📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 জীব-জন্তও কবরের আযাব শুনতে পায়

📄 জীব-জন্তও কবরের আযাব শুনতে পায়


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস ও সাহাবায়েকেরামের বক্তব্য থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, মানুষ ও জিনজাতি যদিও কবরের বিভিন্ন অবস্থা শুনতে পায় না, তবে অন্যান্য জীব-জন্তু তা শুনতে পায়। যেমন, বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, মুনকার ও নাকির কবরে প্রশ্ন করা হলে যখন তারা সঠিক উত্তর দিতে পারে না, তখন ফেরেশতারা লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাদের এমন জোরে আঘাত করে যে, তারা চিৎকার করে ওঠে। তখন মানুষ ও জিন ব্যতীত কবরের আশপাশের সকল প্রাণীই এই আওয়াজ শুনতে পায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই কবরবাসীদের কবরে শাস্তি দেওয়া হয়, যার আওয়াজ জীব-জন্তু শুনতে পায়।

হযরত আবুল হাকাম ইবনে বারাকওয়ান রহ. এক ঘটনা বর্ণনা করেন যে, সেখানকার কোনো এক কবরস্থানে কাউকে দাফন করে লোকজন পাশেই বসে আলাপ করছিল। নিকটেই একটি প্রাণী ঘাস খাচ্ছিল। প্রাণীটি কবরের কাছে এসে কান পেতে কী যেন শুনছিল। কিছুক্ষণ পর দূরে সরে গেল। এর কিছুক্ষণ পর আবার কবরের পাশে এসে কান পেতে শুনতে লাগল। এভাবে কয়েকবার প্রাণীটি আসা-যাওয়া করল। আবুল হাকাম রহ. বলেন, ‘এই ঘটনা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তি আমার মনে পড়ে গেল : “জীব-জন্তুরা কবরের আযাব শুনতে পায়।”’

টিকাঃ
৭০৯. বুখারী, ১/৪২।
৭১০. কিতাবুর রূহ লি ইবনুল কাইয়্যিম, পৃষ্ঠা : ১১০।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 কবরের আযাব থেকে মুক্তি লাভের উপায়

📄 কবরের আযাব থেকে মুক্তি লাভের উপায়


বিশেষ সময়ে মৃত্যুবরণ তো মানুষের ইচ্ছার বাইরের বিষয়, তবে যেসব ইচ্ছাধীন নেক আমলকে কবরের আযাব থেকে মুক্তির কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, সকল মুসলমানের জন্য সেসব আমল করা আবশ্যক। মূলত সব আমলই স্ব-স্ব স্থানে কবরের আযাব থেকে মুক্তির উপায় হয়। অসংখ্য হাদিসে এ বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর নেক আমল মানুষকে চারপাশে ঘিরে রাখে। আযাব আসার পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত প্রতি রাতে সূরা মুলক তিলাওয়াত করা কবরের আযাব থেকে মুক্তির কার্যকরী আমল। এজন্য সূরা মুলককে ‘মানিআ’ ও ‘মুনজিয়া’ বলা হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, সূরা মুলক তার পাঠকারীর জন্য আযাব মুক্তির সুপারিশ করে এবং তা কবুল হয়। পাশাপাশি জুমার রাতে মাগরিবের পর সূরা যিলযাল দুই রাকাত নামাযের প্রত্যেক রাকাতে ১৫ বার করে পাঠ করাকে আযাব মুক্তির মাধ্যম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়াও কবরের আযাব থেকে নিরাপদ থাকার জন্য যাবতীয় অন্যায় ও গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকাও জরুরি।

টিকাঃ
৩৫২. শরহুল সুদূর, ২০২-২২৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 যেসব কারণে সাধারণত কবরে আযাব হয়

📄 যেসব কারণে সাধারণত কবরে আযাব হয়


হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব গুনাহ চিহ্নিত করে দিয়েছেন, যেগুলোতে লিপ্ত হলে মানুষ কবরের আযাবের উপযুক্ত হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কবরগুলোতে লক্ষ করে তিনি ইরশাদ করেন, এই দুই কবরবাসীর আযাব হচ্ছে। তবে বড় কোনো গুনাহের কারণে এদের আযাব হচ্ছে না (যেমন গুনাহকে তোমরা বড় মনে করো)। এদের একজন চোগলখোরী করত, দ্বিতীয়জন পেশাব থেকে হেফাযতে থাকত না। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি তাজা ডাল নিয়ে দুই টুকরো করে দুই কবরের ওপর দুটি টুকরো গেঁড়ে দেন এবং বলেন, আশা করি, ডালদুটি শুকানো পর্যন্ত এদের আযাব লঘু করা হবে।

উক্ত হাদিসে কবরের আযাবের যে দুটি কারণ বর্ণিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা দরকার। আক্ষেপের বিষয় হলো, বর্তমান সমাজে এই দুই কারণ অধিক হারে বিদ্যমান। গিবত, চোগলখোরী আর অপবাদকে গুনাহই মনে করা হয় না। অনুরূপ অপবিত্রতা তথা পেশাবের ফোঁটা থেকে পবিত্রতা অর্জন করাকে অনর্থক মনে করে। দাঁড়িয়ে পেশাব করা এবং পেশাবের পর পূর্ণ পবিত্র না হওয়াকে দূষণীয় মনে করা হয় না। আল্লাহ আমাদের এই অবস্থা থেকে হেফাযত করুন। আমিন।

টিকাঃ
৫৫০. বুখারী, ১/২০৪; মুসলিম, ১/৯০।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বপ্ন

📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বপ্ন


হযরত সামুরা ইবনে জুনদাব রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যহ ফজরের নামাযের পর আমাদের অভিমুখে বসে জিজ্ঞেস করতেন, ‘তোমরা কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ?’ কোনো সাহাবী স্বপ্ন দেখে থাকলে সে তা বর্ণনা করত। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের একটি দীর্ঘ স্বপ্ন সাহাবায়েকেরামের নিকট বর্ণনা করলেন : ‘গত রাতে আমি দেখলাম, দুজন লোক এসে আমার দুই হাত ধরে আমাকে পবিত্র ভূমির দিকে নিয়ে চলল। হঠাৎ দেখতে পেলাম, এক ব্যক্তি বসে আছে আর এক লোক লোহার আকড়া হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দণ্ডায়মান ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তির এক পাশের চোয়ালে এমনভাবে আকড়া বিদ্ধ করছিল যে, তা চোয়াল বিদীর্ণ করে মস্তকের পশ্চাদভাগ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে যাচ্ছিল। তারপর অপর চোয়ালেও পূর্ববৎ আচরণ করছিল। ততক্ষণে প্রথম চোয়াল জোড়া লেগে যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এ কি হচ্ছে?” সাথীরা বললেন, “চলুন।” আমরা চলতে চলতে চিৎ হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির পাশে এসে উপস্থিত হলাম, তার শিয়রে পাথর হাতে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ করে দিচ্ছিল। নিক্ষিপ্ত পাথর দূরে গড়িয়ে যাওয়ায় তা নিয়ে শায়িত ব্যক্তির নিকট ফিরে আসার পূর্বেই চূর্ণ মাথা আগের মতো জোড়া লেগে যাচ্ছিল। সে পুনরায় মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছিল। আমরা অগ্রসর হয়ে চুলার ন্যায় এক গর্তের নিকট উপস্থিত হলাম। গর্তের উপরিভাগ ছিল সংকীর্ণ আর নিচের অংশ ছিল প্রশস্ত এবং এর নিচে আগুন জ্বলছিল। আগুন গর্ত মুখের নিকটবর্তী হলে সেখানকার লোকগুলো উপরে চলে আসত। আগুন ক্ষীণ হয়ে গেলে তারা তলদেশে ফিরে যেত। গর্তের মধ্যে বহুসংখ্যক উলঙ্গ নারী-পুরুষ ছিল। আমরা চলতে চলতে একটি রক্ত প্রবাহিত নদীর নিকট উপস্থিত হলাম। নদীর মাঝখানে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিল। নদীর তীরে অপর এক ব্যক্তি ছিল, যার সামনে পাথর রাখা। মাঝখানের লোকটি নদী থেকে বের হওয়ার জন্য অগ্রসর হলেই তীরে দাঁড়ানো লোকটি তার মুখ বরাবর পাথর নিক্ষেপ করত, এতে সে আগের জায়গায় ফিরে যেত। আমরা চলতে চলতে একটি সবুজ বাগানে উপস্থিত হলাম। এতে একটি বড় গাছ ছিল। গাছটির গোড়ায় একজন বয়োবৃদ্ধ লোক ও কিছু বালক-বালিকা ছিল। হঠাৎ দেখি যে, গাছটির সন্নিকটে এক ব্যক্তি সামনে আগুন রেখে তা প্রজ্বলিত করছিল। সাথিবয় আমাকে নিয়ে গাছের আরও উপরে আরোহণ করে এক সুদৃশ্য বাড়িতে প্রবেশ করালেন। বাড়িটিতে কতিপয় বৃদ্ধ ও যুবক অবস্থান করছিলেন। সাথিরা বললেন, “আপনি যে ব্যক্তির চোয়াল বিদীর্ণ করার দৃশ্য দেখলেন, সে মিথ্যাবাদী। সে মিথ্যা বলে বেড়াত। কিয়ামত পর্যন্ত তার সাথে এমন ব্যবহার করা হবে। আপনি যার মাথা চূর্ণ করতে দেখলেন, সে এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের শিক্ষা দান করেছিলেন, কিন্তু রাতের বেলায় সে কুরআন থেকে বিরত হয়ে নিদ্রা যেত এবং দিনের বেলায় কুরআন অনুযায়ী আমল করত না। গর্তের মধ্যে যাদের আপনি দেখলেন, তারা ব্যভিচারী। রক্ত প্রবাহিত নদী যে আপনি দেখলেন, সে সুদখোর। গাছের গোড়ায় যে বৃদ্ধ ছিলেন তিনি ইবরাহীম আলাইহি সালাম এবং তাঁর চারপাশের বালক-বালিকারা মানুষের সন্তান। যিনি আগুন জ্বালাচ্ছিলেন তিনি হলেন জাহান্নামের রক্ষী মালিক। আপনি যে বাড়িতে প্রবেশ করলেন তা শহিদগণের আবাসস্থল। আমি হলাম জিবরাইল আর ইনি হলেন মিকাইল।” জিবরাইল আমাকে বললেন, “আপনার মাথা উপরে ওঠান।” আমি মাথা উঠিয়ে মেঘমালার ন্যায় কিছু দেখতে পেলাম। তাঁরা বললেন, “এটাই হলো আপনার আবাসস্থল।” আমি বললাম, ‘আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আমার আবাসস্থলে প্রবেশ করি।’ তাঁরা বললেন, ‘এখনও আপনার হায়াতের কিছু সময় অবশিষ্ট রয়ে গেছে, যা পূর্ণ হয়নি। অবশিষ্ট সময় পূর্ণ হলে অবশ্যই আপনি নিজ আবাসে চলে আসবেন।”

টিকাঃ
৫৫২. বুখারী, ২/৮১৩, হাদিস নং-৩৪৩২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px