📄 সমকামিতার অভিশাপ
বর্তমান সমাজে কিছু নির্লজ্জ মানুষ লজ্জা-শরম হারিয়ে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের পশুর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। সমকামিতা তথা পুরুষ পুরুষের সাথে এবং নারী নারীর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হওয়া ভীষণ জঘন্য অপরাধ। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম লূত সম্প্রদায় এ অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। যার কারণে পৃথিবীতে তাদের উপর এমন ভয়ানক আযাব নাযিল করা হয়েছিল যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। তাদের জনবসতি উল্টে দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে প্রস্তরাঘাতে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। যেই স্থানের জনপদ উল্টে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে মৃত সাগর (Dead Sea) নামক এমন একটি ঝিল তৈরি হয়ে গেছে। আজ অবধি সেখানে কোনো প্রাণী জীবিত থাকতে পারে না। ১৬৫
ইসলাম এই অভিশপ্ত কাজের চরম নিন্দা করেছে। এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إن من اخوف ما اخاف على أمتى عمل قوم لوط.
আমি আমার উম্মতের জন্য সর্বাধিক আশঙ্কাজনক বস্তু মনে করি লূত সম্প্রদায়ের আমলকে। ১৬৬
এক হাদিসে এসেছে, সমকামিতার শাস্তি হলো উভয়কে হত্যা করে ফেলা। অর্থাৎ তাদের উপর ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
হযরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. হযরত আবু বকর রা.-কে পত্রযোগে লেখেন, 'আরবের এক গোত্রে এমন এক পুরুষ রয়েছে, যার সঙ্গে সমকাম করা হয়।' হযরত আবু বকর রা. এ চিঠি পাওয়া মাত্রই সাহাবায়েকেরামের এক পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। সভায় এই ব্যক্তির শাস্তির বিষয়ে পর্যালোচনা হলো। হযরত আলী রা. বললেন, 'এটা এমন অপরাধ, যা লূত সম্প্রদায় লিপ্ত ছিল। তাদের কী শাস্তি হয়েছিল, আপনারা তা অবগত আছেন। আমার পরামর্শ হলো, এই ব্যক্তিকে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হোক।' অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়ীগণ তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। অতঃপর হযরত আবু বকর রা. সেই ব্যক্তিকে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। ১৬৭
হাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম রহ. বলেন, 'যদি কোনো ব্যক্তিকে দুইবার প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা সমীচীন হতো, তবে সমকামিতায় লিপ্ত ব্যক্তিকে দুইবার প্রস্তরাঘাত করা হতো।' ১৬৮
প্রসিদ্ধ হাদিসবিশারদ মুহাম্মদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, 'গাধা ও শুকর ব্যতীত অন্য কোনো চতুষ্পদ জন্তু লূত সম্প্রদায়ের অভ্যাসে আক্রান্ত হয় না।' ১৬৯
হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন, 'সমকামী ব্যক্তি আসমান-জমিনের সব পানি দিয়ে গোসল করলেও (অভ্যন্তরীণভাবে) নাপাক থাকবে।' ১৭০
টিকাঃ
১৬৫. মা’আরেফুল কুরআন।
১৬৬. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৬৭. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৭।
১৬৮. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৭।
১৬৯. তাফসীরে দূররে মানসুর, ৩/১৮৭।
১৭০. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
📄 সুদর্শন ছেলেদের সঙ্গে চলাফেরা করা ফিতনার কারণ
সমকামিতা থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো, সমকামিতার প্রতি উদ্বুদ্ধকারী সকল পথ রুদ্ধ করে দেওয়া। দাড়িবিহীন কিশোরদের সঙ্গে চলাফেরা পরিহার করা উচিত। অনেক তাবেয়ী বলেন, 'দীনদার ও ইবাদতগোজার যুবকদের জন্য রক্তপিপাসু জন্তুর চেয়ে ভয়ানক হলো দাড়িবিহীন কিশোর বালক।' ১৭১
হাসান ইবনে জাকওয়ান রহ. বলেন, 'সম্পদশালীদের সন্তানের সাথে ওঠাবসা কোরো না। কারণ তাদের আকৃতি নারীদের মতো সুন্দর হয়। কুমারী নারীদের চেয়ে এদের ফিতনা ভয়াবহ।' ১৭২ কারণ নারী তো কোনো অবস্থায় বৈধ হতে পারে, কিন্তু বালক কখনও বৈধ নয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, 'একবার হযরত সুফিয়ান সাওরী রহ. গোসলখানায় প্রবেশ করলেন। আকস্মিক সেখানে এক সুদর্শন বালক প্রবেশ করল। তাকে দেখে হযরত সুফিয়ান সাওরী রহ. বললেন, "একে এখান থেকে বের করো। কারণ নারীর সাথে একজন শয়তান থাকে, আর বালকদের সাথে দশের অধিক শয়তান থাকে!"' ১৭৩
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ হলো, বাচ্চা বোধসম্পন্ন হতেই তাদের বিছানা আলাদা করে দাও। যাতে বাচ্চারা বাল্যকাল থেকেই বদ অভ্যাস হতে মুক্ত থাকে। পাশাপাশি বাচ্চাদের প্রতি কড়া নজর রাখা দরকার, যাতে অধিকাংশ সময়, বিশেষভাবে নির্জনতায় যেন বড় ছেলেদের সঙ্গে সময় না কাটায়। একাধিক বাচ্চা একই কামরায় থাকলে তাদের বিছানা ও চাদর আলাদা হওয়া চাই।
উপরাউক্ত বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা গেল, কেবল বিবাহিত স্ত্রী ও অধীনস্থ বাঁদির সঙ্গে যৌনতৃষ্ণা পূরণ করার অনুমোদন রয়েছে। এছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতিতে যৌন ক্ষুধা নিবারণ করা শরীয়তসম্মত নয়। পর্দার বিধান ও বেগানা নারীদের সঙ্গে মেলামেশা নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ও এটাই যে, অবৈধ পন্থায় যৌনতাপূর্ণ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা। যে ব্যক্তি এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে নিজের লজ্জাস্থান হেফাযত করবে এবং নিজের যৌবনকে এসব অশ্লীল কর্ম থেকে রক্ষা করবে, আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়স্বরূপ তাকে জান্নাত প্রদান করবেন। ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১৭১. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৭২. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৭৩. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
📄 লজ্জাস্থান হেফাযতের প্রতিদান
১. একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ছয়টি বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, আমি তার জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করব। সাহাবায়েকেরাম জানতে চাইলেন, সেই ছয়টি বিষয় কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, من إذا حدث صدق، وإذا وعد أنجز، وإذا ائتمن أدى ومن غض بصره، و حفظ فرجه وكফ يده. ১. কথা বলার সময় সত্য বলা, ২. প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা, ৩. আমানত হেফাযত করা, ৪. দৃষ্টি অবনত রাখা, ৫. লজ্জাস্থান হেফাযত রাখা, ৬. নিজের হাতকে (অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে) বিরত রাখা। ১৭৩
২. হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘হে কুরাইশ যুবকরা, নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাযত করো। ব্যভিচারে জড়াবে না। শুনে রাখো, যে ব্যক্তি লজ্জাস্থান হেফাযত করবে, তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ ১৭৪
৩. অন্য আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘হে কুরাইশ যুবকরা, ব্যভিচার করবে না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা যে ব্যক্তির যৌবনকে হেফাজত করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ ১৭৫
৪. হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী স্থানকে হেফাজত করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ১৭৬ অনুরূপ একটি হাদিস হযরত সাহল ইবনে সাআদ রা.-এর সূত্রে বুখারী শরিফে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটিতে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি উক্ত দুই স্থান হেফাযতের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, আমি তার জান্নাতের জামিন হবো।
৫. একটি হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন সাতজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যারা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, رَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصَبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ. এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো আভিজাত্য সম্পন্না সুন্দরী ও অর্থবান নারী অসৎ সধনের জন্য আহ্বান করলে সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় পাই। ১৭৭
টিকাঃ
১৭৩. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৭৪. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৭৫. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৭৬. আবূদ ঈমান খিল বাইহাকী, ৪/৩৫৫।
১৭৭. মুসলিম শরীফ, ১/৩০১।
📄 ব্যভিচার থেকে বাঁচার একটি উত্তম পন্থা
হযরত আবু উমামা রা. বলেন, এক যুবক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে আরজ করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি আমাকে যিনার অনুমতি দিতে পারেন?' তার এমন ধৃষ্টতা দেখে উপস্থিত সাহাবায়েকেরাম শোরগোল শুরু করলেন এবং বললেন, 'তাকে মজলিস থেকে বের করে দাও।' কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তোমার মায়ের সাথে একাজ করাকে ভালো মনে করো?' সে বলল, 'না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কেউ-ই নিজের মায়ের সঙ্গে একাজ করাকে ভালো মনে করে না।' অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, কেউ তোমার মেয়ের সঙ্গে এই কাজ করলে তোমার কি ভালো লাগবে?' সে বলল, 'কখনও নয় ইয়া রাসূলাল্লাহ।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'অনুরূপ কেউ-ই নিজের মেয়ের সঙ্গে একাজ করাকে ভালো মনে করে না।' অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বোন, ফুফু, খালাসহ অনেকের কথা উল্লেখ করে তাকে বুঝালে সে একাজের নিকৃষ্টতা বুঝতে পারে। অতঃপর সে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য দোয়া করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাথায় হাত রেখে নিম্নোক্ত দোয়া করলেন, اللَّهُمَّ اغْفِرْ ذَنْبَهُ وَطَهِّرْ قَلْبَهُ وَحَصِّن فَرْجَهُ. হে আল্লাহ, তার গুনাহ মাফ করুন। তার অন্তরকে পবিত্র করুন এবং তার লজ্জাস্থানকে হেফাযত করুন। বর্ণনাকারী বলেন, 'এরপর সেই যুবকের মাঝে এমন পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল যে, তার দৃষ্টি অবৈধ কোনো কিছুর দিকে প্রসারিত হতো না।' ১৭৮
উক্ত ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে ব্যভিচার থেকে বাঁচার এমন এক উত্তম উপায় শিক্ষা দিয়েছেন, যেকোনো ব্যক্তি সামান্য সময় বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলে নিজেকে জঘন্য চরিত্র থেকে বিরত রাখতে পারবে। কারণ যার সঙ্গেই ব্যভিচার করার ইচ্ছা হোক না কেন, সে অবশ্যই কারও না কারও বোন বা মা। মানুষ যেভাবে নিজের মা-বোনের সঙ্গে এমন কাজকে বরদাশত করতে পারে না, তা হলে অন্যরা কীভাবে বরদাশত করবে?
টিকাঃ
১৭৮. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/৩৮২।