📄 আমিরুল মুমিনিন হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যু
উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশেক ও প্রিয়ভাজন, ইসলামের প্রথম খলিফা আমিরুল মুমিনিন হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকেই লেখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিয়োগ-ব্যথা তাঁর মাঝে এমনভাবে বসে গিয়েছিল যে, তিনি ভেতরে ভেতরে জ্বলছিলেন এবং ক্রমান্বয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন। এই বিয়োজন যন্ত্রণার কারণেই হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যু হয়েছিল।
তিনি যখন অন্তিম শয্যায় শায়িত, তখন সাহাবীদের পরামর্শক্রমে পরবর্তী খলিফা হিসেবে হযরত উমর রা.-কে নির্ধারণ করা হয়। উক্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর হযরত আবু বকর রা. দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, আমি যা কিছু করেছি, এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের কল্যাণ সাধন। আমি ফেতনার আশঙ্কায় যা কিছু করেছি, সে বিষয়ে আপনি অবগত আছেন। পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমি ইজতেহাদ করেছি এবং আমার জ্ঞানমতে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তিকে শাসক বানিয়েছি। আপনি এদের মাঝে আমার মতো কল্যাণকামী লোক সৃষ্টি করুন, উমর ইবনে খাত্তাবকে খুলাফায়ে রাশিদীনের মাঝে শামিল করুন।’
উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা. পিতার কষ্ট দেখে বেদনাদায়ক কবিতা আবৃত্তি করলে হযরত আবু বকর রা. বলেন, এসব কবিতা পড়ো না, বরং এই আয়াত পাঠ করো— ‘ওয়া জাআত সাকরাতুল মাওতি বিল হাক্কি যালিকা মা কুনতা মিনহু তাহিদ’ অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। এ থেকেই তুমি টালবাহানা করতে। ৪৪০ এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি মৃত্যুর পূর্বে হযরত আয়েশা রা. কে বলেন, 'আমাকে আমার ব্যবহৃত কাপড়ে কাফন দেবে। যত দ্রুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে পৌঁছাতে পারি ততই উত্তম।' ৪৪০ মৃত্যুর সময় তিনি এই দোয়াটি পড়ছিলেন, ‘তাওয়াফফানি মুসলিমান ওয়া আলহিকনী বিস সালিহীন’ অর্থাৎ হে প্রভু, আপনি আমাকে মুসলমান অবস্থায় মৃত্যু দান করুন এবং আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ৪৪১ এই দোয়া পাঠের পর তাঁর ইনতিকাল হয়। ৪৪২
টিকাঃ
৪৪০. সুরা কাফ, আয়াত : ১৯।
৪৪০. তারিখুল খুলাফা, ১০২-১০৯।
৪৪১. সুরা ইউসুফ, আয়াত : ১০১।
৪৪২. মাসাইর কে আবখেরী কালিমাত।
📄 মৃত্যুকালে হযরত উমর রা.-এর বিচক্ষণতা
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ, আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বিচক্ষণতার এক সোনালী অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন। ফজরের নামায পড়ানোর সময় আবূ লু'লু নামক এক গোলাম কর্তৃক আঘাত পেয়ে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। মৃত্যুরোগে শায়িত অবস্থায় যখন জনৈক নওজোয়ান এসে তাঁর প্রশংসা করল, তখন উমর রা. তার টাখনুর নিচে ঝুলন্ত লুঙ্গির ওপর সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে বললেন, 'ভাই কাপড় টাখনুর ওপর পড়ো। এতে তোমার কাপড় পরিষ্কার থাকবে এবং এই আমল তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম হবে।'
মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর থেকেও তিনি ‘নাহি আনিল মুনকার’ বা অসৎ কাজে বাধা প্রদান করলেন। এরপর তিনি ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে তাঁর ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করতে বলেন এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করতে বলেন যেন তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রা.-এর পাশে দাফন করা হয়। হযরত আয়েশা রা. অনুমতি প্রদান করলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। তিনি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য সাতজন সাহাবীর একটি দল গঠন করেন এবং তাঁদেরকে মুহাজির, আনসার, যিম্মি ও অন্যদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে বিশেষ নসিহত করেন। ৪৪৪
ব্যথার তীব্রতায় আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিলে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! যদি আমার নিকট দুনিয়াভর্তি স্বর্ণ থাকত, তবে আল্লাহর আযাব দেখার পরেই তা হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য ফিদিয়া হিসেবে তা বিলিয়ে দিতাম।’ ৪৪৬ মৃত্যুর সময় হযরত উমর রা. নিজের মাথা আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর কোল থেকে সরিয়ে মাটির ওপর রেখে চেহারা ধূলামলিন করে ইরশাদ করেন, ‘যদি উমর ক্ষমা না পায়, তাহলে উমর ও তার মায়ের বড় অকল্যাণ হবে।’ ৪৪৭
হযরত আলী রা. তাঁর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “হে উমর, আল্লাহ আপনার ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আমি আশা রাখি, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আপনার দুই সাথির (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আবু বকর রা.-এর) সঙ্গেই রাখবেন।” ৪৪৮
টিকাঃ
৪৪৪. বুখারী, ১/৫৩৩-৫৩৪।
৪৪৬. বুখারী, ১/৫২১, হাদিস নং-৩৪৭২।
৪৪৭. কিফায়াতুল আকাব, ৩৪।
৪৪৮. বুখারী, ১/৬৫৯, হাদিস নং-৩৯৩৫।
📄 হযরত উসমান গনী রা.-এর হৃদয়বিদারক শাহাদাত
আমিরুল মুমিনিন হযরত উসমান রা. যখন অবরুদ্ধ হলেন, তখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকলেন। বিদ্রোহীরা আক্রমণ করলে তিনি পূর্ণ ধীরতার সাথে তিলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। এক পর্যায়ে একজন বিদ্রোহী লাফিয়ে এসে হযরতের গলা টিপে ধরে এবং অন্য দুজন তরবারী দিয়ে আক্রমণ করে। হযরত উসমান রা. হাত দিয়ে বাধা দিলে তাঁর হাত কেটে যায় এবং রক্তের প্রথম ফোঁটা কুরআনের ‘ফাসায়াকফীকাহুমুল্লাহ’ আয়াতের ওপর পড়ে। ৪৫০ আহত হাত দেখে হযরতের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়, ‘এটা ঐ হাত, যেই হাত সর্বপ্রথম কুরআনে কারিমের সুরাগুলো লিখেছে।’
অবশেষে জনৈক পিশাচ হযরত উসমান রা.-এর পেটে তরবারী ঢুকিয়ে দিলে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। ৪৫১ রক্তরঞ্জিত অবস্থায় হযরতের মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল— ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমিন। আল্লাহুম্মা ইন্নি আসতাঈনুকা আলা আমরি, ওয়া আসআলুকাস সাবরা আলা বালাই।’ ৪৫২ জনশ্রুতি রয়েছে, যারা হযরত উসমান রা.-এর মৃত্যুর শরিক ছিল, তারা পরে ভয়াবহভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। ৪৫৩
টিকাঃ
৪৫০. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৩৭।
৪৫১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০১।
৪৫২. কিফায়াতুল আকাব, ৩৪।
৪৫৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০৯।
📄 শাহাদাতের সময় হযরত আলী রা.-এর বিচক্ষণতা
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী রা. ঘাতক ইবনে মুলজিম এর আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে যখন বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন তিনি হযরত হাসান ও হুসাইন রা.-কে গুরুত্বপূর্ণ ওসিয়ত করেন। তিনি সন্তানদের ও উম্মতকে আল্লাহকে ভয় করার, ঈমানের ওপর অটল থাকার এবং আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে ধারণ করার নির্দেশ দেন। তিনি আত্মীয়স্বজন, এতিম ও প্রতিবেশীদের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার বিশেষ তগিদ দেন। সবশেষে হযরত আলী রা. বারবার কালিমায়ে তাইয়িবা পাঠ করতে করতে এবং সূরা যিলযালের আয়াত ‘ফামান ইয়ামাল মিছকালা যাররাতিন খয়রাই ইয়ারাহ...’ পাঠ করতে করতে ইন্তিকাল করেন। ৪৫৪
টিকাঃ
৪৫৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০৫।