📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
নবী যুগে এক ব্যক্তির নাম ছিল সালাবা ইবনে আবি হাতেব। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবেদন করল, 'আপনি আমার জন্য আর্থিক স্বচ্ছলতার দোয়া করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে সালাবা, সামান্য পরিমাণ সম্পদ, যার শোকরিয়া তুমি আদায় করতে পারবে, ঐ অধিক সম্পদের চেয়ে উত্তম, যার শোকরিয়া তুমি আদায় করতে পারবে না।' সে পুনরায় একই আবেদন করলে রাসূল সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে সালাবা, তুমি কি আল্লাহর নবীর অবস্থার মতো নিজের অবস্থাকে বানাতে চাও না? ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি আমি চাই সোনা-রূপার পাহাড় আমার সাথে চলুক, তা হলে তা চলবে (কিন্তু আমি এমনটা পছন্দ করি না)।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এ কথা শুনে সালাবা বলল, 'ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন। যদি আপনি আমার জন্য দোয়া করেন এবং আল্লাহ তায়ালা আমাকে সম্পদ দান করেন, তা হলে আমি অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য হক প্রদান করব।' তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি সালাবাকে সম্পদ দান করো।'
অতঃপর সালাবা কিছু বকরি পালন করতে শুরু করল এবং তা পঙ্গপালের মতো বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মদিনায় বসবাস করা তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। তাই সে জনপদ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী একটি উপত্যকায় স্থায়ীভাবে অবস্থান শুরু করে। যোহর ও আসরের নামায সে মসজিদে এসে পড়ত, বাকি তিন ওয়াক্ত মসজিদে আসত না। কিন্তু ধীরে ধীরে পশুর সংখ্যা আরো বেড়ে গেলে উপত্যকাও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়। সে উপত্যকা ছেড়ে আরও দূরে চলে যায়। তখন সে শুধু জুমআর নামাযে মসজিদে আসত। একসময় তার এ আগমনও বন্ধ হয়ে যায়। তখন সে কেবল রাস্তা দিয়ে গমণকারী কাফেলা থেকে মদিনার খবরাখবর নিত।
যাকাতের বিধান নাযিল হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাবার নিকট যাকাত উসুলের জন্য লোক পাঠালেন। তারা সালাবার কাছে গিয়ে যাকাত প্রদানের আবেদন করল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি পাঠ করে শোনাল। সালাবা বলল, 'এটা তো ট্যাক্স। আমি এর হাকীকত জানি না। তোমরা এখন যাও।' সালাবা যাকাতকে অস্বীকার করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছিল। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন : ‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে যারা আল্লাহ তায়ালার সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ দান করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যয় করব এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকব। অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে। তারপর এই পরিণতিতে তাদের অন্তরে কপটতা স্থান করে নিয়েছে সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তাঁর সাথে মিলে যাবে। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা লঙ্ঘন করেছিল এবং এজন্য যে, তারা মিথ্যা কথা বলত।’ ২৮৭
সালাবার কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে সে যাকাতের মাল নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয় এবং তা গ্রহণের আবেদন জানায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা আমাকে তোমার যাকাত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।' একথা শুনে সে মাথায় মাটি মেখে আফসোস করতে থাকে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর সে নিজের যাকাত হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান রা.-এর সামনে পেশ করেছিল। তারা সবাই একথাই বলে তার যাকাত ফিরিয়ে দেন যে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তোমার যাকাত গ্রহণ করেননি, আমরা কীভাবে গ্রহণ করব?'
দেখুন, সম্পদের ভালোবাসা, কৃপণতা ও লোভ-লালসা কীভাবে মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করে। তাই আবশ্যক হলো, শরীয়ত মোতাবেক কোনো সম্পদ প্রদান করা ওয়াজিব হলে অত্যন্ত খুশি মনে তা দিয়ে দেওয়া।
টিকাঃ
২৮৬. ইসাবা, ১/২১৯।
২৮৭. সূরা তাওবা, আয়াত : ৭৫-৭৮।
২৮৮. তাফসিরে ইবনে কাসির, ৫/১২২।
📄 যাকাত প্রদানে কার্পণ্যকারীর ভয়াবহ শাস্তি
বর্তমানে যাকাতকে এক ধরনের বোঝা মনে করা হচ্ছে। অপব্যয় ও অপচয় তো হর-হামেশা হতেই থাকে। সাধারণ থেকে সাধারণ অনুষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা অপচয় করা হয়। কিন্তু কেবল যাকাতই তাদের কাছে দুর্বহ বোঝার মতো মনে হয় এবং হিসাব-কিতাব করে যাকাত আদায় করা তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই যদি কোনো মাদরাসার যাকাত উসুলকারী কিংবা অসহায় ব্যক্তি কোনো ধনীর দরজায় পৌঁছে, তা হলে তার কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। যাকাত আদায় না দেওয়ার শাস্তির কথা যদি লোকদের জানা থাকত, তা হলে তারা আখেরাতের স্মরণে যাকাত আদায়ে অবহেলা করত না।
১. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সোনা-রূপার অধিকারী হয় কিন্তু এর হক (যাকাত) আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার ঐ সোনা-রূপা দিয়ে আগুনের পাত তৈরি করা হবে। অতঃপর তা জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে এবং তা দিয়ে তার চেহারা, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই তা ঠান্ডা হয়ে আসবে, পুনরায় উত্তপ্ত করা হবে। তার সাথে এরূপ করা হবে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ২৮৩
২. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টাক মাথাবিশিষ্ট সাপের আকৃতিতে তার সামনে আনা হবে এবং তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার চোয়াল কামড়ে ধরে বলবে, আমি হলাম তোমার সম্পদ। ২৮৪
৩. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন, তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন। আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণকে ধ্বংস করে দিন। ২৮৯
টিকাঃ
২৮৩. মুসলিম, ১/৩৩৭, হাদীস নং-২৩৬১; মিশকাত, ১/১৫৫।
২৮৪. বুখারী, ১/১৯৮, হাদীস নং-১০২১।
২৮৯. বুখারী, ১/১৯৪, মুসলিম, ১/৩৩৪, হাদীস নং-১০১০।