📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 নুরের বণ্টন

📄 নুরের বণ্টন


মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্যকরণ এবং শেষ পরীক্ষার পর গোটা ময়দানে হাশরে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। অতঃপর মুমিনদের তাদের ঈমান ও নেক আমল হিসেবে নূর প্রদান করা হবে। এই নূরের অসিলায় তারা পরবর্তী কঠিন ঘাঁটি পুলসিরাত অতিক্রম করবে। অবশেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে। মুনাফিকদের হয়তো একদম নূর থেকে বঞ্চিত করা হবে অথবা সামান্য নূর প্রদান করে কঠিন প্রয়োজনের মুহূর্তে নূর ছিনিয়ে নেওয়া হবে। তখন তারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করতে থাকবে। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে :

‘যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদিগকে, তাদের সম্মুখভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে। বলা হবে, আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসফলতা। যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবে, তোমরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করো, আমরা কিছু আলো নেব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবে, তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ করো। অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব। তারা মুমিনদেরকে ডেকে বলবে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? তারা বলবে, হ্যাঁ কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ। প্রতীক্ষা করেছ, সন্দেহ পোষণ করেছ এবং অলীক আশার পেছনে বিভ্রান্ত হয়েছ, অবশেষে আল্লাহর আদেশ পৌঁছেছে। এই সেই তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত করেছে। অতএব, আজ তোমাদের কাছ থেকে কোনো মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং কাফেরদের কাছ থেকেও নয়। তোমাদের সবার আবাসস্থল জাহান্নাম। সেটাই তোমাদের সঙ্গী। কতই না নিকৃষ্ট এই প্রত্যাবর্তনস্থল।’ ৬৯৯

টিকাঃ
৬৯৯. সূরা হাদিদ, আয়াত : ১২-১৫।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 নুর বৃদ্ধির উপায়

📄 নুর বৃদ্ধির উপায়


যেসব আমলের অসিলায় হাশরের অন্ধকারে নূর বৃদ্ধি পাবে, হাদিস শরীফে সেই আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কতিপয় আমলের সারাংশ নিম্নে প্রদত্ত হলো :

১. অন্ধকার রাতে জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে মসজিদে গমনকারীদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দিয়েছেন। ৭০০
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায়কে নূর বৃদ্ধির কারণ এবং নামাজ ছেড়ে দেওয়াকে নূর থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ৭০১
৩. সূরা কাহাফ পাঠকারীর এত নূর হবে যে, সেই নূর সেখান থেকে মক্কা পর্যন্ত আলো ছড়াবে। এক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন নিয়মিত সূরা কাহাফ পাঠ করবে, তার পা থেকে আসমান পর্যন্ত আলো থাকবে। ৭০২
৪. কুরআনে কারিমে তেলাওয়াত নূর বৃদ্ধির কারণ হবে। ৭৪৩
৫. দরূদ শরিফ পাঠ করার কারণে নূর দান করা হবে। ৭৪৪
৬. হজ-ওমরাহ শেষে মুজদালিফায় প্রতিটি চুলের পরিবর্তে নূর দান করা হবে। ৭৪৫
৭. মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপও নূরের কারণ হবে। ৭৪৬
৮. মুসলমান অবস্থায় যে ব্যক্তির চুল সাদা হবে (এবং মুসলমান অবস্থায় ইনতিকাল হবে) তার সাদা চুল তাঁর জন্য নূর হবে। ৭৪৭
৯. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি তীর নূরের অসিলা হবে। ৭৪৮
১০. রাতেও যারা আল্লাহকে মনে রাখে, তাদেরও প্রত্যেক জিকিরের বিনিময়ে নূর দান করা হবে। ৭৪৯
১১. যে ব্যক্তি অপর কোনো মুসলমানের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য পুলসিরাতে দুটি নূরের শাখা নির্ধারণ করবেন, যার কারণে এক পৃথিবী আলোকিত হবে। ৭৫০

বিপরীত দিকে খারাপ আমল যত বেশি হবে, নূর তথা আলো তত হ্রাস পাবে। বিশেষত আল্লাহর বান্দাদের হক নষ্ট, অধিকার খর্ব এবং অন্যকে কষ্ট প্রদান কঠিন অন্ধকার বয়ে আনবে। কাজেই এমন খারাপ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখা জরুরি এবং নেক আমল করে দুনিয়াতেই কিয়ামতের নূর বৃদ্ধির উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা গোটা উম্মতকে নূর দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
৭০০. আবু দাউদ, তিরমিযী।
৭০১. মুসলিম, ১/১০০।
৭০২. তাবারানী।
৭৪৩. মুসনাদে আহমদ।
৭৪৪. দাইলামী।
৭৪৫. তাবারানী।
৭৪৬. তাবারানী।
৭৪৭. বাযযার।
৭৪৮. বাইহাকী।
৭৪৯. তাবারানী; মাআরিফুল কুরআন থেকে সংক্ষেপিত, ৮/৩০৬-৩০৯।
৭৫০. মুসলিম, ১/১০০।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 পুলসিরাত

📄 পুলসিরাত


এরপর জাহান্নামের ওপর একটি পুল স্থাপন করা হবে। যার নাম হবে ‘সিরাত’। এই পুলটি চুলের চেয়ে মিহি এবং তরবারীর চেয়ে ধারালো হবে। ৭৪১ এই পুল অতিক্রম করেই ঈমানদারগণ জান্নাতে গমন করবে। যে যত বেশি পাকা ঈমান ও আমলের অধিকারী হবে, সে তত দ্রুত পুলসিরাত পাড়ি দেবে। আর যাদের আমল কম হবে, তারা সে অনুপাতে ধীরগতিতে পুলসিরাত পার হবে। আর যারা বদ আমলকারী হবে, পুলসিরাতের ধারালো কিনারা লেগে তারা কেটে কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের বিদ্যুৎগতিতে পুলসিরাত পাড় হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তারপর জাহান্নামের ওপর দিয়ে পুলসিরাত পাতা হবে এবং সুপারিশ করার অনুমতিও থাকবে। আর সকলের মুখ থেকে একটি মাত্র বাক্য উচ্চারিত হতে থাকবে : ‘হে আল্লাহ, আমাকে বাঁচাও, আমাকে রক্ষা করো’। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, পুলসিরাত কী? তিনি বললেন, তা মারাত্মক পিছল জায়গা। যার ওপর লোহার আংটা ও বড় বড় কাঁটা থাকবে। যা দেখতে নাজদ এলাকার সাদানা গাছের কাঁটার মতো। মুমিনগণ এই পুলসিরাতের ওপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ উড়ন্ত পাখির মতো, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, আবার কেউ উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ সহিহ সালামতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। আবার কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পার হবে আর কোনো কোনো হতভাগ্য আগুনে পতিত হবে। ৭৫১

কোনো কাফের বা মুনাফিক পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারবে না। কেবল মুমিনগণই পুলসিরাত পাড়ি দিতে সক্ষম হবে। মুমিনদের মাঝে যারা শাস্তির উপযুক্ত, তারা জাহান্নামে পড়ে যাবে এবং নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করার পর তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

টিকাঃ
৭৫১. মুসলিম, ১/১০২।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 দ্বিতীয় পর্যায়ের সুপারিশ

📄 দ্বিতীয় পর্যায়ের সুপারিশ


পুলসিরাত অতিক্রমণের পূর্বে যে-সকল মহান পুরুষের সুপারিশ করার অধিকার থাকবে, তাদের সুপারিশের অনুমতি দেওয়া হবে। এটি সুপারিশের দ্বিতীয় স্তর। যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক কতিপয় মহান মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করে এই অধিকার প্রদান করা হবে যে, তারা তাদের পরিচিতজনদের থেকে এমন লোকদের জন্য সুপারিশ করবে, যারা মুমিন তো বটে, তবে আমলের অবহেলা করার কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়েছিল। এই সকল সম্মানিত সুপারিশকারীদের মাঝে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামসহ নিম্নলিখিত লোকেরা শামিল থাকবে :

১. আমলদার হাফেযে কুরআনদের নিজ বংশের দশজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করা হবে এবং তাদের সুপারিশ মঞ্জুর করা হবে।
২. দুনিয়াতে যদি কোনো খারাপ মানুষ কোনো ভালো মানুষের ওপর কোনো অনুগ্রহ করে, তা হলে কিয়ামতের দিন সেই খারাপ লোকটি ভালো মানুষটিকে দেখে তার কৃত অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দেবে এবং তার কাছ থেকে সুপারিশ প্রার্থনা করবে। ফলে তার সুপারিশে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
৩. কোনো কোনো রেওয়াত থেকেও জানা যায়, আলেম-উলামা ও শহিদদেরও এ স্তরের সুপারিশ করার অধিকার দেওয়া হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px