে সন্ধ্যার অপেক্ষা কোরো না। সুস্থ থাকাকালে অসুস্থ অবস্থার কাজ করে রাখো এবং জীবদ্দশায় মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের পুঁজি সঞ্চয় করো।' ১৩৫

হযরত ইবনে উমর রা.-এর উল্লেখিত বক্তব্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদিস থেকে সংগৃহীত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সাহাবীকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন :
‘ইগদানিম খামসান ক্বাবলা খামসিন : শাবাবাকা ক্বাবলা হারামিকা, ওয়া সিহহাতাকা ক্বাবলা সাক্বামিকা, ওয়া গিনাকা ক্বাবলা ফাক্বরিকা, ওয়া ফারাগাকা ক্বাবলা শুগলিকা, ওয়া হায়াতাকা ক্বাবলা মাওতিকা’
অর্থাৎ পাঁচটি বস্তুর পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে গণিমত মনে করবে : ১. যৌবনকে বার্ধক্যের পূর্বে, ২. সুস্থতাকে অসুস্থতার পূর্বে, ৩. স্বচ্ছলতাকে অস্বচ্ছলতার পূর্বে, ৪. অবসরকে ব্যস্ততার পূর্বে, ৫. জীবনকে মৃত্যুর পূর্বে। ১৩৬

আলোচ্য হাদিসে ঐ পাঁচটি বস্তুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোতে মত্ত হয়ে মানুষ আখেরাতকে ভুলে যায়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এসব বস্তু খুবই ক্ষণস্থায়ী। মানুষ সাধারণত যৌবনকে আমোদ-প্রমোদ ও বিনোদনে কাটিয়ে দেয়। অথচ যৌবন এত মূল্যবান সময় যে, এসময় ইবাদতের মূল্য বৃদ্ধ বয়সের ইবাদতের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এক হাদিসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা ইবাদতগোজার ও মুত্তাকী যুবককে সম্বোধন করে বলছেন, ‘আমার কাছে তোমার মর্যাদা কতিপয় ফেরেশতার মতো।’ ১৩৭

টিকাঃ
১৩৫. বুখারী, ৬/২৯৬।
১৩৬. ফাতহুল বারী, ১১/২৪১।
১৩৭. কিতাবুয যুহদ, ১/৯৭।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 জান্নাতের পথ

📄 জান্নাতের পথ


হযরত হাসান বসরী রা. হতে বর্ণিত আছে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, তোমরা সবাই কি জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও। সাহাবায়েকেরাম বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, জি হ্যাঁ। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
তাহলে নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দাও। মৃত্যুকে সর্বদা চোখের সামনে মনে করবে এবং আল্লাহকে যথাযথ লজ্জায় লজ্জা করবে। সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা তো তাঁকে অবশ্যই লজ্জা করি। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন :
তা নয়। আল্লাহকে যথাযথ লজ্জা করার অর্থ হলো, তুমি মাথা ও তাতে যা সংরক্ষিত আছে, তা রক্ষা করবে; পেট ও তাতে যা জমা আছে, তা হেফাযত করবে; মৃত্যু ও হাড় পচনের কথা স্মরণ রাখবে; যে ব্যক্তি আখেরাতের আশা রাখে, সে দুনিয়ার আড়ম্বর পরিত্যাগ করে। যে ব্যক্তি এই কাজগুলো করল, সে যথাযথ লজ্জা করল। ১৩৮

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই মহামূল্যবান নির্দেশনা সবার চোখের সামনে থাকা উচিত এবং পর্যায়ক্রমে আমাদের গভীরতম প্রদেশে গেঁথে নেওয়া উচিত এবং আমাদের এমন আমল করার তাওফিক দান করুন, যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় ও নেকট্যশীল হওয়া যায়।

টিকাঃ
১৩৮. কিতাবুয যুহদ, ১/৩৭; তিরমিযী, ২/৭৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px