📄 হিসাব-নিকাশ শুরু
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াতে কুবরার পর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হিসাব-নিকাশ শুরু হবে। এ বিষয়ে প্রথম কাজ এই হবে, প্রত্যেকের আমলনামা নিজ নিজ হাতে দিয়ে দেওয়া হবে। সৎ ও নেককার লোকদের আমলনামা তাদের ডান হাতে দেওয়া হবে। আর অসৎ ও বদ আমলওয়ালা লোকদের আমলনামা তাদের বাম হাতে দেওয়া হবে। হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন, সকল আমলনামা আরশে আজিমের নিচে সংরক্ষিত আছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বিশেষ এক প্রকার বাতাস চালু করবেন, যা আমলনামাগুলোকে উড়িয়ে ডান বা বাম হাতে পৌঁছে দেবে। আমলনামাগুলোর ওপর লেখা থাকবে, 'পাঠ করো তোমার আমলনামা। আজ তুমিই তোমার হিসাব গ্রহণে যথেষ্ট।' ৬২৭
এসময় নেককার লোকদের আনন্দের কোনো সীমা থাকবে না। পক্ষান্তরে বদকার লোকদের চেহারা মলিন হয়ে যাবে। যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখো।’ যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘হায় আমার যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব!’ ফেরেশতাদের বলা হবে, ‘ধরো একে, গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও, অতঃপর নিক্ষেপ করো জাহান্নামে।’ ৬২৮
কুরআনে কারিমে হিসাব গ্রহণের মূহুর্তকে নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে :
‘তারা আপনার পালনকর্তার সামনে পেশ হবে সারিবদ্ধভাবে এবং বলা হবে, তোমরা আমার কাছে এসেছ; যেমন তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম। আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে; তার কারণে অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাবে। তারা বলবে, হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা! এ যে ছোট বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি- সবই এতে রয়েছে।’ ৬২৯
প্রথম দিকে কাফের, মুনাফিক ও অন্য বদআমলওয়ালা লোকেরা বিতর্ক ও নিজেদের স্বপক্ষে প্রমাণাদি উপস্থাপনের চেষ্টা করবে। কিন্তু স্বয়ং তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিলে তাদের বিতর্ক করার কোনো সুযোগ থাকবে না। ৬২৯
টিকাঃ
৬২৭. আত্ব-তাযকিরা, ৩৯১।
৬২৮. সুরা আল-হাক্কা, আয়াত: ১৮-৪১।
৬২৯. সুরা কাহাফ, আয়াত: ৪৮-৪৯।
📄 সর্বপ্রথম কোন্ জিনিসের হিসাব নেওয়া হবে
দুনিয়াবী মুয়ামালাত ও পার্থিব হকের মধ্যে হতে সর্বপ্রথম অন্যায় হত্যার হিসাব নেওয়া হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আউওয়ালু মা ইউক্বদ্বা বাইনাস নাসি ইয়াওমাল ক্বিয়ামাতি ফিদ্দামায়ি’ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম অন্যায় রক্তপাতের বিচার করা হবে। ৬৩০
এক হাদিসে এসেছে, নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে টেনে-হেঁচড়ে আরশের সামনে এনে দাঁড় করাবে এবং বলবে, ‘হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক, তাকে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমাকে হত্যা করেছিল?’ অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যদি আসমান-জমিনের সকলে মিলে কোনো একজন মুসলমানকে হত্যা করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে হত্যার ব্যাপারে সহযোগিতা করে, এমনকি সে যদি একটি মাত্র শব্দ দ্বারাও অংশ নেয়, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তার কপালে লেখা থাকবে— সে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত। ৬৩১
টিকাঃ
৬৩০. ইবনে কাসির, ৩৪৬।
৬৩১. ইবনে কাসির, ৩৪৬।
📄 নামাযের হিসাব
ইবাদতের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। এক হাদিসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আউওয়ালু মা ইউহাসাবু বিহিল আবদু ইয়াওমাল ক্বিয়ামাতি আস-সালাতু...’ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মানুষের নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে। যদি নামাজের হিসাব যথাযথ সঠিক হয়, তাহলে তার অন্যান্য আমলও সঠিক পাওয়া যাবে। আর যদি নামাজ ঠিক না থাকে, তাহলে বাকি আমলও সঠিক থাকবে না। ৬৩২
নামাযকে দীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে। বিনা ওজরে নামায ত্যাগকারীকে কাফের ও মুনাফিকদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কাজেই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য হলো নামাযের পাবন্দ হওয়া এবং পরিবার-পরিজন সবাইকে নামাযে অভ্যস্ত করা।
টিকাঃ
৬৩২. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/১৫০।
📄 জুলুম-অত্যাচার ও অধিকার খর্বের প্রতিদান
হাশরের ময়দানে কেউ রেহাই পাবে না; জুলুমের বদলা দিতেই হবে। সেখানে জালিমের নেকি ও পুণ্যগুলো মজলুম ব্যক্তিকে প্রদান করা হবে এবং যখন জালিমের নেকি ফুরিয়ে যাবে, তখন মজলুমের গুনাহগুলো জালিমের মাথায় চাপানো হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
‘মান কানাত লাহু মাজলামাতুন লিআখীহি...’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি তাঁর ভাইয়ের মানহানি করে কিংবা সম্পদ আত্মসাৎ করে তার ওপর জুলুম করেছে, সে যেন সেই দিন আসার পূর্বে তার সাথে মীমাংসা করে নেয়, যেদিন দিনার বা দিরহাম কোনো কাজে আসবে না, বরং জালিমের নেকি থেকে মজলুমের হক আদায় করা হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে, তবে মজলুম ভাইয়ের গুনাহ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। ৬০১
অন্য এক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সাহাবায়েকেরামকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোন ব্যক্তিকে দেউলিয়া মনে করো? সাহাবায়েকেরাম আরজ করলেন, যে ব্যক্তির কাছে টাকাপয়সা থাকে না। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের মাঝে দেউলিয়া হলো ঐ ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি নেক আমল নিয়ে আসবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্তপাত ঘটিয়েছে। ফলে সেসকল ব্যক্তিকে তার পুণ্যসমূহ দিয়ে দেওয়া হবে। তার পুণ্য ফুরিয়ে গেলে তাদের গুনাহগুলো তার ওপর চাপানো হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ৬০২
ইবনে মাজাহ শরিফে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আবিসিনিয়ার এক বৃদ্ধা দুষ্ট বালকদের সম্পর্কে অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘সেদিন তোমরা দেখবে যখন আল্লাহ বিচারকার্য কায়েম করবেন এবং মানুষের হাত-পা তার কৃতকর্ম বর্ণনা করবে।’ একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘সে সত্য বলেছে। আল্লাহ তায়ালা সেই জাতিকে কীভাবে পবিত্র করবেন, যারা নিজেদের দুর্বলদের পক্ষে শক্তিমানদের থেকে হিসাব গ্রহণ করে না।’ ৬০৩
টিকাঃ
৬০১. বুখারী, ১/৩১, হাদিস নং-৩৩৯।
৬০২. মুসলিম, ১/৩২০।
৬০৩. ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-২৪৪৩।