📄 ময়দানে হাশর
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশসমূহকে এবং লোকেরা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে পেশ হবে। সেদিন পাপীদেরকে পরস্পর শৃঙ্খলবদ্ধ দেখবে। তাদের জামা হবে দাহ্য আলকাতরার এবং তাদের মুখমণ্ডলকে আগুন আচ্ছন্ন করে ফেলবে। যাতে আল্লাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেন। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’
সেদিন আসমান-জমিন পরিবর্তন হওয়া সম্পর্কে উলামায়েকেরাম ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ব্যাখ্যা করেছেন :
১. অনেক আলেমের বক্তব্য হলো, বাস্তবেও জমিন পরিবর্তন হয়ে এমন ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর একটি রেওয়ায়েত এ কথা সমর্থন করে। এ হিসেবে জমিন পরিবর্তনের বিষয়টি দুই ফুৎকারের মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত হবে। অর্থাৎ প্রথমবার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার পর আসমান-জমিন সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর হাশর কায়েম হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তায়ালা নতুন আসমান ও নতুন জমিন সৃষ্টি করবেন এবং এই নতুন জমিনের উপরেই হাশর হবে।
২. কারও কারও মত হলো, আসমান-জমিনের হাকিকী পরিবর্তন হবে না; বরং এর গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের মাঝে পরিবর্তন আসবে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, ‘কিয়ামতের দিন জমিনকে চামড়ার মত টানা হবে এবং এর ওপরে সকল মাখলুক সমবেত হবে।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘সকল পাহাড় ও ঘরবাড়ি সমতল করে জমিনকে সমতল প্রান্তরে রূপান্তরিত করা হবে।’
৩. তৃতীয় অভিমত হলো, জমিনের বৈশিষ্ট্য প্রথমবার ফুঁ দেওয়ার সময়ই পরিবর্তন হবে। এরপর জমিনকে ভাঁজ করে ভিন্ন আসমান ও জমিন কায়েম করা হবে।
টিকাঃ
৬৪৪. সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪৮-৫১।
৬৪৫. ফাতহুল বারী, ১১/৪৮৫।
৬৪৬. আত-তাজকিরা, ১/১১২; ফাতহুল বারী, ১১/৪৮৫।
📄 বর্তমান জনিমকে রুটি বানানো হবে
বুখারী শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন একটি রুটির মত হবে। আল্লাহ তায়ালা বেহেশতিদের মেহমানদারির জন্য তা নিজের হাতে তুলে নেবেন। যেমন তোমাদের কেউ সফরের সময় রুটি হাতে তুলে নেয়।’ এমন সময় এক ইহুদি এসে বলল, ‘হে আবুল কাসেম, দয়াময় আপনার উপর বরকত নাযিল করুন। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে বেহেশতবাসীদের আতিথেয়তা সম্পর্কে আপনাকে কি জানাব না?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ!’ লোকটি বলল, ‘(সেই দিন) সমস্ত ভূমন্ডল একটি রুটি হয়ে যাবে।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলেছিলেন (লোকটিও তেমনই বলেছিল)। এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এমনকি তার দাঁতসমূহ প্রকাশ পেল। এরপর বললেন, ‘তবে কি আমি তোমাদের সেই রুটির তরকারী সম্পর্কে বলব না?’ তিনি বললেন, ‘তাদের তরকারী হবে বালাম ও নূন।’ সাহাবায়েকেরাম বললেন, ‘সে আবার কী?’ তিনি বললেন, ‘ষাঁড় ও মাছ। এদের কলিজা ৭০ জন খেতে পারবে।’
এই হাদিস থেকে জানা যায়, হাশরের ময়দানে ঈমানদাররা ক্ষুধার্ত থাকবেন না। বরং এই জমিনকেই তাদের জন্য রুটি বানিয়ে দেওয়া হবে। এটা যেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে সম্মাননা ও আতিথেয়তাস্বরূপ। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এ থেকে জানা যায়, হাশরের ময়দানে অবস্থানকালে মুমিনদের ক্ষুধার্ত রাখা হবে না, বরং আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরতে জমিনের প্রকৃতিই পাল্টে দেবেন। মুমিনরা কোনোরূপ কষ্ট ছাড়াই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা অনুযায়ী পায়ের নিচ থেকে ভক্ষণ করবে। ‘জমিন জান্নাতবাসীদের জন্য আহার হবে’—একথার অর্থ হলো, যারা জান্নাতের উপযুক্ত হবে তাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে এবং পরে গোটা জমিনকে নাশতা বানিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।
এ বিষয়ে জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.-এর অভিমত হলো, হাশরের ময়দানে লোকেরা তিনটি জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অবস্থান করবে। প্রথমত সকলে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে। তারপর অবশিষ্ট লোকেরা জান্নাতে সুশৃঙ্খলভাবে যাবে। হাশরের ময়দান ছেড়ে যখন সবাই পুলসিরাতের অভিমুখী হবে এবং হাশরের ময়দান খালি হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই জমিনকে রুটি বানিয়ে প্রথম মেহমানদারীস্বরূপ জান্নাতীদের পেশ করবেন।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, পৃথিবীর এই জমিন তো মাটি, পাথর ও সূক্ষ্মকণা ভরা। জান্নাতবাসী কীভাবে তা ভক্ষণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে গিয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রহ. বলেন, ‘সেদিন জমিন থেকে ভারী ও শক্ত বস্তুগুলোকে আলাদা করে ফেলা হবে। এটাই যুক্তিসঙ্গত কথা। কারণ, জমিনে সকল প্রকার উপাদান বিদ্যমান। সেগুলোকে পৃথক করা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য কোনো বিষয়ই না।’
টিকাঃ
৬৪৭. বুখারী, ২/১০০৩, হাদিস নং-৬৯৭১।
৬৪৮. ফাতহুল বারী, ১১/৪৮৫; ফয়জুল বারী, ৪/৪৩২।
৯৫০. মা'আরিফুল আ'বার, ২৬৬।
📄 হাশর দিবসের সম্মান ও অপমান
হাশরের ময়দানে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষ ও জিন একত্র হবে। প্রত্যেকে অপরকে দেখবে এবং ময়দানে হাশরের সকল পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করবে। সেদিন যেই সম্মান পাওয়া যাবে, তার চেয়ে অধিক কোনো সম্মান নেই। আর যেই হতভাগ্য সেদিন লাঞ্ছনা ভোগ করবে, তার চেয়ে অধিক লাঞ্ছিত আর কেউ নেই। হাশরের ময়দানে যখন কোনো সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সফলতার কথা ঘোষণা করা হবে এবং প্রকাশ্যে সকলের সামনে তাকে মুকুট পরানো হবে, তখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত তার সফলতার খবর পাবে। এই সম্মান এত বিশাল হবে যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর। অপরদিকে সেখানকার অপমানও সবচেয়ে বড় অপমান। দুনিয়ার লাঞ্ছনা তো খুবই সীমিত। কিন্তু আল্লাহ না করুন, ময়দানে হাশরে কেউ অপমানিত হলে এর চেয়ে অপমানের আর কিছুই নেই। এ কারণেই কুরআনে কারীমের স্থানে স্থানে হাশরের ময়দানে কাফেরদের ভয়াবহ লাঞ্ছনার দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি আয়াত তুলে ধরা হলো :
১. ‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে কোরো না। তাদেরকে তো ঐদিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে। তারা মস্তক উপরে তুলে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে।’
২. ‘আমি কিয়ামতের দিন তাদের সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়, অন্ধ অবস্থায়, মূক অবস্থায় এবং বধির অবস্থায়।’
৩. ‘এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থাপিত করব। সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থাপিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।’
৪. ‘যদি আপনি দেখেন যখন অপরাধীরা তাদের পালনকর্তার সামনে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা দেখলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আমাদেরকে পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে গেছি।’
৫. ‘যেদিন শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীদেরকে সমবেত করব নীল চক্ষু অবস্থায়। তারা চুপিসারে পরস্পর কথা বলবে, তোমরা মাত্র দশ দিন অবস্থান করেছিলে। তারা কী বলে তা আমি ভালোভাবে জানি। তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত উত্তম পথের অনুসারী সে বলবে, তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে।’
এখানে মাত্র কয়েকটি দৃশ্য তুলে ধরা হলো। এছাড়া কিয়ামতের দিন বেঈমান ও বেআমল লোকজন যে লাঞ্ছনা, তুচ্ছতা ও শাস্তির মুখোমুখি হবে, তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে ঈমানদারগণ যে সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত হবে, তা-ও বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তয়ালা আমাদের সেদিনের অপমান থেকে রক্ষা করুন এবং প্রকৃত সম্মানে ভূষিত করুন। আমীন।
টিকাঃ
৯৫০. সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২-৪৬।
৯০১. সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২-৪৬।
৯০২. সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৯৭।
৯০৩. সূরা ত-হা, আয়াত : ১২৪-১২৬।
৯০৪. সূরা সাজদা, আয়াত : ১২।
৯০৫. সূরা ত-হা, আয়াত : ১০২-১০৪।
📄 হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম পোশাক পরিধানকারী
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বয়ান করেন : তোমাদের নগ্ন পায়ে, বিবস্ত্র ও খতনাহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। (কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে) ‘আমরা প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব’। আর কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কাপড় পরিধান করানো হবে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালামকে।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দুটি কিবতী পোশাক পরিধান করানো হবে। অতঃপর তিনি আরশে আযীমের ডান পার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকবেন।
উলামায়ে কিরাম বলেন, ‘নমরুদ যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপের হুকুম দেয়, তখন তাঁকে বিবস্ত্র করা হয়েছিল। সেই দিনের প্রতিদানস্বরূপ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তাঁকে পোশাক পরিধান করানো হবে।’ আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শনের কারণে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান হন না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেদিন যে পোশাক পরানো হবে, তা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাপড়ের চেয়ে অধিক শানদার হবে। যদিও সর্বপ্রথম পরিধান করানোর মর্যাদা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম লাভ করবেন, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পোশাক অধিক শানদার হওয়া তাঁর উচ্চ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।
টিকাঃ
৯০৭. বুখারী, ২/৯৬৭, হাদিস নং-৬৫২২।
৯০৮. ফাতহুল বারী, ১৪/৪৮৭।