📄 মৃত্যুর স্মরণের উপকারিতা
আল্লামা নুয়ুতী রহ. লেখেন, 'উলামায়েকেরাম হতে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে তিনটি জিনিসের তাওফিক দান করেন:
১. দ্রুত তাওবা: অর্থাৎ গুনাহ হয়ে গেলে তাওবাহীন মৃত্যুর আশঙ্কায় দ্রুত তাওবা করে সে গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
২. অন্তরের তুষ্টি: মৃত্যুকে স্মরণকারী লোভ-লালসায় লিপ্ত হয় না; বরং সহজে যে পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হয় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। এই তুষ্টি তাকে আত্মার প্রশান্তি দান করে। তার ভাবনা থাকে, জীবন খুবই ছোট। কোনোভাবে কেটে গেলেই হয়। এ নিয়ে অধিক চিন্তাভাবনার কোনো দরকার নেই।
৩. ইবাদতে উদ্যম: মৃত্যুকে স্মরণকারী পূর্ণ মনোযোগ ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত করে। আখেরাতের স্মরণের কারণে ইবাদতের মহাপ্রতিদান লাভের পূর্ণ বিশ্বাস তার থাকে। যার কারণে ইবাদতে সে এমন স্বাদ অনুভব করে, যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। ৩৯৩
টিকাঃ
৩৯৩. শরহুস সুদূর, ৪৫।
📄 মৃত্যুকে ভুলে যাওয়ার ক্ষতি
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মৃত্যুকে স্মরণ রাখে না, আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকে সে তিনটি বিপদের সম্মুখীন হয়:
১. তাওবার অনিশ্চয়তা: গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করতে সে দোদুল্যমানতায় ভোগে; দ্রুত ক্ষমা প্রার্থনা করে না। অনেক সময় তাওবাহীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।
২. তুষ্টিহীনতা: মৃত্যুর স্মরণ না থাকলে মানুষের লোভ বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় সম্পদ লাভ করেও সে সন্তুষ্ট হয় না; বরং অধিক সম্পদের প্রত্যাশার রোগে আক্রান্ত হয়। মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীনতার কারণে সে কেবল সম্পদ সঞ্চয় করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে লোভী অবস্থায় ই তার ইনতিকাল হয়।
৩. ইবাদতে অলসতা: মৃত্যু সম্পর্কে গাফেল হলে ইবাদতে অলসতা প্রকাশ পায় এবং উদ্যম হারিয়ে যায়। প্রথমত ইবাদত করে না। আবার কখনও ইবাদত করলেও খুব কষ্ট অনুভব হয়। এই কষ্টের মূল কারণ হলো, তার এই খেয়াল থাকে না যে, মৃত্যুর পর জবাবদিহিতা আছে। যদি সেখানে সঠিক উত্তর প্রদানে ব্যর্থ হয় তাহলে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে।
📄 মৃত্যুকে স্মরণ করার কিছু মাধ্যম
হাদিস শরিফে যেখানে মৃত্যুকে স্মরণ করার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই এমন কিছু আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে, যা মৃত্যুকে স্মরণ রাখতে সাহায্য করে। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, মাঝে মাঝে কবরস্থানে গিয়ে কবরের জীবন এবং কবরবাসীদের অবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। যেমন: এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
‘যুরুল কুবুরা ফাইন্নাহা তুযাক্কিরুল মাওত’ অর্থাৎ তোমরা কবরের যিয়ারত করো। কারণ তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ৩৯৪
অন্য এক বর্ণনায় হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি পূর্বে তোমাদের কবর যিয়ারত নিষেধ করতাম। কিন্তু এখন বলছি শোনো, তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা এর দরুন দিল নরম হয়, চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং আখেরাতের কথা স্মরণ হয়। ৩৯৫
এ জাতীয় হাদিসে কবর যিয়ারতকে শিক্ষণীয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কবর যিয়ারতের মূল উদ্দেশ্যও বর্ণনা করা হয়েছে যে, কেবল বিনোদন বা দেখার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করবে না; বরং মৃত্যু ও আখেরাতকে স্মরণ করার নিয়তে যিয়ারত করতে হবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, আমাদের অন্তরে গাফলতের এমন চাদর পড়ে আছে এবং হৃদয়ে এমন ঘন অন্ধকার ঘিরে ধরেছে যে, আমরা কবরস্থানকে খেল-তামাশার স্থান বানিয়ে নিয়েছি। উরুসের নামে কবরের উপর অপচয় ও তুফান বয়ে যায়। বর্তমানে কবরস্থানগুলোকে বেপরওয়া ও উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা খেলার মাঠ বানিয়ে নেয়। কবর সামনে থাকা সত্ত্বেও এমন হীন কাজ করা হৃদয়ের রুক্ষতার প্রমাণ বহন করে।
টিকাঃ
৩৯৪. মুসলিম, ১/১০৪।
৩৯৫. শরহুস সুদূর, ৪৬, হাকেমের বরাতে।
📄 মৃতকে গোসল দেওয়া এবং জানাযায় অংশগ্রহণ করা
হাদিস শরিফে মৃত্যুকে স্মরণ রাখার আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমের কথা বর্ণিত হয়েছে:
১. মৃতকে গোসল দেওয়া।
২. জানাযার নামাযে অধিক অংশগ্রহণ করা।
হযরত আবু যর গিফারী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কবরের যিয়ারতে যাবে। এর মাধ্যমে তুমি আখেরাতকে স্মরণ করবে। মৃতকে গোসল করাবে; কারণ মৃত লাশ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এক ধরনের কার্যকরী উপদেশ। জানাযার নামাযে শরিক হবে। তা তোমাকে চিন্তিত করবে। আর চিন্তিত ব্যক্তি আল্লাহর ছায়াতলে থাকে। ৩৯৬
উক্ত হাদিসে মৃতকে গোসল করানোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। মৃত লাশ দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের লাশ অত্যন্ত সম্মানীয়। লাশকে সম্মান করা আবশ্যক। তাই মাসআলা জেনে নিকটবর্তী লোকেরা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানো উত্তম। গোসল করানোর সময় অংশগ্রহণ করলে নিজের মৃত্যুর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আর স্বাভাবিকভাবে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হবে।
৩. অধিক হারে জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করা। মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি জানাযায় শরিক হয়, সে এক কিরাত সওয়াবের অধিকারী হয়, যা উহুদ পাহাড়ের সমান। আর যে ব্যক্তি জানাযার সঙ্গে কবরস্থান পর্যন্তও যায় সে দুই কিরাত সওয়াবের অধিকারী হয়। ৩৯৭
তাই জানাযায় অংশগ্রহণের সুযোগ এলে তা হাতছাড়া করা উচিত নয়। জানাযার নামায পড়লে মানুষের মাঝে এই চিন্তার উদ্রেক হয় যে, একদিন আমারও মৃত্যু হবে। আমাকেও মুর্দার খাটে চড়তে হবে। এক আরব কবি বলেন :
হে বন্ধু, পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাস দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। একদিন জীবন শেষ হবে, সব নেয়ামত হারিয়ে যাবে। যখন তুমি কোনো জানাযার খাট কবরস্থানে নিয়ে যাবে, তখন মনে করবে, একদিন তোমাকেও জানাযার খাটে উঠতে হবে।
উল্লিখিত হাদিসে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, জানাযা দেখে যখন অন্তর চিন্তিত হবে, তখন মানুষ আল্লাহমুখী হবে।
টিকাঃ
৩৯৬. শরহুস সুদূর, ৪৬, হাকেমের বরাতে।
৩৯৭. মুসলিম, ১/৩০৫।