📄 জান্নাতের পথে যাত্রা
নিরাপদে পুলসিরাত পার হওয়ার পর জান্নাতীরা জান্নাতের দিকে যেতে থাকবে। জান্নাতের দরজায় পৌঁছার পূর্বে তাদের সবাইকে একটি বিশেষ নদীর পুলের ওপর আটকে ফেলা হবে। তাদের মাঝে যদি অন্যের হক বিনষ্টকরণ, অথবা হিসাব-বিবাদ বা কপটতা থেকে থাকে, তাহলে জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে সেখানেই তাদের মাফ করে দিয়ে চিরতরে পূত-পবিত্র করে দেওয়া হবে। কুরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘ওয়া নাযা’না মা ফী সুদূরিহিম মিন গিল্লিন তাজরী মিন তাহতিহিমুল আনহার’ অর্থাৎ তাদের অন্তরে যা কিছু দুঃখ ছিল, আমি তা দূর করে দেব। তাদের তলদেশ দিয়ে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে।
রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিস্তারিত বিবরণ এভাবে তুলে ধরেছেন : মুমিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের একটি পুলের ওপর আটকানো হবে, যা জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে থাকবে। দুনিয়ায় থাকতে তারা একে অপরের ওপর যে জুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তারা যখন পাক সাফ হয়ে যাবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। শপথ সেই মহান সত্তার, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! প্রত্যেক ব্যক্তি তার দুনিয়ার ঘরের তুলনায় আখেরাতের বাসস্থানকে অধিক চিনবে।
টিকাঃ
৮৯৯. সুরা আরাফ, আয়াত : ৪৩।
৭০০. বুখারী, ২/৯৮৭, হাদিস নং-৬৯৬১।
📄 জান্নাতের দরজা খোলার জন্য নবীজির সুপারিশ
জান্নাতীরা জান্নাতের কাছে গিয়ে দেখবে দরজা বন্ধ। তারা জান্নাতে প্রবেশের জন্য পাগলপারা হয়ে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের কাছে সুপারিশের আবেদন করবে। সর্বশেষ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় পড়ে কাঁদতে থাকবেন এবং নিজের উম্মতের জান্নাতে প্রবেশের সুপারিশ করতে থাকবেন।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি রওয়ানা হয়ে আরশের নিচে যাব এবং আমার প্রতিপালকের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ব। এরপর আল্লাহ তায়ালা আমার অন্তর প্রশস্ত করে দেবেন এবং আমাকে তাঁর প্রশংসা করার জন্য এমন কিছু বাক্য শিখিয়ে দেবেন, যা আমার পূর্বে আর কারও জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। অতঃপর আমাকে বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ, মাথা ওঠাও, প্রার্থনা করো, যা চাইবে তোমাকে দেওয়া হবে। সুপারিশ করো, কবুল করা হবে।’ তখন আমাকে বলা হবে, ‘হে মুহাম্মাদ, আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোনো প্রকার হিসাব-নিকাশ নেওয়া হবে না, তাদের বেহেশতের দরজাসমূহের ডান দিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। আর আপনার অবশিষ্ট উম্মত অন্যান্য দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।’
অন্য আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কিয়ামতের দিন বেহেশতের দরজায় এসে তা খোলার জন্য অনুরোধ করব। তখন দ্বাররক্ষী আমাকে জিজ্ঞেস করবে, আপনি কে? আমি বলব, ‘মুহাম্মাদ।’ সে বলবে, ‘আমাকে আপনার ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে আপনার পূর্বে তা আর কারও জন্য উন্মুক্ত না করি।’
টিকাঃ
৭০১. মুসলিম, ১/১১২, হাদিস নং-৬৮৭।
৭০২. মুসলিম, ১/১১২, হাদিস নং-৬৮৩।
📄 সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারীদের আনন্দের বিবরণ
হাদিসের আলোকে এক কথা প্রমাণিত যে, উম্মতে মুহাম্মদীর সত্তর হাজার কিংবা সাত লাখ লোক একই মুহূর্তে প্রথম পর্যায়ে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করবে। তিরমিযী শরিফের এক হাদিস থেকে জানা যায়, সেই ৭০ হাজারের প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার জান্নাতী থাকবে। এদের সাথে আরও আল্লাহর কুদরতী মুষ্টির একটি মুষ্টি লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ হিসেবে এই সৌভাগ্যবানদের সংখ্যা ৪৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে এই বরকতময় জামাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সব সৌভাগ্যবানদের আলোচনা করার সাথে সাহাবায়েকেরাম এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু করে দেন যে, এই সৌভাগ্যবান কারা? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বলেন, ‘হুমুল্লাযীনা লা ইয়ারকুনা ওয়া লা ইয়াস্তাত্বিরুনা ওয়া আলা রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালুন’ অর্থাৎ এরা সেই সকল মানুষ, যারা ঝাড়ফুঁক করে না এবং করায় না, পাখি উড়িয়ে কুলক্ষণ গ্রহণ করে না এবং নিজেদের প্রতিপালকের ওপর পূর্ণ ভরসা করে।
টিকাঃ
৭০৩. মুসলিম, ১/১১৮।
৭০৪. আত-তারগিব, ৪৩৩; ফাতহুল বারী, ১৪/৫০১।
৭০৫. নাওয়াদির উসুল; আত-তারগিব, ৪৩৩।
📄 জান্নাতে প্রবেশের নয়নাভিরাম দৃশ্য
জান্নাতের সর্বপ্রথম দরজা হলো আটটি। নেক আমলের তারতম্য অনুযায়ী মানুষ এই দরজাগুলো দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। একটি দরজার নাম হবে ‘রাইয়ান’। সেই দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের জন্য রোযাদারদের আহ্বান করা হবে। আল্লাহর কতিপয় সৌভাগ্যবান বান্দার অবস্থা এমন হবে যে, তাঁদের সব দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্য আহ্বান করা হবে। যেমন সাইয়েদুনা হযরত আবু বকর রা.।
সেটি হবে আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরপুর এক দারুণ দৃশ্য। জান্নাতীরা প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতের সকল দরজা খুলে দেওয়া হবে। পাহারাদার ফেরেশতারা জান্নাতীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে থাকবে। কুরআন কারিম এই নয়নাভিরাম দৃশ্য তুলে ধরেছে : ‘যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করত তাদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা উন্মুক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে পৌঁছাবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাকো, অতঃপর সদাসর্বদা বসবাসের জন্য তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো।’
টিকাঃ
৭০৪. সূরা যুমার, আয়াত: ৭০-৭৪।