📄 এই দেহ মাটির সঙ্গে মিশে যাবে
মানবদেহ মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তা মাটিতে মিশে যাবে। এই সুন্দর চোখ—যা সুরমা ও কাজল দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়—ফেটে যাবে এবং চোখের পানি চেহারা বেয়ে পড়বে। এই দেহ, যার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য এবং যা পরিপাটি করে রাখার জন্য বহুবিধ প্রচেষ্টা করা হয়, তা শুকিয়ে নিজে নিজেই পচে যাবে। এই পেট, যার ক্ষুধা নিবারণের জন্য অসংখ্য পথ্য অবলম্বন করা হয়, তা দুর্গন্ধময় হয়ে ফেটে যাবে। কীটপতঙ্গ এই মাটির শরীরে নিজেদের খোরাক বানাবে। মানুষ দুনিয়ায় এই অবস্থাকে ভুলে থাকে; কিন্তু একদিন অবশ্যই অবশ্যই তার সাথে এমনটা হবে। এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করার জন্য একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়েকেরামকে সম্বোধন করে বলেন, কবর দৈনন্দিন সুস্পষ্ট ভাষায় এই ঘোষণা করে, ‘হে আদম সন্তান, তুমি আমাকে কীভাবে ভুলে গেলে? তুমি কি জানোনা, আমি নির্জনতার ঘর, আমি সফরের জায়গা, আমি বড়ই ভয়াবহ, আমি কীটপতঙ্গের ঘর, আমি খুবই সংকীর্ণ? তবে ঐ মহান ব্যক্তির জন্য আমি অতি প্রশস্ত, যার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাকে প্রশস্ত করে দেন।’ অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কবর হয়তো জাহান্নামের একটি ঘর, অথবা জান্নাতের একটি বাগান।’ এইজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তায়ালাকে লজ্জা করার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘মৃত্যু ও শরীর চূর্ণবিচূর্ণ হওয়াকে স্মরণ করবে।’
টিকাঃ
৫২০. মাজমাউয যাওয়াহেদ, ৩/৪৬; শরহুস সুদূর, ৬৯৫।
📄 যেই সৌভাগ্যবানদের শরীর সুরক্ষিত থাকবে
আল্লাহ তায়ালা নিজের কতিপয় নেককার বান্দার সম্মানে নিজের অপরিসীম ক্ষমতা এভাবেও প্রকাশ করেন যে, বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ও মাটির নিচে তাদের শরীর হেফাযতে থাকে। জমিন এসব পবিত্র দেহ ভক্ষণ করতে পারে না। এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের মাঝে প্রথম স্তরে রয়েছে হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জমিনের জন্য নবীগণের শরীর হারাম করে দিয়েছেন। একারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, সকল নবীর শরীর কবরে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের এক বিশেষ প্রকার হায়াত (যাকে হায়াতে বরযখী বলা হয়) প্রদান করা হয়। কিছু শহিদের ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শীগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন, দাফন করার দীর্ঘদিন পরও তাঁদের শরীর সুরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
টিকাঃ
৫২১. আবু দাউদ, ১/৯৩৩।
৫২২. রুহুল মা'আনী, ২১/১।
📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে তামের রহ.-এর ঘটনা
পূর্ববর্তী উম্মতের মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে তামের নামে এক বুযুর্গ ছিলেন, যিনি অত্যাচারী শাসকের সামনে হক প্রকাশ করেছিলেন। সূরা বুরূজে সেই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে তিরমিযী শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত উমর ইবনে খাতাব রা.-এর আমলে আবদুল্লাহ ইবনে তামের রহ.-এর কবর কোনোভাবে খুলে গেলে দেখা যায়, তার দেহ অপরিবর্তিত ও সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। তার হাত কানের ওপর ছিল, যেমন ছিল মৃত্যুর সময়।
টিকাঃ
৫২৩. তিরমিযী, ২/১৭১।
📄 উহুদ যুদ্ধের কয়েকজন শহিদের অবস্থা
হযরত জাবের রা. বলেন, আমি আমার বাবা হযরত আবদুল্লাহ রা. (যিনি উহুদ যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন)-এর কবর মৃত্যুর ছয় মাস পর কোনো প্রয়োজনে খুলে তাঁর দেহ মোবারক সেখান থেকে স্থানান্তর করি। তখমও তাঁর দেহ মোবারকের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে কিছুটা ধূলোমলিন হয়েছিলেন। উহুদ যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী দুইজন সাহাবী আমর ইবনে জামুহ ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম রা.-কে একই কবরে দাফন করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর একবার মদিনায় বন্যা প্লাবিত হয়। বন্যায় তাঁদের কবর ভেসে যায়। লোকজন তাঁদের দেহ মোবারক সেখান থেকে অন্যত্র নেওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে দেখেন, তাঁদের দেহে সামান্য পরিবর্তনও আসেনি। মনে হচ্ছিল, যেন তাঁরা গতকালই শাহাদাতবরণ করেছেন। একজন ক্ষতস্থানে হাত রাখা অবস্থায় ছিলেন। হাতটি ক্ষতস্থান থেকে সরানোর চেষ্টা করতে তা পুনরায় সেস্থানে চলে যায়।
অন্যান্য শহিদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা বর্ণিত আছে। আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রহ. তারিখে ইবনুল জাওযী থেকে বর্ণনা করেন, 'একবার বসরা নগরীর একটি টিলা থেকে সাতটি কবর প্রকাশ পায়। কবরগুলোতে সাতটি লাশ ছিল। সবার শরীর সুরক্ষিত ছিল। তাঁদের কাফন থেকে মেশক আম্বরের ঘ্রাণ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। তাঁদের একজন ছিলেন সুন্দর যুবক। তাঁর চুল ছিল লম্বা। ঠোঁট এমন সতেজ ছিল যে, যেন এখনই পানি পান করেছেন। চোখে সুরমা লাগানো ছিল। পেটে ক্ষতের চিহ্ন ছিল। কেউ কেউ তাঁর চুল টেনে দেখে, তা জীবিত মানুষের চুলের ন্যায় শক্ত ছিল।
টিকাঃ
৫২৪. উসদুল গাবা, ৩/২৪৪।
৫২৫. উসদুল গাবা, ৩/২৪৪; তাযকিরা, ১৯৫; শরহুস সুদূর, ৪১২।
৫২৬. শরহুস সুদূর, ৬১৩।