📄 জাহান্নাম থেকে মুমিনদের পরিত্রাণ
জাহান্নামের মুমিনগণ নিজেদের গুনাহের শাস্তিস্বরূপ একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর রহমতের দরজা তাদের জন্য খুলে দেবেন। গুনাহগার মুমিনদের জাহান্নাম থেকে মুক্তিদান শুরু হবে। সর্বপ্রথম আমাদের প্রিয়নবী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন। এক যুগ পর্যন্ত সিজদায় অবস্থান করে আল্লাহর প্রশংসা গাইতে থাকবেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করবেন, ‘হে মুহাম্মাদ, মাথা তুলুন। বলুন, আপনার কথা শোনা হবে। সুপারিশ করুন, সুপারিশ মঞ্জুর করা হবে।’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উম্মতের গুনাহগারদের জন্য সুপারিশ করতে গিয়ে বলবেন, يَا رَبِّ أُمَّتِي أُمَّتِي (হে আল্লাহ, আমার উম্মত আমার উম্মত!!)
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করবেন, ‘যে ব্যক্তির অন্তরে গম পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করুন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অনুমতি পেয়ে এধরনের মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন। এরপর আবার আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হবেন এবং অনুমতি হলে আবার সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘যান, যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করুন।’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন লোকদেরও জাহান্নাম থেকে বের করবেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করলে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করবেন, ‘যান, যার অন্তরে সরিষার দানার তিন ভাগের এক ভাগ ঈমান আছে, তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করুন।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্তরের ঈমানদারদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন। এরপর আল্লাহ্র দরবারে আরজ করবেন, ‘হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আমাকে এমন লোকদেরও বের করার অনুমতি দিন যে একবার হলেও لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ প’ড়েছে।’ একথা শুনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করবেন, ‘এই বিষয়ে আপনাকে অনুমতি প্রদান করা হবে না। তবে আমার ইজ্জত, বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কসম, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলেছে, আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করব।’
এক রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক নবীকে পৃথিবীতে একটি দোয়া করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে, যা অবশ্যই কবুল হবে। সকল নবী দুনিয়াতেই সেই দোয়া করে ফেলেছেন। কিন্তু আমি আখিরাতে নিজের উম্মতের সুপারিশের জন্য তা সংরক্ষণ করে রেখেছি।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করার সময় লক্ষ করলেন, হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নিজ উম্মতের ব্যাপারে বলেছেন, ‘হে পালনকর্তা, এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে। অতএব যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার এবং যে কেউ আমার অবাধ্যতা করলে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম নিজ কওমের ব্যাপারে এভাবে আরজি পেশ করেছেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী।’
উপর্যুক্ত আয়াত পড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের উম্মতের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি কেঁদে ফেলেন এবং اُمَّتِي اُمَّتِي ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মত! আমার উম্মত!’ বলে আল্লাহর দরবারে হাত উত্তোলন করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দিলেন, ‘যাও, আমার হাবিবকে জিজ্ঞেস করো, কোন জিনিস আপনাকে কাঁদিয়েছে?’ হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলেন। তিনি পুরো ঘটনা বর্ণনা করলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য সান্ত্বনাদায়ী প্রেরণ করেন, ‘আমি আপনাকে আপনার সকল উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব, আপনাকে কষ্টে ফেলব না।’
টিকাঃ
৮০৯. মুসলিম, ১/১১০।
৮১০. মুসলিম, ১/১১০।
৮১১. সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৬।
৮১২. সূরা মায়েদা, আয়াত: ১১৮।
৮০৩. মুসলিম, ১/১১০।
📄 জান্নাতবাসী কর্তৃক নিজেদের গুনাহগার ভাইয়ের জন্য সুপারিশ
জান্নাতবাসীরা নিজেদের গুনাহগার ভাইদের জন্য আল্লাহর দরবারে নাছোড় বান্দা হয়ে সুপারিশ করে বলবে, ‘কিছু লোক দুনিয়ায় আমাদের সঙ্গে নামায পড়ত, রোযা রাখত, হজ্ব করত, তাদের তো জান্নাতে দেখছি না। হে দয়াময় প্রভু, তাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।’ তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের সুপারিশ কবুল করবেন এবং নির্দেশ দেবেন, ‘যাদের তোমরা চেনো, তাদের জাহান্নাম থেকে বের করো।’ এরপর জান্নাতীরা জাহান্নামে গিয়ে নিজেদের পরিচিতজনদের বের করে আনবে। সে-সময় আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামীদের চেহারা সুরক্ষিত রাখবেন। ফলে তারা তাদের সহজেই চিনতে পারবে। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলবেন, ‘যাও, যার কাছে এক দিনার পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে বের করো।’ তারা সেসব লোককেও বের করবে। এরপর আল্লাহ তায়ালা অর্ধ দিনার থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানদারদেরও বের করার অনুমতি প্রদান করবেন। এভাবে সকল গুনাহগার মুমিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
📄 আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক বিশেষভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা
এরপর দয়াময় আল্লাহ তায়ালা রাসূল আল আমীনকে ইরশাদ করবেন, ثُمَّ شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَالنَّبِيُّونَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ অর্থাৎ ফেরেশতা, নবী ও ঈমানদার সবাই সুপারিশ করেছে। আমি দয়াময় ছাড়া আর কেউ বাকি নেই।
এরপর আল্লাহ তায়ালা এক মুষ্টি ভরে এমন লোকদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন, যাদের কাছে সুপ্ত ঈমান ব্যতীত বাহ্যিক কোনো আমল ছিল না। জান্নাতের দরজার পাশে অবস্থিত ‘নহরে হায়াত’-এ তাদের গোসল করানো হবে। এতে তারা সবাই সতেজ-সজীব হয়ে বের হয়ে যাবে। তাদের গর্দানে বিশেষ প্রকার নিদর্শন ঝুলিয়ে দেওয়া হবে, যা দেখে জান্নাতবাসীরা তাদের চিনবে যে, তারা আল্লাহর আযাদকৃত জান্নাতী। এসকল লোক সুপ্ত ঈমানের অসিলায় কোনো বাহ্যিক আমল ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাদের বলবেন, ‘যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। চোখের দৃষ্টি যতদূর যাবে, তা তোমাদের!’ তারা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এত বেশি মূল্যায়ন করেছেন, হয়তো সৃষ্টজগতের আর কেউ মূল্যায়ন করেনি!’ আল্লাহ বলবেন, ‘আমার কাছে তোমাদের জন্য এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ নেয়ামত আছে!’ তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কী সেই নেয়ামত? তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের এই সুসংবাদ শোনাবেন, رِضَائِي فَلَا أَسْخَطُ عَلَيْكُمْ بَعْدَهُ أَبَدًا অর্থাৎ আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এরপর তোমাদের প্রতি কখনো অসন্তুষ্ট হব না।
টিকাঃ
৯৬৪. মুসলিম, ১/১০১।
📄 জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ ব্যক্তি
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তার অবস্থা এ রকম হবে, বদ আমলের কারণে প্রথমে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। কারণ মুমিন বান্দাও বদ আমল করলে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে। জাহান্নামে দগ্ধ হওয়া অবস্থায় সে আল্লাহর কাছে আরজ করবে, ‘হে আল্লাহ, জাহান্নামের অগ্নিযন্ত্রণা ও তার উত্তাপ আমাকে পুড়িয়ে ফেলেছে। আমার প্রতি বড় দয়া হবে, যদি আমাকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও জাহান্নাম থেকে উঠিয়ে পাহাড়ে বসিয়ে দেন, যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও আগুন থেকে বাঁচতে পারি।’ আল্লাহ তায়ালা তাকে বলবেন, ‘এরপর আর কিছু দাবি করবে না তো?’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমি ওয়াদা দিচ্ছি, এরপর আমি আর কিছু দাবি করব না।’ আল্লাহ বলবেন, ‘ঠিক আছে, তোমার কথাই মেনে নিচ্ছি।’
তারপর এই ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে পাহাড়ে বসিয়ে দেওয়া হবে। জাহান্নামের পাড়ে ঠাঁই নেওয়ার পর তার হৃদয়ে আরও কিছু পাওয়ার আশা ঝিলিক দিয়ে উঠবে। সে পুনরায় ফরিয়াদ করবে, ‘হে আল্লাহ, জাহান্নামের অগ্নিগর্ভ থেকে তো মুক্তি দিয়েছেন আপনিই। কিন্তু বসিয়েছেন এমন স্থানে সেখানে জাহান্নামের অগ্নিজিহ্বা যথারীতি আমাকে দহন করছে। যদি আমাকে সামান্য সময়ের জন্য এমন স্থানে জায়গা দিতেন, যেখানে জাহান্নামের উত্তাপ আমাকে স্পর্শ করবে না!’ আল্লাহ তায়ালা এবারও তার ফরিয়াদ কবুল করবেন এবং তাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবেন, যেখান থেকে সে জান্নাতের হৃদয়কাড়া দৃশ্যাবলি দেখতে পাবে।
কিছুক্ষণ পর সে পুনরায় ফরিয়াদ করবে, ‘হে আল্লাহ, সবই আপনার করুণা। আমাকে জাহান্নামের অগ্নিশিখা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এমন স্থানে বসতে দিয়েছেন, যেখান থেকে জান্নাতের নয়নাভিরাম দৃশ্য পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। আমাকে আরেকটু সুযোগ দিন, যেন জান্নাতের দরজার কাছে যেতে পারি এবং জান্নাত একটু দেখে নিতে পারি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘বান্দা, তুমি কি আবারও অঙ্গীকার ভঙ্গ করছ?’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আপনি যখন একান্ত দয়া করে এ পর্যন্ত এনে দিয়েছেন, তখন জান্নাতও এক নজর দেখতে দিন।’ আল্লাহ বলবেন, ‘এক নজর দেখতে দিলে তো তুমি বলবে, আমাকে একটু ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিন।’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমাকে শুধু এক নজর দেখতে দিন। এরপর আর কিছুই বলব না।’ তারপর মহান আল্লাহ তাকে জান্নাত এক নজর দেখার সুযোগ দেবেন; কিন্তু আল্লাহর জান্নাত এক ঝলক দেখার সাথে সাথেই সে ফরিয়াদ করে উঠবে, ‘হে আল্লাহ, ইয়া আরহামার রাহিমিন, আপনি যখন এত দয়া করেছেন, মেহেরবানী করে এর ভেতরেও প্রবেশ করিয়ে দিন।’ তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘দেখো বান্দা, প্রথমেই বলেছিলাম, তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে। কিন্তু আমার অনুগ্রহে যখন এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছ, তখন তোমাকে আর নিরাশ করব না। ভেতরে প্রবেশ করো। আর সেখানেও তোমাকে গোটা পৃথিবীর দ্বিগুণ এলাকা দান করব।’ বান্দা বলবে, ‘ওগো আল্লাহ, ওগো আরহামার রাহিমিন, আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? এও কি সম্ভব? আমার মতো নগণ্য গোলাম এও বিশাল জান্নাতের অধিকারী হবে কেমন করে?’ আল্লাহ বলবেন, ‘আমি কারও সাথে ঠাট্টা করি না। সত্যিই আমি তোমাকে এমন জান্নাত দান করলাম।’
টিকাঃ
৭Constants. মুসলিম, ১/১০৬।