📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা.-এর দানশীলতা
১৩. হযরত শাহর ইবনে হাউশাব রা. বলেন, এক লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা.-এর কাছে চাইতে এলো। তখন তাঁর বাঁদি তাঁর সম্মুখে কোনো কাজ করছিল। হযরত আবদুল্লাহ ভিক্ষুককে বললেন, 'এই বাঁদিকে নিয়ে যাও, আজ থেকে সে তোমার।' একথা শুনে বাঁদি চিৎকার করে বলল, 'মুনীব, আপনি আমাকে মেরে ফেললেন।' হযরত আবদুল্লাহ রা. জিজ্ঞেস করলেন, 'কীভাবে?' বাঁদি উত্তর দিল, 'আপনি আমাকে এমন এক ব্যক্তির কাছে অর্পণ করলেন, অর্থসংকট যাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করেছে।' একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. ভিক্ষুককে বললেন, 'তুমি চাইলে একে আমার কাছে বিক্রি করতে পারো।' ভিক্ষুক বলল, 'ঠিক আছে। আপনার ইচ্ছামতো তার মূল্য প্রদান করুন।' হযরত বললেন, 'আমি বাঁদিকে একশ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ক্রয় করলাম। তুমি আমার কাছে দুইশ স্বর্ণমুদ্রায় বিক্রি করো।' হযরত আবদুল্লাহ রা. তাকে দুইশ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বাঁদিকে ফেরত নিয়ে বললেন, 'এগুলো শেষ হয়ে গেলে আবার এসো।' এমন দৃশ্য দেখে বাঁদি বলল, 'আমার কারণে আপনাকে অনেক বোঝা বহন করতে হলো!' হযরত আবদুল্লাহ রা. বললেন, 'তোমার প্রতি আমার ব্যয়িত সম্পদের চেয়ে তোমার ইজ্জত-সম্মান আমার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।' ৩৭৬
১৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. প্রতিবেশিদের চল্লিশটি পরিবারের খরচ বহন করতেন এবং দুই ঈদে তাদের জন্য নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করতেন। একবার তিনি এক এলাকায় ভ্রমণকালে একটি খেজুরবাগানে ছায়া গ্রহণ করেছিলেন। এমন সময় এক হাবশী গোলামকে বাগানে কাজ করতে দেখলেন। গোলামের জন্য দুপুরের খাবার আনা হয়েছে। তাতে কয়েক টুকরো রুটি ছিল। গোলামটি যখন খাওয়ার ইচ্ছা করল, তখন একটি কুকুর এলো। সে এক টুকরা রুটি কুকুরটিকে দিল। কুকুরটি তা খেয়ে শেষ করলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় টুকরোটিও দিয়ে দিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. এই দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'প্রতিদিন কী খাবার আসে?' গোলাম বলল, 'এই তিন টুকরা রুটি।' হযরত জিজ্ঞেস করলেন, 'তা হলে নিজে না খেয়ে কুকুরকে কেন খেতে দিলে?' গোলাম উত্তর দিল, 'কুকুরটি এই এলাকার নয়; অনেক দূর থেকে সে আমার নিকট এসেছে। ও খালি পেটে চলে যাবে, বিষয়টা ভালো লাগেনি।' হযরত আবদুল্লাহ রা. জিজ্ঞেস করলেন, 'তা হলে তুমি আজকে কী খাবে?' গোলাম সাদামাটা উত্তর দিল, 'কাল পর্যন্ত ক্ষুধার্ত থাকব।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. বলেন, 'আমি মনে মনে ভাবলাম, দানশীলতার কারণে মানুষ আমাকে নিন্দা করে। অথচ এই গোলাম তো দেখছি, আমার চেয়ে বড় দানশীল।' অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। গোলাম বলল, 'মদিনার অমুক।' এরপর আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. মদিনায় ফিরে এসে সেই মালিকের কাছ থেকে গোলামসহ গোটা বাগান ক্রয় করে গোলামকে আযাদ করে দেন এবং তাকে বলেন, 'আজ থেকে এই বাগানের মালিক তুমি।' ৩৭৮
১৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা.-এর সন্তান মুয়াবিয়াকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. এর বদান্যতা কতদূর পৌঁছেছিল?' তিনি উত্তর দিলেন, 'তিনি নিজের সম্পদে সবাইকে সমান শরিক মনে করতেন। সব ভিক্ষুককে মনভরে দান করতেন। নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে যেতেন। নিজে অভাবী হওয়ার ভয় পেতেন না।' ৩৭৯
টিকাঃ
৩৭৬. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৮৮।
৩৭৭. মাকারিমুল আখলাক, ২৭০।
৩৭৮. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৯০।
৩৭৯. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/৪০৭।
📄 হযরত হুসাইন রা.-এর দানশীলতা
১৬. এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, আমি ২০-৩০টি উট নিয়ে মদিনায় হাজির হলাম। উদ্দেশ্য হলো, মদিনাবাসীর খেজুর গ্রহণ করব। তারা আমাকে বলল, 'আমর ইবনে উসমান ও হুসাইন ইবনে আলী রা. স্ব-স্ব বাগানে উপস্থিত আছেন, তাদের কাছে চাও।' তিনি বলেন, 'আমি সর্বপ্রথম আমর ইবনে উসমান রা.-এর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি দুই উট খেজুর দিলেন। এরপর আমি হুসাইন রা.-এর বাগানে গেলাম। আমি তাঁকে চিনলাম না। দেখলাম এক লোক জমিনে বসা। তাঁর চারপাশে গোলামরা ঘিরে আছে। মাঝখানে একটা বড় পাত্রে মোটা রুটি ও গোশত। সবাই মিলে তা খাচ্ছে। আমি গিয়ে সালাম দিলাম। হুসাইন রা. আমাকে ডেকে নিজের সঙ্গে খাওয়ালেন। এরপর একটি ছোট নদীর দিকে গিয়ে হাত ধুলেন, পানি পান করলেন। অতঃপর আমার উদ্দেশে বললেন, 'কেন এসেছো?' আমি বললাম, 'আমি কয়েকটি উট নিয়ে আপনাদের কাছে এসেছি। আমার উদ্দেশ্য হলো, আপনাদের থেকে খেজুর নিয়ে উট ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া।' হযরত বললেন, 'যাও, উট নিয়ে আসো।' আমি উটগুলো নিয়ে উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, 'এগুলো নিয়ে গুদাম ঘরে যাও, সেখান থেকে যা ইচ্ছা গ্রহণ করো।' বর্ণনাকারী বলেন, 'আমি সব উট ভর্তি করে খেজুর নিয়ে চলে এলাম। মনে মনে ভাবলাম, এই হলো প্রকৃত দানশীলতা।' ৩৮০
টিকাঃ
৩৮০. মাকারিমুল আখলাক, ২৮৭।
📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর দানশীলতা
১৭. হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা. বসরা গমন করেন এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর মেহমান হন। ইবনে আব্বাস রা. তাঁর জন্য নিজের স্থান ছেড়ে দেন এবং বলেন, ‘হিজরতের সময় আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে যেমন মেহমানদারীমূলক আচরণ করেছিলেন, আজ আমিও আপনার সঙ্গে তেমন আচরণ করব।' অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার ঋণ কত?’ আবু আইয়ুব আনসারী রা. বললেন, ‘২০ হাজার।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বললেন, ‘ঘরের সকল আসবাব আপনার মালিকানাধীন।' ৩৯৪
টিকাঃ
৩৯৪. মাকারিমুল আখলাক, ২৭৯।
📄 নবীপরিবারের দানশীলতা
১৮. হযরত হুমাইদ ইবনে বিলাল রা. বলেন, বনু হাশেম ও বনু উমাইয়ার দুই লোক ঝগড়ায় লিপ্ত হলো। উভয়ের দাবি হলো, তার বংশই অধিক দানশীল। অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, প্রত্যেক বংশে চাঁদা তোলা হোক। এরপর ফয়সালা হবে। উভয়েই নিজ নিজ গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে চাঁদা তুলতে শুরু করল। বনু উমাইয়ার লোকটি দশ ব্যক্তির কাছে মোট চাঁদা পেল এক লাখ টাকা। হাশেমী ব্যক্তি প্রথমে হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর কাছে গেলে তিনি একাকী একলাখ দিরহাম দান করেন। অতঃপর হযরত হাসান রা.-এর কাছে গেলে তিনি এক লাখ তিরিশ হাজার দিরহাম দেন। অতঃপর লোকটি হযরত হুসাইন রা.-এর কাছে যান। তিনিও এক লাখ তিরিশ হাজার টাকা অর্পণ করেন। এই তিন ব্যক্তিই তিন লাখ ষাট হাজার দিরহাম অর্পণ করেন। এভাবে হাশেমী ব্যক্তি নিজ দাবিতে জয় লাভ করে। অতঃপর সিদ্ধান্ত হলো, এসব দিরহাম দাতাদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। উমুবী ব্যক্তি দাতাদের কাছে গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলে দিরহাম ফেরত দিলে তারা তা গ্রহণ করেন। অপরদিকে হাশেমী ব্যক্তি ফেরত দিতে গেলে হযরত উবাইদুল্লাহ, হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন রা. গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, 'আমরা দান করে ফেরত নিই না।' ৩৯৫
টিকাঃ
৩৯৫. মাকারিমুল আখলাক, ২৮০।