📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 বদান্যতা ও দানশীলতা

📄 বদান্যতা ও দানশীলতা


বদান্যতা আল্লাহর নিকট একটি প্রিয় গুণ। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। ২৮৬ এক হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘দুটি চরিত্র আল্লাহর কাছে প্রিয় আর দুটি চরিত্র খুবই ঘৃণিত। প্রিয় চরিত্র দুটি হলো, বদান্যতা ও উত্তম আচরণ। আর ঘৃণিত চরিত্র দুটি হলো, কৃপণতা ও অসদাচরণ। আল্লাহ্ তায়ালা যার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তাকে অন্যের প্রয়োজন পূরণের কাজে লাগিয়ে দেন।’ ২৮৭ হযরত হাসান বসরী রহ. থেকে মুরসালসূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের নেক লোকেরা অধিক নামায-রোযার কারণে নয়, বরং হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা এবং দানশীলতার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ ২৮৮

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'দুনিয়ারতে জননেতা হয় দানশীল ব্যক্তি, আর আখেরাতে নেতা হবে খোদাভীরু ব্যক্তি।' ২৮৯ হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, 'আমি দানশীলতা নিয়ে অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম, তার মৌলিকত্ব হলো, আল্লাহ্ তায়ালা সম্পর্কে এই সুধারণা পোষণ করা যে, আল্লাহ্ তায়ালা ওয়াদার খেলাপ করেন না। কারণ আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন, مَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ خَلِيفَةٌ ۚ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার প্রতিদান দেন। তিনি উত্তম রিযিকদাতা। ২৯০ 'সঞ্চয়ের কৃপণতা হলো আল্লাহ সম্পর্কে (নাউযুবিল্লাহ) এই কুধারণা পোষণ করা যে, আল্লাহ্ ওয়াদা পূরণ করেন না।' ২৯১

টিকাঃ
২৮৬. সূরা হাশর, আয়াত: ৯।
২৮৭. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৭/৪৬৬।
২৮৮. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৭/৪৬৬।
২৮৯. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৬৪।
২৯০. সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯।
২৯১. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১/৬৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতা

📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতা


আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিব রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমস্ত পূর্ণতা ও প্রশংসনীয় গুণাবলি দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং বদান্যতা ও দানশীলতার স্বর্ণশিখরে অধিষ্ঠিত করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের ভাষায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। রমযান মাসে দ্রুত প্রবাহিত বাতাসের মত তাঁর দানশীলতা প্রকাশ পেত। হযরত জাবের রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ভিক্ষুককে বঞ্চিত করতেন না, খালি হাতে ফেরত দিতেন না।' ২৯২ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতার সামান্য নমুনা নিম্নবর্তী ঘটনাগুলো থেকে জানা যায়।

টিকাঃ
২৯২. বুখারী, ১/১০, ২/৮৬২; মাকারিমুল আখলাক, ১৪৪।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 পরনের চাদর দান করে দিলেন

📄 পরনের চাদর দান করে দিলেন


১. হযরত সাহল ইবনে সা'আদ রা. বলেন, একবার এক মহিলা একটি চাদর নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করল, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই চাদরটি আমি নিজ হাতে বুনেছি। আমি এটি আপনার খেদমতে পেশ করলাম। আপনি এটি গ্রহণ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আগ্রহভরে চাদরটি গ্রহণ করলেন এবং সৃষ্টির পরিবর্তে চাদর পরিধান করে মজলিসে তাশরিফ আনলেন। তখন সাহাবী হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. আবেদন করলেন, 'ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু চাদরটি উন্নত মানের। দয়া করে এটি আমাকে প্রদান করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আচ্ছা ঠিক আছে।' কিছুক্ষণ পর তিনি কামরায় প্রবেশ করে লুঙ্গি পরিধান করে চাদরটি পাঠিয়ে দেন। এই অবস্থা দেখে সাহাবায়েকেরাম আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা.-কে শাসাতে লাগলেন যে, 'তুমি যেহেতু জানো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে ফেরৎ দেন না, তা হলে কেন এই চাদরটি চাইলে?' আবদুর রহমান রা. উত্তর দিলেন, 'আমি তো আমার কাফনে ব্যবহারের জন্য এই আবেদন করেছিলাম।' হযরত সাহল রা. বলেন, 'আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা.- এর ইনতিকালের পর এই চাদরই তাঁকে দাফন করা হয়েছিল।' ১০০

টিকাঃ
১০০. বুখারী, ১/১৭০, ৩৭১, ২/৬৮৪, ৮৯২; মাকারিমুল আখলাক, ২৪৫।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 বেদুইনদের শিষ্টাচারহীনতা সহ্য করা

📄 বেদুইনদের শিষ্টাচারহীনতা সহ্য করা


১. হযরত যুবায়ের ইবনে মুতইম রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে বিভিন্ন বস্তু চাইতে শুরু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বড় বৃক্ষের নিচে যান এবং তাঁর চাদর মোবারক তাতে আটকে যায়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেদুইনদের উদ্দেশে বললেন, 'আমার চাদরটি নিয়ে এসো। এ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি এ মরুভূমির পাথর সমপরিমাণ উট থাকে, তা-ও আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দেব। তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী, ভীরু কিংবা কৃপণ পাবে না।' ১০১
২. হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, আমরা মসজিদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষায় বসে ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের দরজা দিয়ে নাজরানী চাদর পরিহিত অবস্থায় প্রবেশ করেন। আকস্মিক এক বেদুইন ব্যক্তি পেছন থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাদর ধরে টানতে শুরু করে। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খুব নিকটবর্তী হন এবং আমি তো দেখলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখোমুখি হয়ে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আপনার কাছে যে সম্পদ আছে, তা থেকে আমাকে কিছু প্রদানের নির্দেশ দিন।' তাঁর কথা শুনে মুচকি হেসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছু সম্পদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। ১০২
৩. হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন। একদিন আলোচনা শেষে কামরায় যেতে শুরু করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মজবুত চাদর পরিহিত ছিলেন। এরই মাঝে এক বেদুইন লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাদর ধরে এত জোরে টান দেয় যে, চাদরের ঘষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গর্দান মোবারক লাল হয়ে যায়। অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, 'মুহাম্মাদ, এ দুটি আমার উট। এর একটির উপর খেজুর এবং অপরটির উপর যব দেওয়ার নির্দেশ দিন। কারণ, আপনি তো নিজস্ব কোনো কিছু দেবেন না (বরং বাইতুল মাল থেকে দেবেন)।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি আমার সঙ্গে কৃত আচরণের কাফফারা না দিলে তোমাকে কিছুই দেব না।' হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমরা যখন বেদুইন লোকটির এ আচরণ দেখি, তখন তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমরা দাঁড়িয়ে যাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এ অবস্থা দেখে বলেন, 'কেউ নিজ স্থান থেকে উঠবে না।' আমরা চুপচাপ বসে থাকলাম, যেন আমাদের রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে তার এক উটের উপর খেজুর এবং আরেক উটের উপর যব দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'তার আচরণ ক্ষমা করা হলো।' ১০৩

টিকাঃ
১০১. মাকারিমুল আখলাক, ২৪৬।
১০২. মাকারিমুল আখলাক, ২৪৭।
১০৩. মাকারিমুল আখলাক, ২৪৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px