📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 অল্পেতুষ্টি স্থায়ী সম্পদ

📄 অল্পেতুষ্টি স্থায়ী সম্পদ


অধিক অর্থের পেছনে না ছুটে আল্লাহর দানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকাকে ‘কানাআত’ বা ‘অল্পেতুষ্টি’ বলা হয়। অল্পেতুষ্ট ব্যক্তি সর্বদা আনন্দিত থাকে, সে কখনও অভাব অনুভব করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
‘ক্বাদ আফলাহা মান আসলামা, ওয়া রুযিক্কা কাফাফান, ওয়া ক্বান্নাহুল্লাহু বিমা আতাহু’
(যে ব্যক্তি তিনটি গুণের অধিকারী হলো) সে সফল হলো : ১. যে ইসলামের ছায়াতলে এলো, ২. যে যথেষ্ট পরিমাণ রিযিকপ্রাপ্ত হলো, ৩. আল্লাহ তায়ালা যাকে নিজের দেওয়া রিযিকের ওপর তুষ্ট করে রাখল। ৯৯৫

আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
‘আলাইকুম বিল ক্বানাআতি ফাইন্নাল ক্বানাআতা মালুন লা ইয়ানফাদ’
তোমরা অল্পেতুষ্টির গুণ অর্জন করো। কারণ অল্পেতুষ্টি এমন সম্পদ যা কখনও ধ্বংস হয় না। ৯৯৬

মানুষ নিজের সন্তানসন্ততির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। এজন্য জীবদ্দশায় তাদের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ বিষয়ে চিন্তা করতেন। তবুও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উত্তরাধিকারীদের জন্য দোয়া করেছেন : ‘আল্লাহুম্মাজ’আল রিযক্বা আ-লি মুহাম্মাদিন কুতান’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, মুহাম্মাদের বংশধরদের প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক দান করুন। ৯৯৭ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এও ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন ধনী-গরিব সবাই আক্ষেপ করবে, হায়, যদি দুনিয়ায় তাদের রিযিক প্রয়োজন পরিমাণ হতো। ৯৯৮ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন : আল্লাহ তায়ালা নিজ দানকৃত সম্পদের মাধ্যমে বান্দাকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্ট হয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে বরকত দান এবং তাকে প্রশস্ত জিন্দেগী দান করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর বণ্টনের প্রতি সন্তুষ্ট হয় না, আল্লাহ তায়ালা তাকে বরকত দান করেন না। ৯৯৯

একবার হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন :
‘হে মুহাম্মদ, যতদিন ইচ্ছা জীবন যাপন করুন। (তবে) একদিন আপনাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর যা ইচ্ছা আমল করুন, প্রত্যেক আমলের প্রতিদান আপনাকে দেওয়া হবে। যাকে খুশি ভালোবাসুন, একদিন তার সঙ্গ ত্যাগ করতেই হবে। মনে রাখবেন, মুমিনের জন্য মর্যাদার বিষয় হলো, গভীর রজনীতে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়া এবং মানুষ হতে অমুখাপেক্ষিতা প্রকৃত সম্মান বয়ে আনে।’ ১৩০

টিকাঃ
৯৯৫. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৭/২৪০।
৯৯৬. মাজমাউজ যাওয়াইদ, ১০/২৫৬।
৯৯৭. মুসলিম, ২/৪০৬; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৭/২৪১।
৯৯৮. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৪/৪৬১।
৯৯৯. মাজমাউজ যাওয়াইদ, ১০/২৬৭।
১৩০. তাবারানী; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৩৯।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো বসবাস করুন

📄 দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো বসবাস করুন


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গায়ে হাত রেখে বলেন : ‘কুন ফিদ দুনিয়া কাআন্নাকা গারিবুন’ অর্থাৎ দুনিয়ায় এমনভাবে অবস্থান করো, যেন তুমি একজন মুসাফির। ১৩১ অর্থাৎ যেভাবে মুসাফির রাস্তায় বিশ্রামাগারে মন বাঁধে না, বরং নিজের গন্তব্যে পৌঁছার জন্য এবং সেখানে শান্তিতে থাকার জন্য সর্বদা চিন্তাফিকির করতে থাকে, অনুরূপ মুমিন বান্দার নিজেকে সর্বদা আখেরাতের মুসাফির মনে করা উচিত। এটি এমন এক উপদেশ, যা সকল সদুপদেশের সমন্বিত রূপ এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন এই নির্দেশনার বাস্তব ব্যাখ্যাস্বরূপ।

টিকাঃ
১৩১. বুখারী, ২/৮১০।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 দুনিয়ার ব্যাপারে নবীজির দৃষ্টিভঙ্গি

📄 দুনিয়ার ব্যাপারে নবীজির দৃষ্টিভঙ্গি


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশ্রামাগারে উপস্থিত হলাম। দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খেজুরের চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আরাম করছেন। চাটাইয়ের দাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মোবারকের ওপর রেখাপাত করেছিল। এই দৃশ্য দেখে আমার চোখে অশ্রু নেমে এলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবদুল্লাহ, কাঁদছ কেন?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই (দুনিয়ার বাদশাহ) কিসরা ও কায়সার তো রেশমের নরম গালিচায় শুয়ে থাকে। আর আপনি (উভয় জগতের বাদশাহ হওয়া সত্ত্বেও) খেজুরের চাটাইয়ের ওপর বিশ্রাম নিচ্ছেন!' আমার একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
‘আবদুল্লাহ, কেঁদো না। কারণ তাদের জন্য দুনিয়াই সবকিছু। আর আমাদের জন্য আখেরাত (-এর নেয়ামত রয়েছে)। দুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী বা কীসের? আমার আর দুনিয়ার দৃষ্টান্ত ঐ মুসাফিরের মতো, যে (বিশ্রামের জন্য) কোনো গাছের নিচে অবতরণ করে। কিছুক্ষণ পর সে স্থান ছেড়ে পুনরায় চলতে শুরু করে।’ ১৩২ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের হেদায়েত ও শিক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় দারিদ্র্যের পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং নিজের আদর্শের মাধ্যমে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।

টিকাঃ
১৩২. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৪/৮৬।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 সুস্থতা ও সময়ের অবমূল্যায়ন

📄 সুস্থতা ও সময়ের অবমূল্যায়ন


মানুষ সাধারণত আল্লাহ তায়ালার মহান দুটি নেয়ামতের মূল্যায়ন করে না এবং এই নেয়ামত দুটির মাধ্যমে যতটা উপকৃত হওয়া দরকার, এর সাহায্যে আখেরাতের যে পরিমাণ সফলতা অর্জন করা দরকার, এক্ষেত্রে যারপরনাই অবহেলা প্রদর্শন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
‘নি’মাতানি মাগবুনুন ফীহিমা কাথীরুম মিনান নাস : আস-সিহহাতু ওয়াল ফারাগ’
অর্থাৎ দুটি নেয়ামতের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় : ১. সুস্থতা, ২. অবসর সময়। ১৩৩

বিখ্যাত হাদিসবিশারদ ইবনে বাত্তাল রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, 'সুস্থতা ও অবসরের প্রতিটি মুহূর্ত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। এ নেয়ামত দুটির যথার্থ মূল্যায়ন হলো, এ দুই সময়ে : ১. আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, ২. হারাম বিষয়াদি থেকে দূরে থাকা। যদি এতে কোনো রকম অবহেলা হয়, তাহলে ঐ ব্যক্তি আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, 'মানুষ কখনো সুস্থ থাকে কিন্তু তার হাতে সময়-সুযোগ থাকে না। আবার কখনো সময়-সুযোগ থাকে, কিন্তু সুস্থতা থাকে না। যখন এই দুটি নেয়ামত একত্রে পাওয়া যায়, তখন মানুষ অলস হয়ে যায়। যে ব্যক্তি অবহেলা ও অলসতা ত্যাগ করে এই দুই নেয়ামতকে ইবাদতের কাজে লাগাবে, সে উপকৃত হবে। আর যে ব্যক্তি অলসতাবশত এই সময়কে নষ্ট করবে, তার ক্ষতির কোনো সীমা থাকবে না।' ১৩৪

টিকাঃ
১৩৩. বুখারী, হাদীস নং-৬৪১২।
১৩৪. ফাতহুল বারী, ৪/২৯৬-২৭৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px