📄 মৃত্যুর হাকিকত ও রহস্য
জনসাধারণের মাঝে একটি কথা প্রচলিত আছে, মৃত্যু হলো ধ্বংসের নাম। অথচ এটি মৃত্যুর হাকিকতের সঠিক ব্যাখ্যা নয়। বাস্তবতা হলো, মৃত্যু মানুষের একটি অবস্থার পরিবর্তনের নাম। শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম মানুষ নয়; বরং মানুষের মূল হলো রুহ, যা শরীরে প্রবেশ করে সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাজে লাগায়। শরীর রুহের জন্য সওয়ারী বা বাহনের মতো। রুহ আলাদা হয়ে গেলে শরীর নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। রুহ বের হয়ে যাওয়ার পর শরীরের যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকঠাক থাকলেও বলা হয়, সে বিদায় গ্রহণ করেছে। কারণ রুহ বা প্রাণ বের হয়ে অন্যত্র চলে গেছে।
মোটকথা, মৃত্যুর কারণে মানুষের মধ্যে একটা বাহ্যিক প্রভাব দেখা যায়। তা হলো, শরীর পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং রুহের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে যায়। তবে রুহ বের হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের মাঝে দুই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় :
১. মৃত্যুর কারণে রুহ থেকে শরীর আলাদা হওয়ার সাথে সাথে, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, ধনসম্পদ সব পৃথক হয়ে যায়। যার ফলে রুহের ভীষণ কষ্ট হয়; বরং রুহ পার্থিব জীবনকে নিয়ে যত ব্যস্ত থাকে, আখিরাত সম্পর্কে যত বেপরোয়া হয়, মৃত্যুর সময় ততবেশি কষ্ট পায়। পক্ষান্তরে যেই রুহ পার্থিব জীবনের ব্যস্ততা ভুলে আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকে, তার জন্য মৃত্যু আনন্দময় বার্তা নিয়ে আসে।
২. তার সামনে সে-সকল অবস্থা প্রকাশিত হয়, রুহ শরীরে থাকা অবস্থায় যা প্রকাশ করা হয়নি। যেমন, ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হলে চারপাশের সব কিছু তার চোখে ভেসে ওঠে। অনুরূপ পৃথিবীর সকল মানুষই এখন ঘুমিয়ে আছে, মৃত্যুর সাথে সাথে তারা জাগ্রত জগতে প্রবেশ করবে এবং সর্বপ্রথম তাদের সামনে যা ভেসে উঠবে তা হলো, সৎ কাজ তার জন্য কী উপকার বয়ে এনেছে, আর অসৎ কাজ কী পরিণাম টেনে এনেছে? ৩৫৫
টিকাঃ
৩৫৫. ইয়াহ্ইয়াউল উলূম, ৪/৩০৬।
📄 মৃত্যুযন্ত্রণা
মৃত্যু কষ্ট ও যন্ত্রণা ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব। কুরআনে কারিমে গাফেলদের সজাগ করে ইরশাদ করা হয়েছে, ‘ওয়া জাআত সাকরাতুল মাওতি বিল হাক্কি যালিকা মা কুনতা মিনহু তাহিদ’ অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতভাবে আসবে। এ থেকেই তুমি টালবাহানা করেছ। ৩৫৬ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করেছেন। বুখারী শরিফের এক হাদিসে এসেছে, মৃত্যুর সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পাত্র থেকে পানি নিয়ে মুখমণ্ডলে ছিটাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইন্না লিল মাওতি সাকরাত’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। নিঃসন্দেহে মৃত্যুযন্ত্রণা বড় কঠিন। ৩৫৭
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. বলেন, আমি স্বচক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুযন্ত্রণা দেখার পর এখন আর অন্যদের মৃত্যুযন্ত্রণাকে ভয় পাই না। ৩৫৮
বোঝা গেল মৃত্যুযন্ত্রণা সবার বেলায় প্রযোজ্য। মুমিন কাফের সকলেই এই কষ্ট ভোগ করে। তবে এর প্রভাবও প্রত্যেক জনের বেলায় একেক রকম হয়ে থাকে। মুমিনের জন্য এই যন্ত্রণা মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়, আর কাফেরের জন্য হয় আযাবের সূচনা। অন্য হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহ তায়ালা মুমিনের ভুল মাফ করার জন্য দুনিয়াতে কষ্ট দেন। তথাপি যদি কোনো গুনাহ অবশিষ্ট থাকে, মৃত্যুযন্ত্রণা মাধ্যমে তা মাফ করে দেন। ৩৫৯ পক্ষান্তরে কাফের মুশরিকদেরকে ভালো কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেন। এমনকি কারও কারও মৃত্যুযন্ত্রণা খুব সহজভাবে হয়। ৩৫৯
তাই কোনো কাফেরের সহজ মৃত্যু দেখে এমন ধারণা করা যাবে না যে, আখিরাতেও তার অবস্থা এমন হবে। আর মুমিন বান্দার মৃত্যুযন্ত্রণা দেখে এ কথা ভাবা যাবে না যে, আখিরাতেও সে কষ্ট ভোগ করবে। বরং নিজের দুর্বলতার কথা ভেবে প্রত্যেক মুমিনের এই দোয়া করা উচিত, যেন সহজভাবে তার মৃত্যু হয়।
টিকাঃ
৩৫৬. সুরা কাফ, আয়াত : ১৯।
৩৫৭. বুখারী, ২/৬৪০, হাদিস নং-৪৪৪৬।
৩৫৮. বুখারী, ২/৬৩৯, হাদিস নং-৪৪৪৬।
৩৫৯. সহীহ মুসলিম; শরহুস সুদূর, ২০৪।
৪০০. সহীহ মুসলিম।
📄 মৃত্যুকালীন অনুভূতি
হযরত আমর ইবনে আস রা. ছিলেন প্রখর মেধাসম্পন্ন ও বিচক্ষণ সাহাবী। অন্তিম মুহূর্তে তাঁর ছেলে বললেন, 'আব্বাজান, আপনি বলতেন, মানুষের হুঁশ থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর সময় নিজের অবস্থা বর্ণনা করতে পারে না! এখন আপনি সেই অবস্থায় পৌঁছে গেছেন। সুতরাং আপনিই বলুন, আপনি মৃত্যুশয্যায় কেমন অনুভব করছেন?' হযরত আমর ইবনে আস রা. বলেন, 'বাস্তবতা হলো, মৃত্যুর সময়ের অবস্থা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তবুও আমি ইঙ্গিতসূচক কিছু বলছি। আমি এখন অনুভব করছি, যেন আমার কাঁধে রেজওয়ান পাহাড় রাখা হয়েছে এবং মনে হয় যেন কাঁটাময় বৃক্ষ দ্বারা আমার পেট ভর্তি করা হয়েছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে, যেন আমার প্রাণ সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে বের হচ্ছে।' ৪০১
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. বলেন, 'মৃত্যুর যন্ত্রণা দুনিয়া ও আখিরাতের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য। মৃত্যুযন্ত্রণা করাত দিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া, কেঁচি দিয়ে কর্তিত হওয়া এবং ফুটন্ত কড়াইতে সিদ্ধ হওয়ার চেয়েও অধিক কষ্টদায়ক।' ৪০২
হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. একবার হযরত কাব আহবার রা.-কে মৃত্যুযন্ত্রণা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন, মনে করুন, অত্যন্ত কাঁটাময় কোনো বৃক্ষ পেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো এবং শরীরের জোড়ায় জোড়ায় কাঁটা বিদ্ধ হলো। অতঃপর প্রচণ্ড শক্তিশালী কেউ সেই বৃক্ষটি ধরে জোরে টান দিয়ে বের করল, এমন করলে মানুষের যে কষ্ট হবে, মৃত্যুর সময় এর চেয়ে বহুগণ বেশি কষ্ট হয়।' ৪০৩
হযরত আবু ইবনে ইয়াসার রহ. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন মৃত্যুর ফেরেশতা রুহ কবজ করে, তখন তাওবা না করা ব্যক্তিদের এর হাজার আঘাতের চেয়েও বেশি কষ্ট হয়। মুমিন বান্দা রোগে কষ্টে রুহ কবজ করে। তখন শয়তানও খুব কাছে থাকে।' ৪০৪
বর্ণিত আছে, যখন হযরত মুসা আলাইহিস সালামের রুহ আল্লাহর দরবারে পৌঁছল, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি মৃত্যুকে কেমন পেয়েছেন?' মুসা আলাইহিস সালাম উত্তর দিলেন, 'যদি কোনো পাখিকে অঙ্গারার উপর ভুনা করা হয়, অথচ সে মরবে না এবং তাকে ছেড়েও দেওয়া হবে না; এই পাখির যেমন কষ্ট হবে, আমার কাছে মৃত্যুকে তেমন মনে হয়েছে।' ৪০৫ অন্য এক বর্ণনা মতে, ‘জীবন্ত বকরির চামড়া ছিলাতে যেমন কষ্ট হবে, আমার কাছে মৃত্যুযন্ত্রণা তেমন মনে হয়েছে।’ ৪০৬
টিকাঃ
৪০১. নসরুল লুগাত, ২/২৪২।
৪০২. নসরুল লুগাত, ২/২৪৩।
৪০৩. নসরুল লুগাত, ২/২৪৪।
৪০৪. নসরুল লুগাত, ২/২৪৫।
৪০৫. আত্ব-তাযকিরা, ২১।
৪০৬. আত্ব-তাযকিরা, ২১।
📄 মৃত্যুর সময় শয়তানের শেষচেষ্টা
মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান শেষ সময় পর্যন্ত মানুষকে ঈমানহারা করে স্থায়ী আযাবের উপযুক্ত বানানোর জন্য কোনো ত্রুটি করে না। রুহ বের হওয়ার সময় শয়তান সামনে এসে দাঁড়ায় এবং বিভিন্নভাবে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তোমাদের মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে থাকবে, তাকে কালিমা তাইয়িবাহর তালকিন দেবে এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেবে। কারণ বড় বড় বিচক্ষণ নারী-পুরুষও এমন ভয়াবহ মুহূর্তে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এই বিপদসঙ্কুল মুহূর্তে শয়তান মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। ৪০৭
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর অবস্থা এমন হয়েছিল যে, কখনও জ্ঞান ফিরে পেতেন, আবার কখনও বেহুঁশ হয়ে পড়তেন। হুঁশ ফিরে এসে ইশারায় বলতেন, 'না' 'না' এবং 'এখন নয়, এখন নয়'। ছেলে জিজ্ঞাসা করেন, 'আব্বাজান, আপনি কী বলছেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'শয়তান আমার সামনে দাঁতে আঙুল চেপে বলছে, "আফসোস আহমদ, তুমি আমার হাত থেকে ছুটে গেলে!" আমি তার উত্তরে বলছি, 'এখন নয়' অর্থাৎ এখনও তোমার ধোঁকা থেকে মুক্তি পাইনি। যতক্ষণ না ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করি ততক্ষণ তোমার ধোঁকা থেকে আমি নিরাপদ নই।' ৪০৮
ইমাম আবু জাফর কুরতুবী রহ.-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁকে বলা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। তিনি বার বার বলছিলেন, না; অর্থাৎ কালিমা পাঠ করতে অস্বীকার করছিলেন। জ্ঞান ফিরে এলে লোকেরা জিজ্ঞেস করল, 'কালিমা পড়তে বললে আপনি কেন না না বলছিলেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'শয়তান আমার সামনে দাঁড়িয়ে একবার বলছিল, খ্রিষ্টান ধর্মের ওপর মৃত্যুবরণ করো, আবার বলছিল ইহুদি ধর্মের ওপর মৃত্যুবরণ করো। আমি তার উত্তরে না না বলছিলাম।' ৪০৯
টিকাঃ
৪০৭. কানযুল উম্মাল, বাইরুত, ১৫/২০৭।
৪০৮. আত্ব-তাযকিরা, ৩৫।
৪০৯. আত্ব-তাযকিরা, ৩৬।