📄 পুলসিরাত
এরপর জাহান্নামের ওপর একটি পুল স্থাপন করা হবে। যার নাম হবে ‘সিরাত’। এই পুলটি চুলের চেয়ে মিহি এবং তরবারীর চেয়ে ধারালো হবে। ৭৪১ এই পুল অতিক্রম করেই ঈমানদারগণ জান্নাতে গমন করবে। যে যত বেশি পাকা ঈমান ও আমলের অধিকারী হবে, সে তত দ্রুত পুলসিরাত পাড়ি দেবে। আর যাদের আমল কম হবে, তারা সে অনুপাতে ধীরগতিতে পুলসিরাত পার হবে। আর যারা বদ আমলকারী হবে, পুলসিরাতের ধারালো কিনারা লেগে তারা কেটে কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের বিদ্যুৎগতিতে পুলসিরাত পাড় হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তারপর জাহান্নামের ওপর দিয়ে পুলসিরাত পাতা হবে এবং সুপারিশ করার অনুমতিও থাকবে। আর সকলের মুখ থেকে একটি মাত্র বাক্য উচ্চারিত হতে থাকবে : ‘হে আল্লাহ, আমাকে বাঁচাও, আমাকে রক্ষা করো’। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, পুলসিরাত কী? তিনি বললেন, তা মারাত্মক পিছল জায়গা। যার ওপর লোহার আংটা ও বড় বড় কাঁটা থাকবে। যা দেখতে নাজদ এলাকার সাদানা গাছের কাঁটার মতো। মুমিনগণ এই পুলসিরাতের ওপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ উড়ন্ত পাখির মতো, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, আবার কেউ উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ সহিহ সালামতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। আবার কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পার হবে আর কোনো কোনো হতভাগ্য আগুনে পতিত হবে। ৭৫১
কোনো কাফের বা মুনাফিক পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারবে না। কেবল মুমিনগণই পুলসিরাত পাড়ি দিতে সক্ষম হবে। মুমিনদের মাঝে যারা শাস্তির উপযুক্ত, তারা জাহান্নামে পড়ে যাবে এবং নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করার পর তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
টিকাঃ
৭৫১. মুসলিম, ১/১০২।
📄 দ্বিতীয় পর্যায়ের সুপারিশ
পুলসিরাত অতিক্রমণের পূর্বে যে-সকল মহান পুরুষের সুপারিশ করার অধিকার থাকবে, তাদের সুপারিশের অনুমতি দেওয়া হবে। এটি সুপারিশের দ্বিতীয় স্তর। যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক কতিপয় মহান মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করে এই অধিকার প্রদান করা হবে যে, তারা তাদের পরিচিতজনদের থেকে এমন লোকদের জন্য সুপারিশ করবে, যারা মুমিন তো বটে, তবে আমলের অবহেলা করার কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়েছিল। এই সকল সম্মানিত সুপারিশকারীদের মাঝে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামসহ নিম্নলিখিত লোকেরা শামিল থাকবে :
১. আমলদার হাফেযে কুরআনদের নিজ বংশের দশজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করা হবে এবং তাদের সুপারিশ মঞ্জুর করা হবে।
২. দুনিয়াতে যদি কোনো খারাপ মানুষ কোনো ভালো মানুষের ওপর কোনো অনুগ্রহ করে, তা হলে কিয়ামতের দিন সেই খারাপ লোকটি ভালো মানুষটিকে দেখে তার কৃত অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দেবে এবং তার কাছ থেকে সুপারিশ প্রার্থনা করবে। ফলে তার সুপারিশে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
৩. কোনো কোনো রেওয়াত থেকেও জানা যায়, আলেম-উলামা ও শহিদদেরও এ স্তরের সুপারিশ করার অধিকার দেওয়া হবে।
📄 আমানত ও আত্মীয়তার বন্ধন পুলসিরাতের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকবে
পুলসিরাতের ডানেবামে আমানত ও আত্মীয়তার বন্ধন শারীরিক আকৃতি ধারণ করে উপস্থিত হবে এবং পুলসিরাত অতিক্রমকারীদের হিসাব নেবে। এই বৈশিষ্ট্য তাদের প্রতি যত্নবান লোকের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে এবং যারা তাদের প্রতি অবহেলা করেছে, তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে ছেড়ে দেওয়া হলে তারা পুলসিরাতের ডানে ও বামে এসে দাঁড়াবে। ৮৯৫
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, যেহেতু আমানত এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ দুটি বিষয়ের হক আদায় করা মানুষের জন্য অপরিহার্য, তাই এই দুটি জিনিসকে পুলসিরাতের পাশে দাঁড় করানো হবে আমানতদার ও খেয়ানতকারী এবং সম্পর্ক রক্ষাকারী ও সম্পর্ক ছিন্নকারীর জন্য। অতঃপর এ দুটি বস্তু তাদের প্রতি যত্নবান লোকের পক্ষে এবং যারা তাদের প্রতি অবহেলা করেছে তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে। ৮৯৬
কাজেই যদি আমাদের নিজেদের সম্মানের প্রতি আমরা যত্নবান হই এবং নিরাপদে পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তা হলে আমানত, দিয়ানত ও আত্মীয়তার প্রতি যত্নবান হওয়া জরুরি। অন্যথায় কঠিন লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই লাঞ্ছনা থেকে হেফাযত করুন। আমিন।
টিকাঃ
৮৯৫. বুখারী; মুসলিম, ১/১১২।
৮৯৬. ফাতহুল বারী, ১৪/৬৯১।
📄 পুলসিরাত অতিক্রমকারী মুমিনদের সম্মান-মর্যাদা
পুলসিরাত অতিক্রমকালে মুমিনদের মর্যাদা হবে ঈর্ষণীয়। সর্বপ্রথম যে দলটি অতিক্রম করবে তাতে ৭০ হাজার লোক থাকবে। তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। এরপর আলোকোজ্জ্বল তারকারাজির ন্যায় একদল লোক অতিবাহিত হবে। এভাবে দলে দলে মুমিনগণ পুলসিরাত অতিক্রম করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তারপর মুমিনগণ মুক্তি পাবে। সর্বপ্রথম যে দলটি মুক্তি পাবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। সংখ্যায় তারা হবে ৭০ হাজার। তাদের কোনো হিসাব নেওয়া হবে না। এদের পরপরই যে দলটি অতিক্রম করবে, তারা হবে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তারপর পর্যায়ক্রমে লোকজন মুক্তি পেতে থাকবে। ৮৯৭
আমাদের এই অভিপ্রায় থাকা উচিত, আমরা দুনিয়া থেকে এমন আমলের সাথে বিদায় নেব যে, পুলসিরাত অতিক্রমকালে আমাদের আপাদমস্তক আলোয় আলোয় আলোকিত থাকবে এবং শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে আলো নিঃসৃত হবে। ‘ওয়া মা যালিকা আলাল্লাহি বিআযীয’ অর্থাৎ এটা আল্লাহ পাকের পক্ষে মোটেই কঠিন নয়। ৮৯৮
টিকাঃ
৮৯৭. মুসলিম, ১/১০৭।
৮৯৮. সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ২০।