📄 নুর বৃদ্ধির উপায়
যেসব আমলের অসিলায় হাশরের অন্ধকারে নূর বৃদ্ধি পাবে, হাদিস শরীফে সেই আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কতিপয় আমলের সারাংশ নিম্নে প্রদত্ত হলো :
১. অন্ধকার রাতে জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে মসজিদে গমনকারীদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দিয়েছেন। ৭০০
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায়কে নূর বৃদ্ধির কারণ এবং নামাজ ছেড়ে দেওয়াকে নূর থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ৭০১
৩. সূরা কাহাফ পাঠকারীর এত নূর হবে যে, সেই নূর সেখান থেকে মক্কা পর্যন্ত আলো ছড়াবে। এক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন নিয়মিত সূরা কাহাফ পাঠ করবে, তার পা থেকে আসমান পর্যন্ত আলো থাকবে। ৭০২
৪. কুরআনে কারিমে তেলাওয়াত নূর বৃদ্ধির কারণ হবে। ৭৪৩
৫. দরূদ শরিফ পাঠ করার কারণে নূর দান করা হবে। ৭৪৪
৬. হজ-ওমরাহ শেষে মুজদালিফায় প্রতিটি চুলের পরিবর্তে নূর দান করা হবে। ৭৪৫
৭. মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপও নূরের কারণ হবে। ৭৪৬
৮. মুসলমান অবস্থায় যে ব্যক্তির চুল সাদা হবে (এবং মুসলমান অবস্থায় ইনতিকাল হবে) তার সাদা চুল তাঁর জন্য নূর হবে। ৭৪৭
৯. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি তীর নূরের অসিলা হবে। ৭৪৮
১০. রাতেও যারা আল্লাহকে মনে রাখে, তাদেরও প্রত্যেক জিকিরের বিনিময়ে নূর দান করা হবে। ৭৪৯
১১. যে ব্যক্তি অপর কোনো মুসলমানের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য পুলসিরাতে দুটি নূরের শাখা নির্ধারণ করবেন, যার কারণে এক পৃথিবী আলোকিত হবে। ৭৫০
বিপরীত দিকে খারাপ আমল যত বেশি হবে, নূর তথা আলো তত হ্রাস পাবে। বিশেষত আল্লাহর বান্দাদের হক নষ্ট, অধিকার খর্ব এবং অন্যকে কষ্ট প্রদান কঠিন অন্ধকার বয়ে আনবে। কাজেই এমন খারাপ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখা জরুরি এবং নেক আমল করে দুনিয়াতেই কিয়ামতের নূর বৃদ্ধির উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা গোটা উম্মতকে নূর দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৭০০. আবু দাউদ, তিরমিযী।
৭০১. মুসলিম, ১/১০০।
৭০২. তাবারানী।
৭৪৩. মুসনাদে আহমদ।
৭৪৪. দাইলামী।
৭৪৫. তাবারানী।
৭৪৬. তাবারানী।
৭৪৭. বাযযার।
৭৪৮. বাইহাকী।
৭৪৯. তাবারানী; মাআরিফুল কুরআন থেকে সংক্ষেপিত, ৮/৩০৬-৩০৯।
৭৫০. মুসলিম, ১/১০০।
📄 পুলসিরাত
এরপর জাহান্নামের ওপর একটি পুল স্থাপন করা হবে। যার নাম হবে ‘সিরাত’। এই পুলটি চুলের চেয়ে মিহি এবং তরবারীর চেয়ে ধারালো হবে। ৭৪১ এই পুল অতিক্রম করেই ঈমানদারগণ জান্নাতে গমন করবে। যে যত বেশি পাকা ঈমান ও আমলের অধিকারী হবে, সে তত দ্রুত পুলসিরাত পাড়ি দেবে। আর যাদের আমল কম হবে, তারা সে অনুপাতে ধীরগতিতে পুলসিরাত পার হবে। আর যারা বদ আমলকারী হবে, পুলসিরাতের ধারালো কিনারা লেগে তারা কেটে কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের বিদ্যুৎগতিতে পুলসিরাত পাড় হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তারপর জাহান্নামের ওপর দিয়ে পুলসিরাত পাতা হবে এবং সুপারিশ করার অনুমতিও থাকবে। আর সকলের মুখ থেকে একটি মাত্র বাক্য উচ্চারিত হতে থাকবে : ‘হে আল্লাহ, আমাকে বাঁচাও, আমাকে রক্ষা করো’। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, পুলসিরাত কী? তিনি বললেন, তা মারাত্মক পিছল জায়গা। যার ওপর লোহার আংটা ও বড় বড় কাঁটা থাকবে। যা দেখতে নাজদ এলাকার সাদানা গাছের কাঁটার মতো। মুমিনগণ এই পুলসিরাতের ওপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ উড়ন্ত পাখির মতো, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, আবার কেউ উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ সহিহ সালামতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। আবার কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পার হবে আর কোনো কোনো হতভাগ্য আগুনে পতিত হবে। ৭৫১
কোনো কাফের বা মুনাফিক পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারবে না। কেবল মুমিনগণই পুলসিরাত পাড়ি দিতে সক্ষম হবে। মুমিনদের মাঝে যারা শাস্তির উপযুক্ত, তারা জাহান্নামে পড়ে যাবে এবং নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করার পর তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
টিকাঃ
৭৫১. মুসলিম, ১/১০২।
📄 দ্বিতীয় পর্যায়ের সুপারিশ
পুলসিরাত অতিক্রমণের পূর্বে যে-সকল মহান পুরুষের সুপারিশ করার অধিকার থাকবে, তাদের সুপারিশের অনুমতি দেওয়া হবে। এটি সুপারিশের দ্বিতীয় স্তর। যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক কতিপয় মহান মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করে এই অধিকার প্রদান করা হবে যে, তারা তাদের পরিচিতজনদের থেকে এমন লোকদের জন্য সুপারিশ করবে, যারা মুমিন তো বটে, তবে আমলের অবহেলা করার কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়েছিল। এই সকল সম্মানিত সুপারিশকারীদের মাঝে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামসহ নিম্নলিখিত লোকেরা শামিল থাকবে :
১. আমলদার হাফেযে কুরআনদের নিজ বংশের দশজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করা হবে এবং তাদের সুপারিশ মঞ্জুর করা হবে।
২. দুনিয়াতে যদি কোনো খারাপ মানুষ কোনো ভালো মানুষের ওপর কোনো অনুগ্রহ করে, তা হলে কিয়ামতের দিন সেই খারাপ লোকটি ভালো মানুষটিকে দেখে তার কৃত অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দেবে এবং তার কাছ থেকে সুপারিশ প্রার্থনা করবে। ফলে তার সুপারিশে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
৩. কোনো কোনো রেওয়াত থেকেও জানা যায়, আলেম-উলামা ও শহিদদেরও এ স্তরের সুপারিশ করার অধিকার দেওয়া হবে।
📄 আমানত ও আত্মীয়তার বন্ধন পুলসিরাতের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকবে
পুলসিরাতের ডানেবামে আমানত ও আত্মীয়তার বন্ধন শারীরিক আকৃতি ধারণ করে উপস্থিত হবে এবং পুলসিরাত অতিক্রমকারীদের হিসাব নেবে। এই বৈশিষ্ট্য তাদের প্রতি যত্নবান লোকের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে এবং যারা তাদের প্রতি অবহেলা করেছে, তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে ছেড়ে দেওয়া হলে তারা পুলসিরাতের ডানে ও বামে এসে দাঁড়াবে। ৮৯৫
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, যেহেতু আমানত এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ দুটি বিষয়ের হক আদায় করা মানুষের জন্য অপরিহার্য, তাই এই দুটি জিনিসকে পুলসিরাতের পাশে দাঁড় করানো হবে আমানতদার ও খেয়ানতকারী এবং সম্পর্ক রক্ষাকারী ও সম্পর্ক ছিন্নকারীর জন্য। অতঃপর এ দুটি বস্তু তাদের প্রতি যত্নবান লোকের পক্ষে এবং যারা তাদের প্রতি অবহেলা করেছে তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে। ৮৯৬
কাজেই যদি আমাদের নিজেদের সম্মানের প্রতি আমরা যত্নবান হই এবং নিরাপদে পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তা হলে আমানত, দিয়ানত ও আত্মীয়তার প্রতি যত্নবান হওয়া জরুরি। অন্যথায় কঠিন লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই লাঞ্ছনা থেকে হেফাযত করুন। আমিন।
টিকাঃ
৮৯৫. বুখারী; মুসলিম, ১/১১২।
৮৯৬. ফাতহুল বারী, ১৪/৬৯১।