📄 দ্বিতীয় জীবন ও ময়দানে হাশরে মহাসমাবেশ
অতঃপর দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে। এতে সকল মানুষ জীবন ফিরে পাবে এবং সবাই হাশরের ময়দানের দিকে রওনা হবে। কুরআনে কারিমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে। তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং স্বয়ং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন। এটা তো হবে কেবল মহানাদ। সে মুহূর্তেই তাদের সবাইকে আমার সামনে উপস্থিত করা হবে।’
সেদিন সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞান ফিরে পাবেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন সকল মানুষ জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। আমিই সর্বপ্রথম জ্ঞান ফিরে পাব। আমি দেখব, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আরশের এক পার্শ্ব ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি জানি না, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জ্ঞান হারিয়ে আমার পূর্বে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন? নাকি আল্লাহ তায়ালা তাকে জ্ঞানহারাদের দলভুক্ত করেননি?’
ইমাম কুরতুবী রহ. শায়েখ আবুল আব্বাস রহ. থেকে বর্ণনা করেন, ‘যখন প্রথমবার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন জীবিতরা মৃত্যুবরণ করবে। আর আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম পূর্বে মৃত্যুবরণ করলেও বরযখী জগতের বিশেষ জায়গায় থাকেন। তাঁরা প্রথম ফুঁয়ের আওয়াজে বেহুঁশ হয়ে যাবেন। অতঃপর দ্বিতীয়বার যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞান ফিরে পাবেন। আল্লাহ তায়ালার দরবারে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখবেন, পূর্ব থেকেই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আরশে আজিমের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিধা-সংশয়ে পড়ে যাবেন যে, মূসা আলাইহিস সালামকে কি বেহুঁশ হওয়া থেকে নিরাপদ রাখা হয়েছে (কারণ তূর পর্বতে তিনি একবার আল্লাহর নূরের ঝলকানিতে বেহুঁশ হয়েছিলেন) নাকি তিনি আমার পূর্বে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন? যা হোক, এটা মূসা আলাইহিস সালামের এক বিশেষ মর্যাদা। এ কারণে সবদিক থেকে তিনি শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তুলনায় মর্যাদাবান হন না।’
কোনো কোনো রেওয়ায়েতে এও বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওজা মোবারক থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা থাকবে এবং তাঁর ডানে ও বামে হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রা. থাকবেন। এরপর জান্নাতুল বাকি ও জান্নাতুল মুআল্লায় শায়িত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ তাঁর শিবিরের সাথে যোগদান করে হাশরের দিকে রওনা হবেন।
টিকাঃ
৫৫৯. সূরা ইয়াসিন, আয়াত : ৫১-৫৩।
৬৪০. বুখারী, ২/৭৩২, হাদিস নং-৬৯৭১।
৬৪১. আত-তাজকিরা, ১/৩৩২; রুহুল মা'আনী, ২৪/১৪৯।
৬৪২. আত-তাজকিরা, ১/১১৪।
📄 আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ
মৃত্যুর পর মানুষ যদিও মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু মেরুদণ্ডের হাড়ের নিচের একটি দানা কোথাও না কোথাও অবশিষ্ট থাকে, যা সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তায়ালা ই জানেন। এর ওপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষকে দ্বিতীয়বার শরীর দান করে তাতে প্রাণ সরবরাহ করবেন। প্রত্যেক ব্যক্তিকে ৬০ হাত লম্বা শরীর দেওয়া হবে। সেদিন সবাই বিবস্ত্র থাকবে। সবাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পানে ছুটবে।
দুনিয়ার অহংকারীদলের সকল অহংকার ধূলিস্যাৎ হবে। রাজা, ধনী-গরিব, জ্ঞানী-মূর্খ সকলেই আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে অবনতমস্তকে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে সবাই শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার হিম্মত হারিয়ে ফেলবে। সবাই ‘ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী’ বলতে থাকবে। যে যত বড় অপরাধী হবে, সে ততবেশি লাঞ্ছিত, অপদস্থ হবে। সেদিনের ভয়াবহতা কুরআনে কারিমে নিম্নোক্ত ভাষায় বিবৃত হয়েছে :
‘সেদিন তারা বের হয়ে পড়বে, আল্লাহর কাছে তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। আজ রাজত্ব কার? এক প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহর। আজ প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের প্রতিদান পাবে। আজ জুলুম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করুন, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। পাপিষ্ঠদের জন্য কোনো বন্ধু নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে।’
আল্লাহ আকবার! সে দিনের কল্পনা করলেই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, শরীর ঝাঁকুনি দেয়। সেদিন দুনিয়ার মান-মর্যাদা, ধন-সম্পদ, বংশগৌরব কিছুই কাজে আসবে না। সেদিন চিন্তামুক্ত ও শান্তিতে কেবল সেই থাকবে, যে এই দিন আসার পূর্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছে। হে দয়াময় মালিক, সেদিনের ভয়াবহতা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমীন, সুম্মা আমীন।
টিকাঃ
৬৪৩. সুরা মুমিন, আয়াত : ১৬-১৮।
📄 ময়দানে হাশর
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশসমূহকে এবং লোকেরা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে পেশ হবে। সেদিন পাপীদেরকে পরস্পর শৃঙ্খলবদ্ধ দেখবে। তাদের জামা হবে দাহ্য আলকাতরার এবং তাদের মুখমণ্ডলকে আগুন আচ্ছন্ন করে ফেলবে। যাতে আল্লাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেন। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’
সেদিন আসমান-জমিন পরিবর্তন হওয়া সম্পর্কে উলামায়েকেরাম ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ব্যাখ্যা করেছেন :
১. অনেক আলেমের বক্তব্য হলো, বাস্তবেও জমিন পরিবর্তন হয়ে এমন ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর একটি রেওয়ায়েত এ কথা সমর্থন করে। এ হিসেবে জমিন পরিবর্তনের বিষয়টি দুই ফুৎকারের মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত হবে। অর্থাৎ প্রথমবার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার পর আসমান-জমিন সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর হাশর কায়েম হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তায়ালা নতুন আসমান ও নতুন জমিন সৃষ্টি করবেন এবং এই নতুন জমিনের উপরেই হাশর হবে।
২. কারও কারও মত হলো, আসমান-জমিনের হাকিকী পরিবর্তন হবে না; বরং এর গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের মাঝে পরিবর্তন আসবে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, ‘কিয়ামতের দিন জমিনকে চামড়ার মত টানা হবে এবং এর ওপরে সকল মাখলুক সমবেত হবে।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘সকল পাহাড় ও ঘরবাড়ি সমতল করে জমিনকে সমতল প্রান্তরে রূপান্তরিত করা হবে।’
৩. তৃতীয় অভিমত হলো, জমিনের বৈশিষ্ট্য প্রথমবার ফুঁ দেওয়ার সময়ই পরিবর্তন হবে। এরপর জমিনকে ভাঁজ করে ভিন্ন আসমান ও জমিন কায়েম করা হবে।
টিকাঃ
৬৪৪. সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪৮-৫১।
৬৪৫. ফাতহুল বারী, ১১/৪৮৫।
৬৪৬. আত-তাজকিরা, ১/১১২; ফাতহুল বারী, ১১/৪৮৫।
📄 বর্তমান জনিমকে রুটি বানানো হবে
বুখারী শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন একটি রুটির মত হবে। আল্লাহ তায়ালা বেহেশতিদের মেহমানদারির জন্য তা নিজের হাতে তুলে নেবেন। যেমন তোমাদের কেউ সফরের সময় রুটি হাতে তুলে নেয়।’ এমন সময় এক ইহুদি এসে বলল, ‘হে আবুল কাসেম, দয়াময় আপনার উপর বরকত নাযিল করুন। কিয়ামতের দিন সম্পর্কে বেহেশতবাসীদের আতিথেয়তা সম্পর্কে আপনাকে কি জানাব না?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ!’ লোকটি বলল, ‘(সেই দিন) সমস্ত ভূমন্ডল একটি রুটি হয়ে যাবে।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলেছিলেন (লোকটিও তেমনই বলেছিল)। এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এমনকি তার দাঁতসমূহ প্রকাশ পেল। এরপর বললেন, ‘তবে কি আমি তোমাদের সেই রুটির তরকারী সম্পর্কে বলব না?’ তিনি বললেন, ‘তাদের তরকারী হবে বালাম ও নূন।’ সাহাবায়েকেরাম বললেন, ‘সে আবার কী?’ তিনি বললেন, ‘ষাঁড় ও মাছ। এদের কলিজা ৭০ জন খেতে পারবে।’
এই হাদিস থেকে জানা যায়, হাশরের ময়দানে ঈমানদাররা ক্ষুধার্ত থাকবেন না। বরং এই জমিনকেই তাদের জন্য রুটি বানিয়ে দেওয়া হবে। এটা যেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে সম্মাননা ও আতিথেয়তাস্বরূপ। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এ থেকে জানা যায়, হাশরের ময়দানে অবস্থানকালে মুমিনদের ক্ষুধার্ত রাখা হবে না, বরং আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরতে জমিনের প্রকৃতিই পাল্টে দেবেন। মুমিনরা কোনোরূপ কষ্ট ছাড়াই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা অনুযায়ী পায়ের নিচ থেকে ভক্ষণ করবে। ‘জমিন জান্নাতবাসীদের জন্য আহার হবে’—একথার অর্থ হলো, যারা জান্নাতের উপযুক্ত হবে তাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে এবং পরে গোটা জমিনকে নাশতা বানিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।
এ বিষয়ে জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.-এর অভিমত হলো, হাশরের ময়দানে লোকেরা তিনটি জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অবস্থান করবে। প্রথমত সকলে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে। তারপর অবশিষ্ট লোকেরা জান্নাতে সুশৃঙ্খলভাবে যাবে। হাশরের ময়দান ছেড়ে যখন সবাই পুলসিরাতের অভিমুখী হবে এবং হাশরের ময়দান খালি হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই জমিনকে রুটি বানিয়ে প্রথম মেহমানদারীস্বরূপ জান্নাতীদের পেশ করবেন।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, পৃথিবীর এই জমিন তো মাটি, পাথর ও সূক্ষ্মকণা ভরা। জান্নাতবাসী কীভাবে তা ভক্ষণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে গিয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রহ. বলেন, ‘সেদিন জমিন থেকে ভারী ও শক্ত বস্তুগুলোকে আলাদা করে ফেলা হবে। এটাই যুক্তিসঙ্গত কথা। কারণ, জমিনে সকল প্রকার উপাদান বিদ্যমান। সেগুলোকে পৃথক করা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য কোনো বিষয়ই না।’
টিকাঃ
৬৪৭. বুখারী, ২/১০০৩, হাদিস নং-৬৯৭১।
৬৪৮. ফাতহুল বারী, ১১/৪৮৫; ফয়জুল বারী, ৪/৪৩২।
৯৫০. মা'আরিফুল আ'বার, ২৬৬।