📄 তারাবী এবং অন্যান্য দীনি কাজের বিনিময় গ্রহণ
আল্লাহ তায়ালার প্রতি পরিপূর্ণ লজ্জাশীলতার দাবিগুলোর মধ্যে একটি দাবি হলো, কোনো ইবাদাতকে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম না বানানো এবং দুনিয়ার সামান্য ফায়াদার জন্য আখেরাতের অসীম কল্যাণকে বিসর্জন না দেওয়া। বর্তমানে তারাবীর বিনিময়কে উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম গণনা করা হয়। অসংখ্য মানুষ এই উদ্দেশ্যেই কুরআন হিফয করে যে, তারাবী পড়িয়ে আয়-উপার্জন করবে। একারণে হাফেয সাহেবরা তারাবীর জন্য উপযুক্ত মসজিদের সন্ধানে মগ্ন থাকে। বড় শহর, বড় মসজিদ তাদের কাম্য হয়। এ জন্য তারা একস্থান থেকে অন্য স্থানে সফর করে। নিজেদের মর্যাদা বিলিয়ে দেয়। এ সবই আত্মমর্যাদাহীনতার পরিচায়ক। কুরআন সামান্য অর্থের বিনিময়ে বিক্রির বস্ত্ত নয়। বিনিময় নির্ধারণ করে কুরআন তেলওয়াত করা স্পষ্টত কুরআনের অপমান ও অবমূল্যায়ন। এসব কাজকে বৈধতা প্রদানের জন্য যেসব কৌশল (হিলা) অবলম্বন করা হয়, তা অগ্রহণযোগ্য। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. লেখেন, 'আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয়ে হিলা অবলম্বন কোনো অবৈধ বস্তুকে বৈধতা প্রদান করে না।'
অসংখ্য মানুষ হাফেয সাহেবদের অচ্ছলতার কথা বলেন। তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন হলো, এসব হাফেযে কুরআন কি আগে থেকেই অচ্ছল ছিল, নাকি তারাবী খতম করার সঙ্গে সঙ্গেই অচ্ছল হয়ে গেল? যদি তারা প্রথম থেকে অর্থনৈতিক অচ্ছলতার দরুন উদ্বিগ্ন হয়, তা হলে তারাবী আসার পূর্বে কেন সহযোগিতা করা হয় না! অসহায় দরিদ্রকে সাহায্য করা কখনোই নিষিদ্ধ নয়। পক্ষান্তরে কুরআনের বিনিময় প্রদান ও গ্রহণ উভয়ই হারাম। কতিপয় লোক এই বাহানার পেছনে পড়ে যে, যদি তারাবীর টাকা দেওয়া না হয়, তা হলে কুরআন খতমের প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অথচ কুরআন খতম করা ওয়াজিব নয়, যার জন্য নাজায়েয কাজ করতে হবে। উপরন্তু এই দাবিও যথার্থ নয় যে, কুরআন খতমের প্রচলন উঠে যাবে। কারণ আল্লাহর মেহেরবানিতে এমন হাফেযের অভাব নেই, যারা নিজেদের কুরআনকে হেফাযতের জন্য মসজিদ খুঁজতে থাকে। যদি বিনিময় প্রদান ও গ্রহণের প্রথা একদম বিলুপ্ত হয়, তা হলে হাফেযদের হৃদয় থেকে বিনিময়ের লোভও দূর হয়ে যাবে। প্রকারান্তরে ফাতাওয়ায় শামীতে এসেছে, বিনিময় গ্রহণপূর্বক কুরআন তিলাওয়াত করলে না পড়ার সমতুল্য হয়। কারণ সওয়াব তো তখনি হয় যখন তিলাওয়াত একমাত্র আল্লাহর জন্য হবে। বিনিময় গ্রহণের কারণে আল্লাহর জন্য ইখলাস বাকি থাকে না। সওয়াব না হলে কুরআন পড়ার বা পড়ানোর উদ্দেশ্যই পণ্ড হয়ে যায়।
টিকাঃ
২৫৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪৮৫।
📄 যদি আল্লাহর জন্য তিলাওয়াতকারী হাফেয পাওয়া না যায়?
অনেক সময় এমন কথা বলা হয় যে, যদি বিনিময় দেওয়া না হয় তা হলে খতম তারাবীহ পড়ানোর জন্য হাফেয পাওয়া যাবে না। অথচ এর উত্তর ইতিপূর্বেও দেওয়া হয়েছে যে, খতম তারাবীহ পড়া জরুরি নয়। আর দ্বিতীয়ত হাফেয পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি অমূলক। বরং এর বিপরীতে বলা যায়, যদি তারাবীর বিনিময় প্রথাটি শক্তভাবে বন্ধ করা হয়, তবে হাফেযদের মাঝে ইখলাস সৃষ্টি হবে এবং যোগ্য হাফেয পাওয়া যাবে। যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করবে। এতে মুসল্লিদের মাঝেও কুরআনের প্রতি গভীর মহব্বত সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বিষয়টি বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।
📄 তিলাওয়াত ও অন্যান্য দীনি কাজের বিনিময়ের মাঝে পার্থক্য
তিলাওয়াত ও অন্যান্য দীনী কাজের বিনিময়ের মাঝে পার্থক্য বুঝতে হলে দেখতে হবে যে, কুরআন তিলাওয়াত একটি মৌলিক ইবাদত, যা কেবল আল্লাহর জন্য হতে হয়। পক্ষান্তরে অন্যান্য দীনী কাজ যেমন: শিক্ষকতা বা ফাতওয়া প্রদান ইত্যাদি কাজসমূহের ক্ষেত্রে উলামায়েকেরাম বিনিময় গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছেন। এর মূল কারণ হলো, যদি এসকল কাজের জন্য বিনিময় নির্ধারণ করা না হয়, তা হলে দ্বীনের মৌলিক স্তম্ভগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মুতাআখখিরিন বা পরবর্তী যুগের উলামায়েকেরাম এই প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখে এসকল কাজের জন্য বেতন বা বিনিময় গ্রহণ বৈধ বলেছেন। তবে কুরআন তিলাওয়াত বা তারাবীর বিষয়টি এর ব্যতিক্রম। কারণ খতম তারাবীহ না পড়ার দরুন দ্বীনের কোনো ভিত্তি ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা নেই।
📄 অন্যায় কাজে সহযোগিতা করে উপার্জন
অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করে উপার্জন করতে গিয়েও শরয়ী সীমারেখার প্রতি লক্ষ রাখা জরুরি। যে কাজে সরাসরি গুনাহের সম্পৃক্ততা থাকে অথবা গুনাহের কাজে সহযোগিতা হয়, এমন কাজের বিনিময় গ্রহণ করা নাজায়েয। উদাহরণস্বরূপ: সুদি প্রতিষ্ঠানের হিসাব রাখা, মদের দোকানে চাকরি করা কিংবা গান-বাজনার সরঞ্জাম তৈরি করা ইত্যাদি। এ সকল কাজের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ হারাম বলে গণ্য হবে। আমাদের উচিত সকল প্রকার সন্দেহযুক্ত উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর দেওয়া হালাল রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট থাকা। এতেই ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিহিত।