📄 আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক বিশেষভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা
এরপর দয়াময় আল্লাহ তায়ালা রাসূল আল আমীনকে ইরশাদ করবেন, ثُمَّ شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَالنَّبِيُّونَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ অর্থাৎ ফেরেশতা, নবী ও ঈমানদার সবাই সুপারিশ করেছে। আমি দয়াময় ছাড়া আর কেউ বাকি নেই।
এরপর আল্লাহ তায়ালা এক মুষ্টি ভরে এমন লোকদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন, যাদের কাছে সুপ্ত ঈমান ব্যতীত বাহ্যিক কোনো আমল ছিল না। জান্নাতের দরজার পাশে অবস্থিত ‘নহরে হায়াত’-এ তাদের গোসল করানো হবে। এতে তারা সবাই সতেজ-সজীব হয়ে বের হয়ে যাবে। তাদের গর্দানে বিশেষ প্রকার নিদর্শন ঝুলিয়ে দেওয়া হবে, যা দেখে জান্নাতবাসীরা তাদের চিনবে যে, তারা আল্লাহর আযাদকৃত জান্নাতী। এসকল লোক সুপ্ত ঈমানের অসিলায় কোনো বাহ্যিক আমল ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাদের বলবেন, ‘যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। চোখের দৃষ্টি যতদূর যাবে, তা তোমাদের!’ তারা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এত বেশি মূল্যায়ন করেছেন, হয়তো সৃষ্টজগতের আর কেউ মূল্যায়ন করেনি!’ আল্লাহ বলবেন, ‘আমার কাছে তোমাদের জন্য এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ নেয়ামত আছে!’ তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কী সেই নেয়ামত? তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের এই সুসংবাদ শোনাবেন, رِضَائِي فَلَا أَسْخَطُ عَلَيْكُمْ بَعْدَهُ أَبَدًا অর্থাৎ আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এরপর তোমাদের প্রতি কখনো অসন্তুষ্ট হব না।
টিকাঃ
৯৬৪. মুসলিম, ১/১০১।
📄 জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ ব্যক্তি
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তার অবস্থা এ রকম হবে, বদ আমলের কারণে প্রথমে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। কারণ মুমিন বান্দাও বদ আমল করলে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে। জাহান্নামে দগ্ধ হওয়া অবস্থায় সে আল্লাহর কাছে আরজ করবে, ‘হে আল্লাহ, জাহান্নামের অগ্নিযন্ত্রণা ও তার উত্তাপ আমাকে পুড়িয়ে ফেলেছে। আমার প্রতি বড় দয়া হবে, যদি আমাকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও জাহান্নাম থেকে উঠিয়ে পাহাড়ে বসিয়ে দেন, যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও আগুন থেকে বাঁচতে পারি।’ আল্লাহ তায়ালা তাকে বলবেন, ‘এরপর আর কিছু দাবি করবে না তো?’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমি ওয়াদা দিচ্ছি, এরপর আমি আর কিছু দাবি করব না।’ আল্লাহ বলবেন, ‘ঠিক আছে, তোমার কথাই মেনে নিচ্ছি।’
তারপর এই ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে পাহাড়ে বসিয়ে দেওয়া হবে। জাহান্নামের পাড়ে ঠাঁই নেওয়ার পর তার হৃদয়ে আরও কিছু পাওয়ার আশা ঝিলিক দিয়ে উঠবে। সে পুনরায় ফরিয়াদ করবে, ‘হে আল্লাহ, জাহান্নামের অগ্নিগর্ভ থেকে তো মুক্তি দিয়েছেন আপনিই। কিন্তু বসিয়েছেন এমন স্থানে সেখানে জাহান্নামের অগ্নিজিহ্বা যথারীতি আমাকে দহন করছে। যদি আমাকে সামান্য সময়ের জন্য এমন স্থানে জায়গা দিতেন, যেখানে জাহান্নামের উত্তাপ আমাকে স্পর্শ করবে না!’ আল্লাহ তায়ালা এবারও তার ফরিয়াদ কবুল করবেন এবং তাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবেন, যেখান থেকে সে জান্নাতের হৃদয়কাড়া দৃশ্যাবলি দেখতে পাবে।
কিছুক্ষণ পর সে পুনরায় ফরিয়াদ করবে, ‘হে আল্লাহ, সবই আপনার করুণা। আমাকে জাহান্নামের অগ্নিশিখা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এমন স্থানে বসতে দিয়েছেন, যেখান থেকে জান্নাতের নয়নাভিরাম দৃশ্য পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। আমাকে আরেকটু সুযোগ দিন, যেন জান্নাতের দরজার কাছে যেতে পারি এবং জান্নাত একটু দেখে নিতে পারি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘বান্দা, তুমি কি আবারও অঙ্গীকার ভঙ্গ করছ?’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আপনি যখন একান্ত দয়া করে এ পর্যন্ত এনে দিয়েছেন, তখন জান্নাতও এক নজর দেখতে দিন।’ আল্লাহ বলবেন, ‘এক নজর দেখতে দিলে তো তুমি বলবে, আমাকে একটু ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিন।’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমাকে শুধু এক নজর দেখতে দিন। এরপর আর কিছুই বলব না।’ তারপর মহান আল্লাহ তাকে জান্নাত এক নজর দেখার সুযোগ দেবেন; কিন্তু আল্লাহর জান্নাত এক ঝলক দেখার সাথে সাথেই সে ফরিয়াদ করে উঠবে, ‘হে আল্লাহ, ইয়া আরহামার রাহিমিন, আপনি যখন এত দয়া করেছেন, মেহেরবানী করে এর ভেতরেও প্রবেশ করিয়ে দিন।’ তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘দেখো বান্দা, প্রথমেই বলেছিলাম, তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে। কিন্তু আমার অনুগ্রহে যখন এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছ, তখন তোমাকে আর নিরাশ করব না। ভেতরে প্রবেশ করো। আর সেখানেও তোমাকে গোটা পৃথিবীর দ্বিগুণ এলাকা দান করব।’ বান্দা বলবে, ‘ওগো আল্লাহ, ওগো আরহামার রাহিমিন, আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? এও কি সম্ভব? আমার মতো নগণ্য গোলাম এও বিশাল জান্নাতের অধিকারী হবে কেমন করে?’ আল্লাহ বলবেন, ‘আমি কারও সাথে ঠাট্টা করি না। সত্যিই আমি তোমাকে এমন জান্নাত দান করলাম।’
টিকাঃ
৭Constants. মুসলিম, ১/১০৬।
📄 যখন মৃত্যুরও মৃত্যু ঘটবে
সর্বশেষে যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং সকল জাহান্নামী জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং যাদের ভাগ্যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লিখিত আছে, তারা সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি প্রাচীরের ওপর মৃত্যুকে ভেড়ার আকৃতিতে দাঁড় করানো হবে। সকল জান্নাতী ও জাহান্নামীদের একত্র করে জিজ্ঞেস করা হবে, ‘বলতে পারো, এই ভেড়াটি কে?’ সবাই উত্তর দেবে, ‘এ হলো মৃত্যু।’ এরপর সবার সামনে ভেড়াটিকে যবাই করা হবে এবং এই ঘোষণা করা হবে, يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ خُلُودٌ فَلَا مَوْتَ، وَيَا أَهْلَ النَّارِ خُلُودٌ فَلَا مَوْتَ (হে জান্নাতবাসী, আজ থেকে চিরন্তন জীবন-যাপন করবে, আর কখনও মৃত্যু আসবে না। হে জাহান্নামবাসী, তোমরা জাহান্নামে সর্বদা থাকবে, তোমাদের কখনও মৃত্যু ঘটবে না।)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এক হাদিসে ইরশাদ করেন, সেদিন জান্নাতীরা এত বেশি আনন্দিত হবে যে, যদি আনন্দের আতিশয্যে কারও মৃত্যু ঘটা সম্ভব হতো, তা হলে সকল জান্নাতী মৃত্যুবরণ করত। পক্ষান্তরে জাহান্নামীরা এত বেশি পেরেশানিতে পড়বে যে, যদি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানিতে মৃত্যু ঘটা সম্ভব হতো, তা হলে সকল জাহান্নামী মৃত্যুবরণ করত।
টিকাঃ
৭৬৩. বুখারী, ২/৬১১।
৭৬৭. তিরমিযী, ২/১৪৮; আত্ব-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৪/৩১৭।