📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 মৃত্যুকে স্মরণ করার নির্দেশ

📄 মৃত্যুকে স্মরণ করার নির্দেশ


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে অধিক হারে মৃত্যুর কথা স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

১. হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আকছিরু যিকরা হাযিমিল লাযযাত...’ অর্থাৎ সকল স্বাদ-আহ্লাদ বিলুপ্তকারীকে (মৃত্যুকে) বেশি বেশি স্মরণ করো। সংকটময় মুহূর্তে মৃত্যুকে স্মরণ করলে মৃত্যু তাকে স্বচ্ছলতা দান করবে। (অর্থাৎ সে আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে। কারণ মৃত্যুযন্ত্রণার বিপরীতে সকল কষ্ট-যন্ত্রণাই সহজ)। আর স্বচ্ছলতা ও আড়ম্বরতার মাঝে মৃত্যুকে স্মরণ করলে তা তাকে সংকটময় অবস্থায় নিপতিত করবে। (অর্থাৎ মৃত্যু স্মরণের কারণে সে সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও গুনাহ থেকে বিরত থাকবে)। ৩৭৮

উক্ত হাদিস একথা প্রমাণ করে, মৃত্যুর স্মরণ সর্বদা মানুষকে উপকৃত করে। বিপদাপদে মৃত্যুকে স্মরণ করলে বিপদ হালকা হয়। একারণেই কুরআনে কারিমে ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাযিনা ইযা আসাবাতহুম মুসিবাতুন কালু ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ অর্থাৎ যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর সান্নিধ্যে ফিরে যাব। ৩৭৯ অনুরূপ স্বচ্ছল অবস্থায় মৃত্যুকে স্মরণ করলে মানুষ অনেক ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকে, যা সাধারণত স্বচ্ছলতার সময় প্রকাশ পায়। এ কারণে উল্লিখিত হাদিসে মৃত্যুকে সকল স্বাদ-আহ্লাদ বিচূর্ণকারী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, ঈমানদারদের মাঝে কোন্ ব্যক্তি সবচেয়ে জ্ঞানী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আকছারুহুম লিলমাওতি যিকরান ওয়া আহ্সানুহুম লিমা বা’দাহু ইসতি’দাদান উলাইকাল আকইয়াস’ অর্থাৎ সেই ঈমানদার ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী, যে মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করে এবং মৃত্যুপর্ববর্তী জীবনের জন্য উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ৩৯০

৩. হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বুদ্ধিমান হলো সে ব্যক্তি, যে স্বীয় নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুপর্ববর্তী জীবনের জন্য আমল করে। অক্ষম হলো সে ব্যক্তি, যে স্বীয় নফসের চাহিদার অনুসরণ করে চলে। আর সে আল্লাহর কাছে অলীক আশা পোষণ করে। ৩৯১

বর্তমানে বুদ্ধিমান মনে করা হয় সেই ব্যক্তিকে, যে দুনিয়া অর্জনে অগ্রগামী হয়, চাই আখেরাতের জন্য কোনো আমল করুক বা না করুক। আর যে ব্যক্তি আখেরাতের পেছনে নিজের জীবন ব্যয় করে, সম্পদ অর্জনে হালাল-হারাম মেনে চলে, সর্বক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশ পালন করে, মানুষ তাকে অক্ষম ও ব্যর্থ মনে করে। কিন্তু উল্লিখিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজকে বুদ্ধিমান হওয়ার মানদণ্ড স্থির করেছেন, যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিতে প্রশংসার যোগ্য কেবল সেই ব্যক্তি, যে মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং মৃত্যুপর্ববর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এক হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে জনৈক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলে তিনি সাহাবায়েকেরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৃত্যুর স্মরণের ক্ষেত্রে তার অবস্থা কী?’ উপস্থিত সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, ‘আমরা তার থেকে মৃত্যুকে স্মরণ করার কোনো কথা শুনিনি।’ তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে নিজের নফসের চাহিদাকে দমন করে কি না?’ সাহাবীগণ জবাব দিলেন, ‘সে দুনিয়া থেকে নফসের চাহিদা অনুযায়ী উপকৃত হয়।’ এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘সে ব্যক্তি এমন প্রশংসার যোগ্য নয়, যেমন প্রশংসা তোমরা তার ব্যাপারে করছ।’ ৩৯২

৪. হযরত ওয়াহাব ইবনে আতা রহ. বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মাঝে মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীনতা অনুভব করলেন, তখন হুজরা শরিফের দরজায় দাঁড়িয়ে নিম্নোক্ত বাক্য তিনবার বললেন : হে লোক সকল, হে মুসলমানগণ, অবশ্যই নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু তোমাদের নিকট আসবে। আর মৃত্যু ঐ সকল বস্তু নিয়ে আসবে যা নিয়ে আসে দয়াময় প্রভুর সেসব নেককার বান্দাদের জন্য, যারা জান্নাতী এবং যারা এর আগ্রহ রাখে ও চেষ্টা করে। তাদের জন্য মৃত্যু আনন্দ ও প্রশান্তি এবং আরও অনেক নেয়ামত নিয়ে আসবে। জেনে রাখো, প্রত্যেক প্রচেষ্টাকারীর সমাপ্তি রয়েছে। আর তা হলো মৃত্যু, যা হয়তো আগে বা পরে আসে। ৩৯৩

উক্ত হাদিসের আলোকে জানা যায়, মৃত্যুকে স্মরণ করা মুমিনের জন্য কোনো অস্বাভাবিক কাজ নয়। কারণ মুমিন বান্দা সুনিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে, সে আখেরাতে তার নেক আমলের প্রতিদান হিসেবে স্থায়ী ও উত্তম নেয়ামত লাভ করবে।

টিকাঃ
৩৭৮. মুসনাদে বাযযার; শরহুস সুদূর, ৪৬।
৩৭৯. সূরা বাকারা, আয়াত : ১৫৬।
৩৯০. ইবনে মাজাহ, ৪২৪; শরহুস সুদূর, ৪৭।
৩৯১. তিরমিযী, ২/৭২, হাদিস নং-২৪৫২।
৩৯২. কিতাবুয যুহদ (ইবনে মোবারক)।
৩৯৩. বাইহাকী, শরহুস সুদূর, ৪৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 মৃত্যু সম্পর্কে বুযুর্গানে দীনের বক্তব্য ও অভিমত

📄 মৃত্যু সম্পর্কে বুযুর্গানে দীনের বক্তব্য ও অভিমত


* হযরত আবু দারদা রা. বলেন, ‘উপদেশ কার্যকরী হওয়ার উত্তম মাধ্যম হলো মৃত্যু। কিন্তু এক্ষেত্রে ঐকান্তিক উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যু নসিহত-উপদেশের জন্য যথেষ্ট। যুগ মানুষের মাঝে বিভিন্নতা সৃষ্টির জন্য সদা-প্রস্তুত। আজ যারা ঘরে অবস্থান করে, কাল তারা কবরে থাকবে।’
* হযরত রামা ইবনে যাওয়ারা রহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তি অধিক হারে মৃত্যুকে স্মরণ করবে, তার অন্তর হিংসা ও কপটতা থেকে মুক্ত হবে। অর্থাৎ সে পার্থিব ভোগের পেছনে ব্যস্ত হবে না আর না সে আনন্দ-উল্লাসে গুনাহে লিপ্ত হবে।’
* হযরত আউন ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তির অন্তরে মৃত্যুর স্মরণ গেঁথে যায়, সে পরের দিন বেঁচে থাকার আশা রাখে না। কারণ বহু লোক এমন আছে যারা দিন শেষ হওয়ার আগেই চলে যায় এবং মৃত্যুর কারণে দিন পার করে যেতে পারে না। আর অনেক লোক আগামী দিনের আশা রাখে, কিন্তু আগামী দিন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।’
* হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. থেকে বর্ণিত আছে, ‘মৃত্যুর স্মরণ যে ব্যক্তির অন্তরে জায়গা বানিয়ে নেয়, সে নিজের মালিকানাধীন সম্পদকে সর্বদা অধিক মনে করে (অর্থাৎ অধিক সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করে না)।’
* হযরত মাজমা তাইমী রহ. বলেন, ‘মৃত্যুর স্মরণ এক ধরনের সম্পদ।’
* এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন, ‘আমলী জীবন গঠনের ও আত্ম-শুদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী বস্তু হলো মৃত্যুর স্মরণ।’
* কাব আহবার রা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুকে সঠিকভাবে চিনতে পারবে, তার কাছে দুনিয়ার যাবতীয় বিপদাপদ, কষ্ট-পেরেশানী হালকা মনে হবে।’
* এক মহিলা হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে এসে নিজের অন্তরের কঠোরতার কথা উল্লেখ করলে হযরত আয়েশা রা. তাকে উপদেশ দেন, ‘মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো, এতে অন্তর নরম ও কোমল হবে।’
* হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'কবর আমাদের আমলের সিন্দুক। মৃত্যুর পর এ বিষয়ে অবগত হওয়া যায়।' ৩৮৯
* এক বুযুর্গ প্রতি রাতে শহরের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতেন, 'চলো, কাফেলা যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।' তাঁর মৃত্যুর পর শহরের বিচারক তাঁর চিৎকার না পেয়ে খবর নিয়ে যখন তাঁর মৃত্যুর কথা জানতে পারলেন, তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করলেন : সে সর্বদা মৃত্যুর আলোচনায় মগ্ন ছিল, একদিন মৃত্যু তার দুয়ারে এসে উপস্থিত হলো, সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত ছিল, পার্থিব আশা-আকাঙ্ক্ষা তাকে গাফেল করতে পারেনি। ৩৯০
* আল্লামা তায়মী রহ. বলেন, 'দুটি বস্তু আমার দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদ কেড়ে নিয়েছে: ১. মৃত্যুর স্মরণ, ২. কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে উপস্থিতির স্মরণ।' ৩৯১
* হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর অভ্যাস ছিল, তিনি উলামায়ে-কেরামকে সমবেত করে মৃত্যু, কিয়ামত ও আখেরাতের মুজাকারা করতেন। তাঁর কথা শুনে সকলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন, যেন তাদের সম্মুখে কোনো জানাযা রাখা হয়েছে।' ৩৯২

টিকাঃ
৩৮৯. শরহুস সুদূর, ৪৬-৪৮।
৩৯০. আত্-তাযকিরা ফি আহওয়ালিল মাওতা ওয়াল আখেররা, ১০।
৩৯১. আত্-তাযকিরা, ১০।
৩৯২. আত্-তাযকিরা, ১০।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 মৃত্যুর স্মরণের উপকারিতা

📄 মৃত্যুর স্মরণের উপকারিতা


আল্লামা নুয়ুতী রহ. লেখেন, 'উলামায়েকেরাম হতে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে তিনটি জিনিসের তাওফিক দান করেন:

১. দ্রুত তাওবা: অর্থাৎ গুনাহ হয়ে গেলে তাওবাহীন মৃত্যুর আশঙ্কায় দ্রুত তাওবা করে সে গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

২. অন্তরের তুষ্টি: মৃত্যুকে স্মরণকারী লোভ-লালসায় লিপ্ত হয় না; বরং সহজে যে পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হয় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। এই তুষ্টি তাকে আত্মার প্রশান্তি দান করে। তার ভাবনা থাকে, জীবন খুবই ছোট। কোনোভাবে কেটে গেলেই হয়। এ নিয়ে অধিক চিন্তাভাবনার কোনো দরকার নেই।

৩. ইবাদতে উদ্যম: মৃত্যুকে স্মরণকারী পূর্ণ মনোযোগ ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত করে। আখেরাতের স্মরণের কারণে ইবাদতের মহাপ্রতিদান লাভের পূর্ণ বিশ্বাস তার থাকে। যার কারণে ইবাদতে সে এমন স্বাদ অনুভব করে, যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। ৩৯৩

টিকাঃ
৩৯৩. শরহুস সুদূর, ৪৫।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 মৃত্যুকে ভুলে যাওয়ার ক্ষতি

📄 মৃত্যুকে ভুলে যাওয়ার ক্ষতি


পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মৃত্যুকে স্মরণ রাখে না, আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন থাকে সে তিনটি বিপদের সম্মুখীন হয়:

১. তাওবার অনিশ্চয়তা: গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করতে সে দোদুল্যমানতায় ভোগে; দ্রুত ক্ষমা প্রার্থনা করে না। অনেক সময় তাওবাহীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।

২. তুষ্টিহীনতা: মৃত্যুর স্মরণ না থাকলে মানুষের লোভ বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় সম্পদ লাভ করেও সে সন্তুষ্ট হয় না; বরং অধিক সম্পদের প্রত্যাশার রোগে আক্রান্ত হয়। মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীনতার কারণে সে কেবল সম্পদ সঞ্চয় করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে লোভী অবস্থায় ই তার ইনতিকাল হয়।

৩. ইবাদতে অলসতা: মৃত্যু সম্পর্কে গাফেল হলে ইবাদতে অলসতা প্রকাশ পায় এবং উদ্যম হারিয়ে যায়। প্রথমত ইবাদত করে না। আবার কখনও ইবাদত করলেও খুব কষ্ট অনুভব হয়। এই কষ্টের মূল কারণ হলো, তার এই খেয়াল থাকে না যে, মৃত্যুর পর জবাবদিহিতা আছে। যদি সেখানে সঠিক উত্তর প্রদানে ব্যর্থ হয় তাহলে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px