📄 হারাম বর্জন বিষয়ক কিছু হাদিস
১. হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ পাক পবিত্র। তিনি একমাত্র পাক-পবিত্র বস্তুকে গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন রাসুলগণকে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুলগণ, আপনারা পাক পবিত্র খাবার গ্রহণ করুন এবং নেক আমল করুন।’ ১৭২ অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার করো, যেগুলো আমি তোমাদের রুজি হিসাবে দান করেছি।’ ১৭৩
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করলেন, এক ব্যক্তি দূর-দূরান্তের সফর করছে। তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীরে ধুলোবালি (এমন ব্যক্তির দোয়া সহজে কবুল হয়)। এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি তার উভয় হাত আসমানের দিকে তুলে কাতর কণ্ঠে ‘হে প্রভু, হে প্রভু,’ বলে ডাকছে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং হারাম ভক্ষণ করেই সে বেড়ে উঠেছে। এই ব্যক্তির দোয়া কীরূপে গৃহীত হতে পারে! ১৭৪
আলোচ্য হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, কেউ বাহ্যিক দৃষ্টিতে দোয়ার উপযুক্ত হলেও হারাম ভক্ষণের কারণে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয় এবং তার দোয়া কবুল হয় না।
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ১০ দিরহামের বিনিময়ে একটি কাপড় ক্রয় করল, কিন্তু সেই ১০ দিরহামের মাঝে একটি দিরহাম ছিল অবৈধ, এই কাপড়টি যতদিন তার পরনে থাকবে, ততদিন আল্লাহ তায়ালা তার কোনো নামাজ কবুল করবেন না। ১৭৫
৩. এক হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-কে বলেন, ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! কেউ এক লোকমা হারাম খাবার ভোগ করলে ৪০ দিন পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তার কোনো আমল কবুল করেন না। আর যে ব্যক্তি হারাম মালের অর্থে স্বাস্থ্যবান হয়েছে, জাহান্নামই তার জন্য যথাযথ স্থান। ১৭৬
৪. হযরত আবু বকর রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে শরীর হারাম আহারের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ১৭৭
৫. হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা হারাম সম্পদ সঞ্চয়কারীর প্রতি ঈর্ষা করো না। কারণ, সে যদি হারাম সম্পদ থেকে সদকা করে, তা কবুল হবে না। আর অবশিষ্ট সম্পদ তাকে জাহান্নামে পৌঁছানোর পাথেয় হবে। ১৭৮
৬. হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ যদি মাটি ভক্ষণ করো, তবে তা হারাম মাল ভক্ষণের চেয়ে উত্তম। ১৮৯
একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন আমলের কারণে মানুষ জান্নাতে বেশি প্রবেশ করে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, খোদাভীতি এবং উত্তম চরিত্র। অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ আমলের কারণে মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করবে? তিনি উত্তর দিলেন, দুটি মধ্যবর্তী অঙ্গ: মুখ (যদ্দদ্বারা হারাম বস্তু পেটে প্রবেশ করে) এবং লজ্জাস্থান। ১৯০
অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ হারাম উপার্জন এবং অবৈধ যৌন সম্ভোগের কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ থেকে রক্ষা করুন। এসকল হাদিসের আলোকে জানা যায়, হারাম সম্পদ ব্যবহার করা শরিয়তের দৃষ্টিতে খুবই জঘন্য এবং আখেরাতের কঠিন আযাবের কারণ।
টিকাঃ
১৭২. সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১।
১৭৩. সুরা বাকারা, আয়াত: ১৭২।
১৭৪. মুসলিম, ১/৩২৬; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ২/৩৮৪; মিশকাত, ১/২৪১।
১৭৫. মুসনাদে আহমাদ; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ২/৩৮৫।
১৭৬. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ২/২৪৫।
১৭৭. মুসনাত ইবনে জা'দ; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ২/৩৮৬।
১৭৮. মুসনাত আহমাদ; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ২/৩৮৬।
১৮৯. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৫৮।
১৯০. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৬।
📄 হালাল উপার্জনের সুফল
হারামের বিপরীতে তাকওয়া ও খোদাভীতি অবলম্বন করা এবং হারাম থেকে বিরত থাকা ইহকালীন ও পরকালীন সফলতার মাধ্যম। হাদিস শরিফে হালাল উপার্জনের ফলস্বরূপ আখেরাতে উত্তম বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি এসেছে :
১. একবার হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবেদন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার জন্য দোয়া করুন, যেন আমি ‘মুসতাজাবুদ দাওয়া’ (এমন ব্যক্তি, যার দোয়া সর্বদা কবুল হয়) হতে পারি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সাআদ, হালাল খাবার ভক্ষণ করো। তা হলে মুসতাজাবুদ দাওয়া হতে পারবে। ১৯১
২. এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ শুনিয়েছেন, যে ব্যক্তি হালাল ভক্ষণ করে, সুন্নাত অনুযায়ী আমল করে এবং মানুষ তার অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ১৯২ (হাদিসটি আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত)
৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমার মাঝে চারটি গুণ বিদ্যমান থাকলে দুনিয়ার কোনো কিছু হারানোর আক্ষেপ থাকবে না : ১. আমানতের হেফাযত, ২. সত্যতা, ৩. উত্তম চরিত্র। ৪. হালাল ভক্ষণ। ১৯৩
অর্থাৎ যে ব্যক্তি এই চারটি গুণের অধিকারী হবে, সে এমন মূল্যবান সম্পদের মালিক হলো, যার বিপরীতে তাবৎ পৃথিবীর ধনসম্পদ খুবই নগণ্য ও তুচ্ছ।
৪. হযরত আবু কাতাদা ও আবুদ দাহনা রা. বলেন, একবার আমরা জনৈক গ্রাম্য ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। সে বলল, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে কয়েকটি উপদেশ দেন। তন্মধ্যে একটি উপদেশ আমার অন্তরে গেঁথে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন, তুমি আল্লাহর ভয়ে যে বস্তু ত্যাগ করবে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান করবেন। ১৯৪
অর্থাৎ তাকওয়া অর্জন করার কারণে বাহ্যত অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখা উচিত যে, এই তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে আল্লাহ তায়ালা আমাদের উদ্দেশ্য এমনভাবে পূর্ণ করবেন, যা আমাদের কল্পনাতেও আসবে না।
টিকাঃ
১৯১. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৫৫।
১৯২. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৫৫; শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৫।
১৯৩. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৪।
১৯৪. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩/৩৫৫।
📄 ব্যবসায়ীদের প্রতি সুসংবাদ
পৃথিবীতে সম্পদ উপার্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো ব্যবসা-বাণিজ্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মাধ্যমকে সর্বাধিক পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তায়ালার নিকট ওই ব্যবসায়ী শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী, যে আমানতদারি ও সততার প্রতি লক্ষ রেখে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করে। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমানতদার সত্যবাদী ব্যবসায়ী (কিয়ামতের দিন) নবী, সিদ্দিক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে। ১৯৫
প্রতীয়মান হলো, ব্যবসায়ীদের জন্য সত্যতা ও আমানতদারিতা সর্বাপেক্ষা সম্মানের বিষয়। সত্যতা ও আমানতদারিতা ব্যবসায়ীকে পৃথিবীতে স্বনামধন্য করে এবং আখেরাতেও সফলকাম করবে। ব্যবসায়ী ভাইদের উচিত, উপার্জনকে সম্পূর্ণ পুত-পবিত্র ও হালাল করার জন্য মিথ্যা, ধোঁকা তথা সকল প্রকার প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা। এতেই মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত।
হযরত সিররী সাক্বতী রহ. বলেন, ‘তিন বস্তুর মাঝে জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরওয়ানা রয়েছে : ১. হালাল ভক্ষণ, ২. পরিপূর্ণ খোদাভীতি, ৩. সঠিক পথ অবলম্বন। ১৯৬
হযরত জুনদাব রা. ওসিয়ত করেছেন, ‘মৃত্যুর পর মানুষের পেটে সর্বপ্রথম পচন ধরবে। কাজেই যথাসাধ্য হালাল ব্যতীত কোনো কিছু ভক্ষণ করা উচিত নয়।’ ১৯৭
প্রসিদ্ধ বুযুর্গ হযরত সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুসতারী রহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তি হারাম থেকে বেঁচে থাকে, কোনো খাদ্য গ্রহণ না করলেও সে ‘খুদে দুনিয়া’ তথা দুনিয়া বিমুখতার গুণে গুণান্বিত হবে। ১৯৮
পক্ষান্তরে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন না করা হারামের সংমিশ্রণ এবং সত্যতা ও আমানতদারীর প্রতি উদাসীনতা ধ্বংসের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লেনদেনের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধানাবলির প্রতি যত্নবান না হওয়ার কারণে অনেক বড় বড় ইবাদত ফলশূন্য হয়ে যায় এবং মানুষের সকল পরিশ্রম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
হযরত ইউসুফ ইবনে আসবাত রহ. বলেন, ‘কোনো যুবক ইবাদতে মগ্ন হলে শয়তান নিজের চেলাদের বলে, দেখো তো তার খাদ্য হালাল না হারাম? যদি তার খাদ্য হারাম হয় তা হলে শয়তান বলে, ‘তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও। সে পরিশ্রম করবে কিন্তু ফল কিছুই পাবে না।’ ১৯৯
টিকাঃ
১৯৫. তিরমিযি, ১২১।
১৯৬. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৬।
১৯৭. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৫।
১৯৮. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৬।
১৯৯. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৬।
📄 হারাম থেকে বাঁচার প্রেরণা সৃষ্টির উপায়
সম্পদের নেশা এমন জিনিস, যা মানুষকে সর্বদা সম্পদবৃদ্ধির প্রতি উৎসাহিত করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সম্পদের নেশা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও দূর হয় না।’ ২০০ সম্পদ যত বেশি বৃদ্ধি পায়, সম্পদের নেশা তত বেড়ে যায় এবং এই নেশার বশবর্তী হয়ে মানুষ হারাম-হালালের পার্থক্য ভুলে গিয়ে সম্পদ গড়ার খেলায় পড়ে যায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষ এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করবে না যে, সে হালাল উপার্জন করছে না হারাম। ২০১
নিঃসন্দেহে আজ সেই যুগ চলে এসেছে। চতুর্দিকে সেই অসাধুতার জয়-জয়কার পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে যত বড় সম্পদশালী, সে তত বেশি উদাসীন। আমাদের এই উদাসীনতা দূর করার জন্য চেষ্টা করা উচিত। এই চেষ্টা ততদিন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, যতদিন আখেরাতের জবাবদিহিতার চিন্তা আমাদের মাথায় না আসবে। এ কারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর প্রদানের পূর্বে কিয়ামতের দিন কেউ নিজ স্থান থেকে অগ্রসর হতে পারবে না : ১. কোন্ কাজে জীবন অতিবাহিত করেছ? ২. কোন্ কাজে যৌবন ব্যয় করেছ? ৩. কোত্থেকে সম্পদ উপার্জন করেছ? ৪. সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছ? ৫. ইলম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ? ২০২
টিকাঃ
২০০. বুখারি, ১/২৭৮, ২৭৯।
২০১. শুআবুল ইমান লিল বাইহাকি, ৫/৬৩।
২০২. তিরমিযি, ২/৪৯৭।