📄 ব্যভিচারীরা আগুনের গর্তে নিক্ষিপ্ত হবে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল, তিনি সাহাবায়ে-কেরামকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কেউ স্বপ্ন দেখলে বলো। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালবেলা নিজের এক দীর্ঘ স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন যে, আমি স্বপ্নে দেখলাম দুজন ব্যক্তি আমার কাছে এলো এবং আমাকে নিয়ে চলল। অতঃপর এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে আমরা অতিক্রম করলাম, যাদের বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। (অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,)
فَأَتَيْنَا عَلَى مِثْلِ التَّنُّورِ قَالَ وَأَحْسَبُ أَنَّهُ কَانَ يَقُولُ فَإِذَا فِيهِ لَغَطٌ وَأَصْوَاتٌ قَالَ فَا طَّلَعْنَا فِيهِ فَإِذَا فِيهِ رِجَالٌ وَنِسَاءٌ عُرَاةٌ فَإِذَا هُمْ يَأْتِيهِمْ لَهَبٌ مِنْ أَسْفَلَ مِنْهُمْ فَإِذَا أَتَاهُمْ ذَلِكَ اللَّهَبُ ضَوْضَوْا.
'অতঃপর আমরা চুলার মতো একটা গর্তের কাছে পৌঁছলাম।' বর্ণনাকারী বলেন, 'আমার মনে হয় তিনি বলছিলেন, তথায় শোরগোলের শব্দ ছিল।' তিনি বলেন, 'আমরা উঁকি মারলাম। দেখলাম, তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে উদ্গত আগুনের লেলিহান শিখা তাদের স্পর্শ করছে। যখনই অগ্নিশিখা তাদের স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে ওঠে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথিদের কাছে এদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বলেন, 'সামনে চলুন।' অতঃপর সব দৃশ্য অবলোকন শেষে সবার পরিচয় প্রদান করেন। এক পর্যায়ে চুলার মতো গর্তের ভেতরের লোকদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
أَمَا الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ الْعُرَاةُ الَّذِينَ هُمْ فِي مِثْلِ بِنَاءِ التَّنُّورِ فَإِنَّهُمُ الزُّنَاةُ وَالزَّوَافِعُ.
আর এসকল উলঙ্গ নারীপুরুষ, যারা চুলার মতো গর্তের অভ্যন্তরে রয়েছে, তারা হলো ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী দল। ১৬১
মুহাদ্দিসিনে কেরাম লেখেন, 'ব্যভিচারীদের এই অপমানজনক পরিণতি তাদের অন্যায়ের উপযুক্ত শাস্তি। কারণ : ১. ব্যভিচারীরা সাধারণত গোপনে এ কাজ সম্পাদন করে থাকে। এর উপযুক্ত শাস্তি হলো, বস্ত্রহীন করে অপমানিত করা। ২. ব্যভিচারীরা শরীরের নিম্নভাগকে মাধ্যমে গুনাহ করে। এর উপযুক্ত শাস্তি হলো, চুলায় নিক্ষেপ করে নিচ থেকে আগুনে লাগিয়ে দেওয়া।' ১৬২
টিকাঃ
১৬১. বুখারী, ২/১০৪৪, হাদিস নং-৬৯৭।
১৬২. ফাতহুল বারী, ২/১০৪৪।
📄 ব্যভিচারীদের শরীর দুর্গন্ধময় হবে
আরেক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লম্বা স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বলেন,
ثُمَّ انْطَلَقْتُ بِي فَإِذَا أَنَا بِقَوْمٍ أَشَدَّ شَيْءٍ انْتِفَاخًا وَأَنْتَنَهُ رِيحًا كَانَ رِيحُهُمْ الْمَرَاحِيضُ قُلْتُ مَنْ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ هَؤُلَاءِ الزَّانُونَ.
অতঃপর আমাকে এমন কতিপয় লোকের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো, যাদের শরীর (পঁচে) ফুলে গিয়েছিল এবং তাদের শরীর থেকে ভীষণ দুর্গন্ধ আসছিল; অনেকটা মলমূত্রের গন্ধের মতো। আমি এদের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে ফেরেশতা বললেন, এরা ব্যভিচারী। ১৬৩
এক বর্ণনায় হযরত বুরাইদা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য বর্ণনা করেন যে, সপ্তম আসমান ও সপ্তম জমিন বৃদ্ধ ব্যভিচারীর প্রতি অভিসম্পাত করে। আর ব্যভিচারিণী মহিলাদের লজ্জাস্থানের দুর্গন্ধ জাহান্নাম নিজে কষ্ট পায়। ১৬৪
অন্য এক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যাবাদীদের শাস্তি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তাদেরকে 'খুবা' নদীর পানি পান করানো হবে। এবং সেই নদীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
نَهْرٍ يَجْرِي مِنْ فُرُوجِ الْمُومِسَاتِ يُؤْذِى أَهْلَ النَّارِ رِيحُ فُرُوجِهِمْ .
এটা এমন নদী, যা ব্যভিচারিণীদের লজ্জাস্থান থেকে প্রবাহিত। যাদের লজ্জাস্থানের দুর্গন্ধ জাহান্নামবাসীকে কষ্ট দেয়। ১৬৫
টিকাঃ
১৬৩. সহিহ ইবনে খুযাইমা; ইবনে হিব্বান; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৮৬।
১৬৪. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৮০।
১৬৫. মুসনাদে আহমদ; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৮৬।
📄 ব্যভিচার আযাবের কারণ
হযরত মাইমুনা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لَا تَزَالُ أُمَّتِي بِخَيْرٍ مَا لَمْ يَفْشُ فِيهِمْ وُلَدُ الزِّنَا، فَإِذَا فَشَا فِيهِمْ ওُلَدُ الزِّنَا فَأَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعَذَابٍ.
আমার উম্মত ততদিন পর্যন্ত কল্যাণের মাঝে বসবাস করবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের মাঝে জারজ সন্তানের ছড়াছড়ি না হবে। জারজ সন্তান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে শীঘ্রই আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি শাস্তি প্রেরণ করবেন। ১৬৬
অপর এক সহিহ হাদিসে এও বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোনো জনপদে ব্যভিচারী ও সুদখোরের সংখ্যা বেড়ে গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের আযাবের উপযুক্ত বানিয়ে নেয়। ১৬৭
টিকাঃ
১৬৬. মুসনাদে আহমদ, ৬/৩০০।
১৬৭. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৯০।
📄 ব্যভিচার অভাব টেনে আনে
হযরত ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِذَا ظَهَرَ الزِّنَا الْفَقْرُ وَالْمَسْكَنَةُ.
ব্যভিচার বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন বৃদ্ধি পায়। ১৬৮
অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَا ظَهَرَتِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ فِعْلِمَ بِهَا فِيهِمُ الْعَلَانِيَةُ إِلَّا ظَهَرَ فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ فِي أَسْلَافِهِمْ.
যখন কোনো জনপদে ব্যাপকহারে অশ্লীলতা বৃদ্ধি পাবে, তখন সে জনপদে মহামারি এবং এমন ব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে, যা পূর্ববর্তীদের মাঝে ছিল না। ১৬৯
امام বাইহাকী রহ. শুআবুল ঈমানে একটি হাদিসে বর্ণনা করেন, যেখানে বলা হয়েছে,
الزِّنَا يُورِثُ الْفَقْرَ.
ব্যভিচার দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। ১৭০
বর্তমান যুগ এসব হাদিসের বাস্তব নমুনা। নির্লজ্জতা ও ব্যভিচারের দ্বারা গোটা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সমাজে এমন সব মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যেগুলোর নামও এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি এবং এসব রোগের কোনো চিকিৎসাও নেই। আর দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অভাবের অর্থ শুধু এই নয় যে, মানুষ রুজি-রোজগারে কষ্ট ভোগ করবে; বরং অভাব-অনটন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুখাপেক্ষিতা। বর্তমানে সেসব নির্লজ্জ সমাজে প্রতিটি পদে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। কোথাও বিদ্যুতের অভাব, কোথাও গ্যাসের অভাব, কোথাও চাকরির অভাব। মোট কথা মানুষ বর্তমানে নিজের কামনা-বাসনার বশবর্তী হয়ে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়, জীবন ও সম্পদ থেকে বরকত উঠে গেছে। আর যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্থহীন কাজে নষ্ট হচ্ছে!
টিকাঃ
১৬৮. ফায়যুল কাদীর, ৪/৩৮২।
১৬৯. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৮৮।
১৭০. শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৪/২৬৩।