📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থকড়ির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন

📄 মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থকড়ির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন


পেটকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য এটাও অত্যন্ত জরুরি, যে-সকল লোক এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত সে প্রতিষ্ঠানে জনগণের অর্থকড়ি বিশেষ খাতে ব্যয় করার জন্য সঞ্চয় করা হয়, তারা যেন সেসব অর্থ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে, অন্যায় খাতে তা ব্যবহার না করে, সর্বোপরি এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। কুরআনে কারীমে এতিমের মাল ভক্ষণকে 'পেটে আগুন ভরা'র সাথে তুলনা করা হয়েছে। উলামায়েকেরাম লেখেন, 'প্রতিষ্ঠানের অর্থকড়ির বিধিবিধান এতিমের ধনসম্পদের মতো।' অর্থাৎ জাতীয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধান ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের মালিক নন। বরং ইসলামের বিধান মোতাবেক প্রত্যেক খাতের টাকা যথাযথ স্থানে ব্যয় করা আবশ্যক। অপ্রয়োজনীয় কিংবা অনুপযুক্ত খাতে ব্যয় করলে তা আল্লাহর দরবারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

আক্ষেপের বিষয় হলো, বর্তমানে এ ব্যাপারে সীমাহীন উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তো অকুণ্ঠচিত্তেও যাকাতের সম্পদ ব্যয় করে। অথচ তা সম্পূর্ণ শরিয়তপরিপন্থী কাজ। অপরদিকে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে যাকাতের সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে হিলা অবলম্বন করা হয়। যার ফলে যে সম্পদ গরিব-দরিদ্রের হক (যাকাতের অর্থ), তা দিয়ে ভবন নির্মিত করা হয়, অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় এবং মাদরাসার উন্নত ও দৃষ্টিনন্দন কার্যবিবরণী (Prospectus) মুদ্রিত হয়। মাদরাসার শিক্ষাদান যেমনই হোক না কেন, 'মাদরাসা পরিচিতি' এত উন্নতভাবে ছাপানো হয় এবং তাতে এত বেশি অতিরঞ্জিত করা হয় যে, যেন এই মাদরাসায়ই এই অঞ্চলের দারুল উলুম (প্রধান বিদ্যাপীঠ)। অনুরূপ এমন বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে বেতন প্রদান ছাড়া খরচের উল্লেখযোগ্য খাত নেই। সেখানে দরিদ্র ছাত্রদের জন্য কোনো আবাসন ব্যবস্থাও নেই, কোনো বোর্ডিংও নেই। এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল ভবন নির্মাণ ও প্রচার প্রসারের পেছনে অপ্রয়োজনেও যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হয়।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 হিলায়ে তামলিক শুধু বাধ্যবাধকতার সুরতে জায়েয

📄 হিলায়ে তামলিক শুধু বাধ্যবাধকতার সুরতে জায়েয


মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অর্থকড়ির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনে ‘হিলায়ে তামলিক’ তথা কৌশল অবলম্বন করে অন্যকে যাকাতের মালিক বানানোকে বর্তমানে একটি মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ তা একান্ত বাধ্যবাধকতার বিষয়। কারণ ভালোভাবে বুঝে নিন, হিলায়ে তামলিক কেবল তখনই জায়েয, যখন মাদরাসায় তড়িৎ ঋণ পরিশোধের প্রয়োজন এতটা তীব্রতর হয়ে যায়, যদি হিলা অবলম্বন না করা হয়, তা হলে কোনোভাবেই দ্বীনি প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হবে না। মনে রাখবেন, প্রত্যেক মাদরাসাকে ‘দারুল উলুম’ (বিশ্ববিদ্যালয়) বানানো আমাদের দায়িত্ব নয়; বরং শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে সহিহভাবে যে পরিমাণ অর্থকড়ির ব্যবস্থা হয়, সে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করা উচিত। বর্তমানে যাকাতের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অসতর্কতার বড় কারণ হলো, প্রতিষ্ঠানের শুরুতেই দীর্ঘ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা না থাকায় হিলা অবলম্বন করে যাকাতের সম্পদ বৈধ করা হয় এবং অপ্রয়োজনে হিলা অবলম্বন করা হয়। অথচ এটা কত বড় বঞ্চনার বিষয় যে, মানুষ অন্যের উপকার সাধনের নামে নিজের আখেরাতকে ধ্বংস করে ফেলে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে হেফাজত করুন।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 মাওলানা ইউসুফ বানুরী রহ.-এর কর্মপদ্ধতি

📄 মাওলানা ইউসুফ বানুরী রহ.-এর কর্মপদ্ধতি


এ জাতীয় অসংকীর্ণতার কারণে বর্তমানে সাধারণ-বিশেষ সকলেই মাদরাসা এবং দীনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে। অথচ দীনী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব পূর্ণ তাকওয়া ও খোদাভীতির উপর আমল করলে তাদের প্রতি জনসাধারণের আস্থায় কোনো ফাটল সৃষ্টি হতো না। এ বিষয়ে দিক-নির্দেশনার জন্য আলেমদের রূহানি ইমামুল হাদিস হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরি রহ.-এর কর্মপদ্ধতি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। হযরত সৈয়দ আবদুুল মাজিদ সাহেব লেখেন:

‘হযরত ইউসুফ বানুরি রহ. তাঁর মাদরাসা জামিয়া ইসলামিয়া, বানুরি টাউন, করাচি, পাকিস্তান-এ এমন কিছু কঠোর পদ্ধতি ও নীতিমালা অবলম্বন করেছেন, যা ইতিপূর্বে কখনও দেখা যায়নি, কারও থেকে শোনা যায়নি, কোনো বইপত্রেও পাওয়া যায়নি। তিনি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে নীতি গ্রহণ করেছেন তা হলো, তিনি মাদরাসার আয়কে দুই ভাগে ভাগ করতেন: ১. যাকাত-সদকা, ২. সাধারণ দান-অনুদান। যাকাত ফান্ড কেবল ছাত্রদের পানাহার, বেতন এবং সহশিক্ষাতিরিক্ত ব্যয়ে ব্যবহৃত হতো। এই ফান্ডের অর্থ মাদরাসার ভবন নির্মাণ, কিতাবাদি ক্রয়, শিক্ষকগণ বেতন ও অন্যান্য ইত্যাদি খাতে ব্যয় হতো না। সাধারণ ফান্ড থেকে শিক্ষকদের বেতন প্রদান করা হতো ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করা হতো। সাধারণ অর্থ দান করা যাকাতের অধিক অংশ দীনী মাদরাসায় দিয়ে থাকেন। সাধারণ দান তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। তাই সাধারণ ফান্ডের সমৃদ্ধির পরিমাণও খুবই কম হয়ে থাকে। আরবিয়া মাদরাসায় কয়েকরবার এমন ঘটনা ঘটেছে যে, যাকাতের ফান্ডে অঢেল অর্থ বিদ্যমান, কিন্তু সাধারণ ফান্ড শূন্য। একবার হাজী মুহাম্মাদ ইয়াকুব সাহেব হযরতদের খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, “শিক্ষকদের বেতন জন‍্য সাধারণ ফান্ডে কোনো টাকা নেই। আপনার অনুমতি হলে যাকাত ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া যেত। যখন সাধারণ ফান্ডে টাকা আসবে, তখন যাকাত ফান্ডের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া হবে।” হযরত বানুরি রহ. কঠোর ভাষায় নিষেধ করে বললেন, “শিক্ষকদের সুবিধার অর্থে তো নিজেকে জাহান্নামের ইন্ধন বানাতে পারি না। তাদের ধৈর্য ধারণ করা উচিত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যের জন্য দোয়া করা উচিত। যদি তারা ধৈর্য ধরতে না পারেন, তা হলে এ ব্যাপারে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে যে, তারা এই মাদরাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারেন।”

আল্লামা বানুরি রহ. যেই মাদরাসার জন্য এই কঠোর নীতি অবলম্বন করেছিলেন, তা বর্তমানে পাকিস্তানের বৃহত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে আজ জাগতিক কোনো বস্তুর অভাব নেই। ধনবান ব্যক্তিরা সেই প্রতিষ্ঠানে দান করতে পারাকে নিজেদের সৌভাগ্য মনে করে।

একটি ভেবে দেখুন, এমন আরও কিছু দৃষ্টান্ত কি কায়েম করা যায় না। বাস্তবতা হলো, যদি আমরা আল্লাহর প্রতি প্রকৃতপক্ষে লজ্জাবশত হতে পারি, তা হলে কোনো কদর্যকে আর কঠিন মনে হবে না। সব কিছুকে সহজ মনে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন এবং সাহায্য করুন। আমিন।

টিকাঃ
১৫৫. ইসলাম ও পর্দা, ৫৬-৫৭ (কিছুটা পরিবর্তনসহ)।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 কালেকশনের কমিশন গ্রহণ

📄 কালেকশনের কমিশন গ্রহণ


অনেক দীনী প্রতিষ্ঠানে নিস‍ংকোচে, নির্দ্বিধায় কালেকশনের উপর কমিশন প্রদান করা হয়। অথচ বর্তমান যুগের গ্রহণযোগ্য আলেম-উলামা এবং মুফতি সাহেবগণ এই পদ্ধতিতে কমিশনগ্রহণকে নাজায়েয সাব্যস্ত করেছেন এবং ফাতওয়া কিতাবাদিতে এ বিষয়ে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু খোদাভীরুতার অভাব ও সম্পদপ্রীতি শরীয়তের বিধান থেকে বিমুখ করে কমিশনগ্রহণকে অর্থ উপার্জনের বিশেষ পন্থা হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

কালেকশনের উপর কমিশনগ্রহণ হারাম হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে: ১. শ্রমিকের শ্রমের মূল্য অজ্ঞাত থাকা। কারণ, কালেকশনের সঠিক পরিমাণ জানা থাকে না। হতে পারে কোনো কিছুই কালেকশন হলো না এবং উসুলকারী (শ্রমিক)-ও কিছুই পেল না। ২. কালেকশনকৃত অর্থ শ্রমিকের শ্রমের ফসল। তার কালেকশন অর্থ থেকেই পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হচ্ছে। এভাবে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা নাজায়েয। ৩. পারিশ্রমিকের বৈধতার জন্য শ্রমিকের নির্ধারিত কাজের ক্ষমতা থাকা শর্ত। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে কালেকশন হওয়া উসুলকারীর ক্ষমতাবহির্ভূত বিষয়। অর্থাৎ দাতারা টাকা না দিলে সেও উসুল করতে পারবে না। সুতরাং শ্রমিক যে কাজ করতে সক্ষম নয়, সে কাজের বিনিময় সে কোন্ হিসেবে গ্রহণ করবে।

হ্যাঁ, যদি বেতনভুক্ত হয়, বেতন নির্ধারিত থাকে, অর্থাৎ কালেকশন হোক বা না হোক সর্বদা সে বেতনপ্রাপ্ত হয়, তা হলে এমন ব্যক্তির এ কাজের জন্য বেতন গ্রহণ করা জায়েয। এই পদ্ধতিতে তার বেতন কালেকশনের অর্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়; বরং কালেকশন সম্পন্ন ব্যয়, সফর, দাতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ইত্যাদি কাজের বিনিময়ে হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে কাজ এবং বেতন দুটোই পূর্ব থেকেই সুনির্দিষ্ট। এমন বেতনভুক্ত ব্যক্তিকে দক্ষতাভারের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণ ফান্ড (যে ফান্ডে যাকাত-সদকার মাল জমা হয় না) থেকে পুরস্কার প্রদান করলে তার জন্য তা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এটা কমিশনের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

মোটকথা, দীনী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বদের শরীয়তের আহকাম পালনে সর্বাধিক যত্নবান হওয়া এবং সকল প্রকার সতর্কতা থেকে বেঁচে থাকা দরকার, যাতে জনসাধারণের মাঝে দীনী প্রতিষ্ঠানের শান-মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দীনী খেদমত বরকতময় হয়।

টিকাঃ
১৫৬. আহসানুল ফাতওয়া, ৭/২৮৫; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ৪/২৭৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px