📄 কবরের শান্তি ও শাস্তি সত্য
প্রসিদ্ধ হাদিস দ্বারা একথা প্রমাণিত, কবরের শাস্তি ও শান্তি সত্য। এটা বুদ্ধির অযোগ্য এবং অদৃশ্য এমন এক আকিদা, যে বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য যুক্তির আশ্রয় নেওয়া নির্ভীকতার পরিচায়ক। কারণ ইহলৌকিক জীবনের সাথে কবরের শাস্তি ও শান্তির কোনো সম্পর্ক নেই; এটা পারলৌকিক বিষয়। আমাদের দুর্বল যুক্তিবুদ্ধি এর প্রকৃত তত্ত্ব উদ্ঘাটনে অক্ষম। কাজেই কুরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা যেমন কিয়ামত, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি, অনুরূপ কবরের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কেও আমাদের ঐশী জ্ঞানের প্রতি পূর্ণরূপে বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরি। যেহেতু বিশুদ্ধ সনদ ও গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে আমাদের নিকট নিশ্চিত জ্ঞান (ইলম) পৌঁছেছে, তাই তা অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। কেবল যুক্তি ও নিজের বুঝে না আসার দোহাই দিয়ে অকাট্য প্রমাণিত আকিদাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা কোনোভাবেই জায়েয নেই। উলামায়েকেরাম একথাও সুষ্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘কবরের শাস্তি ও শান্তি দ্বারা শুধু কবরের স্থান উদ্দেশ্য নয়; বরং আলমে বরযখ (মৃত্যু থেকে কিয়ামত কায়েম হওয়া পর্যন্ত সময়) উদ্দেশ্য। তাই কাউকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হলো বা কেউ সমুদ্রে ডুবে মারা গেলো কিংবা কাউকে হিংস্র প্রাণী খেয়ে ফেলল অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হলেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে শাস্তিদানে পূর্ণ ক্ষমতাবান। আর এই সকল অবস্থা কেবল রুহের ওপরই আবর্তিত হয় না, রুহ ও শরীর দুটোর ওপরই কবরের শান্তি ও শাস্তি উভয়ই অবশ্যই আবর্তিত হয়। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত এ ব্যাপারে এক ও অভিন্ন মত পেশ করেছেন।’
কতিপয় বদদীন লোক কবরের আযাব ওপর নানা প্রশ্ন তোলে। যেমন : কবর খুলে দেখলে তো ফেরেশতা দেখা যায় না। মুমিন বান্দার কবর তো প্রশস্ত হয় না। বরং দাফনের সময় কবর দৈর্ঘ্য-প্রস্থে যতটুকু ছিল, এখনও ততটুকুই আছে ইত্যাদি। সুতরাং কবরবাসীর আযাব হয় বা তারা শান্তিতে থাকে একথা কীভাবে সঠিক হতে পারে? তাদের প্রশ্নের উত্তর হলো, আমাদের দৃষ্টির আড়ালে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া কিংবা শান্তিতে রাখা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অসীম ক্ষমতার কাছে অসম্ভব কিছু নয়। এর দৃষ্টান্ত দুইজন ঘুমন্ত ব্যক্তির মতো; যাদের একজন ঘুমন্ত অবস্থায় কষ্ট অনুভব করে, অপরজন সুন্দর স্বপ্ন দেখে আনন্দ অনুভব করে। অনুরূপ মৃত ব্যক্তিও যেসব অবস্থার সম্মুখীন হয়, সাধারণত আমরা তা অনুভব করতে পারি না।
এটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহান প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। কারণ জীবদ্দশায় মানুষকে কবরের আযাব দেখানো হলে মানুষ মৃতদের দাফন করা ছেড়ে দিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা দাফনকার্য ছেড়ে দেবে, আমি যদি এই আশঙ্কা না করতাম, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম তিনি যেন মানুষদেরকে কবরের আযাব দেখান।’
মোটকথা, কবরবাসীর অবস্থার সম্পর্ক হলো আলমে বরযখের সাথে। পার্থিব জীবনের সঙ্গে এর তুলনা করা যাবে না। যদি কুরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া না হতো, তাহলে এ সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান থাকত না। তাই নিরাপদ পথ ও পস্থা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের ওপর ঈমান এবং কবরের সকল অবস্থার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা। এ ব্যাপারে কোনো রকম সন্দেহ না রাখা।
টিকাঃ
৭০৩. শরহুস সুদূর, ২৪৭।
৭০৪. আত্ব-তাযকিরা, ১৪০।
৭০৫. নববী শরহে মুসলিম, ২/৬৯।
📄 কবরের আযাব থেকে মুক্তিপ্রার্থনা
আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, এক ইহুদী মহিলা তাঁর কাছে এসে তাঁর জন্য এই দোয়া করল, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তাশরিফ আনলে আমি তাঁকে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি ইরশাদ করলেন, ‘নাঈমু আযাবিল ক্বাবরি হাক্কুন’ অর্থাৎ হ্যাঁ, কবরের আযাব সত্য। হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'এরপর থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক নামাযের পর কবরের আযাব থেকে মুক্তি চাইতেন।’
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া করতেন :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ.
আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের আযাব থেকে, জীবন্ত-মৃত সবার ফিতনা থেকে এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রাস্তায় তিনি কয়েকজন মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার পর ইরশাদ করেন, ‘ইন্না হাযিহিল উম্মাতা তুবতালা ফী কুবুরিহা ফালাউলা আন লা তাদাফানু লাদাওয়াতুল্লাহ আন ইউসমিয়াকুম মিন আযাবিল ক্বাবরিল্লাযী আসমাউ মিনহু’ অর্থাৎ এসকল লোক কবরে আযাব পাচ্ছে। তোমরা দাফনকার্য ছেড়ে দেবে, আমি যদি এই আশঙ্কা না করতাম তাহলে কবরের আযাব যেমন আমি শুনতে পাই তোমরাও যেন শুনতে পাও সেই দোয়া করতাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়েকেরামের দিকে ফিরে তাঁদের কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব, ফিতনা-ফাসাদ এবং দাজ্জালের মহা ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনার ব্যাপারে নসিহত করেন।
টিকাঃ
৭০৬. বুখারী, ১/১০১।
৭০৭. বুখারী, ১/১৯৪।
৭০৮. মুসলিম, ২/৯৮।
📄 জীব-জন্তও কবরের আযাব শুনতে পায়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস ও সাহাবায়েকেরামের বক্তব্য থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, মানুষ ও জিনজাতি যদিও কবরের বিভিন্ন অবস্থা শুনতে পায় না, তবে অন্যান্য জীব-জন্তু তা শুনতে পায়। যেমন, বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, মুনকার ও নাকির কবরে প্রশ্ন করা হলে যখন তারা সঠিক উত্তর দিতে পারে না, তখন ফেরেশতারা লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাদের এমন জোরে আঘাত করে যে, তারা চিৎকার করে ওঠে। তখন মানুষ ও জিন ব্যতীত কবরের আশপাশের সকল প্রাণীই এই আওয়াজ শুনতে পায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই কবরবাসীদের কবরে শাস্তি দেওয়া হয়, যার আওয়াজ জীব-জন্তু শুনতে পায়।
হযরত আবুল হাকাম ইবনে বারাকওয়ান রহ. এক ঘটনা বর্ণনা করেন যে, সেখানকার কোনো এক কবরস্থানে কাউকে দাফন করে লোকজন পাশেই বসে আলাপ করছিল। নিকটেই একটি প্রাণী ঘাস খাচ্ছিল। প্রাণীটি কবরের কাছে এসে কান পেতে কী যেন শুনছিল। কিছুক্ষণ পর দূরে সরে গেল। এর কিছুক্ষণ পর আবার কবরের পাশে এসে কান পেতে শুনতে লাগল। এভাবে কয়েকবার প্রাণীটি আসা-যাওয়া করল। আবুল হাকাম রহ. বলেন, ‘এই ঘটনা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তি আমার মনে পড়ে গেল : “জীব-জন্তুরা কবরের আযাব শুনতে পায়।”’
টিকাঃ
৭০৯. বুখারী, ১/৪২।
৭১০. কিতাবুর রূহ লি ইবনুল কাইয়্যিম, পৃষ্ঠা : ১১০।
📄 কবরের আযাব থেকে মুক্তি লাভের উপায়
বিশেষ সময়ে মৃত্যুবরণ তো মানুষের ইচ্ছার বাইরের বিষয়, তবে যেসব ইচ্ছাধীন নেক আমলকে কবরের আযাব থেকে মুক্তির কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, সকল মুসলমানের জন্য সেসব আমল করা আবশ্যক। মূলত সব আমলই স্ব-স্ব স্থানে কবরের আযাব থেকে মুক্তির উপায় হয়। অসংখ্য হাদিসে এ বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর নেক আমল মানুষকে চারপাশে ঘিরে রাখে। আযাব আসার পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত প্রতি রাতে সূরা মুলক তিলাওয়াত করা কবরের আযাব থেকে মুক্তির কার্যকরী আমল। এজন্য সূরা মুলককে ‘মানিআ’ ও ‘মুনজিয়া’ বলা হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, সূরা মুলক তার পাঠকারীর জন্য আযাব মুক্তির সুপারিশ করে এবং তা কবুল হয়। পাশাপাশি জুমার রাতে মাগরিবের পর সূরা যিলযাল দুই রাকাত নামাযের প্রত্যেক রাকাতে ১৫ বার করে পাঠ করাকে আযাব মুক্তির মাধ্যম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়াও কবরের আযাব থেকে নিরাপদ থাকার জন্য যাবতীয় অন্যায় ও গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকাও জরুরি।
টিকাঃ
৩৫২. শরহুল সুদূর, ২০২-২২৪।