📄 হাউজে কাউসার
হাশরের ময়দানে পিপাসার কষ্ট যখন সীমা ছাড়িয়ে যাবে, তখন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সুবিশাল জামাতকে ভিন্ন ভিন্ন হাউজ প্রদান করা হবে, যা থেকে তারা নিজ নিজ মুমিন উম্মতদের পানি পান করাবেন। সেদিন সর্বাধিক বড় হাউজ এবং সর্বাধিক বিশাল সমাবেশ ঘটবে আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজে কাউসারে। সেখানে তিনি স্বশরীরে উপস্থিত থেকে নিজ উম্মতের পানি পান করাবেন। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
‘ইন্না লিকুল্লি নাবিয়্যিন হাওযান ওয়া ইন্নাহুম ইয়াতাবাহুনা আইয়ুহুম আকছারু ওয়ারিদান ওয়া ইন্নী আরজু আন আকুনা আকছারাহুম ওয়ারিদান’ অর্থাৎ সেদিন প্রত্যেক নবীর একটি করে হাউজ থাকবে। প্রত্যেকে এ বিষয়ে গর্ব করবে যে, কার উম্মতের সংখ্যা বেশি। আমি আশা রাখি, আমার উম্মতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। ৩১৪
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাউজ এত বিশাল এবং এমন সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে যে, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন :
‘হাওযী মাসিরাতু শাহরিন ওয়া যাওয়ায়াহু সাওয়াউন আবয়াদু মিনাল ওয়ারিক্বি ওয়া রীহুহু আত্বইয়াবু মিনাল মিসকি ওয়া ক্বীযানুহু কানুজূমিস সামায়ি ফামান শারিবা মিনহু ফালা ইয়াযমাউ বা’দাহু আবাদান’ অর্থাৎ আমার হাউজ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এক মাসের পথের সমান (আনুমানিক সাতশ কিলোমিটার)। হাউজটি চতুর্দিকে সমান হবে। এর পানি হবে রুপার চেয়ে শুভ্র এবং এর সুঘ্রাণ মেশকের চেয়ে অধিক সুগন্ধময়। তার পানপাত্রগুলো আকাশের তারকারাজির মতো আলোকনয় হবে। যে এই পানি পান করবে, সে আর কোনোদিন পিপাসার্ত হবে না। ৩১৫
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবায়েকেরাম সেই পানির স্বাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুধের চেয়েও শুভ্র, মধুর চেয়েও মিঠা। জান্নাতের দুটি নহর তাতে মিলিত থাকবে। একটি স্বর্ণের অপরটি রুপার। ৩১৬
টিকাঃ
৩১৪. তিরমিযী, ২/৭০৭।
৩১৫. মুসলিম, ২/২৮৯, হাদিস নং-২২৯২।
৩১৬. মুসলিম, ২/২৬১।
📄 নবীগণ নিজ নিজ উম্মতদের কীভাবে চিনবেন?
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাউজে কাউসারের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করছিলেন। বক্তৃতাকালে একথাও বলেন, আমি সেদিন হাউজে কাউসারের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যান্য উম্মতকে এমনভাবে তাড়াব, যেমন মানুষ গবাদি পশুকে পানি পান করানোর সময় অন্য কোনো পশু এসে ভিড় করলে তাড়িয়ে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই কথা শুনে সাহাবায়েকেরাম বিস্মত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেদিন কি আপনি আমাদের চিনতে পারবেন? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ শুনিয়ে বলেন :
‘না’আম লাকুম সিমান লাইসা লিআহাদিন মিনাল উমামি তুরিদুনা আলাল গুররা মুহাজ্জালীন মিন আছরিল উযু’ অর্থাৎ হ্যাঁ, তোমাদের এমন নিদর্শন হবে, যা অন্য কারও হবে না। তোমরা এমন অবস্থায় আমার নিকট আসবে যে, তোমাদের ওজুর অঙ্গগুলো চমকাতে থাকবে। ৩১৭
উপরিউক্ত হাদিস থেকে জানা যায়, গুরুত্বের সঙ্গে অধিক পরিমাণ ওজু করা হাশরের ময়দানে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণ হবে এবং ওজুর অঙ্গ দেখেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের চিনবেন।
টিকাঃ
৩১৭. মুসলিম, হাদিস নং-২৪৭।
📄 হাউজে কাউসারের পানি পান করে সর্বপ্রথম যিনি তৃপ্ত হবেন
ইনশাআল্লাহ, প্রত্যেক উম্মতই হাউজে কাউসারের পানি পান করে তৃপ্ত হবে। তবে যে-সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সর্বপ্রথম হাউজে কাউসারের পানি পান করবেন, তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
‘আউয়ালুন নাসি উরূদান আলাইহি ফুকারাউল মুহাজিরীন আশ্-শু’ছু রুউসান আল-দুনুসু ছিয়াবান আল্লাযীনা লা ইয়ানকিহুনাল মুন’আমতি ওয়া লা তুফতাহু লাহুমু আবওয়াবুল ক্বসুর’ অর্থাৎ গরিব মুহাজির সাহাবীরা সর্বপ্রথম হাউজে কাউসারে অবতরণ করবে। যাদের চুল হবে উসকোখুসকো, কাপড় হবে ময়লা; যারা ধনী দুলালীদের বিয়ে করতে পারে না এবং যাদের জন্য রাজপ্রাসাদের দরজা খোলে না। ৩১৮
অর্থাৎ তাদের অসহায়ত্ব দেখে বিলাসী নারীরা তাদের বিয়ে করতে রাজি হয় না। তারা কারও দরজায় গেলে মানুষ তাদের জন্য দরজা খোলে না। পৃথিবীতে তো তাদের এমন অসহায় অবস্থা হবে। কিন্তু আখিরাতে তারা এমন সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবেন যে, সর্বপ্রথম তাদের হাউজে কাউসারে ডাকা হবে। এ হলো আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।
টিকাঃ
৩১৮. তিরমিযী, ২/৭০১।
📄 আমলহীন ও বিদআতী লোককে হাউজে কাউসার থেকেড়িয়ে দেওয়া হবে
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, হাশরের ময়দানে পানি পান করানোর জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ৭০ হাজার ফেরেশতা নিয়োজিত থাকবে। কোনো কাফের বা মুশরিক ব্যক্তি আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের হাতে পানি পান করার সুযোগ পাবে না। ৩১৯
তাই হাউজে কাউসারেও বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত থাকবে। এমন ঘটনাও ঘটবে যে, কিছু মানুষ বাহ্য দৃষ্টিতে মুসলমান বলে মনে হবে। তারা পিপাসার তাড়নায় হাউজে কাউসারের দিকে রওনা শুরু করলে ফেরেশতা তাদের দূর থেকে বাধা প্রদান করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বলবেন, ‘এরা তো আমার মানুষ (তাদের কেন বাধা দিচ্ছ)?’ ফেরেশতারা উত্তর দেবে, ‘হযরত, আপনি জানেন না, যে তারা আপনার পর কী কী (খারাপ কাজ) করেছে?’ একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের তাড়িয়ে দেবেন। এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
‘আনা ফারাতুকুমান আলাল হাউজি মান ওয়ারাদা শারিবা ওয়ামান শারিবা লাম ইয়াযমা আবাদান...’ অর্থাৎ আমি হাউজে কাউসারে তোমাদের পূর্বে অবতরণ করব (এবং তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব)। যে ব্যক্তি সেখানে আসবে, সে পান করবে। আর যে ব্যক্তি পান করবে, সে কখনও পিপাসার্ত হবে না। আমার সামনে এমন কিছু লোক আসবে, যাদের আমি চিনব, তারাও আমাকে চিনবে। অতঃপর তাদের ও আমার মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি হবে। আমি বলব, তারা তো আমার দলভুক্ত। ফেরেশতারা বলবে, আপনি জানেন না, আপনার তিরোধানের পর তারা কী করেছে? অতঃপর আমি বলব, আমার পরে যারা আমার দীনকে পরিবর্তন করেছে, তারা ধ্বংস হোক। ৬২০
আল্লামা কুরতুবী রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘আমাদের উলামায়েকেরামের অভিমত হলো, যে ব্যক্তি মুরতাদ হবে অথবা দীনের বিষয়ে কোনো বিদআতী কর্মকাণ্ডের প্রচলন ঘটাবে, সে কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পানি পান থেকে বঞ্চিত হবে এবং তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। যারা মুসলমানদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে এবং মুসলমানদের রাস্তা ছেড়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে—যেমন: খারেজী, রাফেজী ও মুতাজেলীদের মতো ভ্রষ্ট দল, এবং যারা দীনের মধ্যে পরিবর্তন সৃষ্টির প্রয়াস চালায়, তাদের সর্বাধিক কঠোরভাবে হাউজে কাউসার থেকে তাড়ানো হবে। অনুরূপ সেসব জালেম বাদশাহকেও হাউজে কাউসারের পানি থেকে বঞ্চিত করা হবে, যারা আহলে হক্বের ওপর জুলুম করেছে, তাদের ধোঁকা দিয়েছে, তাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং প্রজাদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে। এছাড়া প্রকাশ্য গুনাহে অভ্যস্ত ব্যক্তিরাও হাউজে কাউসারের পানি পান থেকে বঞ্চিত হবে, যারা খোদায়ী বিধানকে তুচ্ছ মনে করেছে। ৬২১
টিকাঃ
৩১৯. আত-তাজকিরা, ৬৪৮।
৬২০. মুসলিম, ২/২৪৯।
৬২১. আত-তাযকিরা, ৩৫২।