📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাশর দিবসের সম্মান ও অপমান

📄 হাশর দিবসের সম্মান ও অপমান


হাশরের ময়দানে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষ ও জিন একত্র হবে। প্রত্যেকে অপরকে দেখবে এবং ময়দানে হাশরের সকল পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করবে। সেদিন যেই সম্মান পাওয়া যাবে, তার চেয়ে অধিক কোনো সম্মান নেই। আর যেই হতভাগ্য সেদিন লাঞ্ছনা ভোগ করবে, তার চেয়ে অধিক লাঞ্ছিত আর কেউ নেই। হাশরের ময়দানে যখন কোনো সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সফলতার কথা ঘোষণা করা হবে এবং প্রকাশ্যে সকলের সামনে তাকে মুকুট পরানো হবে, তখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত তার সফলতার খবর পাবে। এই সম্মান এত বিশাল হবে যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর। অপরদিকে সেখানকার অপমানও সবচেয়ে বড় অপমান। দুনিয়ার লাঞ্ছনা তো খুবই সীমিত। কিন্তু আল্লাহ না করুন, ময়দানে হাশরে কেউ অপমানিত হলে এর চেয়ে অপমানের আর কিছুই নেই। এ কারণেই কুরআনে কারীমের স্থানে স্থানে হাশরের ময়দানে কাফেরদের ভয়াবহ লাঞ্ছনার দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি আয়াত তুলে ধরা হলো :

১. ‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে কোরো না। তাদেরকে তো ঐদিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে। তারা মস্তক উপরে তুলে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে।’
২. ‘আমি কিয়ামতের দিন তাদের সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়, অন্ধ অবস্থায়, মূক অবস্থায় এবং বধির অবস্থায়।’
৩. ‘এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থাপিত করব। সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থাপিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।’
৪. ‘যদি আপনি দেখেন যখন অপরাধীরা তাদের পালনকর্তার সামনে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা দেখলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আমাদেরকে পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে গেছি।’
৫. ‘যেদিন শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীদেরকে সমবেত করব নীল চক্ষু অবস্থায়। তারা চুপিসারে পরস্পর কথা বলবে, তোমরা মাত্র দশ দিন অবস্থান করেছিলে। তারা কী বলে তা আমি ভালোভাবে জানি। তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত উত্তম পথের অনুসারী সে বলবে, তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে।’

এখানে মাত্র কয়েকটি দৃশ্য তুলে ধরা হলো। এছাড়া কিয়ামতের দিন বেঈমান ও বেআমল লোকজন যে লাঞ্ছনা, তুচ্ছতা ও শাস্তির মুখোমুখি হবে, তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে ঈমানদারগণ যে সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত হবে, তা-ও বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তয়ালা আমাদের সেদিনের অপমান থেকে রক্ষা করুন এবং প্রকৃত সম্মানে ভূষিত করুন। আমীন।

টিকাঃ
৯৫০. সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২-৪৬।
৯০১. সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২-৪৬।
৯০২. সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৯৭।
৯০৩. সূরা ত-হা, আয়াত : ১২৪-১২৬।
৯০৪. সূরা সাজদা, আয়াত : ১২।
৯০৫. সূরা ত-হা, আয়াত : ১০২-১০৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম পোশাক পরিধানকারী

📄 হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম পোশাক পরিধানকারী


বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বয়ান করেন : তোমাদের নগ্ন পায়ে, বিবস্ত্র ও খতনাহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। (কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে) ‘আমরা প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব’। আর কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কাপড় পরিধান করানো হবে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালামকে।

আরেক বর্ণনায় এসেছে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দুটি কিবতী পোশাক পরিধান করানো হবে। অতঃপর তিনি আরশে আযীমের ডান পার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকবেন।

উলামায়ে কিরাম বলেন, ‘নমরুদ যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপের হুকুম দেয়, তখন তাঁকে বিবস্ত্র করা হয়েছিল। সেই দিনের প্রতিদানস্বরূপ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তাঁকে পোশাক পরিধান করানো হবে।’ আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শনের কারণে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান হন না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেদিন যে পোশাক পরানো হবে, তা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাপড়ের চেয়ে অধিক শানদার হবে। যদিও সর্বপ্রথম পরিধান করানোর মর্যাদা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম লাভ করবেন, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পোশাক অধিক শানদার হওয়া তাঁর উচ্চ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।

টিকাঃ
৯০৭. বুখারী, ২/৯৬৭, হাদিস নং-৬৫২২।
৯০৮. ফাতহুল বারী, ১৪/৪৮৭।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাশরের ময়দানে ঘামের স্রোত

📄 হাশরের ময়দানে ঘামের স্রোত


হাশরের ময়দানে ভয়াবহ দৃশ্যাবলির মধ্যে একটা দৃশ্য হলো, সেদিন প্রত্যেক মানুষ নিজের বদ আমলের পরিমাণ ঘামে হাবুডুবু খাবে। সেদিন এত বেশি ঘাম বের হবে যে, হাশরের জমিনের সত্তর হাত নিচ পর্যন্ত ঘাম প্রতীয়মান হবে। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের ঘাম বের হবে। এমনকি তাদের ঘাম জমিনের সত্তর হাত ছাড়িয়ে যাবে এবং ঘাম লাগামের মতো এঁটে থাকবে এমনকি কান পর্যন্ত পৌঁছাবে।’

মুসলিম শরীফে হযরত মিকদাদ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন সূর্য মানুষের খুব কাছে চলে আসবে। এমনকি তা এক মাইল দূরত্বে অবস্থান করবে। মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামে হাবুডুবু খাবে। কারও টাখনু পর্যন্ত ঘাম হবে, কারও হবে হাঁটু পর্যন্ত। কারও পিঠ পর্যন্ত। আবার কারও কারও ঘাম মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।’ এই বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মুখের দিকে ইশারা করেন।

এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, একই ময়দানে—যেখানে মানুষ কেবল পা রাখার স্থান পাবে—প্রত্যেকে নিজের বদ আমলের পরিণাম অনুযায়ী ঘামে ডুবতে থাকবে। এই ভয়াবহ দিনে আল্লাহর কিছু প্রিয় বান্দা এমন থাকবেন, সামান্য পরিমাণ সূর্যের তাপও যাঁদের গায়ে লাগবে না, সেদিন তাঁরা পূর্ণ নিরাপদে থাকবেন। এক হাদিসে এসেছে, সেদিন সূর্যের তাপে মুমিন নারী-পুরুষ কষ্ট পাবে না। উক্ত হাদিসে মুমিন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি। যেমন : আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম, সিদ্দীকিন ও শোহাদা। তাঁরা হাশরের ময়দানে সামান্য কষ্টও করবেন না।

টিকাঃ
৯০৯. বুখারী, ২/৯৬৭, হাদিস নং-৬৫২১।
৩০৬. মুসলিম, ২/৩৮৪; আতি-তারগীব ওয়াত তারহিব, ৪/২০৯।
৩০৭. ফাতহুল বারী, ১৪/৪৮৩।
৩০৮. ফাতহুল বারী, ১৪/৪৮৩; আত-তারগীব ওয়াত-তারহিব, ২৭৫-৩৭৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হাশরের দিনের দীর্ঘতা

📄 হাশরের দিনের দীর্ঘতা


হাশরের দিন দুনিয়ার সাধারণ দিনের মতো হবে না, বরং সেই দিন দুনিয়ার দিনের ৫০ হাজার বছরের সমান হবে। হাশরের দিন এত দীর্ঘ হওয়ার কারণে কাফের-মুশরিক ও বদ আমলওয়ালা লোকদের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর হতে থাকবে এবং তাদের জন্য দিন ফুরাতেই চাইবে না। কিন্তু মহান আল্লাহর করুণা দেখুন! এই বিশাল দিনটি মুমিনদের জন্য এক ফরজ নামাজের ওয়াক্তের মতো মনে হবে। মুসনাদে আহমদে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন মুমিনদের জন্য এত সহজ হালকা হবে যে, তা এক ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মতো হবে। তাবরানী শরিফে একটি রেওয়াততে এসেছে, মুমিনদের জন্য কিয়ামতের দিনটি দুনিয়ার দিনের একটি ছোট থেকে ছোট প্রহরের মতো মনে হবে। নেককার ও মুমিন বান্দাগণ সেদিন এত শান্তিতে থাকবে যে, তারা বুঝতেও পারবে না দিন কীভাবে কেটে গেল। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আমাদের হাশরের দিন এমন শান্তি ও নিরাপত্তা দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
৩০৯. তাফসিরে ইবনে কাসির কামেল, ১০৭৮।
৩১০. ফাতহুল বারী, ১৪/৪৮৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px