📄 জুয়া ও পাশা
উপার্জনের যেসকল পথকে ইসলাম কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছে, জুয়া ও পাশা খেলা সেগুলোর অন্যতম। কুরআনে কারিমে সুরা মায়দায় জুয়া ও মদকে একত্রে উল্লেখপূর্বক উভয় কাজকে নাপাক সাব্যস্ত করেছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাশা খেলা সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, مَنْ لَّعِبَ بِالشَّرَنِجِ, فَكَأَنَّمَا غَمَسَ يَدَهُ فِي لَحْمِ خِنْزِيرِ وَدَمِهِ যে ব্যক্তি পাশা খেলল, সে যেন নিজের হাতকে শুকরের রক্ত ও মাংসে রঙিন করল। ২১৮
দেখুন, পাশা খেলাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ঘৃণিত কাজের সাথে তুলনা করেছেন, যা কোনো মুসলমান কল্পনাও করতে পারে না। পাশা খেলার দুনিয়াবী ও দীনী ক্ষতি দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। আল্লামা আলুসী রহ. তাফসিরে রুহুল মা'আনীতে লেখেন, وَمَنْ মَفَاسِدِ الْمَيْسِرِ أَنَّ فِيهِ أَكْلَ الْاَمْوَالِ بِالْبَاطِلِ وَاِنَّهُ يَدْعُو كَثِيرًا مِنَ الْمُقَامِرِينَ إِلَى السُّرِقَةِ وَتَلِفِ النَّفْسِ وَاِضَاعَةِ الْعِيَالِ وَارْتِكَابِ الْاُمُورِ الْقَبِيحَةِ وَالرَّذَائِلِ الشَّنِيعَةِ وَالْعَدَاوَةِ الْكَامِنَةِ وَالظَّاهِرَةِ, وَهَذَا اَمْرٌ مُشَاهَدٌ لَّا يُنْكِرُهُ الَّا مَنْ اَعْمَاهُ اللَّهُ تَعَالَى وَاصَمَّهُ.
জুয়ার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হলো : ১. অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, ২. অধিকাংশ জুয়ারীর চরিত্র কলুষিত হওয়া, ৩. জীবন ধ্বংস করা, ৪. পরিবারের প্রতি যত্নবান না হওয়া, ৫. জনকল্যাণ কাজে অক্ষম হওয়া, ৬. প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শত্রুতা পোষণ করা। এগুলো অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত বিষয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে অন্ধ ও বধির করেছেন, সে ব্যতীত কেউ এগুলো অস্বীকার করতে পারে না। ২১৬
অভিজ্ঞতার আলোকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, যে সমাজে পাশা খেলার প্রচলন বৃদ্ধি পায়, সেই সমাজ অন্যায়-অপকর্মের চারণভূমিতে পরিণত হয়। কারণ যখন বিনাকষ্টে কেউ হারাম উপার্জনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মেহনত ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আয়-রোজগার করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। লাখো পরিবার এই অপকর্মে লিপ্ত হয়ে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং উভয় জগতের ব্যর্থতা ক্রয় করেছে।
টিকাঃ
২১৮. মুসলিম, ২/২৪০১।
২১৬. তাফসিরে রুহুল মা'আনী, ২/১০০।
📄 লটারী
বর্তমান যুগে জুয়া ও পাশার অসংখ্য পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এগুলো সবই হারাম। তন্মধ্যে লটারী এমন এক অভিশাপ, যার মাধ্যমে সুকৌশলে দরিদ্র জাতির রক্ত চুষে খাওয়া হয়। ধরুন, কোনো লটারী কোম্পানি তিন লাখ টাকার টিকিট বিক্রি করল। তা থেকে এক লাখ টাকা পুরস্কার হিসেবে প্রদান করল। সুতরাং কোম্পানি যে দুই লাখ টাকা আয় করল, এ টাকাটা কোত্থেকে এলো? এই টাকা রিকশাওয়ালা ও দিনমজুরদের টাকা। এদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত সম্পদ ক্ষমতাশীলদের হাতে চলে যায় এবং সাধারণ লোকেরা শুধু লাভের আশায় নিজের রক্ত পানি করে উপার্জিত অর্থ খুশি মনে প্রতারক জালেমদের হাতে সোপর্দ করে। আমাদের সামনে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, লটারীর চক্করে পড়ে বহু মানুষ ঘরের আসবাবপত্র, স্ত্রীর অলংকারাদি, এমনকি পোশাক-পরিচ্ছেদ ও জায়গা-জমি বিক্রি করেছে কিংবা বন্ধক রেখে রেখেছে এবং দেখতে দেখতেই মহাভাবাপন্ন কাঙালে পরিণত হয়েছে।
অতঃপর আজকাল পাড়ায় পাড়ায় কিসমতের নামে পুঁজি সঞ্চয় করা হচ্ছে। এগুলো মূলত জুয়ার পদ্ধতি প্রচলিত আছে। যেমন যার নাম সবার আগে ওঠে সে খুব সস্তায় ভালো পণ্য অথবা অনেক টাকার মালিক হয়ে যায়, আর অবশিষ্ট লোকেরা নিজের নামকে অপেক্ষায় বসে থাকে। ঘুড়ি ওড়ানো, কবুতর ওড়ানো, দাবা, ক্যারামবোর্ড – এসব খেলায় দুই পক্ষের মধ্যে হার-জিতের ভিত্তিতে লেনদেনের শর্ত রাখা হয় – এমন সব খেলাই হারাম। এমনকি উলামায়েকেরাম লেখেন, 'ছোট্ট ছেলেমেয়েদের খেলাধুলায় বাজি ধরা হলে তা-ও জুয়া হিসেবে বিবেচিত হবে।' বড়-ছোট সবাইকে এ সব কাজ থেকে বিরত থেকে আল্লাহর প্রতি পূর্ণরূপে লজ্জাবান হওয়া উচিত।
📄 ইনসিওরেন্স
সুদ এবং জুয়ার একটি অত্যাধুনিক নাম হলো বিমা বা ইনসিউরেন্স. জীবনবিমা হোক বা পণ্যের বিমা, তাতে অবশ্যই জুয়ার উপস্থিতি থাকে। অর্থাৎ পলিসির মেয়াদপূর্তে যদি বিমাকৃত পণ্য ধ্বংস হয় অথবা বিমাকারী ব্যক্তি মারা যায়, তা হলে শর্তকৃত অর্থ বিমা-কোম্পানির উপর পরিশোধ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। সম্পদের বিমায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে কোনো টাকা সরবরাহকারীকে ফেরত দেওয়া হয় না। অন্যদিকে জীবনবিমায় যদি পলিসি হোল্ডার মারা যায়, তা হলে কোম্পানি পলিসির মেয়াদ উত্তীর্ণকালে সংগৃহীত সকল টাকা সুদে আসলে ফেরত দেয়। এই দুই ধরনের ইনসিউরেন্সের মধ্যে সুদ ও জুয়া উভয়টাই পাওয়া যায়। অর্থ সম্পদের বিমায় শুধু জুয়া বিদ্যমান। এ কারণেই উলামায়েকেরামের মতে সম্পদ-বিমার চেয়ে অধিক নিষিদ্ধ হলো জীবনবিমা। কাজেই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, স্বেচ্ছায় বিমা বা ইনসিউরেন্স না করা। হ্যাঁ, বাধ্যবাধকতার সুরতে হক্কানী উলামায়ে-কেরামের শরণাপন্ন হওয়া। উপকার ও ক্ষতির একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা। যে ক্ষতি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তা ইনসিউরেন্সের কারণে কখনোই প্রতিহত হবে না। এ কারণে আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। আল্লাহর ভীতি অন্তরে জাগরুক রাখা উচিত। সামান্য উপকারের লোভে আখেরাতের স্থায়ী উপকারকে বিঘ্নিত করা কোনো বিবেকবান ব্যক্তির কাজ নয়। মুক্তি ও নিরাপত্তার রাস্তা এটাই।
📄 অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ বা জায়গা দখল করা
হারাম উপার্জনের আরেক মাধ্যম হলো বিনা অধিকারে অন্যের সম্পদ বা জমি দখল করে নেওয়া। কুরআন কারিমে একাধিক স্থানে পরস্পর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্যায়াভাবে অপরের সম্পদ ভোগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এক হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ مِنَ الْأَرْضِ، طَوَّقَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ.
যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ অন্যের জমি জুলুম করে আত্মসাৎ করে কিয়ামতের দিন, সাত তবক জমিনের হার তার গলায় পরানো হবে। ২১৮
আলোচ্য হাদিসের কয়েকটি ব্যাখ্যা হতে পারে : ১. আল্লামা বাগাবী রহ. বলেন, ‘ঐ ব্যক্তিকে এক বিঘত পরিমাণ জমি সাত তবক জমিনের নিচ পর্যন্ত খনন করার নির্দেশ দেওয়া হবে। তা খনন করার সময় সে মনে করবে, তার গলায় সাত তবক জমিন পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।' বুখারী শরিফের অন্য এক হাদিসে এই ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। ২. আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, আত্মসাৎকৃত জমিনের সঙ্গে সাত তবক জমিন মিলিয়ে যে ওজন হয়, এই পরিমাণ ওজন তার মাথায় তোলার নির্দেশ দেওয়া হবে। মুসনাদে আহমদ ও তাবারানীর বর্ণনা অনুযায়ী এই ব্যাখ্যাটি শক্তিশালী।
অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়াভাবে অপরের সামান্য জমি আত্মসাৎ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার নফল, ওয়াজিব কোনো ইবাদত কবুল করবেন না। ২১৯
আবু হুমাইদ সায়েদী রহ. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَأْخُذَ عَصًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ.
কোনো মুসলমানের জন্য halaal নয়, সে অন্যের একটি লাঠিও তার আন্তরিক সন্তুষ্টি ব্যতীত গ্রহণ করবে। ২২০
এ সকল হাদিস দ্বারা একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, কারও সম্পত্তি আত্মসাৎ করা আল্লাহর নিকট ভীষণ অপছন্দনীয় কাজ এবং আখেরাতে অবর্ণনীয় অপমানের কারণ।
আক্ষেপের বিষয় হলো, আখেরাতের দৃষ্টিতে যা জঘন্য, বর্তমানে সে কাজকেই গর্বের মনে করা হয়। এর কুপ্রভাবে আইল বা পরনালা নিয়ে বহু বছর বছর মামলা-মোকদ্দমা চলতে থাকে এবং অন্যায়াভাবে মামলায় জয়লাভ করাকে গর্ব ও মর্যাদার বিষয় মনে করা হয়। এ সকল অন্যায় কাজের মূল কারণ হলো আখেরাতের প্রতি উদাসীনতা এবং আল্লাহর আযাবের ব্যাপারে অজ্ঞতা। আত্মসাৎ করার শাস্তির কথা যদি লোকদের জানা থাকত, তা হলে কোনো বিবেকবান মানুষই দুই-চার গজ জায়গার জন্য ঝগড়া-বিবাদ ও মামলা-মোকদ্দমা করে নিজের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহান ধ্বংস করতে রাজি হতো না।
হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ مَالِهِ فَلْيُوْজِها إِلَيْهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، لَا يُقْبَلُ فِيهِ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ وَأُعْطِيَ صَاحِبَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ.
যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মানহানি করে কিংবা সম্পদ আত্মসাৎ করে তার উপর জুলুম করেছে, সে যেন সেই দিন আসার পূর্বে তার সাথে মীমাংসা করে নেয়, যেদিন দিনার বা দিরহাম কোনো কাজে আসবে না, বরং জালিমের নেকি থেকে মজলুমের হক আদায় করা হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে, তবে মজলুম ভাইয়ের গুনাহ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। ২২১
একারণে প্রত্যেক মুসলমানকে জুলুম ও আত্মসাৎ থেকে বেঁচে আল্লাহর প্রতি প্রকৃত লজ্জা প্রমাণ দেওয়া এবং আখেরাতের নিদারুণ পরিণতি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করা উচিত।
টিকাঃ
২১৮. বুখারী, ১/৪৮৩, হাদিস নং-২৪৫৮; মুসলিম, ১/৩০৩; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৯।
২১৯. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/১০।
২২০. ইবনে হিব্বান; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/১১।
২২১. বুখারী, ২/৯৬৭, হাদিস নং-৬০৫০; মুসনাদে আহমদ, ২/০০৫-৪৩২; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/১২৯।