📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 দাড়ি কাটা বা মুণ্ডানোও নির্লজ্জতা

📄 দাড়ি কাটা বা মুণ্ডানোও নির্লজ্জতা


মাথা হেফাযতের একটি বিশেষ দিক হলো, মাথা ও মুখমণ্ডলের বাহ্যিক রূপ শরীয়তের নির্দেশ মোতাবেক হওয়া। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নারী ও পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শরীয়তের বিভিন্ন অঙ্গের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। নারী-পুরুষের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী একটি আলামত হলো দাড়ি। কুদরতীভাবে পুরুষদের চেহারায় দাড়ি উদ্গত হয়; কিন্তু নারীদের হয় না। এটা এমন পার্থক্য সৃষ্টিকারী আলামত, যা দেখামাত্রই পুরুষ ও নারীর মাঝে পার্থক্য করা যায়। কাজেই যে ব্যক্তি দাড়ি মুণ্ডন করল, সে নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করল। এ ধরনের সাদৃশ্য অবলম্বনে হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারী এবং নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষদের অভিশাপ দিয়েছেন।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে লজ্জা করে, তার উচিত, নিজেকে নারীদের সাদৃশ্য থেকে বিরত রেখে সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তায়ালার প্রতি লজ্জার প্রমাণ দেওয়ার এবং মাথা ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা।

দাড়ি না রাখলে নারীদের সাথে সাদৃশ্য তৈরি হয়—একজন মুসলমানের জন্য এটুকু নিন্দাই যথেষ্ট। অধিকন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ি না রাখাকে মুশরিক ও অগ্নিপূজকদের আলামত সাব্যস্ত করেছেন এবং দাড়ি রাখার জোর নির্দেশ প্রদান করে মুশরিকদের বিরুদ্ধাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ: وَفَرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ. মুশরিকদের বিরুদ্ধাচরণ করো। দাড়ি লম্বা করো এবং মোচ ছোট করো।

অন্য এক হাদিসে এসেছে, قُصُّوا الشَّوَارِبَ وَأَرْخُوا اللِّحَى خَالِفُوا الْمَجُوسَ. মোচ ছোট করো, দাড়ি লম্বা করো এবং অগ্নিপূজকদের বিরোধিতা করো।

অপর রেওয়ায়েতে এসেছে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে বাদশাহ কিসরার দুইজন দূত উপস্থিত হলো। তাদের উভয়েরই দাড়ি মুড়ানো ছিল এবং মোচ লম্বা ছিল। তাদের এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ রাগান্বিত হন এবং বলেন, “ধিক তোমাদের প্রতি। তোমাদের এই আকৃতি গঠনের নির্দেশ কে দিয়েছে?’ তারা উত্তর দিলো, ‘আমাদের সরদার।’ এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, لَكِنْ رَبِّي أَمَرَنِي بِإِعْفَاءِ لِحْيَتِي وَقَصَّ شَوَارِبِي. কিন্তু আমার প্রতিপালক আমাকে দাড়ি লম্বা করার এবং মোচ ছোট করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বুঝা গেল, দাড়ি রাখা মূলত মুসলমানদের নিদর্শন। অপর দিকে দাড়ি মুড়ানো মুশরিক ও অগ্নিপূজকদের নিদর্শন। দাড়ি সকল নবী-রাসূলদের সুন্নাত, যাকে ফিতরতও বলা হয়। হযরত আয়েশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি বর্ণনা করেন, দশটি জিনিস ফিতরতের অন্তর্ভুক্ত। তন্মধ্যে মোচ কাটা এবং দাড়ি লম্বা করাও শামিল।

এই সকল দলিলের আলোকে দাড়ি রাখা ওয়াজিব ও কাটা হারাম সাব্যস্ত হয়। এক্ষেত্রে সাধারণ লোকের মতো একথা বলে শিথিলতা প্রদর্শন করা যাবে না যে, দাড়ি রাখা একটি সাধারণ সুন্নাত। রাখলে ভালো, না রাখলে গুনাহ হবে না। কারণ প্রথমত এভাবে সুন্নাতের অবমাননা করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসার পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত দাড়ি রাখাকে সুন্নাতে যায়েদার সুন্নাত মনে করা ভুল। যদি এটি সুন্নাতে যায়েদা হতো, তবে তা না রাখার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রোধ প্রকাশ করতেন না। এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরামের মতে দাড়ি মুড়ানো এবং এক মুষ্ঠির চেয়ে কম রাখা হারাম। এই বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ ফিকহের কিতাবাদিতে দেখা যেতে পারে।

টিকাঃ
১৩৭০. বুখারী, ২/১০৮৪, হাদিস নং-৫৮৮৫।
১৭০. বুখারী, ২/৮৭৫।
১৭১. মুসলিম, ১/২২৩; নাহলুল মায়ানী, ১/১১৮।
১৭২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৯৩।
১৭৪. মুসলিম, ১/২২৯।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 একটু ভাবুন!

📄 একটু ভাবুন!


এই আলোচনার মাধ্যমে আমাদের সামনে শরিয়তে দাড়ির অবস্থান, মর্যাদা ও গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। পক্ষান্তরে উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের আমল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এত ব্যাপক ভাবে দাড়ি মুড়ানো শুরু হয়েছে যে, তা নাজায়েয হওয়ার কথাই মানুষ ভুলে গেছে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যদি কাউকে শুধরানো হয় বা বুঝানো হয়, তা হলে ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে সে হাজার হাজার অর্থহীন ওজর-আপত্তি উত্থাপন করে বসে। অথচ গুনাহের ওজর পেশ করাও এক ধরনের গুনাহ।

আফসোস এর বিষয় হলো, অন্যান্য সম্প্রদায়—যাদের আখিরাতে চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই, তারা নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়নে যথাযথ গুরুত্বারোপ করে এবং সর্বত্র নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে মুসলমানগণ—যারা বিশ্বমানবতার বুনিয়াদ ও সফলতার জিম্মাদার, যারা পরকালীন সফলতার সুসংবাদ নিয়ে দুনিয়ায় আগমন করেছে, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম তৈরি না করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের অন্ধ অনুকরণ করে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করতে বসেছে। এটা কেবল আফসোসের বিষয়ই নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। হিন্দুদের মাঝে শিখদের সংখ্যা হলো মাত্র দুই কোটি। কিন্তু তারা নিজেদের আদর্শ ও প্রতীক এতটা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে, যদি লাখো জনতার মাঝে একজনও শিখ থাকে, তা হলে বহু দূরে পাগড়ি, দাড়ি, জামার কারণে তাকে চেনা যায়। তারা নিজেদের আদর্শকে সর্বদা বুকে আঁকড়ে রাখে। তারা পার্লামেন্টের সদস্য হোক অথবা গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হোক। অনুরূপ সেনাধ্যক্ষ সদস্য হোক কিংবা কোনো কোম্পানির কর্মকর্তা হোক। অথচ হিন্দুস্থানে কমপক্ষে ২০ কোটি মুসলমানের বসবাস, তবু ব্যাপকভাবে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, বেশ-ভূষায় পরিচয় বহনকারী এমন কোনো আদর্শ নেই, যা তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট হিসেবে পরিগণিত হয়। বর্তমানকালে মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় খুবই কঠিন। এই উদাসীনতা, অসাবধানতার কারণেই আজ মুসলমানদের কষ্ট অবর্ণনীয়। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা রাখে না। এই অশুভ পরিণাম নববী দিক-নির্দেশনা থেকে দূরে থাকার ফল। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ একটাই, তা হলো, নিজেদের আমলের নিয়মিত খোঁজ-খবর নেওয়া এবং পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে ইনসাফের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, আমাদের জীবনকে আমরা সঠিক পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 ইংরেজদের অনুকরণে চুল রাখা

📄 ইংরেজদের অনুকরণে চুল রাখা


চুল রাখার নিয়ম নীতি সম্পর্কেও শরিয়তে স্পষ্ট নির্দেশনা বিদ্যমান রয়েছে। এসব নির্দেশনার প্রতি যত্নবান হওয়া সকল মুসলমানের জন্য জরুরি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত বাবরি চুল রাখতেন। যা কখনও কানের লতি পর্যন্ত, আবার কখনও এর চেয়েও লম্বা হতো। হজ ও উমরার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা মুড়ানোর কথাও পাওয়া যায়। তাঁর থেকে কমপক্ষে একটি প্রমাণিত হয় যে, চুল রাখলে সব রাখতে হবে, আর কাটলে বা মুণ্ডালে সব মুড়াতে হবে। এমন যেন না হয় যে, কোথাও ছোট, কোথাও লম্বা, কোথাও মুড়ানো, কোথাও চুল রাখা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘কাজা’ (কোথাও মুড়ানো, আবার কোথাও চুল রাখা) করতে নিষেধ করেছেন।

উলামায়ে কেরাম উক্ত হাদিস থেকে এই মাসআলা উদঘাটন করেন যে, একই সময়ে চুল কোথাও বড়, কোথাও ছোট রাখা জায়েয নেই। যেমন, আজকাল ইংরেজদের অনুকরণে পেছনের দিকে ছোট এবং সামনের দিকে বড় রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে চুল রাখার মধ্যে দুটি খারাপ দিক পাওয়া যায়:
১. হাদিসের নিষেধাজ্ঞার বিপরীত আমল।
২. অমুসলিম সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন।

অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
কেউ কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করলে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।

আফসোস! আজ অমুসলিম সম্প্রদায়ের রীতিনীতি আমাদের নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণনা করলে শতকরা দু-চার জন লোক পাওয়া যাবে, যারা চুল রাখার ব্যাপারে শরিয়ত-নির্ভরতা মেনে চলে। তাদের বাদ দিলে এখন শুধু ইংলিশ হেয়ার কাটেরই প্রচলন দেখা যায়। মাথার টুপি থাকে না, ইংরেজদের অনুকরণের ছাপ পাওয়া যায়। শিশু বাচ্চা থেকে শুরু করে যুবক-বৃদ্ধ সকলের মাঝেই এলোমেলো চুল রাখার প্রতি আকর্ষণ দেখা যায়। অপরদিকে নববী আদর্শ অনুসরণের চিন্তাও মাথায় আসে না।

টিকাঃ
১৭৫. বুখারী, ২/৮৭৭।
১৭৬. মিশকাত, ২/৩৭৫।

📘 গুনাহমুক্ত জীবন 📄 নারীদের চুল

📄 নারীদের চুল


চুল নারীদের ভূষণ। শরীয়ত মাথার চুলকে নারীদের সৌন্দর্য সাব্যস্ত করেছে এবং নারীদের চুল মুড়াতে নিষেধ করেছে। এক হাদিসে এসেছে,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تَحْلِقَ الْمَرْأَةُ رَأْسَهَا.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের মাথার চুল মুড়াতে নিষেধ করেছেন।

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব দুররে মুখতারে এসেছে, স্বামীর অনুমতিসাপেক্ষে নারী নিজের মাথার চুল কাটলেও গুনাহগার ও অভিশপ্ত হবে। কারণ সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির কথা মান্য করা যায় না।

নারীদের চুল কাটার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো, এ কাজের মাধ্যমে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হবে, যা নারীদের জন্য নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারীকে অভিশাপ দিয়েছেন।

উপরিউক্ত বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, আজকাল নারীদের চুল কাটার যে ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে হারাম। যেমন পুরুষদের জন্য দাড়ি কাটা হারাম, অনুরূপ নারীদের জন্য চুল কাটা হারাম। গোটা পৃথিবীর মানুষ এই কাজকে নির্লজ্জতা না বললেও আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে তা লজ্জাহীনতার অন্তর্ভুক্ত। সর্বদা এ কাজ থেকে নিজেকে এবং পরিবারের সবাইকে বাঁচানো উচিত।

টিকাঃ
১৭৭. নাসাঈ, ১/২৭৫।
১৭৮. দুররে মুখতার, ৬/৪০৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px