📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 আরশের ছায়াতলে

📄 আরশের ছায়াতলে


হাশরের ময়দানে কোনো বাড়িঘর, গাছপালা বা ছাউনি থাকবে না। সবাই এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এমনভাবে সমবেত হবে যে, সবাই স্ব স্ব স্থান থেকে সবাইকে দেখতে পারবে। সেদিন একমাত্র আরশের ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি আরশের ছায়াতলে আশ্রয় নেবে, সে আর কখনও অস্থিরতায় ভুগবে না। যেন আরশের ছায়া মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তাঁর নেক বান্দাদের জন্য বিশেষ মেহমানখানা।

বিভিন্ন হাদিসে সেই সৌভাগ্যবান লোকেদের তালিকা বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের মহান আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন নিজের আরশের নিচে ছায়া প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে : ‘সাবআতুন ইউযিল্লুহুমুল্লাহু ফী যিল্লিহি ইয়াওমা লা যিল্লা ইল্লা যিল্লুহু...’ সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা এমন একদিনে তাঁর ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া অবশিষ্ট থাকবে না : ১. ন্যায়পরায়ণ ইমাম (জননেতা)। ২. সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতে বড় হয়েছে। ৩. সে ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে। ৪. সেই দুই ব্যক্তি যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় একে অপরকে ভালোবাসে, পরস্পর মিলিত হয় এবং এজন্যেই বিচ্ছিন্ন হয়। ৫. যে ব্যক্তি কোনো অভিজাত, সুন্দরী মেয়ে ব্যভিচারের জন্য আহ্বান জানালে তার জবাবে সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। ৬. যে ব্যক্তি এতটা গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করল, তার বাম হাত তা টের পায় না। ७. যে ব্যক্তি একাকী বসে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

তবে আরশের ছায়াতলে কেবল উল্লেখিত সাতটি গুণে গুণান্বিত লোকেরাই আশ্রয় পাবে না, বরং কতিপয় হাদিসে অন্যান্য আমলের প্রতিদানস্বরূপ এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। মুসলিম শরিফের অন্য এক হাদিসে এসেছে : যে ব্যক্তি (ঋণ আদায়ের জন্য) কোনো অভাবীকে সুযোগ দেয় কিংবা মাফ করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা এই কাজের বিনিময়স্বরূপ সেই দিন তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন কোনো ছায়া থাকবে না। আল্লামা হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. উল্লেখিত গুণাবলি ছাড়াও নিম্নোক্ত গুণগুলো উল্লেখ করেছেন : ১. আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদদের সহযোগিতা করা। ২. ঋণদাতার ঋণ পরিশোধ করা। ৩. গোলাম মুক্তির ব্যাপারে সহযোগিতা করা। ৪. অন্যদের সঙ্গে সদাচরণ করা। ৫. আমানত ও দিয়ানতদারীর সঙ্গে ব্যবসা করা। ৬. মসজিদের দিকে গমনাগমন করা। ৭. কষ্ট হলেও পরিপূর্ণ ওযু করা। ৮. অতিরিক্ত খাবার গরিবদের দান করার অভ্যাস গড়ে তোলা। ৯. ফেতনার আশঙ্কায় নিজের অধিকার ছেড়ে দেওয়া। ১০. কোনো গরিবের দায়িত্ব গ্রহণ করা। মোটকথা দুনিয়াতেই আমাদের এমন আমল করার চেষ্টা করা উচিত যার অসিলায় হাশরের ময়দানে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা এবং আরশে আজিমের বরকতময় ছায়ালাভে ধন্য হতে পারি।

টিকাঃ
৬৬৩. মুসলিম, ১/৩৩৯; হাদিস নং-২২৫০।
৬৬৪. মুসলিম, ২/৮৬৭, ফাতহুল বারী, ৩/১০১।
৬৬৫. ফাতহুল বারী, ৩/১০১।
৬৬৬. ফায়জুল কাদীর, ৪/১১৪-১১৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 প্রত্যেক ব্যক্তি তার পছন্দের মানুষের সাথে থাকবে

📄 প্রত্যেক ব্যক্তি তার পছন্দের মানুষের সাথে থাকবে


হযরত সায়িদ ইবনে যুবায়ের রা. বলেন, একবার এক আনসারী সাহাবী এমন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলেন যে, তার চেহারায় পেরেশানি ও অস্থিরতার ছাপ ফুটে উঠেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে বললেন, ‘কী ব্যাপার? তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে?’ সাহাবী উত্তর দিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, একটা বিষয় চিন্তা করে আমি পেরেশানিতে পড়ে গিয়েছি। এখন তো আমরা সকাল-সন্ধ্যা আপনার যিয়ারতে আসতে পারি, আপনার মজলিসে বসে উপকৃত হতে পারি। কিন্তু আখিরাতে তো আপনি আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সুবিশাল জামাতের সঙ্গে উচ্চ মর্যাদায় আসীন থাকবেন (আমরা আপনার কাছে যাব কীভাবে?)’ উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুই বললেন না। তখন হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নিম্নোক্ত আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হলেন : ‘ওয়া মাইয়্যুতিয়িল্লাহ ওয়া রাসূলাহু ফাউলাইকা মাআল্লাযিনা আনআমাল্লাহু আলাইহিম মিনান নাবিয়্যিন ওয়াসসিদ্দিকিন ওয়াশশুহাদায়ি ওয়াসসালিহিন...’ অর্থাৎ আর যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন সে তাদের সঙ্গী হবে। তারা হলেন নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম। (সূরা নিসা, আয়াত: ৬৯)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত সাহাবীকে ডেকে এই আয়াতের সুসংবাদ প্রদান করলেন।

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে নামায আদায় করে কামরায় গমন করছিলেন, এমন সময় এক গ্রাম্য লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, কিয়ামত কবে হবে?’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?’ সে বলল, ‘আমার কাছে অনেক নামায-রোজার সওয়াব নেই। তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসি।’ এই উত্তর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ‘আলমারউ মাআ মান আহাব্বা’ অর্থাৎ প্রত্যেকের হাশর তার সঙ্গেই হবে, যাকে সে ভালোবাসে। হযরত আনাস রা. বলেন, ‘ইসলাম গ্রহণের পর এই সুসংবাদ শুনে আমি যতটা আনন্দিত হয়েছি অন্য কোনো সুসংবাদ শুনে এর চেয়ে বেশি আনন্দিত হইনি।’ বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যবসায়ী পূর্ণ সততা ও আমানতদারীর সঙ্গে ব্যবসা করে কিয়ামতের দিন আম্বিয়া, সিদ্দিকীন, শুহাদা ও সালেহীনদের সঙ্গে তার হাশর হবে। এই হাদিসের আলোকে একথাই জানা যায়, যদি খারাপ লোকদের প্রতি কারও মহব্বত থাকে, তা হলে তাদের সঙ্গে তার হাশর হবে।

টিকাঃ
৬৬৭. সূরা নিসা, আয়াত: ৬৯।
৬৬৮. তাফসীরে ইবনে কাসীর কাযেল, ৩৪৩।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাফেযে কুরআনের সম্মান

📄 হাফেযে কুরআনের সম্মান


কিয়ামতের দিন হাফেযে কুরআনদের মর্যাদার শীর্ষচূড়ায় উত্তীর্ণ করা হবে। স্বয়ং কুরআনে কারিম তাদের জন্য সুপারিশ করবে। তাদের মর্যাদার মুকুট ও কাপড়ও পরিধান করানো হবে। এক হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : কুরআন কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট এসে আবেদন করবে, হে আল্লাহ, তাকে (কুরআনের হাফেযকে) একজোড়া কাপড় পরিধান করান। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানের মুকুট পরিধান করাবেন। এরপর সুপারিশ করবে, হে আল্লাহ, তার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করুন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাকে এক জোড়া সম্মানের কাপড় পরিধান করাবেন। এরপর কুরআন বলবে, হে আল্লাহ, তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তখন আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। এরপর হাফেযে কুরআনকে বলা হবে, তিলাওয়াত করো এবং উঁচুতে থাকো। প্রতিটি আয়াতের বিনিময়ে একটি নেকি বৃদ্ধি করা হবে।

টিকাঃ
৬৪৯. তিরমিযী, ২/১১৯।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাফেযে কুরআনের পিতামাতার সম্মান

📄 হাফেযে কুরআনের পিতামাতার সম্মান


কুরআনে কারিমের মাধ্যমে শুধু হাফেযে কুরআনই সম্মানিত হবে না, বরং হাশরের ময়দানে সুধীর সকল মানুষের সম্মেলনে হাফেযে কুরআনের পিতা-মাতাকেও উচ্চ মর্যাদা দান করা হবে। এক হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং কুরআনের বিধাবলির ওপর আমল করে, তার পিতামাতাকে কিয়ামতের দিন এমন মর্যাদাপূর্ণ মুকুট পরানো হবে, যার আলো পৃথিবীর সূর্যের চেয়েও অধিক আলোকোজ্জ্বল হবে। যদি তোমাদের ঘরে এমন সূর্য থাকত, তা হলে তোমাদের কেমন ভালো লাগত? (যদি পিতামাতার এমন অবস্থা হয়) তা হলে যে ব্যক্তি এর ওপর আমল করল, তার মর্যাদার ব্যাপারে তোমাদের কী ধারণা!

টিকাঃ
৬৫০. মিশকাত, ২/১১৯।

ফন্ট সাইজ
15px
17px