📄 মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য এবং আল্লাহর নুরের প্রকাশ
যখন মুমিন ও মুনাফিকরা আখিরাতে প্রবেশ করার পর ময়দানে হাশরে কেবল প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিকরা অবশিষ্ট থাকবে, তখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘সবাই তো চলে গেছে। তোমরা এখানে কেন রয়ে গেলে?’ তারা উত্তর দেবে, ‘আমরা তো পৃথিবীতে তাদের থেকে পৃথক পথ অবলম্বন করেছিলাম, যখন আমরা তাদের সহযোগিতার মুখাপেক্ষীও ছিলাম। তা হলে আজ আমরা তাদের সঙ্গে কীভাবে থাকতে পারি? আমরা তো এই ঘোষণা শুনেছি যে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপাস্যের কাছে থাকবে। তাই আমরা আমাদের প্রভু-প্রতিপালকের অপেক্ষায় রয়েছি।’ সেসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে দুটি তাজাল্লীর প্রকাশ ঘটবে। প্রথম তাজাল্লী এমন হবে যে মুমিনদের মস্তিষ্কে অঙ্কিত আল্লাহর ছবির সঙ্গে এর কোনো মিল থাকবে না। আল্লাহ তায়ালার সেই নূর না চেনার একটি মৌলিক উদ্দেশ্য থাকবে। এজন্য মুমিনরা তা চিনতে পারবে না। এরপর মহান নূরের প্রকাশ ঘটবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক প্রকৃত মুমিন বান্দা আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে। কিন্তু মুনাফিকদের কোমর কাঠের মতো শক্ত হয়ে যাবে। তারা সিজদা করার পরিবর্তে পড়ে যাবে।
মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতকারীরা। তাদের মাঝে নেককারও থাকবে, পাপীরাও থাকবে। রাব্বুল আলামিন তাদের কাছে পরিচিত চেহারা নিয়ে উপস্থিত হয়ে বলবেন, ‘তোমরা কীসের অপেক্ষায় আছো? তোমরা প্রত্যেকে যে যার ইবাদত করতে তার সাথে মিশে যাও।’ তখন তারা বলবে, ‘হে আমাদের প্রভু, দুনিয়াতে আমরা তাদের থেকে আলাদা ছিলাম। আমরা দরিদ্র ও নিঃস্ব ছিলাম। তবুও তাদের অনুসরণ করিনি।’ তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের রব।’ তখন তারা বলবে, ‘নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা। আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করব না।’ একথাটি দুবার বা তিনবার বলবে। তাদের কেউ কেউ ফিরে যেতে উদ্যত হবে (কারণ, পরীক্ষাটি বড় কঠিন হবে)। তখন আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করবেন, ‘তোমাদের কাছে কোনো চিহ্ন আছে কি? যা দেখে তোমরা তাকে চিনতে পারবে?’ তারা বলবে, ‘হ্যাঁ।’ তখন তাঁর পায়ের নিচের অংশ (হাঁটু থেকে গোছা পর্যন্ত) খুলে যাবে। অতঃপর যারা স্বেচ্ছায় পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে (দুনিয়াতে) আল্লাহকে সিজদা করত, তখন তাদের সিজদা করার অনুমতি দেওয়া হবে। আর সাথে সাথে সবাই সিজদায় লুটিয়ে পড়বে। কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। কিন্তু যারা আত্মরক্ষণামূলক অথবা লোকদেখানোর জন্য সিজদা করত, তারা সিজদা করতে চাইলে তাদের মেরুদণ্ডের হাড় শক্ত স্তম্ভের ন্যায় হয়ে যাবে। ফলে তারা সিজদা করতে চাইলে পেছন দিকে চিত হয়ে পড়ে যাবে। অতঃপর সিজদায় অবনত লোক প্রথমবার মাথা তুলে আল্লাহকে যেই আকৃতিতে দেখেছিল, ঠিক সেই আকৃতিতে দেখতে পাবে। তিনি বলবেন, ‘আমিই তোমাদের রব।’ তারা বলবে, ‘হ্যাঁ, আপনিই আমাদের প্রভু।’ ৬৭৭
উপরোক্ত হাদীসের আলোকে একথা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মহান নূরের প্রকাশের পর যখন মুমিনরা সিজদা থেকে মাথা ওঠাবে, তখন তারা আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি স্ব স্ব স্থানে থেকে কষ্ট ছাড়াই আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হবে, যেমন মানুষ নিজস্থান থেকে সূর্য-চন্দ্র দেখতে পায়। আর যেসব মুনাফিক সিজদা করতে ব্যর্থ হবে, তারা নিজেদের কুফরি ও ফাসেকির কারণে আল্লাহর দিদার থেকে বঞ্চিত হবে। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, ‘কাল্লা ইন্নাহুম আন রাব্বিহিম ইয়াওমায়িযিন লাহ মাহজুবুন’ অর্থাৎ কখনও না, তারা সেদিন তাদের পালনকর্তার থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে। (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৫)। ৬৭৮ আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর দিদার লাভে ধন্য করুন। আমিন।
টিকাঃ
৬৭৭. মুসলিম, ১/১০২, হাদীস নং-১৮৩।
৬৭৮. ফাতহুল বারী, ১৩/৫৫৩; ফাতহুল মুগিসি ইত্যাদি।