📄 পার্থিব আড়ম্বরতা পরিত্যাগ করা
আমাদের আলোচ্য হাদিসে আসতাহইউ মিনাল্লাহ ‘আল্লাহকে লজ্জা করো’—এর শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারমর্মস্বরূপ একটি অর্থবহ বাক্য বলেছেন। বাক্যটি হলো, وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ تَرَكَ زِينَةَ الدُّنْيَا (যে ব্যক্তি আখিরাতের অভীক্ষা রাখে সে যেন দুনিয়ার আড়ম্বরতা পরিত্যাগ করে)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আখিরাতে পূর্ণাঙ্গ সফলতার আশাবাদী, তার উচিত দুনিয়ার সৌন্দর্য থেকে মনকে সরিয়ে আখিরাতের প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হওয়া। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন স্থানে পার্থিব জীবনের মূল্যহীনতা স্পষ্ট করেছেন। সূরা আনআমে বর্ণিত হয়েছে : ‘পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পরকালের আবাস পরহেযগারদের জন্য শ্রেষ্ঠতর। তোমরা কি বোঝো না?’ অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : ‘এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়। পরকালের গৃহই প্রকৃত জীবন; যদি তারা জানত।’ সূরা হাদীদে আরও সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত হয়েছে : ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীঁতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটো হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।’
টিকাঃ
৭৬৬. সূরা আনআম, আয়াত : ৩২।
৭৬৭. সূরা আনকাবূত, আয়াত : ৬৪।
৭৬৯. সূরা হাদীদ, আয়াত : ২০।
📄 পার্থিব জগতের রূপ-সৌন্দর্যের দৃষ্টান্ত
কুরআনে কারিমের কয়েক স্থানে দুনিয়ার অস্থায়ীত্বকে স্পষ্ট উদাহরণের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। এক জায়গায় এসেছে : ‘পার্থিব জীবনের উদাহরণ তেমনি, যেমন আমি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করলাম, পরে তা মিলিত-সন্মিশ্রিত হয়ে তা থেকে জমিনের শ্যামল উদ্ভিদ বেরিয়ে এলো যা মানুষ ও জীব-জন্তুরা খেয়ে থাকে। এমনকি জমিন যখন সৌন্দর্য-সুষমায় ভরে উঠল, আর জমিনের অধিবাসীরা ভাবতে লাগল, এগুলো আমাদের হাতে আসবে, হঠাৎ করে তার ওপর আমার নির্দেশ এলো রাত্রে কিংবা দিনে, তখন সেগুলোকে কেটে স্তূপাকার করে দিল যেন কালও এখানে কোনো আবাদ ছিল না।’
অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণের পর জমিন সবুজের সমারোহে ভরে ওঠে, কিন্তু এই শ্যামলিমা ক্ষণস্থায়ী বস্তু। যদি এর ওপর কোনো আসমানী বিপদ নেমে আসে, তা হলে জমিনের সৌন্দর্য মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়। সূরা কাহাফে বর্ণিত হয়েছে : ‘তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। তা পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাযিল করি। অতঃপর এর সংমিশ্রণে শ্যামল-সবুজ ভূমিজ লতাপাতা নির্গত হয়; অতঃপর তা এমন শুষ্ক চূর্ণবিচূর্ণ হয় যে, বাতাসে উড়ে যায়। আল্লাহ এ সবকিছুর ওপর শক্তিমান। ধনৈশ্বর্য ও সন্তানসন্তুতি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদানপ্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্য উত্তম।’
দুনিয়ার সব খেত-খামারের পরিণাম এটাই যে, ফসল পাকার পর তা কেটে ফেলা হয়। অতঃপর সেই ফসলের খড়কুটো বাতাসে উড়তে থাকে। দুনিয়া ও দুনিয়ার সহায়-সম্পদ ও ধনভাণ্ডারও একই রকম অস্থায়ী হবে।
টিকাঃ
৭৭০. সূরা হাদীদ, আয়াত : ২০।
৭১. সূরা ইউনুস, আয়াত : ২৪।
৭৭২. সূরা কাহাফ, আয়াত : ৪৫-৪৬।
📄 আল্লাহর দৃষ্টিতে দুনিয়ার মর্যাদা
গোটা দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল নেয়ামত আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে সত্যিকার অর্থে তুচ্ছ ও মূল্যহীন। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা কাফের-মুশরিকদের দুনিয়ার সকল নেয়ামত ভোগ করার সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : ‘গোটা দুনিয়া যদি মহান আল্লাহর নিকট একটা ক্ষুদ্র মাছির ডানার সমান মূল্যবান হতো, তা হলে তিনি কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানি পান করাতেন না।’
হযরত মুসতাওরিদ ইবনে শাদ্দাদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সংখ্যক সাহাবীকে নিয়ে পড়ে থাকা মরা একটি বকরির বাচ্চার পাশে এসে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, তোমরা কি মনে করো, এই মরা বাচ্চাটি তার মালিকের নিকট নিকৃষ্ট ও মূল্যহীন বলেই সেটিকে ফেলে দিয়েছে? সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এর নিকৃষ্টতা এবং মূল্যহীনতার কারণেই তারা এটিকে ফেলে দিয়েছে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন : ‘এটি তার মালিকের নিকট যেমন নিকৃষ্ট, আল্লাহর নিকট দুনিয়া এর চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট।’
আরেক হাদিসে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : ‘আল্লাহর যিকির এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সহায়ক অপরাপর আমল, আলেম এবং তালেবে ইলম ছাড়া দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই অভিশপ্ত।’
টিকাঃ
৭৭৩. তিরমিযী, ২/৪৮, হাদিস নং-২৩২০।
৭৭৪. তিরমিযী, ২/৪৮, হাদিস নং-২৩২৪।
৭৭৫. তিরমিযী, ২/৪৮, হাদিস নং-২৩২৪।
📄 কাফেরদের জাগতিক মান-মর্যাদা দেখে চিন্তিত হবেন না
সাধারণত কাফেরদের জাগতিক শান-শওকত, ধনসম্পদ ও বাহ্যিক আড়ম্বরতা দেখে মানুষের মাঝে লোভ-লালসা জন্ম নেয়, অথবা তারা সংকীর্ণমনা হয়ে পড়ে। ফলে তারা তাদের মতো ঐশ্বর্য অর্জনে মত্ত হয়ে হালাল-হারামের পার্থক্য ভুলে যায়। তাদের সতর্ক করে দিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন : ‘নগরীতে কাফেরদের চাল-চলন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয়। এটা হলো সামান্য ফায়দা — এরপর তাদের ঠিকানা হবে দোযখ। আর সেটা হলো অতি নিকৃষ্ট অবস্থান।’
টিকাঃ
৭৭৬. তিরমিযী, ২/৫১।
৭৭৭. সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫-১৮৭।