📄 দাঁড়িপাল্লায় আমল ওজন করার পদ্ধতি কী হবে?
মিযানে কী ওজন করা হবে? আমল নাকি আমলকারী? এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে তিনটি অভিমত পাওয়া যায় :
১. অধিকাংশ আলেমের মতে মানুষের আমলগুলোকেই শরীরী আকৃতি দিয়ে পাল্লায় উঠানো হবে।
২. কতিপয় গবেষকদের মতে ঐ দফতর বা খাতাটি পাল্লায় তোলা হবে যাতে ফেরেশতারা মানুষের আমলগুলো লিখে রেখেছে। একটি হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা এক ব্যক্তির আমলনামার ৯৯টি খাতা গুনাহের পাল্লায় রাখবেন। আর নেকির পাল্লায় কেবল একটি চিরকুট রাখবেন যাতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা ছিল। দেখা যাবে সেই একটি চিরকুটের কারণে নেকির পাল্লা ভারী হয়ে গেছে।
৩. তৃতীয় অভিমত হলো, স্বয়ং আমলকারীকে পাল্লায় তোলা হবে। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন বিশাল দেহধারী এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে কিন্তু আল্লাহর নিকট মশার ডানার সমানও তার ওজন হবে না। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : ‘ফালা নুক্বীমু লাহুম ইয়াওমাল ক্বিয়ামাতি ওয়াযনা’ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোনো গুরুত্ব স্থির করব না। (সুরা কাহাফ, আয়াত : ১০৫) আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তোমরা কি তার হালকা-দুর্বল পায়ের গোছা দেখে আশ্চর্য হচ্ছ? সেই সত্তার শপথ, যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ! মিযানের পাল্লায় এই দুটি গোছা উহুদ পাহাড়ের চেয়ে বেশি ভারী হবে।
হাফেয ইবনে কাসির রহ. বলেন, ‘উক্ত তিনটি অভিমতের সমন্বিত রূপ হলো, প্রত্যেকটি নিজ নিজ স্থানে সঠিক ও যথার্থ। কিয়ামতের দিন এমন বিভিন্ন অবস্থা সামনে আসবে। কখনও আমল ওজন করা হবে, আবার কখনও আমলওয়ালাকে ওজন করা হবে। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. উক্ত তিনটি অভিমত থেকে প্রথম অভিমতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।’
📄 যাদের আমল পাল্লায় তোলা হবে
মুহাক্কিক ও গবেষক উলামায়েকেরামের মতে কিয়ামতের দিন আমলের দিক থেকে মানুষ তিন দলে বিভক্ত হবে :
১. যাদের আমলনামায় গুনাহ বলতে কিছুই থাকবে না। শুধুই নেকি আর নেকি থাকবে। উম্মতে মুহাম্মাদীর মাঝে এমন আমলওয়ালা লোকের সংখ্যা হবে প্রচুর। বিনা হিসেবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে (এদের আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ)।
২. কাফেরের দল, যাদের নিকট কোনো রকম নেকি থাকবে না। এদের বিনা হিসেবে জাহান্নামে পাঠানো হবে।
৩. সেই সকল বেআমাল মুসলমান ও কাফের, যারা ভালো-মন্দ উভয় রকম কাজ করেছে। অর্থাৎ এমন কাফের, যারা কিছু নেকির কাজও করেছে। কিন্তু কুফরির বিপরীতে তা খুবই নগণ্য। তবে তাদের এই নেকি আযাব লঘুকরণের ক্ষেত্রে কিছুটা উপকারে আসবে। আর এমন মুসলমান যারা ভালো-মন্দ উভয় কাজ করেছে। তাদের নেকির পাল্লা হালকা বা ভারী হওয়ার ভিত্তিতে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা করা হবে। আর কিছু লোকের নেকি ও গুনাহ বরাবর হবে। তাদেরকে আরাফে রেখে অপেক্ষা করানো হবে। দীর্ঘকাল পর অবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ কবুল করে তাদের জান্নাতে পাঠানো হবে।
টিকাঃ
৬৪৩. ফাতহুল বারী (সংক্ষেপিত), ১৬/৬৪৮-৬৪৯।
📄 নেকির ওজন বৃদ্ধির উপায়
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট নেকির ওজন বাড়ানোর উপায় হলো, অন্তরের ইখলাস ও একনিষ্ঠতা এবং ইখলাসের গভীরতা। অন্তরের ইখলাস যত বেশি হবে, আমল যত বেশি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হবে, আমলের ওজন তত বেশি হবে। ইখলাস কম হলে আমলের ওজনও কম হবে। আমল ইখলাসপূর্ণ হলে আমলের ওজন কত বেশি হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা তা প্রতীয়মান হয় : ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মিযানে পাল্লাকে ভরে দেয়।
একটু আগে এক হাদিসে অতিবাহিত হয়েছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ চিরকুট রাখাতে নেকির পাল্লা ঝুঁকে যাবে। এটা আল্লাহর এমন যিকির, জীবনে কেউ যদি একবার পূর্ণ ইখলাসের সঙ্গে পাঠ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা এই ইখলাসের বিনিময়ে তা ওজোনদার বানিয়ে দেবেন। আরেক হাদিসে এও এসেছে, আমল ওজনের মুহূর্তে এক মুমিন বান্দার নেকিতে ঘাটতি দেখা দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা চিরকুট নেকির পাল্লায় দেবেন। চিরকুটটিতে দরূদ শরিফ পাঠের সওয়াব ছিল। সেটি রাখতেই নেকির পাল্লা ঝুঁকে যাবে। মোটকথা, ইখলাসের মাধ্যমে নেকির ওজন বৃদ্ধি পায়। বাহ্যত আমল ছোট হলেও ইখলাসের কারণে আখিরাতে তার ওজন খুব বেশি হবে। আর যদি ইখলাস না থাকে, তা হলে আমল দেখতে যত বড়ই হোক না কেন, আখিরাতে তা ওজনহীন ও অকার্যকর বলে বিবেচিত হবে।
টিকাঃ
৬৪৪. মুসলিম, ১/১৯৮।
৬৪৫. আবু-তাযকিরা, ৬৬১।
৬৪৬. আবু-তাযকিরা, ৬৬১।
📄 সাহাবায়েকেরামের আমল সর্বাধিক বেশি হওয়ার কারণ
সাহাবায়েকেরাম সকল উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠ হওয়ার এটাও একটা কারণ যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতময় সান্নিধ্যের কারণে তারা এমন পূর্ণ ইখলাসের অধিকারী হয়েছিলেন, যা পরবর্তী যুগে পাওয়া যায়নি। তাদের এই পূর্ণাঙ্গ ইখলাসই তাদের আমলের ওজন বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। ফলে পরবর্তী কোনো উম্মতই যত বড় আমলই করুক না কেন, তাদের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারবে না। এজন্যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন : ‘লা তাসুব্বু আসহাবি...’ তোমরা আমার সাহাবীদের গালমন্দ করো না। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো, তা হলে তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ (সদকা করার) সমান সওয়াব হবে না। কাজেই যদি আমরা আমাদের আমলের ওজন বাড়াতে চাই এবং আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চাই, তা হলে সর্বদা ইখলাসকে সামনে রাখা জরুরি এবং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ইখলাস দান করুন এবং রিয়া (আত্মপ্রদর্শন) থেকে হিফাযত করুন। আমিন।
টিকাঃ
৬৪৭. বুখারী, ১/৫১৮, হাদিস নং-৩৪০৮; মুসলিম ২/৩০১৮; তিরমিযী, ২/২৫৯।