📄 তাসাউফ তথা আত্মশুদ্ধির মূল লক্ষ্য
এ সকল আল্লাহওয়ালাদের দিক-নির্দেশনায় নির্দিষ্ট আমল ও অজিফা পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো, আত্মশুদ্ধি প্রার্থীদের মাঝে 'ইহসানের' গুণ প্রকাশিত হওয়া। অর্থাৎ অন্তর থেকে উদাসীনতার পর্দা সরে গিয়ে ঈমানের আলোয় অন্তরকে এমনভাবে আলোকিত করা, যাতে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণ অন্তরে জাগরুক রাখা সহজ হয়। ‘আন তা’বুদাল্লাহা কাআন্নাকা তারাহু...’ অর্থাৎ এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি এভাবে ইবাদত করতে না পারো, তা হলে ভাববে, তিনি তোমাকে দেখছেন। ৪০৩ এই মর্যাদায় উত্তীর্ণ হওয়া ই তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির যাবতীয় মেহনতের মূল উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
৪০৩. মুসলিম, ১/২৭৯।
📄 আরেফ বিল্লাহ হযরত আবদুল কাদের রায়পুরী রহ.-এর বক্তব্য
উক্ত বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল কাদের রায়পুরী রহ. বলেন, 'সর্বদা আল্লাহকে ভালোবাসা, সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চিন্তায় মগ্ন থাকা, তাঁর ব্যাপারে কখনও উদাসীন না হওয়া—নিজেকে এমনভাবে সাজানো শরিয়তের দাবি। কুরআন ও হাদিসের আলোকে জানা যায়, এসব অর্জন ব্যতীত ঈমান পূর্ণতায় পৌঁছে না। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে একের পর এক তালিম ও তারবিয়া (শিক্ষাদীক্ষার) মতো এসব অবস্থা ও অর্জন হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের বরকতে সাহাবিগণের সান্নিধ্যেও এই প্রভাব ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও যোগ্যতার অধঃপতনে কারণে তালিম-তরবিয়তের উদ্দেশ্যে বুযুর্গানে দীনের সান্নিধ্য অবলম্বনেই যথেষ্ট থাকেনি। কাজেই বুযুর্গানে দীন ইহসানের অবস্থা সৃষ্টির জন্য সান্নিধ্য অবলম্বনের পাশাপাশি অধিক হারে যিকির করার পরামর্শ দেন। ৪০৪
টিকাঃ
৪০৪. ফিকহুল মাসায়েল, ৯০৮।
📄 তাসাউফের পথ দ্বারা দীনি খেদমতের স্পৃহা সৃষ্টি হয়
তাসাউফের পথ দ্বারা দ্বীনী খেদমত ও স্পৃহা সৃষ্টি হয়। তাসাউফ দ্বীনী খেদমত ও অন্যান্য দায়িত্বপালনে প্রতিবন্ধক হয় না, বরং তাসাউফকে শরিয়তের মাঝে রূহ এর ভূমিকা রাখে। একারণেই উলামায়ে কেরাম লেখেন, 'ঐ ব্যক্তিই জাহেরী (প্রকাশ্য তথা তালিম-তোরবিয়ত) ও বাতেনী (অভ্যন্তরীণ তথা আত্মশুদ্ধি)-ভাবে উপকৃত করার হকদার যার অন্তর পাক-পবিত্র ও তাসাউফের রঙে রঙিন। তাসাউফের রঙে রঙিন হওয়া মহান ব্যক্তিদের মাধ্যমে এই দ্বীন ইসলাম সারা পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করেছে। হযরত হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী রাহ. বলেন, 'অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন হওয়ার দুটি আলামত রয়েছে : ১. যিকিরে খোদা তথা আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ রাখার এমন যোগ্যতা অর্জন হওয়া যে, আল্লাহর স্মরণ মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। ২. কথাবার্তা, কাজকর্ম, মুয়ামালা-মাআশারা ও ইবাদত-বন্দেগীতে শরিয়তের হুকুম-আহকামের পূর্ণ অনুসরণ করা এবং শরিয়তপরিপন্থী কাজের প্রতি স্বভাবগত ঘৃণা জন্ম নেওয়া। 'কানা খুলুকুহুল কুরআন' তথা নবীজির জীবন-চরিত ছিল কুরআনের বাস্তব দৃষ্টান্ত – এই সিফাতও তার জীবনের শান হয়ে যাওয়া। ৩৭২
টিকাঃ
৩৭২. কাসদুস সাবিল (ইসলাহি নেসাব), ৫২।
📄 ভণ্ডপীরদের থেকে সাবধান থাকুন
এপর্যায়ে একটি বিষয় ব্যক্ত করা অতি প্রয়োজনীয় মনে করছি। বিষয়টি হলো, প্রচলিত হক্কানী পীর-মুরিদির চাদর পরিধান করে দেশে অসংখ্য প্রচারলোভী লোক শিরক ও বিদআতের রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। তারা তাসাউফকে শরিয়ত থেকে আলাদা করে গোমরাহী ও ভ্রষ্টতার ফাঁদ পেতেছে। এজন্য জঘন্য ব্যবসার মাধ্যমে অশিক্ষিতদের ঠকাচ্ছে। খুব ভালোভাবে বুঝে নিন, যেই তাসাউফ শরিয়তপরিপন্থী কাজের নির্দেশ দেয় তা তাসাউফই নয়, বরং শয়তানী কর্মকাণ্ড। কাজেই ভণ্ডপীরদের কারসাজি থেকে যেমন নিজেদের বাঁচানো জরুরি, অনুরূপ তাদের কাজকারখানা দেখে হক্কানী পীরদের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ না করাও জরুরি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর ভয় ও তাকওয়া দান করুন। আমিন।