📄 মুবাসশির বাশির
অধিকাংশ বর্ণনায় পাওয়া যায়, কবরে প্রশ্নকারী ফেরেশতাদের নাম হলো মুনকার নাকির। তবে শাফেয়ী মাযহাবের কতিপয় আলেম হতে বর্ণিত আছে যে ফেরেশতারা কাফেরদের প্রশ্ন করবে, তাদের নাম হলো মুনকার নাকির। আর ঈমানদারদের প্রশ্নকারী ফেরেশতাদের নাম হবে মুবাশ্বির ও বাশির (সুসংবাদদাতা)। আল্লাহ তায়ালাই সর্বজ্ঞাত।
টিকাঃ
৩১২. শরহুস সুদূর, ১০০।
📄 কবরে কাফের-মুনাফিকদের করুণ অবস্থা
কবরে কাফের-মুনাফিকদের অবস্থা হয় মুমিন ও মুসলমানদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের মৃত্যুর সময় আসমান থেকে কালো চেহারার ফেরেশতারা দুই টুকরা চ্যাপ্টা চট হাতে অবতীর্ণ হয়। তারা এসে তার সামনে বসে। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তার মাথার পাশে বসে বলে, ‘হে নিকৃষ্ট প্রাণ, আল্লাহর আযাব ও ক্রোধের দিকে রওনা হও।’ একথায় তার রূহ শরীরের এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। মৃত্যুর ফেরেশতা তার রূহকে এমনভাবে টেনে বের করে, যেমন ভেজা কাপড় দিয়ে কাঁটাদার বৃক্ষ পেঁচিয়ে তারপর সজোরে টেনে বের করা হয়। এরপর মালাকুল মওত সেই রূহকে হাতে নেয় এবং অন্য ফেরেশতারা দুর্গন্ধময় চটে তা পেঁচিয়ে ফেলে। মৃত লাশ পচে ফেটে গেলে যেমন দুর্গন্ধ বের হয় সেই চট থেকে তেমন দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। তারা তাকে নিয়ে আসমানের দিকে রওনা হলে ফেরেশতাদের কোনো দলের পাশ অতিক্রম করলেই তারা জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কোন্ অপবিত্র রূহ?’ তারা অত্যন্ত খারাপ উপাধি ও নামের সাথে তার পরিচয় তুলে ধরে। একপর্যায়ে তারা তাকে নিয়ে আসমানে পৌঁছে যায় এবং আসমানের দরজা খুলতে চায়; কিন্তু তাদের জন্য দরজা খোলা হয় না। কিয়ামত পর্যন্ত তাকে এই অপমান ভোগ করতে হবে।
তারপর তার রূহ শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার রব কে?’ সে বলে, ‘হায়! হায়! আমার জানা নেই।’ এরপর তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার দীন কী?’ সে বলে, ‘হায়! হায়! আমি জানি না।’ এরপর জিজ্ঞেস করে, ‘এই ব্যক্তি কে, যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল?’ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সে উত্তর দেয়, ‘আমি জানি না।’ তখন আসমান থেকে আওয়াজ ভেসে আসে, ‘এই বান্দা মিথ্যাবাদী। তাই তার নিচে অগ্নি বিছিয়ে দাও, তার জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দাও।’ তখন তার কবরের দিকে জাহান্নামের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং সেই দরজা দিয়ে আগুনের তাপ ও লু হাওয়া আসতে শুরু করে। তার কবর এত সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় যে তার পাঁজরের হাড় একটি আরেকটির ভেতরে ঢুকে পড়ে। অতঃপর দুর্গন্ধময় নোংরা কাপড় পরিহিত এক কদাকার ব্যক্তি এসে সেই মুনাফিককে বলে, ‘একটা দুঃসংবাদ শোনো! আজ সেই দিন, যেদিনের ব্যাপারে তোমাকে ভয় দেখানো হতো।’ সে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে? বস্তুত তোমার চেহারা দুঃসংবাদবাহীর মতোই!’ সে উত্তর দেয়, ‘আমি তোমার বদ আমল।’ একথা শুনে (আখেরাতের কঠিন আযাবের আশঙ্কায়) সেই কবরবাসী বলে, ‘হে আমার রব, কিয়ামত কায়েম করবেন না।’
আরেক বর্ণনায় এসেছে, কাফের ও মুনাফিকদের আশপাশে ভয়ংকর বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দেওয়া হয়, যা তাকে দংশন করতে থাকে। এতে সে চিৎকার করলে আগুন বা লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাকে পেটানো হয়। কবরের শাস্তি প্রদানের জন্য যেসব সাপ-বিচ্ছু পাঠানো হবে, সেগুলো এত ভয়াবহ হবে, যদি এগুলোর কোনো একটি জমিনে ফুঁ মারে, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো তৃণ জন্মাবে না। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে এসেছে, এসব বিষাক্ত প্রাণীর সংখ্যা হবে ৯৯টা এবং প্রত্যেকটা সাতটা মাথাবিশিষ্ট হবে।
টিকাঃ
৩১৩. সূরা আরাফ, আয়াত: ৪০।
৩১৪. সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩১।
৩১৫. মুসনাদে আহমাদ, ৪/২৯৮; মুসতাদরাকে হাকেম, ৩/৬৮; শরহুস সুদূর, ১০।
৩১৬. মুসতাদরাকে হাকেম, ৩/৬৮।
৩১৭. মাসাঈদুল আলাইনা, ৩/৬৮।
৩১৮. মাসাঈদুল আলাইনা, ৩/৬৮।
📄 মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কবরে কী যাবে?
কবরে কেবল মানুষের আমল যায়। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ কবরের জীবনে কোনো কাজে আসে না। কবর ও আখেরাতের জগতে প্রবেশের পূর্বে সেখানকার কারেন্সি অর্জন করা জরুরি। আর সেখানকার কারেন্সি হলো পূর্ণ ঈমান ও সৎ কর্ম। যদি এ সম্পদ সঙ্গে নিয়ে কেউ কবরজগতে সফর করে তাহলে আখেরাতের সকল ঘাঁটি, কবর ও পরবর্তী স্থানসমূহ খুব সহজেই পাড়ি দিতে পারবে। আর যদি ঈমান ও আমলের পাথেয় না থাকে, তাহলে বঞ্চনার শেষ থাকবে না। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে।’ প্রকৃত জ্ঞান ও বিবেকের দাবি হলো, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পেছনে না পড়ে আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
যত নিকটবর্তী ও প্রিয়জনই হোক না কেন, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থানে রেখে আসতে হয়। মৃতের ধনসম্পদও কবরে রাখা হয় না, আর তা তার কোনো কল্যাণে আসে না; বরং চোখ বন্ধ হতেই মাল উত্তরাধিকারী সূত্রে উত্তরাধিকারীদের মালিকানাধীন সম্পদে পরিণত হয়। কিন্তু আমল এমন বিশ্বস্ত ও খাঁটি বন্ধু, যা পৃথিবীতে সঙ্গে থাকে, আখেরাতেও সঙ্গে যায় এবং আমলকারীকে তার প্রকৃত ঠিকানায় (জান্নাতে) পৌঁছিয়ে ক্ষান্ত হয়। কাজেই ভালো আমলের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত, যাতে তা আমাদের সর্বোত্তম স্থানে পৌঁছাতে পারে।
টিকাঃ
৫১৯. বুখারী, ২/৯৬৪; মুসলিম, ২/৪০৭; তিরমিযী, ১/৬০।