📄 অন্তরের হেফাযত
পেট ও তৎসংশ্লিষ্ট অঙ্গের হেফাযতের মধ্যে অন্তরের হেফাযতও অন্তর্ভুক্ত। অন্তর মানবদেহের রাজা। সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্তরের অবৈতনিক সেবক। কাজেই অন্তর ঠিক হলে অন্য সকল অঙ্গও ঠিক পথে চলে। পক্ষান্তরে অন্তর বেঁকে বসলে সকল অঙ্গ ভুল পথে অগ্রসর হয়। একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ.
জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে। তা ঠিক হয়ে থাকলে সারা শরীর ঠিক হয়ে যায়, তা খারাপ হয়ে গেলে সারা শরীর খারাপ হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেই গোশতের টুকরাটি হলো অন্তর। ১৭১
এজন্য অন্তরকে শরীয়তের অনুগামী বানানো আবশ্যক, যাতে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাজায়েয ও অবৈধ কাজ না করে। কুরআনে কারিম হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের অন্যতম উদ্দেশ্য সাব্যস্ত করেছে। ইরশাদ হয়েছে,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُواْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ
তিঁনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পবিত্র করেন। ১৭২
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর অর্পিত দায়িত্বকে পূর্ণরূপে আদায় করেছেন এবং সাহাবায়েকেরাম এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, তাদের অন্তর পরিশোধিত ও আলোকিত হয়েছে যে, তাদের দেখে ফেরেশতারা ঈর্ষা করত। ইবাদত ও কল্যাণকর কাজে তারা এমন অভিনব ও অনুপম স্বাদ অনুভব করতেন যে, বর্তমান যুগের বড় বড় কুতুব কিংবা ওলীও একজন অতি সাধারণ সাথীর স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। সাহাবায়ে-কেরামের এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা মূলত তাদের আত্মিক পরিশুদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। আত্মিক পরিশুদ্ধতাই তাদের সততা, একনিষ্ঠতা, শ্রেষ্ঠ চরিত্র, অপরকে প্রাধান্যদান এবং ভ্রাতৃত্ববোধের এমন উচ্চস্পৃহা দান করেছিল, যার দৃষ্টান্ত মানব ইতিহাসে বিরল।
টিকাঃ
১৭১. বুখারী, ১/১০১।
১৭২. সূরা জুমুআ, আয়াত: ২।
📄 আত্মার ব্যাধি
আত্মার অসংখ্য ব্যাধি রয়েছে, যার প্রভাব গোটা জীবনের উপর পড়ে। তন্মধ্যে কয়েকটি ব্যাধি রয়েছে ভয়াবহ। এসব রোগের কারণে হাজার হাজার রোগ সৃষ্টি হয়। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি লজ্জাবান হওয়ার গুণে গুণান্বিত হতে চায়, তার জন্য আবশ্যক হলো, হৃদয়কে এই ব্যাধিগুলো থেকে মুক্ত রাখা : ১. দুনিয়াপ্রীতি, ২. ঘৃণা ও শত্রুতা, ৩. আখেরাত সম্পর্কে উদাসীনতা।
যদি অন্তরকে উল্লিখিত তিন ব্যাধি থেকে পবিত্র রাখা যায়, তা হলে ইনশাআল্লাহ, হৃদয় পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভ করবে এবং গোটা শরীর আল্লাহর আনুগত্যে রঙিন হয়ে যাবে এবং সকল প্রকার গুনাহ থেকে দূরে থাকবে।
📄 দুনিয়াপ্রীতি
দুনিয়ার মহব্বত মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘মানুষের জন্য ওই সকল বস্তুর আসক্তিকে মনোরম করা হয়েছে, যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক হয় অর্থাৎ নারী, সন্তান, রাশিকৃত সোনা-রূপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার।’ ১৭৯
এই মহব্বত প্রয়োজনীয়ও বটে। কারণ দুনিয়ার মহব্বত ব্যতীত সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু এই মহব্বত-ভালোবাসা সীমাতিক্রম হওয়ার কারণে যদি মানুষ নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে যায় এবং আল্লাহর বিধি নিষেধ ও বান্দার হক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন এই দুনিয়াপ্রীতি ভয়াবহ আত্মিক ব্যাধিতে পরিণত হয়। উদাহরণত, মানবজীবনে বিশেষ মাত্রায় সুগার আবশ্যক। সুগার ব্যতীত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু এই সুগারই যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তখন তা অনারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়, যা শরীরকে ফোকলা করে দেয়। মানুষের জীবন তখন দুঃসহ হয়ে ওঠে। অনুরূপ দুনিয়াপ্রীতি মাত্রাতিরিক্ত হলে তা সকল অনর্থের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়। হযরত হাসান বাসরী রহ.-এর মুরসাল হাদিসসমূহের মাঝে নিম্নোক্ত বাক্যটি প্রসিদ্ধ : ‘দুনিয়াপ্রীতি সকল অন্যায়ের মূল।’ ১৮০
আল্লামা মুনাভী রহ. লেখেন, ‘অভিজ্ঞতার আলোকে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, দুনিয়াপ্রীতিই সকল খারাপ কাজের ভিত্তি। উদাহরণত, পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলো আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের দাওয়াত কবুল না করার কারণ হলো, তারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল। আর আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত কবুল করলে দুনিয়ালাভে এবং চাহিদাপূরণে বিঘ্ন সৃষ্টি হতো। তাই তারা নবী-রাসুলদের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিল। অনুরূপ অভিশপ্ত ইবলিস হযরত আদম আলায়হিস সালামকে এজন্যই সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, কারণ সে হযরত আদম আলায়হিস সালামের অস্তিত্বকে নিজের নেতৃত্ব ও বড়ত্বের পথে বাধা মনে করত। নমরুদ, ফেরাউন, হামানও একই অবস্থায় ছিল। তারা ক্ষমতা ও মর্যাদার লালসায় মগ্ন হয়ে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল।’ ১৮১
টিকাঃ
১৭৯. সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪।
১৮০. ফায়জুল কাদির, ৩/৪৮৮।
১৮১. ফায়জুল কাদির, ৩/৪৮৮।
📄 লোভ-লালসা
দুনিয়ার মহব্বত বড় বড় আত্মিক ব্যাধি সৃষ্টি করে। তন্মধ্যে একটি বড় ব্যাধি হলো লোভ-লালসা। যখন মানুষের ভেতরে দুনিয়াপ্রীতি প্রভাব বিস্তার করে, তখন সে লোভ-লালসার রোগে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হলেও ‘আছে কি আরও?’-এর বাস্তব নমুনায় পরিণত হয়। তখন পাহাড় পরিমাণ সম্পদও তার শান্তি ও তৃপ্তির কারণ হতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘বনি আদমের জন্য যদি উপত্যকা পরিমাণ সম্পদ থাকে, তা হলে সে আরও ধন অর্জনের জন্য লালায়িত থাকবে। বনি আদমের লোভী চোখকে মাটি ছাড়া আর কিছুই তৃপ্ত করতে পারে না। তবে যে তাওবা করবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করবেন।’ ১৮২
অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আদম-সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি অভিলাষ বৃদ্ধি পায় : ১. সম্পদপ্রীতি, ২. দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা।’ ১৮৩
অন্য এক হাদিসে এসেছে, দুই ব্যক্তির ক্ষুধা নিবারণ হয় না : ১. ইলম অন্বেষী, সে ইলম অর্জনে তৃপ্ত হয় না। ২. সম্পদলোভী, সে যত বিপুল সম্পদের মালিক হোক না কেন, তবুও আরও অর্জনের চিন্তায় মগ্ন থাকে। ১৮৪
লোভী ব্যক্তির হৃদয় কখনও প্রশান্তি পায় না। সম্পদের নেশায় তার চোখের ঘুমও হারিয়ে যায় এবং অন্তরের প্রশান্তিও দূর হতে থাকে। অথচ অন্তরের শান্তিই মানুষের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, ধনসম্পদ নয়। অল্প সম্পদের মধ্যে যদি আত্মার শান্তি লাভ হয়, তা হলে মানুষ প্রকৃতপক্ষে ধনবান হয়। পক্ষান্তরে বিপুল সম্পদের মাঝেও যদি আত্মার শান্তি না পাওয়া যায়, তবে সে প্রকৃত ধনবান হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সম্পদের আধিক্যের নাম ধনাঢ্যতা নয়, বরং অন্তরে যে ধনী, সেই প্রকৃত ধনবান।’ ১৮৫
উপর্যুক্ত বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা যায়, লোভ-লালসা এমন ভয়াবহ রোগ, যা মানুষের জীবনের প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলে। কাজেই এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
টিকাঃ
১৮২. বুখারী, ২/৯৬৫, হাদিস নং-৬৪৩৪।
১৮৩. বুখারী, ২/৯৫৫।
১৮৪. মিশকাত, ১/১১২।
১৮৫. বুখারী, ২/৯৩৪; মুসলিম, ১/৩০৮; তিরমিযী, ২/৬৩।