📄 মাওলানা ইউসুফ বানুরী রহ.-এর কর্মপদ্ধতি
এ জাতীয় অসংকীর্ণতার কারণে বর্তমানে সাধারণ-বিশেষ সকলেই মাদরাসা এবং দীনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে। অথচ দীনী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব পূর্ণ তাকওয়া ও খোদাভীতির উপর আমল করলে তাদের প্রতি জনসাধারণের আস্থায় কোনো ফাটল সৃষ্টি হতো না। এ বিষয়ে দিক-নির্দেশনার জন্য আলেমদের রূহানি ইমামুল হাদিস হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরি রহ.-এর কর্মপদ্ধতি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। হযরত সৈয়দ আবদুুল মাজিদ সাহেব লেখেন:
‘হযরত ইউসুফ বানুরি রহ. তাঁর মাদরাসা জামিয়া ইসলামিয়া, বানুরি টাউন, করাচি, পাকিস্তান-এ এমন কিছু কঠোর পদ্ধতি ও নীতিমালা অবলম্বন করেছেন, যা ইতিপূর্বে কখনও দেখা যায়নি, কারও থেকে শোনা যায়নি, কোনো বইপত্রেও পাওয়া যায়নি। তিনি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে নীতি গ্রহণ করেছেন তা হলো, তিনি মাদরাসার আয়কে দুই ভাগে ভাগ করতেন: ১. যাকাত-সদকা, ২. সাধারণ দান-অনুদান। যাকাত ফান্ড কেবল ছাত্রদের পানাহার, বেতন এবং সহশিক্ষাতিরিক্ত ব্যয়ে ব্যবহৃত হতো। এই ফান্ডের অর্থ মাদরাসার ভবন নির্মাণ, কিতাবাদি ক্রয়, শিক্ষকগণ বেতন ও অন্যান্য ইত্যাদি খাতে ব্যয় হতো না। সাধারণ ফান্ড থেকে শিক্ষকদের বেতন প্রদান করা হতো ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করা হতো। সাধারণ অর্থ দান করা যাকাতের অধিক অংশ দীনী মাদরাসায় দিয়ে থাকেন। সাধারণ দান তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। তাই সাধারণ ফান্ডের সমৃদ্ধির পরিমাণও খুবই কম হয়ে থাকে। আরবিয়া মাদরাসায় কয়েকরবার এমন ঘটনা ঘটেছে যে, যাকাতের ফান্ডে অঢেল অর্থ বিদ্যমান, কিন্তু সাধারণ ফান্ড শূন্য। একবার হাজী মুহাম্মাদ ইয়াকুব সাহেব হযরতদের খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, “শিক্ষকদের বেতন জন্য সাধারণ ফান্ডে কোনো টাকা নেই। আপনার অনুমতি হলে যাকাত ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া যেত। যখন সাধারণ ফান্ডে টাকা আসবে, তখন যাকাত ফান্ডের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া হবে।” হযরত বানুরি রহ. কঠোর ভাষায় নিষেধ করে বললেন, “শিক্ষকদের সুবিধার অর্থে তো নিজেকে জাহান্নামের ইন্ধন বানাতে পারি না। তাদের ধৈর্য ধারণ করা উচিত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যের জন্য দোয়া করা উচিত। যদি তারা ধৈর্য ধরতে না পারেন, তা হলে এ ব্যাপারে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে যে, তারা এই মাদরাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারেন।”
আল্লামা বানুরি রহ. যেই মাদরাসার জন্য এই কঠোর নীতি অবলম্বন করেছিলেন, তা বর্তমানে পাকিস্তানের বৃহত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে আজ জাগতিক কোনো বস্তুর অভাব নেই। ধনবান ব্যক্তিরা সেই প্রতিষ্ঠানে দান করতে পারাকে নিজেদের সৌভাগ্য মনে করে।
একটি ভেবে দেখুন, এমন আরও কিছু দৃষ্টান্ত কি কায়েম করা যায় না। বাস্তবতা হলো, যদি আমরা আল্লাহর প্রতি প্রকৃতপক্ষে লজ্জাবশত হতে পারি, তা হলে কোনো কদর্যকে আর কঠিন মনে হবে না। সব কিছুকে সহজ মনে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন এবং সাহায্য করুন। আমিন।
টিকাঃ
১৫৫. ইসলাম ও পর্দা, ৫৬-৫৭ (কিছুটা পরিবর্তনসহ)।
📄 কালেকশনের কমিশন গ্রহণ
অনেক দীনী প্রতিষ্ঠানে নিসংকোচে, নির্দ্বিধায় কালেকশনের উপর কমিশন প্রদান করা হয়। অথচ বর্তমান যুগের গ্রহণযোগ্য আলেম-উলামা এবং মুফতি সাহেবগণ এই পদ্ধতিতে কমিশনগ্রহণকে নাজায়েয সাব্যস্ত করেছেন এবং ফাতওয়া কিতাবাদিতে এ বিষয়ে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু খোদাভীরুতার অভাব ও সম্পদপ্রীতি শরীয়তের বিধান থেকে বিমুখ করে কমিশনগ্রহণকে অর্থ উপার্জনের বিশেষ পন্থা হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কালেকশনের উপর কমিশনগ্রহণ হারাম হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে: ১. শ্রমিকের শ্রমের মূল্য অজ্ঞাত থাকা। কারণ, কালেকশনের সঠিক পরিমাণ জানা থাকে না। হতে পারে কোনো কিছুই কালেকশন হলো না এবং উসুলকারী (শ্রমিক)-ও কিছুই পেল না। ২. কালেকশনকৃত অর্থ শ্রমিকের শ্রমের ফসল। তার কালেকশন অর্থ থেকেই পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হচ্ছে। এভাবে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা নাজায়েয। ৩. পারিশ্রমিকের বৈধতার জন্য শ্রমিকের নির্ধারিত কাজের ক্ষমতা থাকা শর্ত। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে কালেকশন হওয়া উসুলকারীর ক্ষমতাবহির্ভূত বিষয়। অর্থাৎ দাতারা টাকা না দিলে সেও উসুল করতে পারবে না। সুতরাং শ্রমিক যে কাজ করতে সক্ষম নয়, সে কাজের বিনিময় সে কোন্ হিসেবে গ্রহণ করবে।
হ্যাঁ, যদি বেতনভুক্ত হয়, বেতন নির্ধারিত থাকে, অর্থাৎ কালেকশন হোক বা না হোক সর্বদা সে বেতনপ্রাপ্ত হয়, তা হলে এমন ব্যক্তির এ কাজের জন্য বেতন গ্রহণ করা জায়েয। এই পদ্ধতিতে তার বেতন কালেকশনের অর্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়; বরং কালেকশন সম্পন্ন ব্যয়, সফর, দাতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ইত্যাদি কাজের বিনিময়ে হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে কাজ এবং বেতন দুটোই পূর্ব থেকেই সুনির্দিষ্ট। এমন বেতনভুক্ত ব্যক্তিকে দক্ষতাভারের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণ ফান্ড (যে ফান্ডে যাকাত-সদকার মাল জমা হয় না) থেকে পুরস্কার প্রদান করলে তার জন্য তা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এটা কমিশনের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
মোটকথা, দীনী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বদের শরীয়তের আহকাম পালনে সর্বাধিক যত্নবান হওয়া এবং সকল প্রকার সতর্কতা থেকে বেঁচে থাকা দরকার, যাতে জনসাধারণের মাঝে দীনী প্রতিষ্ঠানের শান-মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দীনী খেদমত বরকতময় হয়।
টিকাঃ
১৫৬. আহসানুল ফাতওয়া, ৭/২৮৫; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ৪/২৭৪।
📄 তারাবী এবং অন্যান্য দীনি কাজের বিনিময় গ্রহণ
আল্লাহ তায়ালার প্রতি পরিপূর্ণ লজ্জাশীলতার দাবিগুলোর মধ্যে একটি দাবি হলো, কোনো ইবাদাতকে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম না বানানো এবং দুনিয়ার সামান্য ফায়াদার জন্য আখেরাতের অসীম কল্যাণকে বিসর্জন না দেওয়া। বর্তমানে তারাবীর বিনিময়কে উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম গণনা করা হয়। অসংখ্য মানুষ এই উদ্দেশ্যেই কুরআন হিফয করে যে, তারাবী পড়িয়ে আয়-উপার্জন করবে। একারণে হাফেয সাহেবরা তারাবীর জন্য উপযুক্ত মসজিদের সন্ধানে মগ্ন থাকে। বড় শহর, বড় মসজিদ তাদের কাম্য হয়। এ জন্য তারা একস্থান থেকে অন্য স্থানে সফর করে। নিজেদের মর্যাদা বিলিয়ে দেয়। এ সবই আত্মমর্যাদাহীনতার পরিচায়ক। কুরআন সামান্য অর্থের বিনিময়ে বিক্রির বস্ত্ত নয়। বিনিময় নির্ধারণ করে কুরআন তেলওয়াত করা স্পষ্টত কুরআনের অপমান ও অবমূল্যায়ন। এসব কাজকে বৈধতা প্রদানের জন্য যেসব কৌশল (হিলা) অবলম্বন করা হয়, তা অগ্রহণযোগ্য। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. লেখেন, 'আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয়ে হিলা অবলম্বন কোনো অবৈধ বস্তুকে বৈধতা প্রদান করে না।'
অসংখ্য মানুষ হাফেয সাহেবদের অচ্ছলতার কথা বলেন। তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন হলো, এসব হাফেযে কুরআন কি আগে থেকেই অচ্ছল ছিল, নাকি তারাবী খতম করার সঙ্গে সঙ্গেই অচ্ছল হয়ে গেল? যদি তারা প্রথম থেকে অর্থনৈতিক অচ্ছলতার দরুন উদ্বিগ্ন হয়, তা হলে তারাবী আসার পূর্বে কেন সহযোগিতা করা হয় না! অসহায় দরিদ্রকে সাহায্য করা কখনোই নিষিদ্ধ নয়। পক্ষান্তরে কুরআনের বিনিময় প্রদান ও গ্রহণ উভয়ই হারাম। কতিপয় লোক এই বাহানার পেছনে পড়ে যে, যদি তারাবীর টাকা দেওয়া না হয়, তা হলে কুরআন খতমের প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অথচ কুরআন খতম করা ওয়াজিব নয়, যার জন্য নাজায়েয কাজ করতে হবে। উপরন্তু এই দাবিও যথার্থ নয় যে, কুরআন খতমের প্রচলন উঠে যাবে। কারণ আল্লাহর মেহেরবানিতে এমন হাফেযের অভাব নেই, যারা নিজেদের কুরআনকে হেফাযতের জন্য মসজিদ খুঁজতে থাকে। যদি বিনিময় প্রদান ও গ্রহণের প্রথা একদম বিলুপ্ত হয়, তা হলে হাফেযদের হৃদয় থেকে বিনিময়ের লোভও দূর হয়ে যাবে। প্রকারান্তরে ফাতাওয়ায় শামীতে এসেছে, বিনিময় গ্রহণপূর্বক কুরআন তিলাওয়াত করলে না পড়ার সমতুল্য হয়। কারণ সওয়াব তো তখনি হয় যখন তিলাওয়াত একমাত্র আল্লাহর জন্য হবে। বিনিময় গ্রহণের কারণে আল্লাহর জন্য ইখলাস বাকি থাকে না। সওয়াব না হলে কুরআন পড়ার বা পড়ানোর উদ্দেশ্যই পণ্ড হয়ে যায়।
টিকাঃ
২৫৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪৮৫।
📄 যদি আল্লাহর জন্য তিলাওয়াতকারী হাফেয পাওয়া না যায়?
অনেক সময় এমন কথা বলা হয় যে, যদি বিনিময় দেওয়া না হয় তা হলে খতম তারাবীহ পড়ানোর জন্য হাফেয পাওয়া যাবে না। অথচ এর উত্তর ইতিপূর্বেও দেওয়া হয়েছে যে, খতম তারাবীহ পড়া জরুরি নয়। আর দ্বিতীয়ত হাফেয পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি অমূলক। বরং এর বিপরীতে বলা যায়, যদি তারাবীর বিনিময় প্রথাটি শক্তভাবে বন্ধ করা হয়, তবে হাফেযদের মাঝে ইখলাস সৃষ্টি হবে এবং যোগ্য হাফেয পাওয়া যাবে। যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করবে। এতে মুসল্লিদের মাঝেও কুরআনের প্রতি গভীর মহব্বত সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বিষয়টি বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।