📄 কিয়ামত অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই পৃথিবীকে একটা নির্দিষ্ট কালের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এমন একটি দিন অবশ্যই আসবে, যেদিন মুহূর্তকালের সারা পৃথিবী তছনছ হয়ে যাবে, সৃষ্টি জগতের যাবতীয় নিয়ম-শৃঙ্খলা ধ্বংস হবে, অপ্রতিরোধ্য সুবিশাল পাহাড়-পর্বত ধুনিত তুলার মতো উড়তে থাকবে। সূর্য, চন্দ্র ও হাজার বছর ধরে আলো দানকারী তারকারাজি জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে। সে-সময়ের কথা ভাবতে শিরা-উপশিরা শিউরে ওঠে, শরীরে কম্পন সৃষ্টি হয়। কুরআন ও হাদিসে কিয়ামতের পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনের প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বস্তুত কিয়ামতের চিন্তাভাবনাই মানুষকে অপকর্ম হতে বিরত থাকতে অনুপ্রাণিত করে। পক্ষান্তরে কিয়ামত সম্পর্কে উদাসীনতা মানুষকে বিপদসংকুল পথে পরিচালিত করে। বিভিন্ন মতাদর্শের ধারক-বাহক অসংখ্য মানুষ কেবল এই জন্য বিভ্রান্ত হয়েছে, তাদের কাছে কিয়ামতের চিন্তাভাবনা বলতে কিছুই নেই। পার্থিব জীবনকেই তারা সবকিছু মনে করে। আর যেহেতু তাদের ধর্মে পরকালের কোনো পরিচিতি নেই, সেহেতু জীবন-পরবর্তী জীবনের জন্য কোনো প্রস্তুতিও নেই। এই কারণে ইসলামের মূল ভিত্তি ও গুরুত্বপূর্ণ আকিদা-বিশ্বাসের একটি হলো কিয়ামত ও আখেরাতের উপর ঈমান আনা। কুরআনুল কারিমে এবং হাদিস শরিফে কিয়ামতের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
টিকাঃ
৪৭০. সূরা লুকমান, আয়াত : ৩৪।
📄 কিয়ামত কখন প্রতিষ্ঠিত হবে?
কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কেউ জানেন না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ
নিঃসন্দেহে কিয়ামতের জ্ঞান আল্লাহর নিকটেই। ৪৭০ হাদিস জিবরাঈলে এসেছে, হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, কিয়ামত কখন প্রতিষ্ঠিত হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর চেয়ে আমি বেশি জানি না (অর্থাৎ জিজ্ঞাসাকারী যেমন এ বিষয়ে কিছুই জানে না, তদ্রূপ আমিও এর নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে অনবগত)। ৭১৯
একথা স্পষ্ট যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না জানলে পৃথিবীর আর কোনো ব্যক্তিই জানতে পারে না।
টিকাঃ
৪৭০. সূরা লুকমান, আয়াত : ৩৪।
৭১৯. মুসলিম, ২/২৯।
📄 কিয়ামতের আলামতের ধারাবাহিকতা
উল্লিখিত হাদিসে কিয়ামতের আলামতসমূহের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি। অন্যান্য হাদিসে এর ক্রমধারা রক্ষা করা হয়েছে। তবে এর মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। একারণেই মুহাক্কিক উলামায়েকেরাম কিয়ামত বিষয়ক সমস্ত হাদিসকে সামনে রেখে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, উল্লিখিত দশটি আলামত দুই ধরনের : ১. কিয়ামতের ভূমিকাস্বরূপ কয়েকটি আলামত প্রকাশ পাবে। ভূমিধসের ঘটনা দ্বারা এই প্রকার আলামতের সূচনা হবে। অতঃপর দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আবির্ভাব হবে। তারপর ধোঁয়া ও ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।
২. দ্বিতীয় প্রকার আলামতের সম্পর্ক হলো সৃষ্টিজগতের বৈষয়িক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে। এই প্রকার আলামতের সূচনা হবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার মাধ্যমে। এই আলামতদুটো যেহেতু আল্লাহর কুদরতের প্রতি মানুষের আস্থা সৃষ্টি করবে। কাজেই তখন তাওবা ও ঈমানের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং সেই দিন সন্ধ্যায় 'দাব্বাতুল আরদ' বের হবে, যেই প্রাণী কাফের ও মুমিনের মাঝে চিরকালের জন্য পার্থক্য সৃষ্টি করবে। এর কিছুকাল পর এক বিশেষ ধরনের বায়ু প্রবাহিত হবে, এতে সকল মুমিন মৃত্যুবরণ করবে। ভূপৃষ্ঠে কোনো মুমিন অবশিষ্ট থাকবে না। এরপর সর্বশেষ আলামত হিসেবে অগ্নিকুণ্ডের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। তা অবশিষ্ট সকল মানুষকে সিরিয়াভূমিতে একত্র করবে এবং এখানেই হাশরের মাঠে কায়াম হবে। মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, শেষ দশটি আলামতের মাঝে সর্বশেষ আলামত হলো আগুন, যার উদগীরণ ঘটবে ইয়ামেন থেকে। তা মানুষের হাশরের ময়দানে (সিরিয়ায়) তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
টিকাঃ
৭১৯. মুসলিম; ইকমালুল মু'লিম, ৮/৪৪২।
📄 কিয়ামতের পূর্বে সিরিয়ায় লোকজনের সমাবেশ
কিয়ামতের খুব নিকটবর্তী সময়ে ফিতনার যুগে লোকদের সিরিয়ায় একত্র করে হাশরের ময়দানে হিজরত করানো হবে। বিভিন্নভাবে মানুষ সিরিয়ায় একত্র হবে। বুখারী শরিফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, মানুষদের তিন দলে একত্র করা হবে। একদল তো হবে আল্লাহ তায়ালার প্রতি আশিক ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত। বান্দাদের দ্বিতীয় দল হবে দুজন, তিনজন, চারজন বা দশজন এক উটের উপর আরোহণকারী। আর অবশিষ্ট লোকদের অগ্নি একত্র করবে। যেখানে তারা বিশ্রাম নেবে, আগুনও সেখানে থাকবে। তারা যেখানে রাত্রি যাপন করবে, আগুনও তাদের সঙ্গে রাত্রি যাপন করবে। তারা যেখানে প্রভাত করবে, আগুনও সেখানে প্রভাত করবে। যেখানে তাদের সন্ধ্যা হবে, আগুনও সেখানে সন্ধ্যা হবে।
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে আল্লামা খাত্তাবী ও আল্লামা তিব্বী রহ.-এর সূত্রে উক্ত হাদিসকে কিয়ামতের অতি নিকটে সংঘটিত ঘটনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, যখন আগুনের উৎপত্তি ঘটবে তখন প্রথম দল শান্তিতে বাহনে আরোহণ করে মুক্তির আশায় এবং গুনাহের অশুভ পরিণামের আশঙ্কায় দোদুল্যমান অবস্থায় সিরিয়ায় পৌঁছাবে। দ্বিতীয় দল ঐসব লোক, যারা অলসতার কারণে আগুনের উৎপত্তির সময় বাহন যোগাতে পারবে না। ফলে এক উটের উপর কয়েকজন আরোহণ করে রওনা হবে। তখন বাহনের এত তীব্র সংকট দেখা দেবে যে, মানুষ একটা উটের বিনিময়ে নিজের বিশাল বাগান প্রদান করতেও প্রস্তুত থাকবে। আর তৃতীয় দল হবে ঐসব লোক, যাদের কাছে কোনো বাহন বা জন্তু থাকবে না। ফলে আগুন তাদের পদব্রজে ময়দানে হাশরের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে।
টিকাঃ
৭১৯. বুখারী, ২/৯৪০, হাদিস নং-৬০২১।
৭১০. ফাতহুল বারী, ৪/৪৮৯; মুফহিম, ৭/২০৯-২৪০।