📄 আত্মার ব্যাধি
আত্মার অসংখ্য ব্যাধি রয়েছে, যার প্রভাব গোটা জীবনের উপর পড়ে। তন্মধ্যে কয়েকটি ব্যাধি রয়েছে ভয়াবহ। এসব রোগের কারণে হাজার হাজার রোগ সৃষ্টি হয়। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি লজ্জাবান হওয়ার গুণে গুণান্বিত হতে চায়, তার জন্য আবশ্যক হলো, হৃদয়কে এই ব্যাধিগুলো থেকে মুক্ত রাখা : ১. দুনিয়াপ্রীতি, ২. ঘৃণা ও শত্রুতা, ৩. আখেরাত সম্পর্কে উদাসীনতা।
যদি অন্তরকে উল্লিখিত তিন ব্যাধি থেকে পবিত্র রাখা যায়, তা হলে ইনশাআল্লাহ, হৃদয় পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভ করবে এবং গোটা শরীর আল্লাহর আনুগত্যে রঙিন হয়ে যাবে এবং সকল প্রকার গুনাহ থেকে দূরে থাকবে।
📄 দুনিয়াপ্রীতি
দুনিয়ার মহব্বত মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘মানুষের জন্য ওই সকল বস্তুর আসক্তিকে মনোরম করা হয়েছে, যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক হয় অর্থাৎ নারী, সন্তান, রাশিকৃত সোনা-রূপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার।’ ১৭৯
এই মহব্বত প্রয়োজনীয়ও বটে। কারণ দুনিয়ার মহব্বত ব্যতীত সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু এই মহব্বত-ভালোবাসা সীমাতিক্রম হওয়ার কারণে যদি মানুষ নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে যায় এবং আল্লাহর বিধি নিষেধ ও বান্দার হক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন এই দুনিয়াপ্রীতি ভয়াবহ আত্মিক ব্যাধিতে পরিণত হয়। উদাহরণত, মানবজীবনে বিশেষ মাত্রায় সুগার আবশ্যক। সুগার ব্যতীত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু এই সুগারই যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তখন তা অনারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়, যা শরীরকে ফোকলা করে দেয়। মানুষের জীবন তখন দুঃসহ হয়ে ওঠে। অনুরূপ দুনিয়াপ্রীতি মাত্রাতিরিক্ত হলে তা সকল অনর্থের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়। হযরত হাসান বাসরী রহ.-এর মুরসাল হাদিসসমূহের মাঝে নিম্নোক্ত বাক্যটি প্রসিদ্ধ : ‘দুনিয়াপ্রীতি সকল অন্যায়ের মূল।’ ১৮০
আল্লামা মুনাভী রহ. লেখেন, ‘অভিজ্ঞতার আলোকে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, দুনিয়াপ্রীতিই সকল খারাপ কাজের ভিত্তি। উদাহরণত, পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলো আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের দাওয়াত কবুল না করার কারণ হলো, তারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল। আর আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত কবুল করলে দুনিয়ালাভে এবং চাহিদাপূরণে বিঘ্ন সৃষ্টি হতো। তাই তারা নবী-রাসুলদের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিল। অনুরূপ অভিশপ্ত ইবলিস হযরত আদম আলায়হিস সালামকে এজন্যই সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, কারণ সে হযরত আদম আলায়হিস সালামের অস্তিত্বকে নিজের নেতৃত্ব ও বড়ত্বের পথে বাধা মনে করত। নমরুদ, ফেরাউন, হামানও একই অবস্থায় ছিল। তারা ক্ষমতা ও মর্যাদার লালসায় মগ্ন হয়ে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল।’ ১৮১
টিকাঃ
১৭৯. সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪।
১৮০. ফায়জুল কাদির, ৩/৪৮৮।
১৮১. ফায়জুল কাদির, ৩/৪৮৮।
📄 লোভ-লালসা
দুনিয়ার মহব্বত বড় বড় আত্মিক ব্যাধি সৃষ্টি করে। তন্মধ্যে একটি বড় ব্যাধি হলো লোভ-লালসা। যখন মানুষের ভেতরে দুনিয়াপ্রীতি প্রভাব বিস্তার করে, তখন সে লোভ-লালসার রোগে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হলেও ‘আছে কি আরও?’-এর বাস্তব নমুনায় পরিণত হয়। তখন পাহাড় পরিমাণ সম্পদও তার শান্তি ও তৃপ্তির কারণ হতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘বনি আদমের জন্য যদি উপত্যকা পরিমাণ সম্পদ থাকে, তা হলে সে আরও ধন অর্জনের জন্য লালায়িত থাকবে। বনি আদমের লোভী চোখকে মাটি ছাড়া আর কিছুই তৃপ্ত করতে পারে না। তবে যে তাওবা করবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করবেন।’ ১৮২
অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আদম-সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি অভিলাষ বৃদ্ধি পায় : ১. সম্পদপ্রীতি, ২. দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা।’ ১৮৩
অন্য এক হাদিসে এসেছে, দুই ব্যক্তির ক্ষুধা নিবারণ হয় না : ১. ইলম অন্বেষী, সে ইলম অর্জনে তৃপ্ত হয় না। ২. সম্পদলোভী, সে যত বিপুল সম্পদের মালিক হোক না কেন, তবুও আরও অর্জনের চিন্তায় মগ্ন থাকে। ১৮৪
লোভী ব্যক্তির হৃদয় কখনও প্রশান্তি পায় না। সম্পদের নেশায় তার চোখের ঘুমও হারিয়ে যায় এবং অন্তরের প্রশান্তিও দূর হতে থাকে। অথচ অন্তরের শান্তিই মানুষের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, ধনসম্পদ নয়। অল্প সম্পদের মধ্যে যদি আত্মার শান্তি লাভ হয়, তা হলে মানুষ প্রকৃতপক্ষে ধনবান হয়। পক্ষান্তরে বিপুল সম্পদের মাঝেও যদি আত্মার শান্তি না পাওয়া যায়, তবে সে প্রকৃত ধনবান হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সম্পদের আধিক্যের নাম ধনাঢ্যতা নয়, বরং অন্তরে যে ধনী, সেই প্রকৃত ধনবান।’ ১৮৫
উপর্যুক্ত বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা যায়, লোভ-লালসা এমন ভয়াবহ রোগ, যা মানুষের জীবনের প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলে। কাজেই এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
টিকাঃ
১৮২. বুখারী, ২/৯৬৫, হাদিস নং-৬৪৩৪।
১৮৩. বুখারী, ২/৯৫৫।
১৮৪. মিশকাত, ১/১১২।
১৮৫. বুখারী, ২/৯৩৪; মুসলিম, ১/৩০৮; তিরমিযী, ২/৬৩।
📄 অভিজ্ঞতার আলোকে লোভের চিকিৎসা
লোভ-লালসার ব্যাধিকে নির্মূল করার জন্য সেসব হাদিসের প্রতি দৃষ্টিপাত করা উচিত, যেখানে দুনিয়ার অস্থায়িত্ব এবং মন্দ দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার, আর কাফেরের জন্য জান্নাত।’ ১৮৬
অর্থাৎ দুনিয়ায় মুমিনের এমনভাবে বসবাস করা দরকার, যেভাবে একজন কয়েদি কারাগারে অবস্থান করে। কয়েদি যেমন সর্বদা কারাগার থেকে বের হওয়ার জন্য সর্বান্তকরণে চেষ্টা করে, তদ্রূপ একজন মুমিনেরও উচিত দুনিয়ার মোহে না পড়ে দ্রুত আখেরাতের পাথেয় প্রস্তুত করা।
আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসল সে আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করল। আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে ভালোবাসল, সে দুনিয়ার সাময়িক ক্ষতি করল। সুতরাং তোমরা স্থায়ী বস্তুকে ক্ষণস্থায়ী বস্তুর উপর প্রাধান্য দাও।’ ১৮৭
আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির সমানও নয়। তাই এই কয়েকদিনের জীবনে লোভ করে আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করাই বিবেকের দাবি। অনুরূপ লোভ-লালসাকে মিটানোর ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস স্থাপন করাও খুবই উপকারী যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য পূর্ব থেকে যে রিযিক নির্ধারণ করেছেন নিঃসন্দেহে আমরা তা পাব। ততদিন মৃত্যু আসবে না, যতদিন নির্ধারিত রিযিক আমরা ভোগ না করি।
লোভ-লালসাকে মিটিয়ে অল্পে তুষ্ট থাকার প্রেরণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি যুগান্তকারী পদ্ধতি বলে দিয়েছেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কারও দৃষ্টি যদি এমন ব্যক্তির উপর নিপতিত হয়, যাকে সম্পদে ও দৈহিক গঠনে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তবে সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে তার চেয়ে হীন অবস্থায় আছে।’ ১৮৯
অর্থাৎ সাধারণত সম্পদপ্রীতির মূল কারণ হলো, মানুষ ধনবান ব্যক্তিদের দিকে দৃষ্টিপাত করে। যেমন তিন কোটি টাকার মালিক চার কোটি টাকার মালিকের দিকে তাকায়। ফলে কখনোই তৃপ্তি অর্জন হয় না। অন্তরে শান্তিও থাকে না। তবে মানুষ যদি নিজের তুলনায় দরিদ্র ব্যক্তির দিকে তাকায়, তা হলে অন্তরে কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি লোভ-লালসার মূলও দূর হয়ে যাবে। তাই সর্বদা লোভ দমনের চেষ্টা থাকা দরকার।
টিকাঃ
১৮৬. মুসলিম, ২/৪০৭।
১৮৭. মিশকাত, ২/৪৪৩।
১৮৯. বুখারী, ২/৯৬০।