📄 মৃত্যু সম্পর্কে বুযুর্গানে দীনের বক্তব্য ও অভিমত
* হযরত আবু দারদা রা. বলেন, ‘উপদেশ কার্যকরী হওয়ার উত্তম মাধ্যম হলো মৃত্যু। কিন্তু এক্ষেত্রে ঐকান্তিক উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যু নসিহত-উপদেশের জন্য যথেষ্ট। যুগ মানুষের মাঝে বিভিন্নতা সৃষ্টির জন্য সদা-প্রস্তুত। আজ যারা ঘরে অবস্থান করে, কাল তারা কবরে থাকবে।’
* হযরত রামা ইবনে যাওয়ারা রহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তি অধিক হারে মৃত্যুকে স্মরণ করবে, তার অন্তর হিংসা ও কপটতা থেকে মুক্ত হবে। অর্থাৎ সে পার্থিব ভোগের পেছনে ব্যস্ত হবে না আর না সে আনন্দ-উল্লাসে গুনাহে লিপ্ত হবে।’
* হযরত আউন ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তির অন্তরে মৃত্যুর স্মরণ গেঁথে যায়, সে পরের দিন বেঁচে থাকার আশা রাখে না। কারণ বহু লোক এমন আছে যারা দিন শেষ হওয়ার আগেই চলে যায় এবং মৃত্যুর কারণে দিন পার করে যেতে পারে না। আর অনেক লোক আগামী দিনের আশা রাখে, কিন্তু আগামী দিন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।’
* হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. থেকে বর্ণিত আছে, ‘মৃত্যুর স্মরণ যে ব্যক্তির অন্তরে জায়গা বানিয়ে নেয়, সে নিজের মালিকানাধীন সম্পদকে সর্বদা অধিক মনে করে (অর্থাৎ অধিক সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করে না)।’
* হযরত মাজমা তাইমী রহ. বলেন, ‘মৃত্যুর স্মরণ এক ধরনের সম্পদ।’
* এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন, ‘আমলী জীবন গঠনের ও আত্ম-শুদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী বস্তু হলো মৃত্যুর স্মরণ।’
* কাব আহবার রা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুকে সঠিকভাবে চিনতে পারবে, তার কাছে দুনিয়ার যাবতীয় বিপদাপদ, কষ্ট-পেরেশানী হালকা মনে হবে।’
* এক মহিলা হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে এসে নিজের অন্তরের কঠোরতার কথা উল্লেখ করলে হযরত আয়েশা রা. তাকে উপদেশ দেন, ‘মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো, এতে অন্তর নরম ও কোমল হবে।’
* হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'কবর আমাদের আমলের সিন্দুক। মৃত্যুর পর এ বিষয়ে অবগত হওয়া যায়।' ৩৮৯
* এক বুযুর্গ প্রতি রাতে শহরের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতেন, 'চলো, কাফেলা যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।' তাঁর মৃত্যুর পর শহরের বিচারক তাঁর চিৎকার না পেয়ে খবর নিয়ে যখন তাঁর মৃত্যুর কথা জানতে পারলেন, তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করলেন : সে সর্বদা মৃত্যুর আলোচনায় মগ্ন ছিল, একদিন মৃত্যু তার দুয়ারে এসে উপস্থিত হলো, সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত ছিল, পার্থিব আশা-আকাঙ্ক্ষা তাকে গাফেল করতে পারেনি। ৩৯০
* আল্লামা তায়মী রহ. বলেন, 'দুটি বস্তু আমার দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ কেড়ে নিয়েছে: ১. মৃত্যুর স্মরণ, ২. কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে উপস্থিতির স্মরণ।' ৩৯১
* হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর অভ্যাস ছিল, তিনি উলামায়ে-কেরামকে সমবেত করে মৃত্যু, কিয়ামত ও আখেরাতের মুজাকারা করতেন। তাঁর কথা শুনে সকলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন, যেন তাদের সম্মুখে কোনো জানাযা রাখা হয়েছে।' ৩৯২
টিকাঃ
৩৮৯. শরহুস সুদূর, ৪৬-৪৮।
৩৯০. আত্-তাযকিরা ফি আহওয়ালিল মাওতা ওয়াল আখেররা, ১০।
৩৯১. আত্-তাযকিরা, ১০।
৩৯২. আত্-তাযকিরা, ১০।
📄 মৃত্যুর স্মরণের উপকারিতা
আল্লামা নুয়ুতী রহ. লেখেন, 'উলামায়েকেরাম হতে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে তিনটি জিনিসের তাওফিক দান করেন:
১. দ্রুত তাওবা: অর্থাৎ গুনাহ হয়ে গেলে তাওবাহীন মৃত্যুর আশঙ্কায় দ্রুত তাওবা করে সে গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
২. অন্তরের তুষ্টি: মৃত্যুকে স্মরণকারী লোভ-লালসায় লিপ্ত হয় না; বরং সহজে যে পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হয় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। এই তুষ্টি তাকে আত্মার প্রশান্তি দান করে। তার ভাবনা থাকে, জীবন খুবই ছোট। কোনোভাবে কেটে গেলেই হয়। এ নিয়ে অধিক চিন্তাভাবনার কোনো দরকার নেই।
৩. ইবাদতে উদ্যম: মৃত্যুকে স্মরণকারী পূর্ণ মনোযোগ ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত করে। আখেরাতের স্মরণের কারণে ইবাদতের মহাপ্রতিদান লাভের পূর্ণ বিশ্বাস তার থাকে। যার কারণে ইবাদতে সে এমন স্বাদ অনুভব করে, যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। ৩৯৩
টিকাঃ
৩৯৩. শরহুস সুদূর, ৪৫।
📄 মৃত্যুকে ভুলে যাওয়ার ক্ষতি
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মৃত্যুকে স্মরণ রাখে না, আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকে সে তিনটি বিপদের সম্মুখীন হয়:
১. তাওবার অনিশ্চয়তা: গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করতে সে দোদুল্যমানতায় ভোগে; দ্রুত ক্ষমা প্রার্থনা করে না। অনেক সময় তাওবাহীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।
২. তুষ্টিহীনতা: মৃত্যুর স্মরণ না থাকলে মানুষের লোভ বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় সম্পদ লাভ করেও সে সন্তুষ্ট হয় না; বরং অধিক সম্পদের প্রত্যাশার রোগে আক্রান্ত হয়। মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীনতার কারণে সে কেবল সম্পদ সঞ্চয় করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে লোভী অবস্থায় ই তার ইনতিকাল হয়।
৩. ইবাদতে অলসতা: মৃত্যু সম্পর্কে গাফেল হলে ইবাদতে অলসতা প্রকাশ পায় এবং উদ্যম হারিয়ে যায়। প্রথমত ইবাদত করে না। আবার কখনও ইবাদত করলেও খুব কষ্ট অনুভব হয়। এই কষ্টের মূল কারণ হলো, তার এই খেয়াল থাকে না যে, মৃত্যুর পর জবাবদিহিতা আছে। যদি সেখানে সঠিক উত্তর প্রদানে ব্যর্থ হয় তাহলে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে।
📄 মৃত্যুকে স্মরণ করার কিছু মাধ্যম
হাদিস শরিফে যেখানে মৃত্যুকে স্মরণ করার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই এমন কিছু আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে, যা মৃত্যুকে স্মরণ রাখতে সাহায্য করে। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, মাঝে মাঝে কবরস্থানে গিয়ে কবরের জীবন এবং কবরবাসীদের অবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। যেমন: এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
‘যুরুল কুবুরা ফাইন্নাহা তুযাক্কিরুল মাওত’ অর্থাৎ তোমরা কবরের যিয়ারত করো। কারণ তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ৩৯৪
অন্য এক বর্ণনায় হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি পূর্বে তোমাদের কবর যিয়ারত নিষেধ করতাম। কিন্তু এখন বলছি শোনো, তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা এর দরুন দিল নরম হয়, চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং আখেরাতের কথা স্মরণ হয়। ৩৯৫
এ জাতীয় হাদিসে কবর যিয়ারতকে শিক্ষণীয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কবর যিয়ারতের মূল উদ্দেশ্যও বর্ণনা করা হয়েছে যে, কেবল বিনোদন বা দেখার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করবে না; বরং মৃত্যু ও আখেরাতকে স্মরণ করার নিয়তে যিয়ারত করতে হবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, আমাদের অন্তরে গাফলতের এমন চাদর পড়ে আছে এবং হৃদয়ে এমন ঘন অন্ধকার ঘিরে ধরেছে যে, আমরা কবরস্থানকে খেল-তামাশার স্থান বানিয়ে নিয়েছি। উরুসের নামে কবরের উপর অপচয় ও তুফান বয়ে যায়। বর্তমানে কবরস্থানগুলোকে বেপরওয়া ও উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা খেলার মাঠ বানিয়ে নেয়। কবর সামনে থাকা সত্ত্বেও এমন হীন কাজ করা হৃদয়ের রুক্ষতার প্রমাণ বহন করে।
টিকাঃ
৩৯৪. মুসলিম, ১/১০৪।
৩৯৫. শরহুস সুদূর, ৪৬, হাকেমের বরাতে।